E-Paper

বিপদসাগরে নিকোবর

পর্যটন ভারতীয় অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। তাকে পরিবেশবান্ধব রূপ দানের প্রচেষ্টাটি ইতিবাচক, সন্দেহ নেই। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘ দিন ধরেই দু’টিকে এক সুতোয় বেঁধে দেওয়ার কথা বলে চলেছেন।

পৌলমী দাস চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:০৯

সদ্যসমাপ্ত কেন্দ্রীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের মুখে পর্যটনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের কথা একাধিক বার উচ্চারিত হয়েছে। বলা হয়েছে কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পূর্বঘাট পর্বতমালার আরাকু উপত্যকা ও পশ্চিমঘাটের একাংশে পরিবেশবান্ধব ট্রেকিং রুট তৈরির কথা। থিম-ঘেঁষা টুরিজ়ম সার্কিট তৈরির প্রসঙ্গও উঠেছে। অন্ধ্রপ্রদেশ-তামিলনাড়ুতে পাখি-দেখিয়েদের জন্য বিশেষ রুটের ব্যবস্থা, ওড়িশা, কর্নাটক, কেরলের যে সব অঞ্চলে কচ্ছপরা প্রতি বছর বিশেষ এক সময়ে ডিম পাড়তে আসে, সেখানে সংরক্ষণ-ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তোলা ইত্যাদি।

পর্যটন ভারতীয় অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। তাকে পরিবেশবান্ধব রূপ দানের প্রচেষ্টাটি ইতিবাচক, সন্দেহ নেই। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘ দিন ধরেই দু’টিকে এক সুতোয় বেঁধে দেওয়ার কথা বলে চলেছেন। সমস্যা হল, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার যাকে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ বলে গড়ে তুলতে চায়, পর্দা সরিয়ে দিলে দেখা যাবে তার পিছনে পরিবেশকে ধ্বংস করে দেওয়ার অনেকখানি অপচেষ্টা লুকিয়ে আছে। সেই অপচেষ্টা একান্ত ভাবে মুনাফাকেন্দ্রিক, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জীববৈচিত্র, স্থানীয় অধিবাসী, আবহাওয়া— কোনও কিছুর ভাবনাই জড়িত নেই। ইতিপূর্বে সংরক্ষণের নামে সরিস্কা টাইগার রিজ়ার্ভ-এ নতুন করে সীমানা নির্ধারণের পরিকল্পনায় তার ছাপ দেখা গিয়েছে। আরাবল্লী পর্বতমালার পরিবর্তিত সংজ্ঞার ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল। এবং গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যেও ধ্বংসকারী মানসিকতার ছায়াটিকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।

মলাক্কা প্রণালীর কাছে গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৮১,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পরিকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাবিত প্রকল্পটিকে বলা হচ্ছে এক কৌশলগত-অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। এর মধ্যে দিয়ে ভারতের এই দক্ষিণতম দ্বীপাঞ্চলটিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক, অর্থনৈতিক এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত এক আন্তর্জাতিক মানের সামরিক ও বিলাসবহুল জাহাজের বন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, এবং টাউনশিপ নির্মাণ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে ভূপ্রকৃতিগত ভাবে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলটির পরিবেশ, জীববৈচিত্র এবং এখানকার বিলুপ্তপ্রায় জনজাতি জীবনের উপর এই বিশাল কর্মকাণ্ড এবং তার দরুন হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়া জনসংখ্যার সম্ভাব্য কুপ্রভাব নিয়ে। কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য জাতীয় পরিবেশ আদালতের সামনে এ সব অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে, দ্বীপের মাত্র ১৮ শতাংশ জুড়ে হবে এই প্রকল্প। বাকি অঞ্চলের জঙ্গলে মোটেই হাত দেওয়া হবে না। জনজাতিদের উচ্ছেদের তো প্রশ্নই নেই। জাতীয় পরিবেশ আদালত এই ‘কৌশলগত গুরুত্ব’-এর প্রশ্নেই প্রকল্পটিকে ছাড় দিয়েছে। জানিয়েছে, এতে পর্যাপ্ত পরিবেশগত সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু কেন্দ্রের আশ্বাসবাণীতে নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় নেই। ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক নির্দেশে সরিস্কা টাইগার বিজ়ার্ভ-এর কোর এরিয়া-র সীমানার এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত পঞ্চাশটির বেশি খনিতে কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু গত বছরের জুলাইতে জাতীয় বন্যপ্রাণ পর্ষদ রাজস্থান সরকারের এক প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সরিস্কা টাইগার রিজ়ার্ভের বর্তমান ক্রিটিক্যাল টাইগার হ্যাবিট্যাট (সিটিএইচ)-এর মধ্যে থেকে ৪৮.৩৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা সরিয়ে দেওয়া হবে এবং ক্ষতিপূরণ হিসাবে বাফার জ়োনের ৯০.৯১ বর্গকিলোমিটার এলাকা সংযুক্ত করা হবে। এক ঝলক দেখে মনে হতে পারে সিটিএইচ-এর মোট পরিধি বাড়ল, সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তার ফল ইতিবাচক হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু মূল ঘটনাটি অন্য। প্রথমত, জঙ্গলের বাফার জ়োন-গুলিকে বন্যপ্রাণীরা কোর এরিয়া-য় প্রবেশ বা বেরোনোর পথ হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। সেই অঞ্চলকে ছোট করে দেওয়ার অর্থ বাঘ-সহ বন্যপ্রাণীদের অনায়াস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা। একদা বাঘ-শূন্য হয়ে পড়া সরিস্কা যখন তার কৌলীন্য ফিরে পেতে শুরু করেছে, তখন এই ধাক্কা প্রত্যাশিত নয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, নতুন করে সীমানা নির্ধারণের এই প্রচেষ্টায় সেই মার্বেল, ডলোমাইটের খনিগুলির পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা, সুপ্রিম কোর্ট যেগুলির কাজকর্ম আগেই বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। সুতরাং, সংরক্ষণের নামে আসলে যে খনিমাফিয়াদেরই সন্তুষ্ট করার উদ্যোগ করা হয়েছে, তেমন সন্দেহ অপ্রাসঙ্গিক নয়।

ঠিক একই ভাবে আরাবল্লীকে ভেঙেচুরে তার ভিতর থেকে চুনাপাথর, গ্র্যানিট, মার্বেল, খনিজ চেঁছেপুঁছে বার করে নেওয়ার ফন্দি এঁটেছিল কেন্দ্রীয় সরকার, ‘অভিন্ন সংজ্ঞা’ তৈরির অজুহাতে। দেশজোড়া প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত শীর্ষ আদালত তার পূর্ববর্তী রায় কার্যকরের উপর স্থগিতাদেশ দিয়ে এক কমিটিকে দায়িত্ব দিয়েছে এই সংজ্ঞার পরিবেশগত এবং আইনি দিক খতিয়ে দেখতে। যদিও ইতিমধ্যেই অসংখ্য অবৈধ খননের ধাক্কায় অপূরণীয় ক্ষতিসাধনের কাজটি সম্পন্ন। প্রতি বর্ষায় ভেঙেচুরে তছনছ হচ্ছে উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, সিকিম। অবৈজ্ঞানিক ভাবে নির্মাণকাজ, অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ, কেটে সাফ করে দেওয়া বনরাজি— সবই কিন্তু ওই ‘উন্নয়ন’-এরই নামে। হায়দরাবাদ ইউনিভার্সিটি লাগোয়া ৪০০ একরের ময়ূর-হরিণের বাসস্থান জঙ্গলটিতে যখন বুলডোজ়ার নেমেছিল, তখনও ধ্বংসকারীদের মুখে ছিল সেই উন্নয়নের বুলি। তাই উন্নয়নের নামে নিকোবরের কর্মযজ্ঞ নিয়ে সংশয় কাটতে চায় না।

নিকোবর নিয়ে বিশেষ দুশ্চিন্তার কারণ— এই অঞ্চলটিকে আঁকড়ে রাখা এক অনন্য জীববৈচিত্রের ভান্ডার, যা ইউনেস্কোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। শতাব্দীপ্রাচীন বনভূমি আর বিস্তৃত উপকূল অঞ্চল জায়ান্ট লেদারব্যাক টার্টল, মেগাপড পাখিদের আস্তানা। আর বাসভূমি ভারতের সবচেয়ে বিপন্ন দুই জনজাতি গোষ্ঠী শম্পেন আর নিকোবরিদের। অভিযোগ, এই জনগোষ্ঠীদের গ্রামগুলি গ্রাস করে নেবে প্রকল্প এলাকা। অতঃপর কী হবে তাদের ঠিকানা? ২০০৪ সালের ভয়ঙ্কর সুনামিতে ইতিমধ্যেই তাদের উপকূলীয় ঘরবাড়ি হারিয়েছিল নিকোবরিরা। ফের কি তাদের নতুন ঠিকানায় ঠেলে দেওয়া হবে? কেন্দ্রের আশ্বাস সত্য হলেও যে জনজাতিভুক্তরা এত কাল দ্বীপের অভ্যন্তরে নিভৃত যাপনে অভ্যস্ত ছিল, হঠাৎ এক রাশ লোকের মধ্যে তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে কী করে? বর্তমানে এই দ্বীপপুঞ্জের জনসংখ্যা আট হাজারের কাছাকাছি। প্রকল্প সম্পন্ন হলে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে সাড়ে আট লক্ষ। এই বিপুল সংখ্যক বহির্জগতের মানুষের হাত ধরে সংক্রামক রোগব্যাধি প্রবেশ করলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাহীন মানুষগুলি নিজেদের বাঁচাবে কী করে? না কি আধুনিকতার অজুহাতে চিরতরে তাদের মুছে দিয়ে জমি দখলই মূল লক্ষ্য?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প নিছক উন্নয়ন যজ্ঞ নয়, বরং জীববৈচিত্রের স্বর্গটিকে রাতারাতি এক জমজমাট বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার সরকারি কৌশল। এর কোপে কাটা পড়তে পারে অন্তত ষাট লক্ষ গাছ। পরিবেশ, বন এবংজলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক যদিও জানিয়েছে প্রকল্পের কাজে দশ লক্ষেরও কম গাছ কাটা হবে। সে পরিসংখ্যানও যদি সত্য হয়, তা হলেও সেই ক্ষতি পূরণ হবে কী উপায়ে? বৃষ্টি-অরণ্য গড়ে উঠতে বহু বছর সময় লাগে। কোন জাদুমন্ত্রে সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা যাবে? বিপন্ন লেদারব্যাক টার্টল-এর প্রজনন ক্ষেত্রটিও কি অটুট থাকবে? গ্যালাথিয়া বে-তে প্রস্তাবিত বন্দর ধ্বংস করতে পারে এরপ্রবাল প্রাচীর এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্ব জুড়েই সামুদ্রিক প্রবাল বিবর্ণ হয়ে পড়ছে। তাকে রক্ষার পরিবর্তে আরও বিপদে ঠেলে দেওয়ার প্রয়াসটি পরিবেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

সর্বোপরি, এই প্রকল্প অঞ্চল দাঁড়িয়ে আছে ভারতের সর্বাপেক্ষা ভূমিকম্প প্রবণ এলাকার মধ্যে। অদূর ভবিষ্যতে এখানে অতি তীব্র ভূমিকম্প এবং সুনামির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ২০০৪ সাল তার একটি নমুনা দেখেছে। তীব্র ভূমিকম্পে প্রায় সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে ইন্দিরা পয়েন্ট। সেই ধাক্কার রেশ এখনও পুরো মেলায়নি। প্রায়শই ছোট-মাঝারি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে এখানকার মাটি। এর উপর ম্যানগ্রোভ-সহ অরণ্য উচ্ছেদ হলে গোটা অঞ্চলই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। কিন্তু প্রকল্পের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে অঞ্চলভিত্তিক সমীক্ষা হয়েছে সামান্যই।

দেশের সুরক্ষার জন্য এই অঞ্চলে ভারতের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করা বা ভারত মহাসাগরে নজরদারি চালানোর মতো উদ্দেশ্য নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠতে পারে না। কিন্তু নিকোবরের মতো ভূপ্রকৃতিগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকায় তা গড়ে তুলতে হলে দীর্ঘ প্রস্তুতি, সমীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ আবশ্যক। অবশ্য বিজেপি সরকার ‘অন্য’দের পরামর্শ মেনে সুস্থায়ী পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন-রেখা প্রস্তুত করবে, বারো বছর পরে তেমন দিবাস্বপ্ন দেখা চলে না। সুতরাং, ‘পর্যাপ্ত পরিবেশগত সুরক্ষা’ সত্ত্বেও নিকোবরের ভবিষ্যৎ ঘোর অনিশ্চিত।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Andaman and Nicobar Islands Great Nicobar island Great Nicobar Development Environmental awareness

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy