E-Paper

আমরা কিছু করব না?

যদি সিনেমায় দেখা কল্পচিত্রের মতো দেখা যেত একটা মহাপ্রলয়োত্তর জীবন যেখানে বাংলা নামে কোনও ভাষা নেই, এক জনও বাঙালি নেই কোথাও, তবে হয়তো তুমি আজ বুঝতে এ-ভাষার গুরুত্ব!

শিশির রায়

শেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:২৭

এই সহস্রাব্দের শুরুতে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক পাঠ্যক্রমে আমাদের একটা আধুনিক নাটক পড়তে হত: জন অসবোর্ন-এর লেখা লুক ব্যাক ইন অ্যাঙ্গার। মাস্টারমশাইয়ের মুখে শোনা, সে-নাটক থেকেই ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ ধারণার উদ্ভব। এ-নাটকের নায়ক জিমি পোর্টারই সেই রাগী যুবক: উচ্চশিক্ষিত কিন্তু চাকরি পায়নি; তাই তার রাগ। নিজে শ্রমিক শ্রেণি থেকে উঠে এসেছে কিন্তু বিয়ে করেছে উচ্চবর্ণের মেয়ে অ্যালিসনকে, বলা ভাল অ্যালিসনই তাকে ভালবেসে বাড়ি আর সুখের জীবন ছেড়ে চিলতে বাসায় কষ্টের সংসার পেতেছে— তাতেও তার রাগ। বৌকে সে উঠতে-বসতে খোঁটা দেয়: কেন সে এত নিরুত্তাপ, দেশ সমাজ সংসার সব যখন অধঃপাতে যাচ্ছে তখনও সে এত নিস্পৃহ কী করে, কেন তার কিছু আসে-যায় না, এত নির্বিকার জীবন কারও কী করে হতে পারে! গলা চড়াতে চড়াতে, মাত্রা ছাড়াতে ছাড়াতে নাটকে একটা সময় জিমির মুখে আমরা একটা সংলাপ শুনে শিউরে উঠি, যখন সে নিজের স্ত্রীকে বলে: তোমার যদি একটা বাচ্চা হত, আর সেটা মারাও যেত, ইস যদি দেখতে পেতাম কেমন করে তুমি তা সামলাও!

১৯৫৬-র লন্ডনে নাটকটা নিয়ে বিস্তর হইচই হয়েছিল। আমরা সে-নাটক যখন পড়ছি তখন তো মুক্ত অর্থনীতির পালে হাওয়া লেগেছে, বিশ্বায়নের বান ডেকেছে। তবু, যতই সাহেবি ভাষা আর বিলিতি সাহিত্য পড়ি না কেন, ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে বাকি সময় বাংলা ভাষায় কলকল করা মুখ আর বাঙালি ভদ্রবিত্তের মূল্যবোধ-জবজবে মনটি যাবে কোথা! জিমির উপরে তাই চরম রাগ হত আমাদের, পরীক্ষার উত্তরে বাঁধা গত ছেড়ে ওই উদ্ধত ছোঁড়াটাকে আচ্ছাসে ধুয়ে দিতে কলম নিশপিশ করত: আরে বাবা, চার পাশের পরিস্থিতি যা-ই হোক, ওই ভাবে কেউ প্রিয়জনকে বলে? ও রকম বলা যায়?

তার পরেও সিকি শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। উত্তর-আধুনিকেরও দিন গিয়েছে, উত্তর-সত্য এসেছে। ঠিক সেই সময়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপনের আবহে, বাংলা ভাষার শতমুখী প্রশংসার এই লগ্নে এ-লেখা লিখতে গিয়ে হঠাৎ ফিরে এল কত বছর আগের এক পাঠ-স্মৃতি। সেই বদরাগী দুর্বিনীত যুবকের কথার ছায়ায় মনে ভেসে এল এই প্রতিতুলনা— হায় বাঙালি, তোমার মাতৃভাষা বাংলার যদি আজ মৃত্যু হত, যদি এ ভাষায় কথা বলা আর লেখা নিষিদ্ধ হয়ে যেত, যদি সিনেমায় দেখা কল্পচিত্রের মতো দেখা যেত একটা মহাপ্রলয়োত্তর যুগের জীবন যেখানে বাংলা নামে আর কোনও ভাষা নেই, এক জনও বাঙালি নেই এই বিশ্বের কোথাও, তবে হয়তো তুমি আজ বুঝতে এ ভাষার গুরুত্ব, গৌরব!

এ কথাটা বেশি করে নিজেদেরই বলার। নিজেদের মানে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের। আয়নাটা আর একটু কাছে টানলে বলা যেতে পারে কলকাতার বাঙালিদের— যারা কিনা বাংলা ভাষাটার উপর আমাদের এক রকম অঘোষিত মালিকানা স্বাভাবিক ধরে, ভাষাটাকে নিয়ে যথেচ্ছ ও যদৃচ্ছ লোফালুফি করে চলেছি— কিন্তু সত্যি বলতে গেলে, যে ভাষাটা আমাদের কষ্টের ‘অর্জন’ নয়, যাকে আপন করে পেতে আমাদের বুকের রক্ত ঝরাতে হয়নি, যাকে ঘিরে আমাদের কোনও ‘আন্দোলন’ নেই। একুশে ফেব্রুয়ারির ‘পাল্টা’ অনেকে উনিশে মে তুলে ধরেন, বলেন, এও তো শাসকের চাপিয়ে দেওয়ার অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে, পুলিশের গুলির মুখে বুক পেতে দিয়ে মাতৃভাষার জন্য লড়াই। নিশ্চয়ই তা-ই, কিন্তু সে লড়াইও তো করল শিলচর আর অসম, কলকাতা সেখানে কোথায়! কলকাতা যেন স্রেফ ‘রাইট টাইম অ্যাট দ্য রাইট প্লেস’-এর সুবাদে, ঔপনিবেশিক কাল থেকে অদ্যাবধি বঙ্গভূমির চোখের মণি বলে, রামমোহন বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ আদি মনীষীদের ঠিকরে পড়া আলো গায়ে মেখে বাংলা ভাষার লাভের গুড়টুকু খেয়ে চলেছে, আজও। না চাইতেই, উত্তরাধিকার সূত্রে তার পাওয়া হয়ে গেছে বাংলা ভাষার উর্বর জমিজিরেত, ঘড়া-ভরা মোহর, পায়ের উপর পা তুলে এতকাল সে খাচ্ছে কেবল। আর জমিদারের মতো ছড়ি বাগিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আর নাক সিঁটকাচ্ছে: বাংলাদেশি বাংলা কে বলছিস র‌্যা? এ হে হে, এ তো দেখছি পুরুলিয়ার জিভের আড় না-ভাঙা বাংলা, ও-দিকে কে সুর করে বাংলা গাইছিস— সাকিন উত্তরে বুঝি?

সিন্দুক ভেঙে খাওয়া আর গায়েগতরে খেটে কামাই করে খাওয়ার মধ্যে যে তফাত, আজ তা দেখা যাচ্ছে চোখের সামনে। অর্জন না হলে সে জিনিসের আদরও হয় না; কলকাতার ভদ্রবিত্ত বাঙালিকুলে বাংলা ভাষার আজ খাতির কই? বাংলা মাধ্যমের ইস্কুল, বাংলা বইয়ের লাইব্রেরি, জেন-জ়ি’র বাংলা ভাষা-পরিচয়, সামাজিক জীবনে দৃশ্যমান বাংলা চিহ্নক— সবই নিবু-নিবু। দাপট দেখাচ্ছে রাজনীতির ভাষা হিন্দি, কিংবা অর্থকরী ভাষা ইংরেজি— কলকাতার অসরকারি স্কুলগুলিতে কত শিক্ষার্থী যে সময়, শ্রম ও অর্থ দিয়ে ফরাসি জার্মান স্প্যানিশ অবধি পড়ছে-শিখছে, বাংলা ভাষা কি তার কণামাত্র মনোযোগও পাচ্ছে? এই সময়ের সন্তানরা বলবে, একুশ শতকে ‘মাতৃভাষা’ নিয়ে আবেগের মানে নেই। যতীন সরকারের লেখায় ‘মাতৃভাষা’ প্রসঙ্গে এই রসিকতা পড়েছিলাম: রবীন্দ্রনাথের গোরা তো আসলে ছিল আইরিশ মায়ের সন্তান, তার ‘মাতৃভাষা’ তবে কী? এ কালে যে ভাষাই আনন্দময়ীর মতো লালনপালন করছে, আবার মানুষ করে বৃহত্তর জগতের লায়েক বানিয়ে ছেড়েও দিচ্ছে, সে ভাষার কাছেই যাচ্ছে মহানাগরিক বাঙালি। শুধু বাংলা ভাষার আশ্রয়ে কাজ হচ্ছে না, বাংলা ভাষাচর্চা-ভিত্তিক কর্মসংস্থান কোথায় আজ? উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এহ বাহ্য। দেশে-বিদেশে অনেক জাতি আছে যারা কাজের ভাষা, রোজগারের ভাষা হিসাবে মাতৃভাষা বাদে অন্য ভাষাকেই বরণ করে নিয়েছে, তা বলে মাতৃভাষাকে পায়ে ঠেলেনি, তাকে নিয়ে লজ্জা বা হীনম্মন্যতারও কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কলকাতার বাঙালির তবে কী হল? পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা ঐতিহ্যের আঁচ পোহাতে গিয়ে কবে, কখন তার জীবন থেকে বাংলা ভাষা মুছে যেতে বসার উপক্রম হল? আজকের যে মধ্যবয়সি প্রজন্মটি, সে-ই মনে হয় শেষ— তার পরে আর কি এ শহরের বাঙালিরা বাংলা ভাষায় বলতে-লিখতে পারবে ঠিকঠাক? একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে কলকাতায় এখনও যে আবেগস্রোতটুকু বহতা, তার একটা বড় কারণ একুশের ইতিহাসটুকু এখনও অবধি এ-পারের জানা, এবং সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকারী হিসাবে এখনও পর্যন্ত নিজেদের বিবেচনা করা। কিন্তু ‘মাতৃভাষার অধিকার’-এর জন্যও যে একদা একটা জাতিকে পথে নামতে হয়েছিল, এই ব্যাপারটাই ভবিষ্যতের যে কসমোপলিটান বাঙালি বুঝবে না, বুঝলেও বিস্ময়প্রকাশের বেশি আমল দেবে না, তার কাছে সেই ইতিহাসের গুরুত্বই বা কী, কতটুকু?

ভবিষ্যতের বাংলা-বিবর্জিত বঙ্গপ্রজন্ম তো ভুঁইফোঁড় নয়। আমাদেরই হাতে তা তৈরি হচ্ছে ক্রমে, এই একুশ শতকের এআই-ঝলমল নগরসভ্যতার মধ্যেই। সেই প্রজন্মের অভিভাবক আমরা এক দিকে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করছি, ফেসবুকে ভাষা নিয়ে আবেগ-থরথর রচনা লিখছি। সেই আমরাই বলছি কী দিনকাল পড়ল, ছেলেমেয়েগুলো বাংলা ভাষাটা ছুঁয়েও দেখে না, ফেলুদা যদি বা পড়ে সেও ইংরেজিতে— এরা তো সুকুমার রায়-লীলা মজুমদারের রস পেল না! তা হলে দ্বিচারিতা কাদের, অপরাধী কারা! এক দিকে বাংলা ভাষার মর্যাদা নিজেরাই প্রতি পদে হরণ করব, অন্য দিকে সমাজমাধ্যমে কাঁদুনি গাইব কলকাতায় ব্যাঙ্ক থেকে মেট্রো স্টেশনের কাউন্টারে বাংলা বলার লোক নেই, অ্যাপ-ক্যাবের চালক থেকে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে সহায়িকাও কথা শুরু করেন অবধারিত ভাবে হিন্দিতে— এ তো চলতে পারে না। যে কোনও একটিই আমাদের ভবিতব্য: হয় আমাদেরই হাতে বাংলা ভাষার মর্যাদারক্ষা; কিংবা আমাদেরই হাতে বাংলা ভাষা সম্পূর্ণ পরাজিত— এই সত্যের স্বীকার।

এ-পারের বাঙালিকে যদি কষ্ট করে বাংলা ভাষা পেতে হত, বর্তমানের এই অবমাননা হত না বলেই মনে হয়। স্বাধীন ভারতরাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পশ্চিমবঙ্গবাসী বাংলাকে অনায়াসে পেলেন, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সেখানে অচিরেই যুঝতে হল উর্দুর সঙ্গে। রক্ত ঝরিয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা ভাষার অধিকার অর্জিত হল তো গৃহযুদ্ধ হাজির— এই বাংলা ভাষার শরীর থেকে হিঁদুয়ানির গন্ধ হটাও, আরবি-ফারসি গন্ধমাখা ‘মুসলমানি বাংলা’ আনো, এই শোরগোল। পূর্ববঙ্গ সেই লড়াইও লড়েছে। ষাটের দশকে আবার আঘাত এল রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রচর্চার উপরে, সেও তো ঘুরপথে বাংলা ভাষার শরীরেই মুষ্ট্যাঘাত! তার পর একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ— বাঙালিসত্তাকেই গুঁড়িয়ে দিতে চাওয়ার চেষ্টা, যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত বুঝে শেষ মরণকামড়ে ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী-হত্যাযজ্ঞ— এই সব কিছু সয়ে এবং লড়ে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে স্বাধীন বাংলাদেশ। যে অসম্ভব সম্ভব করেছেন সেই বাঙালিরা, তার পাশে আমরা তো নস্যি!

এত বছর লাগল এটা বুঝতে যে, জিমির রাগকে আমরা সে-দিন নিষ্ঠুরতা ভেবে ভুল বুঝেছিলাম। জিমি আসলে ভবিষ্যৎটা দেখতে পেয়েছিল। চার পাশে যখন সব ভাঙছে, তখনও উঠে না-দাঁড়ানোর নির্লিপ্তি আসলে কাপুরুষতা, বোঝাতে চেয়েছিল। আমাদের চতুর্দিকেও এখন বাংলা ভাষানদীর পাড় ভাঙার অবিরল শব্দ, আমরা কিছু করব না?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali language

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy