• দেবোত্তম চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

আপনার অভিমত

রবীন্দ্রদূষণ, শ্রীমান রায় ও কালচারকাকুদের কীর্তিকলাপ

যৌন উত্তেজনাবর্ধক তেল বা ক্যাপসুলের বিজ্ঞাপন দেখানোর সময়ে এই স্বঘোষিত কালচারকাকুরা কোথায় ছিলেন? তাঁরা কোথায় ছিলেন যখন একাধিক রাজনৈতিক নেতা ধারাবাহিক ভাবে অহরহ কুকথার স্রোত বইয়ে দিয়েছেন ও দিচ্ছেন?

RabindraBharati

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্তোৎসব পালন নিয়ে থানা-পুলিশ, উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়ায় বসে যাওয়া খাপ পঞ্চায়েত সমূহে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি হিসাবে একের পর এক নিদান হাঁকা, রোদ্দূর রায়ের গ্রেফতারির দাবি, উপাচার্যের পদত্যাগপত্র প্রেরণ, কৃতকার্যের জন্য মেয়েদের ক্ষমাপ্রার্থনা— সব মিলিয়ে বাংলা জুড়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড।

বসন্তোৎসব চলাকালীন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর জুড়ে সাউন্ডবক্সে যখন উচ্চস্বরে বাজছে রোদ্দূর রায়ের গান ‘যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে’ এবং সেই গানের সঙ্গে একদল ছাত্রছাত্রী উদ্দাম নৃত্যসহকারে প্রকাশ করছে তাদের বাঁধভাঙা উল্লাস, তখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভাইরাল’ হয়ে যায় কয়েকটি ছবি। একাধিক ছবির মধ্যে যে ছবিটিতে চার জন তরুণী তাদের পিঠে ওই গানের চারটে শব্দ লিখেছিল— যার একটি সমাজে বহুল ব্যবহৃত হলেও ‘অপশব্দ’ হিসেবে পরিচিত, সেই ছবিটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে সঙ্গে সঙ্গে।

কেন আমি গানটিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত না বলে ‘রোদ্দূর রায়ের গান’ বলছি, তার কারণ আছে। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে ১৯২২ সালে এলিয়ট যখন ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’ কবিতাটি শুরু করেন ‘April is the cruellest month, breeding/Lilacs out of the dead land’ লিখে, তখন ইংরেজ কবি চসারের ‘দ্য প্রোলোগ টু দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস’ (The Prologue to the Canterbury Tales) থেকে নেওয়া প্রথম দুটি পঙ্‌ক্তিকে তিনি এমন দ্যোতনাবাহী করে তোলেন যে সেটি আর চসারের কবিতা থাকে না, এলিয়টেরই কবিতার অংশ হয়ে যায়। একই ভাবে বিষ্ণু দে যখন ‘ক্রেসিডা’-য় ‘কাল রজনীতে ঝড় হয়ে গেছে রজনীগন্ধা বনে’ রবীন্দ্রপঙ্‌ক্তিটি ব্যবহার করেন; সমর সেন যখন ‘মৃত্যু’ কবিতায় লেখেন ‘হে শহর হে ধূসর শহর!/ কালিঘাট ব্রিজের উপরে কখনো কি শুনতে পাও/ লম্পটের পদধ্বনি/ কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও/ হে শহর হে ধূসর শহর!’— তখন সেটিও সম্পূর্ণত বিষ্ণু দে কিংবা সমর সেনের মৌলিক কবিতা হয়ে যায়, কোনও ভাবেই রবীন্দ্রনাথের একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয় না। একই যুক্তিক্রমে রবীন্দ্রভারতীতে মেয়েদের পিঠে লেখা শব্দগুলো রোদ্দূর রায়েরই, রবীন্দ্রনাথের নয়। এখন সেই গানটিতে কাঙ্ক্ষিত দ্যোতনা সৃষ্টি হয়েছে কি না, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ।

সত্যি কথা বলতে এই কাণ্ডের আগে রোদ্দূর রায়ের নাম কিংবা তাঁর দু-একটা গান যে শুনিনি তা নয়, কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে তেমন ভাল লাগেনি। সে না লাগতেই পারে কিন্তু তাই বলে সে গান অন্য কারও ভাল লাগা উচিতই নয় এমন মনোভাব পোষণ তো করিই না, সমর্থনও করি না। আমি ভলতেয়ারের জীবনীকার ইভলিন বিয়াত্রিচে হলের ‘I disapprove of what you say, but I will defend to the death your right to say it’ বাণীতে বিশ্বাসী। সর্বোপরি, রোদ্দূর রায় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে তাঁর গানটি বাজাতে বলেননি, মেয়েদের পিঠে আবির দিয়ে সে গানের কলি লিখতে বলেননি, এমনকি লিখলেও সে ছবি ফেসবুকে ছড়াতে বলেননি। কাজেই শুধু গান গাওয়ার কারণে তাঁকে এই কাণ্ডে গ্রেফতার করার দাবি হাস্যকরই নয়, সাংস্কৃতিক মৌলবাদও বটে। এমনিতেই রাষ্ট্র জুড়ে ধর্মীয় মৌলবাদের রমরমা চলছে দীর্ঘ দিন ধরে। শাসককে প্রশ্ন করলেই জুটছে ‘আর্বান নকশাল’ কিংবা ‘দেশদ্রোহী’র তকমা। সেখানে এক জন মানুষ কী গান গাইবেন, কেমন ভাবে গাইবেন, কখন গাইবেন সে বিষয়ে ফতোয়া জারি করার কোনও অর্থ নেই। তা ছাড়া, রবীন্দ্রনাথ এত পলকা নন যে, সামান্য রোদ্দূর রায় নামক ফুলের ঘায়ে মুচ্ছো যাবেন!

এখানে আর একটা বিষয়ও লক্ষ্য করার মতো। সেটা হচ্ছে ওই দিন একই চত্বরে অনেক তরুণও তাদের বুকে একাধিক ‘অপশব্দ’ লিখেছে, সে সব সোশ্যাল মিডিয়াতে এসেছেও বটে, কিন্তু তা নিয়ে সমাজের মরাল মেসোমশাইদের কোনও হেলদোল চোখে পড়েনি। তাঁদের যাবতীয় আক্রোশ আবর্তিত হয়েছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই নির্দিষ্ট তরুণী চতুষ্টয় ও পরবর্তী কালে মালদহের বার্লো হাইস্কুলের মেয়েদের নিয়ে। ভাবটা এমন— একই কাজ ছেলেরা করলে সাত খুন মাফ। কিন্তু মেয়েদের এ কাজ মানায় না। সমাজের সর্বক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যের এই ধ্বজাধারী মরাল-মেসোরা ১৯১৬ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’ সম্ভবত পড়েও দেখেননি! পড়লে সেখানে গুরু লীলানন্দ স্বামীর নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে শচীশের সঙ্গে জোরে জোরে ‘নিষিদ্ধ’ পুস্তক পড়তে ব্যস্ত দামিনীকে দেখতে পেতেন।

যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিকৃতি নিয়ে কালচারকাকুদের এত হাহাকার, তাঁরা বেমালুম ভুলে গিয়েছেন কিছু দিন আগে মুক্তিপ্রাপ্ত অঞ্জন দত্তের ‘বং কানেকশন’ চলচ্চিত্রটির কথা, যেখানে ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ গানটির আগে ‘উলালা’ শব্দপ্রয়োগ কিংবা গানটিকে দ্রুত তালে গাওয়ার অপরাধে কেউই অভিযুক্ত হননি। শচীন দেববর্মণ কিংবা রাজেশ রোশন একাধিক হিন্দি গানে রবীন্দ্রনাথের সুর ব্যবহার করলেও গেল-গেল রব ওঠেনি। দিনের পর দিন একাধিক সর্বভারতীয় বাংলা চ্যানেলে খবরের ফাঁকে ফাঁকে যৌন উত্তেজনাবর্ধক তেল বা ক্যাপসুলের বিজ্ঞাপন দেখানোর সময়ে এই স্বঘোষিত কালচারকাকুরা কোথায় ছিলেন? তাঁরা কোথায় ছিলেন যখন একাধিক রাজনৈতিক নেতা ধারাবাহিক ভাবে অহরহ কুকথার স্রোত বইয়ে দিয়েছেন ও দিচ্ছেন? সদ্য ঘটে যাওয়া দিল্লি গণহত্যার সময়ে যখন রাষ্ট্রের পুলিশবাহিনী মৃত্যুপথযাত্রী ভারতীয় নাগরিকদের জোর করে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বাধ্য করেছিল, তখন সে কাজ তাঁদের অশ্লীল মনে হয়নি?

যাঁর গান নিয়ে এত অশ্লীলতার অভিযোগ, সেই রবীন্দ্রনাথ মেয়েদের প্রকাশ্যে নৃত্য বা নাট্যাভিনয়ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও তাঁর জীবদ্দশাতেই নীতিবাগীশ বাঙালি সমাজের মুরুব্বিদের কাছে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে রমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় লেখেন, “শান্তিনিকেতনের মেয়েদের লইয়া রবীন্দ্রনাথ যে নাট্যাভিনয় করেন, তাহাতে নায়কের অংশগ্রহণ করেন তিনি নিজেই। চুলদাড়িতে কলপ মাখিয়া কচি সাজিয়া তিনি কখনো কিশোরী কুমারীর সঙ্গে নাট্যাভিনয় করেন। অভিনয়ে কখনো বা উদ্ভিন্নযৌবনা মহিলাকে অভিনেতার বাহুপাশে আবদ্ধ ও আলিঙ্গন করিতে হয়। কিন্তু কুমারী মহিলার সহিত এ ভাবে অভিনয় করিয়া কোন সূক্ষ্ম রসতত্ত্বের বিশ্লেষণ যে করা হয় তাহা আমার ন্যায় লম্পটও বুঝিতে সক্ষম হয় নাই।” হায়, ৯০ বছর পেরিয়ে গেলেও নীতিবাগীশ বাঙালিদের সামান্যতম পরিবর্তনও হয়নি! 

বহু দিন আগে ১৩২২ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ছাত্রশাসনতন্ত্র’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন— “কিন্তু ছাত্রকে জেলের কয়েদি বা ফৌজের সিপাই বলিয়া আমরা তো মনে ভাবিতে পারি না। আমরা জানি, তাহাদিগকে মানুষ করিয়া তুলিতে হইবে। মানুষের প্রকৃতি সূক্ষ্ম এবং সজীব তন্তুজালে বড়ো বিচিত্র করিয়া গড়া। এইজন্যই মানুষের মাথা ধরিলে মাথায় মুগুর মারিয়া সেটা সারানো যায় না; অনেক দিক বাঁচাইয়া প্রকৃতির সাধ্যসাধনা করিয়া তার চিকিৎসা করিতে হয়।... ছাত্রদের ভার তাঁরাই লইবার অধিকারী যাঁরা নিজের চেয়ে বয়সে অল্প, জ্ঞানে অপ্রবীণ ও ক্ষমতায় দুর্বলকেও সহজেই শ্রদ্ধা করিতে পারেন; যাঁরা জানেন, শক্তস্য ভূষণং ক্ষমা; যাঁরা ছাত্রকেও মিত্র বলিয়া গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হন না।”

এ কথা কেউই বলছেন না যে, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো ঠিক কাজ করেছে। মুহূর্তের অসতর্কতায়, হয়তো উদ্দেশ্যহীন ভাবে কিংবা হয়তো সচেতন ভাবেই চমক সৃষ্টির জন্য তারা এমন একটা অনভিপ্রেত কাজ করে ফেলেছে। আজ প্রবল সামাজিক চাপের মুখের দাঁড়িয়ে এই অপরিণতমনস্ক ছেলেমেয়েগুলো যদি আত্মহননের পথ বেছে নেয়, তবে তার দায়ভার আমরা নিতে রাজি তো?

(উদ্ধৃতির ভিতর বানান অপরিবর্তিত)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন