কয়েকদিন আগে এক্স হাতড়াতে হাতড়াতে ইমরান খানের একটা ছবি ভেসে এল। দেখে খারাপ লাগল!
অসহায়ের মতো হুইলচেয়ারে বসে আছেন। পরনে হালকা খাকি রঙের পাঠান স্যুট। দুটো চোখ ফুলে প্রায় বুজে গিয়েছে। ইমরান বসে আছেন দীনহীনের মতো। পিছনে দাঁড়িয়ে কিছু উর্দিধারী পাকিস্তানি রেঞ্জার্স বা সেনাবাহিনীর সদস্যই হবে বোধহয়। অথবা জেলের নিরাপত্তারক্ষী। তারা ফ্যাকফ্যাক করে হাসছে!
সত্তরের দশকের শেষভাগে যে ইমরানকে ক্রিকেটমাঠে দেখেছি, তিনি অবিশ্বাস্য এবং বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর। বন্য ঝাঁজ আছে। কিন্তু তার মধ্যে কোথাও একটা একটা পরিশীলনও মেশানো। মাথার ঝাঁকড়া চুল থেকে পায়ের ক্রিকেট বুট পর্যন্ত ‘মাচো’। তৎসহ ক্যারিশ্ম্যাটিক এবং অনিঃশেষ রমণীমোহন। মূর্ত চ্যাম্পিয়ন। কবিতার মতো ছন্দোবদ্ধ বোলিং রান আপ। আবার ব্যাট হাতে আনখশির ‘হিম্যান’। বাল্যে এবং কৈশোরে সেই ইমরানকে আমরা বিভিন্ন খেলার সাময়িকীর একবর্ণ ছবিতে দেখেছি। দূরদর্শনের ঝাপসা এবং ঝিরিঝিরি স্ক্রিনে দেখেছি, কোমরটা ভেঙে সামান্য, খুব সামান্য নিচু হয়ে ইমরান রান-আপ শুরু করছেন, প্রতিটি আগুয়ান পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মাথা একটু একটু করে উঁচু হচ্ছে, হাওয়ায় উড়ছে তাঁর ঘাড়-ছাপানো সিংহের কেশরের মতো এলোমেলো চুল, আম্পায়ারকে পেরিয়ে পপিং ক্রিজে পৌঁছে তিনি চিতাবাঘের মতো শূন্যে লাফ দিচ্ছেন, সাদা টি-শার্টের উপরের দু’টি বোতাম সযত্নে খোলা, কপাটবক্ষ চিতিয়ে আছে আড়াআড়ি, বাঁ’চোখের কোনায় সূচিভেদ্য দৃষ্টি স্থির পিচের সেই বিন্দুর উপর, যেখানে ড্রপ পড়ে চকিতে ব্যাটারের দিকে ধেয়ে যাবে তাঁর মারাত্মক ‘ইনডিপার’।
সেই ইমরান ছিলেন পাকিস্তান ক্রিকেটের প্রথম ‘পোস্টারবয়’। কিন্তু সীমান্তের এপারেও দুর্মর ছিল তাঁর আকর্ষণ। অপ্রতিরোধ্য ছিল তাঁর আবেদন।
হুইলচেয়ারে আসীন যে ইমরানকে দেখলাম, তিনি তিয়াত্তরের বৃদ্ধ ঠিকই। কিন্তু বয়সের চেয়েও পারিপার্শ্বিকের ভারে যেন আরও বেশি ন্যুব্জ। এই ইমরান কাচের মতো ভঙ্গুর।
ছবিটা দেখে একটা বিস্ময়ও তৈরি হল। ইমরান পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তো বটেই, তারও আগে পাকিস্তানকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ এনে দেওয়া ইতিহাস সৃষ্টিকারী অধিনায়ক। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু, ব্রিটিশ ধনকুবেরের সন্তান জেমাইমা গোল্ডস্মিথের প্রাক্তন স্বামী। নীল রক্তের সেই পাঠান হুইলচেয়ারে অশক্ত, প্রায়ান্ধ অবস্থায় বসে আছেন আর তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে হে-হে করে হাসছে কিছু নিরাপত্তারক্ষী, যারা ইমরানের বাঁ-পায়ের কড়ে আঙুলের নখের যুগ্যিও কোনওদিন হতে পারবে না।
এই কি ইমরানের প্রাপ্য ছিল? এই-ই?
ইমরানকে কখনও সামনে থেকে দেখিনি। অ্যাসাইনমেন্টে একাধিক বার পাকিস্তানে গিয়েছি। কিন্তু তার সঙ্গে ক্রিকেটের কোনও সম্পর্ক ছিল না। ২০০৮ সালে যখন পাকিস্তানের ভোট কভার করতে গিয়েছিলাম, তখনও নয়। যদিও ততদিনে তিনি রাজনীতিতে এসে পড়েছেন। বস্তুত, তার ১২ বছর আগেই এসে পড়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে ইমরান তৈরি করেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক দল ‘তেহরিক-ই-ইনসাফ’। কিন্তু তাঁর দল ২০০৮ সালের ভোট বয়কট করেছিল। ফলে ভোটপ্রচারে আলগা এবং আলটপকা ইমরানকে পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। তবু নম্বর যোগাড় করে কপাল ঠুকে ফোন করেছিলাম তাঁর মোবাইলে। তিনি ধরেও ফেলেছিলেন। কিন্তু অপরিচিত ‘ইন্ডিয়ান সাহাফি’ (ভারতীয় সাংবাদিক। উর্দুতে সাংবাদিককে ‘সাহাফি’ বলা হয়) শুনে তিলমাত্র উৎসাহ দেখাননি। সেই ফোনালাপ ছিল মেরেকেটে ৩০ সেকেন্ডের। সাংবাদিকেরা ফোনে বিভিন্ন ভুজুং-ভাজুং দিয়ে কথা টেনে নিয়ে যান। কিন্তু তিনি ইমরান। বাঁ-হাত ঝাড়া দিলে আমার মতো গোটাবিশেক সাংবাদিক ঝরঝর করে ঝরে পড়বে। ফলে তাঁকে টলানো যায়নি। কিন্তু তার মধ্যেই মনে হয়েছিল, গলাটা যাকে বলে, বাঘা! ইমরানের কণ্ঠ এমনই হওয়া উচিত। আশ্চর্য নয় যে, সেই গলায় তিনি ‘ওয়াসিম’ বলে হাঁক পাড়লে অনুশীলনের ফাঁকে নেটের পাশে পরিচিতের সঙ্গে গল্পগাছা জুড়ে-দেওয়া তারকা পেসার পড়িমড়ি করে দৌড় লাগাতেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জেনারেল পারভেজ মুশারফ হেরেছিলেন। সেটাই হওয়ার ছিল। মুশারফের ফৌজি শাসনের (অনেকে বলেন, অপশাসন) কৌটোর ঢাকনি খুলে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দলের হাতে পাকিস্তানের শাসনভার যাওয়াটা স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু ওই ২০০৮ সালে ভাবিনি, ইমরান সত্যিই একদিন পাকিস্তানের ‘উজির-এ-আজ়ম’ হয়ে বসবেন। কারণ, একে তো তখন তাঁর দল পাকিস্তানের রাজনীতিতে নেহাতই এক প্রান্তিক শক্তি। দ্বিতীয়ত, আমার মনে হয়নি ইমরানের মতো সোজা ব্যাটে খেলা মানুষ রাজনীতিতে সফল হতে পারবেন। মানে দেশের মানুষ তাঁকে ভোটে জেতাবেন এবং একেবারে প্রধানমন্ত্রীর মসনদেই বসিয়ে দেবেন! একই সঙ্গে এটাও মনে হয়েছিল, ইমরানের মতো লোক কেন মরতে রাজনীতিতে গেলেন! ভারতীয় উপমহাদেশে সামগ্রিক ভাবে রাজনীতি এবং রাজনীতিক সম্পর্কে ধারণা খুব একটা উচ্চ নয়। ক্রিকেটের মাঠে হৃদয় লাগে, বীরত্ব লাগে, অধীত এবং অনুশীলিত বিদ্যা লাগে। রাজনীতিতে লাগে কূটকৌশল। মনে হয়েছিল, ইমরান কি পারবেন? কেন ফালতু যাচ্ছেন এই ঝুঁকি নিতে?
কিন্তু কে না জানে, রাজনীতির একটা অন্য ধরনের মোহ আছে। নীলবাতির গাড়ি, উঠতে-বসতে স্যালুট, সবসময় আলোকবৃত্তের মধ্যে থাকা আর অপরিমেয় ক্ষমতা ভোগ করা। সেই মোহের সুতোয় আচ্ছা-আচ্ছা লোক বাঁধা পড়ে যায়। সেই মোহাঞ্জনের মায়া এমনকি, অমিতাভ বচ্চনও এড়াতে পারেননি। ভেবেছিলেন, সেলুলয়েডের মতোই বাস্তবেও ‘দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন’ করবেন। তাঁর চোখের কাজল মুছে যেতে দেরি হয়নি। কিন্তু ইমরান? পাশ্চাত্যশিক্ষিত হয়েও তিনি এতটা মোহাবিষ্ট হয়ে পড়লেন? ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জেতার পরে সাধারণ পাকিস্তানির চোখে যে উচ্চতায় তিনি উঠেছিলেন, যে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ আসনে তাঁকে বসানো হয়েছিল, তিনি তো সেই সিংহাসনেই আজীবন থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি নেমে এলেন ধুলোবালির রাজনীতিতে। তাঁকে ঘিরে সেই বিভাটা আর থাকল না।
একটা মরিয়া ফাটকাই খেলেছিলেন ইমরান। কারণ, একটা দলের ক্রিকেটারদের নেতা আর একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্যে আকাশপাতাল তফাত। একটা সমস্যাদীর্ণ দেশ চালানো আর ১১টা বা ১৫টা লোক নিয়ে একটা দলের অধিনায়কত্ব করা, তাদের ট্রফি জেতার জন্য চাগানো আলাদা। কোটি কোটি মানুষের নির্বাচিত নেতা হওয়া এবং তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা-চাহিদা পূরণ করা ভয়ঙ্কর কঠিন। প্রায় অসম্ভব। তবে ইমরান বলেই সম্ভবত সেই কঠিন কাজটা করতে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন, অধিনায়ক হিসাবে সিংহহৃদয় এবং তারকা ক্রিকেটারদের বশ করেছেন। দেশের জনতাকে বশীকরণের জাদুকাঠিটিও তাঁর করায়ত্ত। ঠিকই ভেবেছিলেন। কারণ, ঘটনাচক্রে (না কি দুর্ঘটনাচক্রে?) ২০১৮ সালে নির্বাচনে (এবং রাজনৈতিক জুয়াখেলায়) জিতে ইমরান খান পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হয়েও গেলেন। অর্থাৎ, আমি পাকিস্তানের নির্বাচন কভার করে ফিরে আসার ১০ বছর পরে। এক দশক কেটে গেলেও বিস্ময়টা কাটতে সময় লেগেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে চার বছর ছিলেন ইমরান। ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। সেই বছরে পাকিস্তানের সংসদে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয় এবং হেরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব চলে যায় ইমরানের। ঘটনাচক্রে, পাকিস্তানের ইতিহাসে ইমরানই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যাঁকে দেশের আইনসভায় অনাস্থা প্রস্তাব এনে ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতিতে গদিচ্যুত করা হয়েছিল। বাকি সব তো মেয়াদ ফুরনোর আগেই সেনা অভ্যুত্থানে পদচ্যুত বা হামলায় নিহত।
২০২৪ সালে নির্বাচনের আগে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে জেলে পাঠানো হয়। তিনটি মামলায় তাঁর শাস্তি হয় যথাক্রমে ১০, ১৪ এবং ১৭ বছর কারাদণ্ডের। ওহ্, বলতে ভুলে গিয়েছি, এর সঙ্গে আরও একটি অভিযোগে তাঁর আরও সাত বছর জেল হয়েছিল। সেই মামলাটি অসাধারণ— দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই ইমরান তৃতীয় বার দার পরিগ্রহ করেছেন। বিপুল সমালোচনার ঝড়ের সামনে সেই দণ্ড অবশ্য মকুব করা হয়েছিল। কিন্তু টানা কারাবাস আটকানো যায়নি। ইমরানের দুই পুত্র এবং তাঁর নিকটাত্মীয়েরা তার পর থেকে নিয়মিত অভিযোগ করেছেন, জেলে তাঁকে একটি ‘ডেথ সেল’-এ রাখা হয়েছে এবং অহরহ শারীরিক অত্যাচার করা হচ্ছে। পরিজনদের দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি, ঠিকঠাক চিকিৎসারও ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। পাকিস্তান সরকার যথারীতি সে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। যেমন ইমরানের দল তাঁর বিরুদ্ধে যাবতীয় দুর্নীতির অভিযোগকে ‘সাজানো’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল (এখনও দিচ্ছে)।
মনে হয়েছিল, বাকি জীবনটা জেলের কালকুঠুরিতে বন্দি হয়েই কেটে যাবে ইমরানের। বন্দি অবস্থাতেই ইন্তেকাল হবে তাঁর। অথবা কোনও না কোনও দিন জেলের মধ্যেই তাঁকে ফাঁসিতে লটকে দেওয়া হবে। সম্ভবত সেটা ভেবেছিল গোটা দুনিয়াও। ভুল ভাবেনি। এখনও ভুল ভাবছে না। পাকিস্তান এমনিতেই একটি অত্যন্ত ঘাঁটা দেশ। সেখানে রাজনীতি করতে গেলে নিজের জীবন এবং মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করেই ময়দানে নামতে হয়। ইমরান ‘কাপ্তান’ হলেও পাকিস্তানেরই রাজনীতিক তো!
কিন্তু তৎসত্ত্বেও হুইলচেয়ার-বন্দি ইমরানের ছবিটা দেখে মনে হচ্ছিল, এটা কি তাঁর প্রাপ্য ছিল? এই অনাদর? এই অবহেলা? তাঁর লাহৌরের জামান পার্কের বাড়িতে ভৃত্য হওয়ার ইন্টারভিউয়েও যারা পাশ করতে পারবে না, তারা ইমরানের দুর্দশা দেখে দাঁত বার করে হাসবে? হাজার হোক, তিনি তো দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী!
কিন্তু বিস্ময়ের তখনও বাকি ছিল। ওই ছবির দিনদুয়েকের মধ্যে সেই সুখকর বিস্ময়ের জন্ম হল। সম্মানজনক এবং মানবিক পীতিনীতি অনুসরণ করে ইমরান খানের সুচিকিৎসার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফকে একটি খোলা চিঠি লিখলেন বিশ্বক্রিকেটের ১৪ জন প্রাক্তন অধিনায়ক।
চিঠির উদ্যোক্তা গ্রেগ চ্যাপেল। যিনি ঘটনাচক্রে, বাঙালির কাছে অন্যতম খলনায়ক। কী কারণে, সেই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটা অবান্তর। বরং অনেক প্রণিধানযোগ্য, তিনি এই উদ্যোগটা নিয়ে কী বলেছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক বলেছেন, ‘‘ইমরানের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। প্রায়ই কথা হত। ও জেলে যাওয়ার পর থেকে আর কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু ওর খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর মাধ্যমে ওর কিছু খবর পাই। সেই বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। শুনেছি, ইমরানের পরিবারের কেউ জেলে ওর সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। ইমরানকে নিয়ে খুব উদ্বেগে ছিলাম। ভাবতাম, এই পরিস্থিতিটা কী ভাবে বদলানো যেতে পারে। বিষয়টা নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলাম। সে-ই আমাকে পরামর্শ দেয়, প্রাক্তন অধিনায়কদের একজোট হয়ে প্রতিবাদ করা উচিত।’’
(বাঁ দিকে) বন্দি ইমরান খান এবং তাঁর জন্য লেখা ১৪ প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়কের খোলা চিঠি (ডান দিকে)। ছবি: সংগৃহীত।
তবু সংশয়ী ছিলেন গ্রেগ। সুনীল গাওস্কর বা কপিল দেবের সঙ্গে কথা বলবেন কি না বুঝতে পারছিলেন না। কারণ, ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ইতিহাস। সম্প্রতি যে ইতিহাস আরও ঘোরাল হয়েছে। যার লম্বা ছায়া পড়েছে ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচে। গ্রেগের কথায়, ‘‘ইমরান শুধু প্রাক্তন ক্রিকেটার নয়, পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীও। ক্ষমতায় থাকার সময় ইমরানের রাজনৈতিক অবস্থান কিছুটা ভারতবিরোধী ছিল। কিন্তু ক্রিকেটার এবং রাজনীতিবিদ হিসাবে ইমরান বহু বার ভারতে গিয়েছে। ভারতে ও দারুণ জনপ্রিয়। ভারতীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ভাল।’’ দ্বিধা কাটিয়ে গাওস্কর-কপিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন গ্রেগ। দু’জনেই পত্রপাঠ রাজি হন। বস্তুত, ভারতের এই দুই প্রাক্তন অধিনায়কই চিঠিতে সই করার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন বলে জানিয়েছেন গ্রেগ।
পড়ে মনে হল, যাক, সব আলো এখনও নিবে যায়নি!
পাক প্রধানমন্ত্রীকে ১৪ জন প্রাক্তন অধিনায়কের সই-করা যে খোলা চিঠিটি পাঠানো হয়েছে, তাতে গ্রেগ, গাওস্কর এবং কপিল ছাড়াও সই করেছেন ইয়ান চ্যাপেল, ক্লাইভ লয়েড, অ্যালান বর্ডার, মাইকেল আর্থারটন, নাসির হুসেন, মাইক ব্রিয়ারলি, ডেভিড গাওয়ার, স্টিভ ওয়, জন রাইট, কিম হিউজ এবং বেলিন্ডা ক্লার্ক। গুনে দেখলাম, এঁদের সকলের মিলিত টেস্ট রান ৯১,২৭৪। অর্থাৎ, প্রায় এক লাখ। টেস্ট উইকেটের কথা আর না-ই বা বললাম।
কারাবন্দি ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এই কিংবদন্তিরা চিঠিটিতে লিখেছেন, ইমরানের পরিজনেরা জানিয়েছেন, তাঁর একটি চোখের দৃষ্টি প্রায় চলে গিয়েছে। জেলে তাঁর ঠিকমতো চিকিৎসাও হচ্ছে না। আইন এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের কোনও বক্তব্য নেই। কিন্তু বন্দি ইমরানকে যেন তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া হয় এবং ন্যূনতম মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো হয়। ক্রিকেটে ইমরানের অবদান সারা বিশ্ব জানে। ১৯৯২ সালে স্কিল, অতুলনীয় নেতৃত্ব এবং খেলোয়াড়ি মনোভাবের যোগফলে তিনি পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। যে জয় কাঁটাতারের বেড়ার তোয়াক্কা না-করে বিভিন্ন দেশের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে।
খুব ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে ১৪ জন প্রাক্তন অধিনায়ক চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমরা অনেকেই ইমরান খানের বিরুদ্ধে খেলেছি। কিন্তু তাঁর তেজ, ক্যারিশমা এবং নাছোড় মনোভাবকে আদর্শ করে বড় হয়েছি। এখনও তিনি সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। পাশাপাশিই তিনি সর্বকালের সেরা অধিনায়কদেরও একজন। ক্রিকেটে তাঁর অবদান এবং তাঁর পারফরম্যান্সের জন্য ইমরান সহ-ক্রিকেটার, ভক্ত এবং প্রশাসকদের সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন।’
চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘ক্রিকেটের বাইরেও ইমরান পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকেছেন। চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনীতির কথা বাদ দিলেও এটা বলা যায় যে, ইমরান গণতান্ত্রিক ভাবে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই সম্মানও তাঁর প্রাপ্য। পাকিস্তান সরকারের কাছে বিনম্র আর্জি, ইমরানকে যেন অবিলম্বে সুচিকিৎসা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে তাঁর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো হয়। আমাদের আবেদন, যাতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিকটজনেরা ইমরানের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে পারেন, যাতে তাঁকে ঠিকঠাক আইনি সহায়তা দেওয়া যায়।’
কিন্তু এই চিঠির সবচেয়ে গভীর অংশ অন্যত্র। সেই অনুচ্ছেদটি শাশ্বত এবং চিরন্তন ক্রিকেটদর্শনের কথা বলেছে, ‘যুগ যুগ ধরে ক্রিকেট বিভিন্ন দেশের মধ্যে সেতু তৈরি করে এসেছে। আমরা ক্রিকেটমাঠে যে সময় কাটিয়েছি, তা আমাদের শিখিয়েছে, স্টাম্প তুলে নেওয়া হলে যুদ্ধও শেষ হয়ে যায়। কিন্তু পারস্পরিক সম্মান এবং শ্রদ্ধাটা থেকে যায়।’ বলা হয়েছে, ‘ইমরান তাঁর গোটা ক্রিকেটজীবনে এই দর্শনের মূর্ত প্রতীক হয়ে থেকেছেন। আমরাও সেই খেলোয়াড়ি মনোভাব এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই আবেদন করছি।’
চিঠিটা পড়তে পড়তে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে ভারতীয় ক্রিকেটারদের পাক প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত না-মেলানোর অভব্যতা, চ্যাম্পিয়ন হয়েও পাকিস্তানের ক্রিকেটকর্তার হাত থেকে ট্রফি না-নেওয়ার মতো ছেলেমানুষি অবিমৃষ্যকারিতার কথা মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, ইমরানের সুচিকিৎসার জন্য আবেদনকারী ১৪ জন যুগন্ধর অধিনায়ককে (টেস্ট ক্রিকেটে যাঁদের রানের যোগফল, মনে রাখুন, প্রায় এক লক্ষ) এই আরোপিত যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা খেলতে হয়নি। তাঁরা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়েছেন শরীরের অ্যাড্রিনালিনের শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত নিংড়ে দিয়ে। কিন্তু মাঠে এবং বাউন্ডারির দড়ির বাইরে পরস্পরের ক্ষমতা এবং ক্রিকেটমেধার প্রতি সম্মান বজায় থেকেছে। মাঠের লড়াইকে তাঁরা মাঠে রেখে এসেছেন। মাঠের বাইরে তাঁরা গুণীর কদর করেছেন।
মনে হচ্ছিল, ক্রিকেট সত্যিই এক সেতু তৈরি করে। শ্রদ্ধার সেতু, সৌহার্দ্যের সেতু, সম্পর্কের সেতু। সেই সেতুর দু’পাশে রাজনীতির জন্য ‘নো এন্ট্রি’ বোর্ড ঝোলানো থাকে। মনে হচ্ছিল, এমন একটা সময়ে গাওস্কর এবং কপিল এই খোলা চিঠিতে সই করলেন, যখন তাঁদের উত্তরসূরিরা রাজনীতির সুতোর টানে পুতুলের মতো মুক্তকচ্ছ হয়ে নাচানাচি শুরু করেছেন।যদিও মনে হয় না, ক্রিকেট পূর্বপুরুষদের উদারতার বিন্দুমাত্র ছাপ তাঁদের ব্যবহারে পড়বে। এর পরেও সূর্যকুমারেরা পাক অধিনায়কের মুখোমুখি হলে ওই বালখিল্যসুলভ আচরণই করবেন। ম্যাচ জিতে ‘কিংবদন্তি’ বিশেষণ-টিশেষণও পেয়ে যাবেন দিব্যি।
মনে হচ্ছিল, ‘কিংবদন্তি’ শব্দটা হরির লুটের বাতাসার মতো ব্যবহার করে আমরা তার ওজনটাই লঘু করে দিয়েছি। কিংবদন্তি এমনি এমনি জন্মায় না। তার দীর্ঘ ইতিহাস থাকে। সত্যিকারের কিংবদন্তিকে ঐতিহ্য লালন করতে হয়। সময় এলে পালন করতে হয়। যেমন করেছেন গাওস্কর-কপিল এবং তাঁদের মতো আরও ১২ জন কিংবদন্তি।
গত কয়েকমাসের ভারত-পাক ক্রিকেট ম্যাচের ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছিল, চটকদার রাজনীতি এসে সেই আবহমান ক্রিকেট-সেতুর উপর বুলডোজ়ার চালিয়ে দিল! গাওস্কর-কপিলের সই করা খোলা চিঠিটা পড়ে মনে হল, যাক, সব আলো এখনও নিবে যায়নি!