ফাঁ দ পেতে গোধিকা (গোসাপ) নিয়ে বাড়িতে এসেছেন ব্যাধ কালকেতু, গোধিকার রূপ ধরে দেবী চণ্ডী ঘরে এসে পরমাসুন্দরী নারীর রূপ নিয়ে ফুল্লরার মুখোমুখি। ভীতত্রস্ত ফুল্লরা, এ কি তবে সতীন এল? কেঁদেকেটে চোখ লাল করে ঘর থেকে বেরিয়ে পথে এসে বিস্মিত কালকেতুর মুখোমুখি: ‘শাশুড়ী ননদী নাহি নাহি তোর সতা (সতীন)/ কার সঙ্গে দ্বন্দ্ব করি চক্ষু কৈলি রাতা (রক্তবর্ণ)।’ তবু ফুল্লরা ব্যাধিনী, নিজের মতো করে শিকার করে জীবন কাটাতে পারেন, তাঁর ক্ষুন্নিবৃত্তির অভাব হয়তো হবে না। আর শাশুড়ি নিদয়া, কালকেতুর মা, ব্যাধবধূ বলেই জানেন ফুল্লরাও স্বাধীন তাঁর জীবিকা নিয়ে। মা দুর্গা যদি ফুল্লরার তুলনায় তথাকথিত উচ্চবর্ণের পরিবারেই বধূ হতেন, যদি সে বাড়িতে থাকতেন শাশুড়ি, পিসিশাশুড়ি বা মাসিশাশুড়ি, তা হলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে একলা বাপের বাড়ি আসার সাধ্য কি তাঁর থাকত? আর গ্রামদেশ হলে তো জ্ঞাতি-আত্মীয়ারা থাকতেন ঘিরে। তাঁরা কি এই অসৈরণ সহ্য করতেন? আমরা অনেকেই হয়তো উত্তরটা জানি, কিন্তু এটাও যখন গবেষকরা তথ্যের সমর্থন দিয়ে বলেন, তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
আমাদের মা দুগ্গার দুঃখ জানানোর জন্য আছে শুধু জয়া-বিজয়া— ছেলেমেয়ে, বর, আর তাদের এক গন্ডা পুষ্যিকে কী দিয়ে খেতে দেবেন! শিবঠাকুর সংসারের কিছুই দেখেন না। এক দিন ভিক্ষে করে এনে নেশা করে ঘুমোন আর হুংকার ছাড়েন, কেন রোজ ভাল ভাল খেতে পাচ্ছেন না। এ তো আমাদের চার পাশের বহু পরিবারেই ঘটছে, যেখানে এক জন পুরুষ সরকারি ভাবে কর্তা, কিন্তু বাস্তবে তা চলে পরিবারের মেয়েটির পরিচালনায়। শিবঠাকুরের পরিবারও সেই রকম। অর্থাৎ, খাতায়-কলমে দুর্গা কর্তা না হলেও নারী-পরিচালিত পরিবারের সার্থক প্রতিনিধি। তবে শিব স্বয়ম্ভূ, থাকেন হিমালয়ের গহনে একগাদা সাপখোপ, ভূতপ্রেত নিয়ে, পরিবারে নেই আর কোনও নারী বা পুরুষ আত্মীয়, এমনকী জ্ঞাতিগোষ্ঠীও। ‘কি জানি তপের ফলে বর মিলেছে হর। পাট-পড়শী নাহি আসে দেখি দিগম্বর।।’ মা দুগ্গা হাঁপিয়ে ওঠেন। সম্বচ্ছরে মায়ের কাছে এসে দুটো সুখ-দুঃখের গপ্পো করে মায়ের হাতে রাঁধা ভাত পাত পেড়ে খেতে চান, বলছেন কবিকঙ্কণ।
কিন্তু এই নিতান্ত স্বাভাবিক ইচ্ছেটাও সম্ভব হত না, যদি পরিবারে থাকতেন কোনও বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা। উত্তর ভারতে তো নিয়ম করে বিয়ে হয় দূরে, যাতে বাপের বাড়ি যাওয়ার প্রশ্ন কখনও না-ওঠে। বাড়ির বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে সাত দিন বাপের বাড়ি গিয়ে থাকবে, এটা শুধু উত্তর ভারত নয়, তথাকথিত সমতার বাংলাতেও অনেক পরিবারের মহিলা অভিভাবকের কাছে নিতান্ত অন্যায় শখ। বউ বাপের বাড়ি গিয়ে ফুর্তি করলে বাড়ির কাজগুলো করবে কে? ছেলের দেখভালই বা কে করবে? এমনকী কাজে যদি নাও আটকায়, যাওয়ার অধিকারটাই থাকা উচিত নয় বলে অনেকের মনে হয়। তাই গত দু’দশকে বিবাহিত মেয়েদের স্বাতন্ত্র্যের সূচক হিসাবে বহু গবেষণা, দোকানে যাওয়া, ডাক্তার দেখানো, চেনাজানা বা বাপের বাড়ি যাওয়া অথবা বাইরে কাজ করার মতো বিষয়ে বড়দের অনুমতি লাগে কি না, এ রকম বিষয়কে তাদের কাজের অন্তর্ভুক্ত করছে। যেখানে অনুমতি লাগে না, সেখানে স্বাতন্ত্র্য স্বাভাবিক ভাবেই বেশি।
২০০৫ সালে আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নয়া দিল্লির ন্যাশনাল কাউন্সিল অব অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক রিসার্চ ১৫-৪৯ বছরের বিবাহিত ভারতীয় মেয়েদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে প্রায় তেত্রিশ হাজার নমুনার এক সমীক্ষা করে। সেই নমুনায় প্রায় এক হাজার মেয়ে ছিলেন যাঁদের স্বামীরা বাইরে কাজে গেছেন। স্বামীর সঙ্গে থাকেন, এ রকম স্ত্রীদের ক্ষেত্রে ৩৪ শতাংশ পরিবারে এক বয়স্ক মহিলা সদস্য রয়েছেন। কিন্তু স্বামী বাইরে কাজ করতে গেছেন এ রকম ৫৬ শতাংশ পরিবারে হয় কোনও বয়স্ক মহিলা সদস্য রয়েছেন বা তাঁরা কোনও জ্ঞাতি বা প্রসারিত পরিবারের সঙ্গে থাকেন। এটা সব বয়সের মেয়েদের গড় মান। যদি বউটির বয়স কম হয়, তা হলে তাঁর কোনও বয়স্ক মহিলা সদস্য বা প্রসারিত পরিবারের সঙ্গে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। মেয়েটি যদি ছেলেমেয়েদের নিয়ে একলা থাকার সুযোগ পান, পরিবারের ছোটবড় অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর জন্মাচ্ছে।
বাইরে কাজ করতে যাওয়া অনুপস্থিত স্বামীদের তুলনা শিবঠাকুরের মতো নেশাখোর নিষ্কর্মা বরের সঙ্গে নয়। তাঁরা ঘর ছেড়েছেন রোজগারের প্রয়োজনে। কিন্তু স্বামীর অনুপস্থিতিতে বউটির ওপর বাড়ির মহিলা অভিভাবকের যে নিষেধের বেড়ি দেখা যায়, সেই একই ছবি কিন্তু পাওয়া যাবে স্বামী উপস্থিত, কিন্তু পরিবারটি বউটি একাই দেখেন, এ রকম ক্ষেত্রেও। কারণ এ ক্ষেত্রে স্বামীর উপস্থিতিতেও প্রসারিত পরিবার বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা আত্মীয়র নজরদারি, আগের সূচকগুলির ভিত্তিতে বউটিকে নানা ভাবে নিয়ন্ত্রিত করছে। হয়তো সেই বয়স্ক মহিলা অভিভাবকরা স্বামীর অনুপস্থিতিতে বাড়ির বউটির ওপর নজরদারির বাড়তি শিকল চাপিয়ে দেন, যাতে প্রবাসী ছেলেটির কাছে স্খলনের কোনও অতিরঞ্জিত গল্প গিয়ে না-পৌঁছয়, এবং সে জন্য তাঁকে যাতে দোষী সাব্যস্ত করা না-হয়। যেখানে এ রকম নজরদারি নেই, সেখানে মেয়েরা পুরুষশাসনের সীমানাটাকে নানা ভাবে পেরিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা প্রয়োজনে বাইরে বেরোচ্ছেন, দোকান-বাজার সামলাচ্ছেন, সন্তান, বিশেষত কন্যাসন্তানদের পড়াশোনা করাচ্ছেন, লোক লাগিয়ে খেতিবাড়ির দেখাশোনা করছেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাচ্ছেন, পরিবারের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখছেন। আর প্রত্যাশিত ভাবেই সিদ্ধান্তগ্রহণ, ঘোরাফেরা আর অর্থকরী কাজে যোগ দেওয়া— এই তিনটে নিরিখেই কমবয়সি বউরা পিছিয়ে থাকছেন। আরও পিছিয়ে থাকছেন বর্ণহিন্দু মেয়েরা, শিক্ষা সেখানে বিশেষ ভূমিকা নিচ্ছে না।
অর্থাৎ, সমীক্ষা দেখিয়েছে, বাড়ির কর্তৃত্ব যখন অর্থনৈতিক ভাবে স্বাধীন গৃহবধূর হাতে, তার ওপর নজরদারির জন্য অন্য কারও উপস্থিতি নেই, তখন তার চলাফেরার স্বাধীনতা থাকে অনেক বেশি। নারী-পরিচালিত সংসারের কর্ত্রী মা দুর্গা তাই পঞ্জিকার পুজোর দিনগুলো দেখে সপরিবার মর্তে আসার অগ্রিম টিকিট কেটে রাখতে পারেন বছর বছর।