জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভূতপূর্ব কাণ্ডের পর তর্কবিতর্ক কেবল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে সরকারি লাঠির সীমা আলোচনাতেই আবদ্ধ নেই। অন্য একটা বিষয়ও বিস্তর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশদ্রোহিতা, জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধতা, এবং সেই সূত্রে, ‘কাশ্মীর সমস্যা’ এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এমন একটা স্লোগান এই ঘটনার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে, যাকে কাশ্মীর উপত্যকায় দশকের পর দশক ধরে দাপিয়ে বেড়াতে দেখা গিয়েছে— ‘আজাদি’। আপাতত এটা একটা প্রতীকী মুখচলতি শব্দ, যাকে বলে ‘বাজ্-ওয়ার্ড’। দেশের দ্রুত-বর্ধমান অসহনশীলতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস যাঁরা করছেন, সাম্প্রদায়িক মানসিকতার প্রতিবাদ করছেন, তাঁদের সকলের কাছে ‘আজাদি’ শব্দটার ব্যঞ্জনাই এখন আলাদা!
এ দিকে, একটা বড় সময় ধরে কাশ্মীরিরা ভেবে এসেছে যে যতক্ষণ না তাদের ভাগ্যে ‘আজাদি’ জুটছে, তারাই এই শব্দটার মালিক। যেন তারাই শব্দটার ‘পেটেন্ট’ নিয়ে ফেলেছে। ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ তারা দেখল যে কাশ্মীরে যে অর্থে ‘আজাদি’ স্লোগানটা এত দিন ব্যবহৃত হয়ে এসেছে, তার থেকে অনেক আলাদা ভাবে, আলাদা অর্থে জেএনইউ-র ছাত্রছাত্রীরা সেটা ব্যবহার করছে। কানহাইয়া কুমার স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন যে তিনি বা তাঁরা ভারত ‘থেকে’ স্বাধীনতা চান না, ভারতের ‘মধ্যে’ স্বাধীনতা চান। কাশ্মীরের মানুষ নিশ্চয়ই এই স্লোগান এত দিন এই অর্থে উচ্চারণ করেননি! কানহাইয়া কুমার ‘আজাদি’-র যে কাশ্মীরি ব্যঞ্জনা অস্বীকার করলেন, সেটার কারণেই কিন্তু তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল। তিনটি নিউজ চ্যানেলে অনেক কারিকুরি-সমেত যে ভিডিয়োটি দেখানো হয়েছিল, তাতে তাঁর বিরুদ্ধে ‘কেস’ তৈরির জন্য তাঁর নিজস্ব ‘আজাদি’ স্লোগানটিকে কাশ্মীরি ‘আজাদি’ স্লোগান করে দেখানো হয়। এর থেকেই বিজেপির অবস্থানটা স্পষ্ট বেরিয়ে আসে। জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষের স্বাধীনতার যে আকুতি, তার প্রতি মৌখিক সহানুভূতি প্রকাশ করলেও ‘ভারতীয়’দের কী ভবিতব্য হতে পারে, সেটা বুঝিয়ে দেওয়াই তাদের এ বারের অবস্থান!
বাস্তবিক, বিজেপি সরকারের পক্ষে গোটা বিষয়টা দুমুখো তলোয়ারের মতো সুবিধেজনক। প্রথমত, যে সব কাশ্মীরিরা আফজল গুরুর মৃত্যু-বার্ষিকী পালন করার দুঃসাহস করে, তাদের একটা জবর ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়া গেল। দ্বিতীয়ত, বাম রাজনীতি-মনস্ক তরুণ নাগরিক সমাজের সবচেয়ে উর্বর আঁতুড়ঘর জেএনইউ-কেও আচ্ছা করে বুঝিয়ে দেওয়া গেল কত ধানে কত চাল। কানহাইয়া কুমার আজাদি-র যে ব্যাখ্যা দিলেন, সেটাও উল্লেখযোগ্য। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে অসম্ভব জোরালো বক্তৃতায় ‘আজাদি’ স্লোগান ও আজকের ভারতের বাস্তবের প্রেক্ষিতে সেই স্লোগানের নানা ধরনের অর্থ ও নিহিতার্থ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শোনা গেল। শোনা গেল, সামাজিক বৈষম্য, কিংবা জাতপাত-ঘটিত বৈষম্য, কিংবা সাম্প্রদায়িক বৈষম্য, সব কিছু কী ভাবে ক্ষমতার ব্যাকরণে এ দেশে শুদ্ধ স্বীকৃতি পেয়ে যায়, জাতীয়তাবাদের হিস্টিরিয়া কী ভাবে সংখ্যাগুরুবাদের অত্যাচারকে মহত্ত্বের আবরণে আবৃত করে। বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র দুই বছর। এর মধ্যে আর কোনও বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বর এত জোরে ধ্বনিত হতে শোনা যায়নি। কানহাইয়া কুমার এও জোর দিয়ে বলেছেন যে, কাশ্মীরে যে আজাদির দাবি ওঠে, তার সঙ্গে তাঁর ‘আজাদি’-র বিরাট ফারাক। এও বলেছেন, তাঁর আইকন কখনওই আফজল গুরু নন, বরং রোহিত ভেমুলা (হায়দরাবাদ ইউনিভার্সিটির আত্মঘাতী বামপন্থী দলিত ছাত্রটি)। বিজেপি যে ভাবে সমগ্র রাষ্ট্রশক্তিকে নিজেদের দলশক্তি বানিয়ে তুলছে, ভাবনাচিন্তার পরিসরকে কুক্ষিগত করছে, নরেন্দ্র মোদী ও আরএসএস-এর সেই ঐতিহ্য থেকে, বিজেপি-র ‘নতুন ভারত’ থেকে কানহাইয়া কুমার আজাদি চাইলেন।
একটা বিষয় লক্ষ করার মতো। কানহাইয়া কুমারের এই বক্তৃতা যদিও রাজনীতির নতুন ভাষা তৈরি করে ফেলল, অরবিন্দ কেজরীবালের আম-জনতার অধিকারের চ্যালেঞ্জের মতোই নরেন্দ্র মোদীর সামনে একদম নতুন, কড়া ধরনের একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল— তবু একটা বিভাজনরেখা কিন্তু খেয়াল না করে থাকা যাচ্ছে না। সেই বিভাজনরেখা কাশ্মীর এবং লিবারালিজম-এর মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। কানহাইয়া কুমার নিজেকে কাশ্মীরের সমস্যা থেকে যে ভাবে সরিয়ে নিলেন, তাতে কাশ্মীরি সমাজের একটা বড় অংশ তাই বিক্ষুব্ধ বোধ করছেন। তাঁরাও দ্রুত এই দুই আজাদি-র মধ্যে লাইনটা বেশ জোরে টেনে দিলেন। সঙ্গত ভাবেই। অথচ — ভারতের বাম মহল কিন্তু চির কাল জম্মু-কাশ্মীরের আঞ্চলিক স্বশাসনের কথা বলে এসেছে। কংগ্রেস বলে এসেছে, তারা ৩৭০ ধারা রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। এ সব কথা যতই বলাবলি হোক, এক বিন্দু সংশয় নেই, ভারতীয় রাজনীতির মেনস্ট্রিম ঘরানায় কাশ্মীরের সম্পর্কে কথা উঠলেই স্পষ্ট ঐকমত্য। কোনও রঙবেরঙ নেই। আফজল গুরুর ফাঁসির কথাই ধরা যাক না কেন। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিতদের লম্বা তালিকা থেকে যে ভাবে তাঁর নামটা হঠাৎ আগেভাগে বেছে নেওয়া হল, সে তো ভারতীয় সমাজকে খুশি করার জন্যই— যে সমাজ অব্যবহিত পরেই তাদের নেতা হিসেবে বেছে নেবে নরেন্দ্র মোদীকে। কাশ্মীর সংকট একান্ত ভাবেই কংগ্রেসের একের পর এক অন্যায় পদক্ষেপের ফল। ২০১০ সালে ১২০ জন নাগরিক যখন নিহত হলেন, জম্মু ও কাশ্মীরে সেই সময় ন্যাশনাল কনফারেন্স ও কংগ্রেসের যৌথ শাসন। তাদের সরকারের কাছ থেকে সে দিন একটাই কথা শোনা গিয়েছিল: জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সমর্থনে সওয়াল! ভারতীয় মেনস্ট্রিম রাজনীতি অসংখ্য বারের মতো সে দিনও দেখিয়ে দিয়েছিল, কাশ্মীরের প্রসঙ্গ এলেই কী ভাবে দ্বিচারিতা ছাড়া অন্য পথ খোলা থাকে না। আফজল গুরুকে ফাঁসি দেওয়া হল ‘জাতীয় আবেগকে সম্মান’ জানাতে। এ দিকে, তার কাছাকাছি সময়েই, তামিলনাড়ু মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার নির্দেশে রাজীব গাঁধীর ঘাতকদের মুক্তি দেওয়া হল। পঞ্জাবে বিজেপির জোটসঙ্গী অকালি দল কবে থেকেই বিয়ন্ত সিংহের ঘাতকদের জন্য ক্ষমা মঞ্জুরের দরবার করে আসছে। সংসদের উপর আক্রমণ যত গুরুতর, ভারতীয় সরকারের অভিধানে তো এই দুটি ঘটনার ভয়ংকরতাও তার থেকে কিছু কম হওয়ার কথা নয়!
কানহাইয়া কুমার তাঁর কাঙ্ক্ষিত আজাদি পাবেন কি না, দেখা যাক। যে বিক্ষোভ-বিস্ফোরণের মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি, গোটা দেশ জুড়ে সেই বিক্ষোভ বেশ কিছু কাল ধরেই আগ্নেয়গিরির মতো বিপজ্জনক হয়ে আছে। তবু, ভারতের সাধারণ পরিস্থিতি আর কাশ্মীরের আজাদি স্লোগানের মধ্যে তুলনা টানার চেষ্টাটা অন্যায়, ভিত্তিহীন। কাশ্মীরে যা ঘটেছে, ঘটছে, তার মূল কথাটা হল, বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে ওই অঞ্চলের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মতামত সম্পূর্ণ ভাবে পদদলিত হয়েেছ। তাদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাদের কথা বলতে দেওয়ার বা তাদের কথা শোনার কোনও জায়গাই রাখা হয়নি এই গণতান্ত্রিক দেশে। এটা না বুঝলে তাদের ‘আজাদি’ স্লোগানের জোর, বা তার গভীরতাটা উপলব্ধি করা মুশকিল। না, একেবারেই অস্বীকার করা যায় না যে, তাদের সেই স্লোগানের লক্ষ্য অবশ্যই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রশক্তি।
গত ২৫ বছর ধরে একটা জিনিস খালি চোখেই দেখতে পাওয়া সম্ভব: আজাদির স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে কাশ্মীরি সমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা কী ভাবে িববর্তিত, এমনকী আবর্তিত হয়ে চলেছে। এই সময়কালের মধ্যে কিছু কিছু সমাধানের চেষ্টা হয়েছে, যার ফলে ঘটনা অন্য দিকে মোড় নিলেও নিতে পারত। কাশ্মীরে এর মধ্যে নির্বাচন সংঘটিত হয়েছে। নির্বাচিত সরকার শাসন করেছে। এক-এক সময় যথেষ্ট পরিমাণ শান্তি বিরাজ করেছে। কিছু চাকরিবাকরি, কিছু রাজ্য স্তরের প্রজেক্ট হয়েছে। কিন্তু এ সব করেও আজাদি-র আগুন নেবানো যায়নি। বিশেষত, গত কয়েক মাসে যে ভাবে কাশ্মীরের সমাজটাকে পাল্টাতে দেখছি আমরা, কাশ্মীরি যুবসমাজকে চোখের সামনে যে ভাবে মাঝে মধ্যেই হতাশা আর ক্রোধে ফুঁসে উঠতে দেখছি, তাতে পরিস্থিতি একটা নতুন মোড় নিচ্ছে ভাবলে বাড়াবাড়ি হবে না। এই যেমন, সংঘর্ষে হত জঙ্গির সমাধিকৃত্যে শ্রীনগরকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখেছি কি আগে? হাজারে হাজারে মানুষ এসেছেন শেষযাত্রায় সামিল হতে। ব্যাপারটা বেশ উদ্বেগজনক। কাশ্মীরিরা কিন্তু জঙ্গি কার্যকলাপ সমর্থন করা এক রকম বন্ধ করে দিয়েছিল, এমনকী প্রকাশ্যে জানানো হয়েছিল যে হিংসাত্মক পথে সমাধানের চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু আজ বোধহয় তাদের মনে হচ্ছে, চার দিকে যে হিংসার তাণ্ডব চলছে, সেখানে তাদের নিজেদের এই পথে শামিল না হওয়াটা বোকামি। মানুষ এখন নিজের বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে গোলাগুলি চলতে দিতেও ইতস্তত করছে না। ভিন্ দেশের নিহত জঙ্গির দেহের উপর দাবি জানাতে দলে দলে রাস্তায় বেরিয়ে আসছে। অর্থাৎ কাশ্মীর আবার একটি সন্ধিক্ষণে। এই হতাশা, রাগ, ক্ষোভ: সব কিন্তু ওই একটি স্লোগানের সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গি ভাবে যুক্ত— আজাদি!
আর একটা কথা। জেএনইউ কাণ্ডের পর কাশ্মীরে কানহাইয়া কুমারের মুক্তির দাবিতে একটা অভূতপূর্ব স্ট্রাইক দেখা গেল, অনেকে সেই খবর জেনে ফেলেছেন। স্ট্রাইক-এর সময়ে কিন্তু আর একটি দাবিও পাশাপাশি উঠেছিল। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এস এ আর গিলানির মুক্তির দাবি। যাঁরা এতে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের একটা অংশ সোজাসুজি বিচ্ছিন্নতাবাদী। আজাদির আলাদা ব্যাখ্যা, আলাদা মর্ম ইত্যাদি মনে না রেখে তাঁরা খোলাখুলি কানহাইয়া কুমারের সঙ্গে নিজেদের ‘আইডেন্টিফাই’ করছিলেন, সম্ভবত এই ভেবে যে এ ভাবে ভাবার মতো মানুষগুলোও আজ দেওয়ালে পিঠ দিয়ে লড়ছেন। এর সঙ্গে আর একটা ছবি মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। আজ অবধি কিন্তু দিল্লিতে একটি প্রতিবাদ দেখা যায়নি গিলানির মুক্তির দাবিতে। একটাই কারণে। তিনি কাশ্মীরি।
শ্রীনগর থেকে দিল্লি: আজাদির এই নানা মত, নানা রঙ কেবল একটাই কথা বলে দেয়। আজাদি-র বিভিন্ন প্রাসঙ্গিকতা, বিভিন্ন দাবি নিয়ে আলোচনার দরকারটা কিন্তু থাকছেই। সেটাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।