তোমরা ডেঙ্গু পালটে ডেঙ্গি লিখবে, আর আমরা নিজেদের পালটে নেব না? এমনিতেই তো আজকাল আর ভুঁড়িতে বা থাইতে কামড়াই না, অতি সূক্ষ্ম টার্গেট প্র্যাকটিস করে হুল ফোটাই কনুইয়ে, হাঁটুতে, অর্থাৎ খোঁচালো ছুঁচলো সরু হেড়ো পয়েন্টে, যেখানে প্রকাণ্ড চড় বাগাবার সম্ভাবনা কম, বুল’স আই হওয়া পেল্লায় শক্ত। তার ওপর অন্য মশাদের পেরিয়ে আমি আবার ছ’কাঠি এক্সট্রা, আলট্রা-কুলীন। সিরিয়ালের নায়িকা যেমন প্লাস্টিক সার্জারি করে নয়া এপিসোডে ফিরে আসে মুখ চোখ মায় ফিগার অবধি বদলে, আমি নিজেকে দিয়েছি সেই নিপুণতম মেক-ওভার। ‘আরে দিওয়ানো, আমাকে চেনো?’ বলে পোজ মেরে দাঁড়াব, আর তুমি ভুরু কুঁচকে মগজ হাতড়াতে শুরু করেছ কি করোনি, একটি চকিত সিরিঞ্জে তোমায় প্লেটলেটকে ছক্কা মেরে, ধাঁ।
ডাক্তাররা তো আত্মবিশ্বাস হারিয়ে একেবারে ভিজিট কমিয়ে দেবে ভাবছে। হবে না? একটা বোলারের তন্নতন্ন ভিডিয়ো ক্লিপিং দেখে, সবে হাঁপ ছেড়ে ভেবেছ, যাক, ঘাঁতঘোঁত বোঝা গেল, এ বার নিশ্চিন্তে স্টান্স, তার পরেই দেখলে, ই কী, এই ম্যাচে সে পেস-ই করছে না, ছোট রান-আপে স্পিনের জন্যে তৈরি! কখনও দেখছ লক্ষণ ডেঙ্গির, কিন্তু ব্লাড টেস্টে কিস্যু নেই, কখনও দেখছ টেস্টে ডেঙ্গি, কিন্তু লক্ষণে টি-টোয়েন্টি। দুঃস্বপ্নের বাবা! এগজামে বসে থরথরিয়ে দেখছ, একটা কোশ্চেনও কমন পড়েনি! হুল ফুটুক না ফুটুক, আজ ধুন্ধুমার!
এমন স্তরে উঠে গেছি, অন্য মশারা অবধি আমাদের পানে তাকিয়ে স্ট্রেটকাট মুচ্ছো। আমরা নাইট ডিউটি করি না। আরে ছোঃ, পাঁচপেঁচি মশার মতো সেই সূর্যাস্ত হতে বেরোব, ভোরে বাড়ি ফিরব? আমি কি সিঁদেল চোর? আমাদের কাজ ভদ্দরলোকের মতো, সকালে। তকতকে দিনের আলোয় বুক ফুলিয়ে কাণ্ড সারব, কিছু করতে পারলে, করে নে। অবশ্য শুধু উচ্চণ্ড রেলা নয়, এর পিছনে বোম্বাস্টিক বুদ্ধিও মিশে আছে। মানুষ রাত্তিরের দিকটায় সাতাশি গন্ডা বিপদের ব্যাপারে সাবধান হয়ে ওঠে। দরজায় তিরিশটা খিল আর ছিটকিনি লাগায়, জানলায় পরদা টানে, বারান্দায় কেউ ঘাপটি মেরে বসে আছে কি না ঝুঁকে ও হামাগুড়ি দিয়ে খোঁজে। তার ধারণা, বিশ্বের যত রকম ঝামেলা নিশিকালীন ছোবল মারে। কন্ধকাটা, অ্যাসিডিটি, ভূমিকম্প। বোধহয় আদিম মানুষকে ঠিক অন্ধকার বুঝে ম্যামথরা শুঁড়ে টেরোড্যাকটিলরা ঠোঁটে আর টি-রেক্সরা থাবায় নিয়মিত তুলে নিয়ে যেত। সমষ্টিগত নির্জ্ঞানে রাত্তির হলেই এখনও গাঁটে গাঁটে বিনাশ-ভয় তড়াক মারে।
এই বার কথা হল, গেরস্থ যখন দশ গুণ সতর্ক হয়ে টালুম-টালুম চোখে সার্চলাইটের মতো ঘুরন-জাগ্রত, আর অন্তর্গত সাইরেনের সুইচের আধ ইঞ্চি ওপরে তার সত্তার আঙুল থরহরি ও রেডি, তখন তাকে অ্যাটাক করার মতো গবেট কেউ হয়? যে কোনও যুদ্ধ জিততে গেলে, শত্রুর দুর্বলতাটা আগে স্পট করতে হয়। সকাল নাগাদ, জাস্ট আলো আছে বলেই, মানুষ নিশ্চিন্ত হয়ে ওঠে অনেকটা। তার মনে হয়, যাক বাবা, হার্ট অ্যাটাকের সময় পেরিয়ে গেছে। বোকার মতো সিদ্ধান্ত, কারণ বাঘকে পষ্ট দেখতে পেলেই বাঘের দাঁতের ধার কমে যায় না। কিন্তু মানুষ জাতটা তো আসলে কুসংস্কারের পিন্ডি। সকাল হতেই সে ইতিবাচকতার ফুসকুড়িতে হাত বুলিয়ে, উঠে-হেঁটে বেড়ায়। খালি গায়ে কাগজ পড়ে, হাফহাতা ফতুয়া বাগিয়ে বাজার করে, আটপৌরে সাজে রান্নাঘরে ঢোকে, বাচ্চাগুলো তো চান করে জামাকাপড় পরার আগে তিন পাক তুড়ুক নেচে নেয়। মোদ্দা কথা, ওঠো ওঠো হে বিফলে প্রভাত বয়ে যায় ও দিকে স্কুলগাড়ি এসে গেছে হায়। বিপদ কে ত্রিসীমানায়?
ঠিক তখনই, ‘শত্রু যখন আশঙ্কাহীন, তখনই সে সবচেয়ে নিরস্ত্র’ মোটো মেনে, আমি ফিল্ডে নামি। ফাঁকা মাঠ। যত্ত খুশি গোল দাও। দুপুর-বিকেল অবধি চুটিয়ে ও নিশ্চিন্তে কাজ সেরে, দুরন্ত সফল শিফ্ট সেরে যখন বাড়ি ফিরছি, পায়ের ওপর পা তুলে সিরিয়ালে খুদে গায়কের কেরামতি দেখব আর চাকরকে দিয়ে পিঠে সাদা দাগগুলোতে সুড়সুড়ি বুলিয়ে নেব, তখন আমার হাঁদা জাতভাইগুলো সবে অফিস শুরু করে। আমার দিকে অবাক হয়ে তাকায়। ওরে হিংসুটেরা, দেখলে হবে, চর্চা আছে!
নোংরা জলে অবধি ফুটি না। ও সব তো ম্যালেরিয়া-মশার মতো নিঘিন্নে গুষ্টির কাজ। আমরা ডিম পাড়ি ও ফুটে বেরোই তকতকে পরিষ্কার জলে। ক্রাইম করব বলে নোংরা থাকব কেন? গডফাদারে কারা সব কোট-প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়িয়েছে! মার্লন ব্র্যান্ডো, আল পাচিনো! তাদের একটি কাফ লিংক’ও তেলচিটে হয়? আমাদের তদন্ত-টিমও ঝক্কাস। খোঁজ এনেছে, সব ব্যাটা ঘরে ঘরে এসি লাগাচ্ছে। এ দিকে গাছ নিয়ে আদিখ্যেতাও হেভি বাড়ছে। এক চিলতে বারান্দা নামের সিমেন্ট পেলাম তো আর দেখতে হবে না, বন্য বন্য এ অরণ্য ভাল। টবে টবে গোটা বাড়ি জল দিয়ে যাচ্ছে। ফোটোসিন্থেসিস করে করে গাছগুলো হাঁপিয়ে একসা! আর চৌবাচ্চা, বালতি তো টইটম্বুর বটেই। কখন জল চলে যাবে, আর পাম্প চালাবার জন্যে দারোয়ানজিকে বলতে গিয়ে শোনা যাবে, এইমাত্তর দেশের বাড়ি চলে গেল, ভাগ্নির বিয়ে। তার চেয়ে বাবা সব ভরে রাখ। আর আমার ডিম পাড়ার ফেস্টিভ্যাল স্পনসর কর!
মুখ্যু মানুষকে ঘোল খাওয়াতে খাওয়াতে এ বছরটা সত্যিই মনে হচ্ছে, পূর্বপুরুষদের রক্তাক্ত মার্ডারগুলোর, কিছুটা হলেও শোধ নিতে পারছি। আসলে জীবন যে হিন্দি সিনেমাই, শেষ অবধি ঝাড়-খাওয়া লোক ফিরে আসবেই অধিকতর ঝাড় মুষ্টিতে নিয়ে, সেই সেন্সটা ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে মনুষ্যসমাজ থেকে। মানে জাস্টিসের ধারণাটা আর কী। সেইটা যখন অ্যাদ্দিন গজাল মেরে তোদের মগজে ঢোকানো গেলই না, ভগবান আমাদেরই পাঠালেন হুল দিয়ে মজ্জার মধ্যে সেঁধিয়ে দিতে!
লেখাটির সঙ্গে বাস্তব চরিত্র বা ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্ত অনিচ্ছাকৃত, কাকতালীয়