২৩ ডিসেম্বর দিল্লি হাই কোর্টের রায়ে জামিন পেয়েছিল উন্নাও ধর্ষণকাণ্ডের প্রধান অপরাধী তথা বিজেপির প্রাক্তন বিধায়ক কুলদীপ সিংহ সেঙ্গার। বিচার-চলাকালীন নয়, পূর্ণাঙ্গ বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়ার পর এ জামিন। শুধু ধর্ষণই নয়, তার পরবর্তী ঘটনাক্রমে সেঙ্গার যে নির্যাতিতার জীবন তছনছ করেছে, তা প্রমাণিত। মেয়েটির কাছে গত ছয় বছর ধরে এ সব ক্ষতের একমাত্র মলম ছিল কুলদীপের যাবজ্জীবন।
এক বার অপরাধ প্রমাণিত হলে স্বাধীনতা আর অপরাধীর স্বাভাবিক অধিকার থাকে না। সে ক্ষেত্রে দেখার কথা, বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনও সুস্পষ্ট ত্রুটি ছিল কি? সেঙ্গারের বিচারের ক্ষেত্রে তেমন কোনও ত্রুটি ঘটেনি। বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটেছে, কিন্তু তা তো নির্যাতিতার দায় নয়। ভুক্তভোগীর জীবনের ঝুঁকি আছে কি না, এই প্রশ্নও অপরাধীর জামিনের বিবেচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। উন্নাও-এর নির্যাতক যে ভাবে চূড়ান্ত প্রতিশোধস্পৃহা দেখিয়েছে, তাতে নির্যাতিতাকে এক সময় মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে গায়ে আগুন দিতে হয়েছিল। আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রেখেও প্রশ্ন করা প্রয়োজন যে, সেঙ্গারকে জামিন দেওয়ার আগে এই কথাগুলি যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়েছিল কি?
আইনবিদ ফ্ল্যাভিয়া অ্যাগনেস বলেছিলেন, “ন্যায়-প্রত্যাশী নারীর জন্য বিচারপ্রক্রিয়াটাই শাস্তি।” সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশে আপাত রেহাই মিললেও, স্বস্তির শ্বাস ফেলার উপায় বোধ হয় নেই নির্যাতিতাদের, কারণ গত এক দশকে অ্যাগনেসের কথাটির প্রতিধ্বনি বার বার শোনা গিয়েছে এ দেশে। ২০২২ সালে ‘স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর উদ্যাপন করার জন্য’ কেন্দ্রীয় সরকার বিলকিস বানোর গণধর্ষণে জড়িত, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত এগারো জন অপরাধীকে মুক্তি দিয়েছিল। ধর্ষকদের মালা পরিয়ে বরণ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট পরে সেই সাজা মকুবের সিদ্ধান্ত রদ করেছে। সম্পূর্ণ সাজা মকুবের আগে তাদের বহু বার প্যারোল দেওয়া হয়েছিল। দুই ধর্ষক ধর্মব্যবসায়ী, আশারাম বাপু ও চিন্ময়ানন্দ সরস্বতী, উভয়েই বহু বার চিকিৎসা-সংক্রান্ত জামিন ও প্যারোল পেয়েছে। অসংখ্য ধর্ষণে অভিযুক্ত বাবা রামরহিমের উপর্যুপরি প্যারোলের তালিকা দেখে আদালত হরিয়ানার বিজেপি সরকারকে ভর্ৎসনা করেছিল। কাঠুয়ার নাবালিকার গণধর্ষণে জড়িতদের এক জন জামিন পেয়েছে, সহ-অপরাধীদের লঘু ধারা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত। হাথরস কাণ্ডের দুই ধর্ষক বিচার চলাকালীন জামিন পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মেডেলজয়ী কুস্তিগিরদের এত ধর্না, প্রতিবাদ সত্ত্বেও ব্রিজভূষণ শরণ সিংহকে এক দিনের জন্যও হাজতবাস করানো যায়নি।
বিন্দুগুলি মেলালে সংশয় হয়, ধর্ষকের জামিন, অপরাধের লঘুকরণ, গ্রেফতারে ও বিচারে গড়িমসি, সাজা মকুব— এ সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ল অ্যান্ড জেন্ডার ইনইকোয়ালিটি বইতে ফ্ল্যাভিয়া অ্যাগনেস আরও বলেছিলেন, “ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় ‘ডিসক্রিশন’ প্রয়োগের মাধ্যমে নারীর প্রাপ্য ন্যায়ের অধিকার যে ভাবে হরণ করা হয়, আইনের অভাবের কারণেও সে অধিকার ততটা লঙ্ঘিত হয় না।” আইনি পরিভাষায় ‘ডিসক্রিশন’ মানে হল বিচারক বা সরকারি কর্মকর্তাদের নিজস্ব বিচক্ষণতা, বিবেচনা ও বিবেকবোধ অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা। তবে সে সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছাচারিতা বা খামখেয়ালিপনার নমুনা না হয়ে যুক্তিসঙ্গত ও আইনসম্মত হতে হয়।
২০১৩ সালের ফৌজদারি (সংশোধন) আইন প্রণীত হওয়ার পর ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে আইন কঠোরতর হয়েছে, কিন্তু ফাঁকফোকর বার করে নেওয়া গেছে ‘ডিসক্রিশন’-এর ছলে। ফলে নির্যাতিতাদের জন্য পড়ে থাকছে হতাশা— শুধু অপরাধজনিত নয়, বরং পরবর্তী ঘটনাজনিত, কখনও রায়-পরবর্তী ঘটনাজনিতও বটে। দীর্ঘসূত্রতা, নিষ্ক্রিয়তা ও ‘ডিসক্রিশন’ মিলে এক ধর্ষকবান্ধব বাস্তুতন্ত্র তৈরি করেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা, উচ্চবর্ণ, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, নির্বাচনী উপযোগিতা— ধর্ষক যদি এর মধ্যে এক বা একাধিকের অধিকারী হয়, তবে ত্রাণের ব্যবস্থা যেন পাকা।
পরিসংখ্যান বলছে, মেয়েদের মধ্যেও দলিত, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু নির্যাতিতারা বিচারের নামে পদ্ধতিগত অ-বিচারের সম্মুখীন হচ্ছেন বেশি। আম্বেডকর কাস্টস ইন ইন্ডিয়া-তে বলেছিলেন, বর্ণপ্রথা যৌন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও বটে। শর্মিলা রেগে এগেনস্ট দ্য ম্যাডনেস অব মনু-তে আরও বিস্তারিত আলোচনা করেন দলিত নারীর যৌনতার উপরে ব্রাহ্মণ্য পিতৃতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে। উল্লিখিত সাম্প্রতিক উদাহরণগুলিতেও দেখি, প্রভাবশালী বর্ণের পুরুষকে বার বার সম্মাননীয়, সংশোধনযোগ্য ভাবা হচ্ছে। দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু নারীদের দুর্ভোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি?
ক্যাথারিন ম্যাককিনন টুওয়ার্ড আ ফেমিনিস্ট থিয়োরি অব দ্য স্টেট বইটিতে বলেছিলেন, “আইন নারীদের পুরুষের চোখে দেখে, তাদের সঙ্গে সেইমতো আচরণ করে।” কিংবা “বস্তুনিষ্ঠতা আসলে ক্ষমতাবানদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাকে নিরপেক্ষতার মতো দেখায় মাত্র।” আশঙ্কা হয়, সাম্প্রতিক কালে যেন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হয়ে উঠেছে ধর্ষক পুরুষের ‘ক্ষতি’। যেন যৌন হিংসাকে বর্ণগত, লিঙ্গগত এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকৃত প্রকাশ হিসাবে দেখাই হচ্ছে না। যেন বিচ্ছিন্ন ঘটনায় বিচ্ছিন্ন এক অপরাধী খানিক শাস্তি পেল, খানিক সাজা মকুব হল। প্রকৃত ন্যায়বিচারে পৌঁছতে আরও কত আগুন-পথ পেরোতে হবে নির্যাতিতাদের?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)