Advertisement
E-Paper

পিটুলি খাই, ‘দুধ’ চেঁচাই

কী বিপদে না পড়লাম! যারা মোদীর এই নোট বাতিলের যাত্রাপালার পক্ষে, তারা সব্বাই হয়ে গেল বিজেপি। আর যারা বিপক্ষে, সব্বাই হয়ে গেল তৃণমূল। আমরা পড়ে রইলাম মাঝামাঝি, ঝুলন্ত, ঝুল।

শেষ আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০১৬ ০০:০০

কী বিপদে না পড়লাম! যারা মোদীর এই নোট বাতিলের যাত্রাপালার পক্ষে, তারা সব্বাই হয়ে গেল বিজেপি। আর যারা বিপক্ষে, সব্বাই হয়ে গেল তৃণমূল। আমরা পড়ে রইলাম মাঝামাঝি, ঝুলন্ত, ঝুল। পাখার হাওয়ায় সিলিং-এর ঝুল যেমন অল্প অল্প নড়ে, তেমন একটু-আধটু চোপা করছি, ভান করছি যেন আমাদের ঘটেও বুদ্ধি খেলছে জিভে গজাচ্ছে চাড্ডি জ্বালাময়ী দড়াম, আমাদেরও আছে কর্মসূচি নেওয়ার ধক ও প্ল্যান। কিন্তু কী করব? মমতা আগেই এমন পালে হাওয়া লাগিয়ে বসে আছেন, এত দ্রুত উনি হইহইটা শুরু করে দিতে পারেন, তত দুদ্দাড়িয়ে আমাদের মিটিং-এর ঘরের তালা অবধি খোলা হয় না। কাজেই যত ক্ষণে উনি কোমর বেঁধে এটিএম-এর সামনে, তত ক্ষণে আমাদের ঢুলুন্তি মগজ সিধে হয়ে শুধু চোখ গোলগোলিয়ে দেখছে মাত্তর, লেনিনকে পেন্নাম ঠুকে প্রাথমিক গলা-খাঁকারিই শেষ হয়নি। আসলে, মার্ক্স এত বলে গেলেন, রিটায়ারমেন্টের বয়সটা বলে গেলেন না! পালাতেও পারছি না চোঁ-চাঁ, আবার যে তরুণ তুর্কিগুলো আসছে তাদের দেখে বেহ্মতালু শুকিয়ে যাচ্ছে। এরা আমাদের গামবাট ও একবগ্গা কমিউনিজম-প্রেম কিছুটা পেয়েছে বটে, ওরা সবাই জানে যে আমাদের নিন্দুকরা প্রত্যেকে শ্রেণিশত্রু আর পাতিবুর্জোয়া (মুদির দোকানের হিসেব না মেলাতে পারলে যেমন আমরা যোগটাকে বুর্জোয়া বলে গাল পাড়ি) কিন্তু মাঠে নেমে খেলতে কী করে হয়, সে বিষয়ে এক একটি প্রকৃষ্ট ঢ্যাঁড়স। মানুষকে টিক্কি ধরে টেনে আবার পার্টির দিকে কী করে নিয়ে আসতে হবে, সে বিষয়ে এক ছটাক আইডিয়া কারও পেটে পেটো মারলেও বেরবে না। আমরা বুড়োরা যে পরিপূর্ণ হেজে গেছি, আর কিচ্ছুই মৌলিক ও অভিনব বলে উঠতে পারব না, আমরাও জানি, ওরাও। কিন্তু ওদেরও এই বয়সে আশি-নব্বুই মার্কা সেনাইল ঘিলু, ভাবলে চোখগুলো আমাদের পতাকার মতো লাল লাল হয়ে যায়।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমরা ভেবে বের করলাম আশ্চর্য ঘনঘটা: বন্‌ধ ডাকব। লোকে শুনে শিউরে উঠল। আজি হতে শতবর্ষ আগেও এই পার্টি প্রতিবাদ করতে হলে সহস্র মাথা চুলকে সেই বন্‌ধই ডাকত, এখনও চিন্তা-দেওয়ালে মাথা কুটে সেই বন্‌ধই ডাকছে। কী ব্রেন-বিবর্তন! তবু এক সময় আমরা বন্‌ধ ডাকলে সবাই ঘরে সেঁধিয়ে থরথরিয়ে কাঁপত আর আমরা সন্ধেয় স্টেটমেন্ট দিতাম: মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত সাথ দিয়েছেন। এখন জমানা এমন ভয়াবহ পাল্টি খেয়েছে, আমাদের সভায় তিনটে খক্ক-কেশো বুড়ো ছাড়া কেউ বসে থাকে না, তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, কারণ সিরিয়াল দেখতে অসুবিধে হয়। তা হলে আমরা আজ বন্‌ধ ডাকলে সে হুমকিতে ঘরে বসে থাকবে কে? এই নখদন্তহীন সিংহ ফের গর্জন প্র্যাকটিস করছে, তার ঘ্রোঁয়াও ক্রমাগত মিয়াওঁ-এর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে— এ কথা ভেবে হাত-পা ছুড়ে খ্যাকখ্যাক হাসতে হাসতে যার পেটে খিঁচ লেগে গেছে, একমাত্তর সে। তাই বন্‌ধটা প্রচুর মাথা খাটিয়ে ডাকলাম, তৃণমূলের মিছিলের দিন। ভাবতে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে সত্যি। তৃণমূল লাখ লাখ লোক জোগাড় করবে, তাদের ঠেলায় শহর অচল হয়ে যাবে, গাড়িঘোড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে চাকায় গেঁটেবাত ফলাবে, ড্রাইভার প্যাসেঞ্জাররা মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে ন্যাড়া হয়ে যাবে, অবশ্য আসলে এ সব কিছুই হবে না কারণ লোকে পুরো অশান্তিটা আন্দাজিয়ে বাড়ি থেকেই বেরবে না, আর আমরা সন্ধেবেলা পায়রা-বকম ফুলিয়ে বলব, আমাদের বন্‌ধ সফল! মানে, বামফ্রন্ট তার কর্মকাণ্ডকে ব্যাকডোর দিয়ে ‘হুররে’ ট্যাগ লাগিয়ে আনবে, তৃণমূলের কোলে চেপে! যাদের আমরা উঠতে-বসতে গালাগালি দিই, তাদের ন্যাজ ধরে নতমুখে সবিনয়ে আমরা লঙ্কা পেরোব। লোকে বুঝবে, বামফ্রন্ট নিজেরা বন্‌ধ ডাকার সাহস পায় না, তাই শত্রুর ডাকা সেমি-বন্‌ধের দিনে ডিটো দিয়ে ‘আম্মো পারি’ বলে পিটুলিগোলা খেয়ে ‘দুগ্ধ’ হেঁকে টিভির সামনে পোজ দেয়। এই দিনও দেখতে হল বার্ধক্যকালীন, হা স্তালিন!

এর মধ্যে একটা ভাল, কাস্ত্রো মারা গেলেন। অ্যাট লিস্ট একখানা মিছিল করার ছুতো তো পাব। তাতে স্লোগান-টোগান দিয়ে সবাইকে চাগিয়ে তোলার একটা চেষ্টা করতে হবে, আইসিইউ-এর রোগীকে যেমন আত্মীয়রা দেখা করতে গিয়ে বলে, এই তো আর তিন দিন, তার পর বাড়ি, আর বাইরে গিয়ে চুকচুক করে মাথা নেড়ে শ্বাস ছাড়ে: ভেন্টিলেটরে দিল বলে! আমরা নিজেদের চোখ ঠেরে এমন একটা ভাব দেখাব, কাস্ত্রো খুব বড় লিডার ছিলেন বলে, তিনি মারা যেতেই নির্ঘাত আমাদের ভেতর থেকে এক-আধ জন খুব বড় লিডার গজিয়ে যাবে, লিডারের নিত্যতা সূত্রে। সেই কল্কি অবতার হুড়হুড় করে দুর্গাপুজোয় ও ক্রিসমাসে বসিয়ে দেবে লাল সালুর স্টল, আর যুবসমাজ মল-ঘুরন্তি ‘ক্যাপিটাল-দাস’ না হয়ে, সারা দিন দুলে দুলে পড়বে দাস ক্যাপিটাল-এর এসএমএস-ভার্সন, অমনি দিগন্তে উদিত হবে টকটকে নতুন দিন, আর প্রথম রিপু ‘কাম’ ছেড়ে হবে ‘উই শ্যাল ওভারকাম’!

Advertisement

কাস্ত্রো-মিছিলের স্লোগানও জম্পেশ হবে। ‘পৃথিবীতে কত শাস্ত্র, কিন্তু সবার সেরা কাস্ত্রো!’ বা ‘ঠুকুসঠাকুস কত দেখলাম, একটাই ব্রহ্মাস্ত্র— তিনি ফিদেল কাস্ত্রো।’ অথবা, ‘নোট বদলে কী করবে তোদের রাষ্ট্র, যদি বিপ্লবের নোটস দেন কাস্ত্রো!’ অবশ্য চটকদার অন্ত্যমিলে ভবী ভোলার নয়, কিন্তু আশায় চাষা-সম মরতে শেখা তো মানুষের কম অর্জন নয়! এখনও চোখ বুজলে দেখি, তেড়ে জনগণতান্ত্রিক ইয়ে হচ্ছে, আর পলিটবুড়ো সমিতির ট্যাবলো থেকে আমরা পুষ্পবৃষ্টি করছি। সত্যজিতের কী একটা ফিল্মে ছিল না, ধৃতিমান দাড়ি লাগিয়ে চে গেভারা হয়ে গেল! ইস, আমাদের কেউ দাড়ি রেখে হঠাৎ কাস্ত্রোর আত্মাটা গুপুস গিলে নিতে তো পারে! আরি দাঁড়াও দাঁড়াও, বুদ্ধ ক’দিন আগে দাড়ি রাখছিল না?

লেখাটির সঙ্গে বাস্তব চরিত্র বা ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত, কাকতালীয়

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy