E-Paper

ভাষার ভাব ভাষার ভার

কটি সমীক্ষা অনুযায়ী পৃথিবীতে যে ৭১১৭টি ভাষা আছে, তার অর্ধেক একুশ শতক শেষ হওয়ার আগে অবলুপ্ত হতে পারে। এর পিছনে নানা কারণ থাকতে পারে।

রামকুমার মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:৩৬

সদাশিব নন্দ বালেশ্বর গভর্নমেন্ট স্কুলে ওড়িয়া ও সংস্কৃত ভাষার শিক্ষক ছিলেন। তাঁর অবসরের পর অবিভক্ত বঙ্গদেশ থেকে কান্তিচন্দ্র ভট্টাচার্য সেই পদে যোগ দেন। তিনি ভেবেছিলেন, ওড়িয়া পড়ানো এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। কিছু দিন চেষ্টা করে ওড়িয়া ভাষায় লেখা ছাপা বই পড়তে শিখলেন, কিন্তু ছেলেদের পড়াতে গিয়ে ‘ন’, ‘ণ’ আর লেজকাটা ‘ল’ ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পেরে হাসির খোরাক হলেন। অপমানিত হয়ে তিনি বললেন যে, ওড়িয়া হল বাংলার বিকৃত রূপ মাত্র। উড়িয়া স্বতন্ত্র ভাষা নহে নামে একটা বইও লিখে ফেললেন। তার পর সেটি শিক্ষা দফতরে পাঠিয়ে, কিছু মানুষের সাহায্য নিয়ে, সব স্কুল থেকে ওড়িয়া তুলে দেওয়ার চেষ্টা চালালেন। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হল। সে আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম ফকীরমোহন সেনাপতি (১৮৪৩-১৯১৮)। আন্দোলনের ফলে ওড়িয়া ভাষা শিক্ষায় ও প্রশাসনিক কাজে তার যোগ‍্য মর্যাদা পেল।

ও-দিকে ফকীরমোহনের সংসারে ছেলে মোহিনীমোহনের বিয়ে হয়েছে বাঙালি মেয়ে হিরণপ্রভার সঙ্গে। সন্তানও হয়েছে। তাদের শিক্ষা দিতে হবে। হিরণপ্রভা ওড়িয়া বলতে পারতেন, ছাপা অক্ষর হলে পড়তেও পারতেন, কিন্তু সেই জ্ঞানে মেয়েদের পড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করলেন। তিনি সোজাসুজি বললেন, যদি ওড়িয়া ভাষায় পড়াতে হয় তা হলে সে দায়িত্ব যেন মেয়েদের বাবা বা দাদু নেন, আর বাংলা হলে তিনি পড়িয়ে দেবেন। ফকীরমোহন শুনে বললেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন, আর তা যে কোনও ভাষাতেই হতে পারে। ফলে হিরণ‍প্রভার উপরে কন্যাদের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল, আর সেটি বাংলা ভাষার মাধ্যমে।

ভাষা বিষয়ে কান্তিচন্দ্র ও ফকীরমোহনের যে দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, এটার সঙ্গে ভাষার উন্নতি-অবনতি, বিস্তার-সঙ্কোচন, এমনকি জন্ম-মৃত্যুও অনেকখানি নির্ভর করে। কোনও ভাষা যদি মানুষের মতো যৌবন থেকে বার্ধক্যে পৌঁছে অবলুপ্ত হয়, তা হলে সেটা এক রকম। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বঙ্গদর্শনের পত্র-সূচনা’য় এটিকে কালস্রোতের নিয়মাধীন বলেছিলেন। কালের এই নিয়মে পাশ্চাত্যে ল্যাটিন ভাষা অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মানুষের বংশধারার মতো তার ভিতর থেকে জন্ম নিয়েছিল স্প্যানিশ, ফরাসি, পর্তুগিজ় ইত্যাদি ভাষা। তেমনই সংস্কৃত ভাষা থেকে প্রাকৃত হয়ে বাংলা, হিন্দি, মরাঠি-সহ অন্যান্য নব‍্য ভারতীয় ভাষার জন্ম হয়েছিল। তবে মরা হাতির লাখ টাকা দামের মতো, প্রাচীন এই সব ভাষার অন‍্য এক মূল্য থাকে। সে কথা ১৮৫৩ সালে ‘বীটন সোসাইটি’তে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘সংস্কৃতভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্যশাস্ত্র বিষয়ক প্রস্তাব’ শীর্ষক বক্তৃতায় আলোচনা করেছিলেন। সে সময়ের হিন্দি, বাংলা ইত্যাদি ভাষার অবস্থা ‘অতি হীন’ বলে উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘প্রাচীন ও উৎকৃষ্ট’ সংস্কৃত ভাষার ‘ভূরি পরিমাণে সংস্কৃত কথা লইয়া ঐ সকল ভাষায় সন্নিবেশিত না করিলে তাহাদের সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধি সম্পাদন করা যাইবেক না।’

ভাষার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়ে অপমৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী পৃথিবীতে যে ৭১১৭টি ভাষা আছে, তার অর্ধেক একুশ শতক শেষ হওয়ার আগে অবলুপ্ত হতে পারে। এর পিছনে নানা কারণ থাকতে পারে। তা কান্তিচন্দ্র ভট্টাচার্যের মতো ব‍্যক্তিগত থেকে ঔপনিবেশিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি কারণও হতে পারে। ঔপনিবেশিক শাসনে শাসক তার নানা কিছুর মতো ভাষাও শাসিতের উপরে চাপিয়ে দেয়। সে চাপানোর প্রক্রিয়াটি বেশ সূক্ষ্ম। প্রথমে দখলদার বলে পরিচিত হলেও, পরে বিদেশি শক্তি এমন ভাব দেখায় যেন দেশোদ্ধার করতে এসেছে। কিছু দিনের মধ্যে শাসিতও তা বিশ্বাস করতে শুরু করে। ফরাসি মনোবিজ্ঞানী ফ্রানৎস ফ্যানন আলজিরিয়ার যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ১৯৬১ সালে ফরাসি ভাষায় একটি বই লেখেন, যা ১৯৬৭ সালে ইংরেজি অনুবাদে দ‍্য রেচেড অব দি আর্থ নামে প্রকাশিত হয়। ঔপনিবেশিক শাসনে শাসক ও শাসিতের মন বুঝতে বইটি গুরুত্বপূর্ণ।

ঔপনিবেশিক শাসনে অনেক কাল থাকার ফলে শাসকের ভাষা নিয়ে আমাদের ভালই অভিজ্ঞতা আছে। উনিশ শতকে বাংলা ভাষায় শব্দের বিশেষ অভাব ছিল না, তবু বহু শিক্ষিত বাঙালি পরস্পরকে ইংরেজিতে চিঠি লিখতেন। তার পর ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটেছে, কিন্তু ঔপনিবেশিক ভাষা ও সংস্কৃতির ছাপ এখনও নানা ক্ষেত্রে থেকে গেছে। ২০০৭ সালে নাগা কবি তেমসুলা আও (১৯৪৫-২০২২) ১৬টি কবিতা নিয়ে ৬৮ পাতার একটি বই প্রকাশ করেন, যার ছত্রে ছত্রে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষাদ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি লিখছেন, ক্ষমতাশালী ‘অক্ষর’ শব্দটি আসার আগে আমরা আমাদের প্রাচীন কথা ও বিশ্বাস নিয়ে নিজেদের মতো ছিলাম। বাইরে থেকে অনাহূতরা এসে বলল, তোমাদের মন থেকে সব কিছু মুছে ফেলো। তার পর তারা আমাদের নতুন ইতিহাস লিখতে শুরু করে দিল। তেমসুলার কথা আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা-সহ পৃথিবীর নানা অংশের বিভিন্ন জাতির ক্ষেত্রেও সত্য। সেখানেও ইতিহাস নতুন করে লেখা হয়েছে, আর সে সঙ্গে অজস্র মাতৃভাষা হারিয়ে গেছে।

ভাষার স্বাস্থ্য এবং বাঁচা ও মরার সঙ্গে ভাষাভাষীদের অর্থনৈতিক অবস্থাও নির্ভর করে। ত্রিপুরার বংচের ভাষার জনসংখ্যা ১৯৩১ সালের গণনানুযায়ী ছিল ২১৯। তার সাতান্ন বছর পরে ১৯৮৮ সালে গবেষক সইলিয়ানা সাইলো বংচেরদের জনসংখ্যার হিসাব নিতে গিয়ে দেখলেন, তা বেড়ে ৩৮৫ হয়েছে। বৃদ্ধির হার ১.৩২ শতাংশ মাত্র। কেন এত কম, খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলেন, খাদ্যের অভাব আছে, সঙ্গে বিশুদ্ধ পানীয় জলেরও। ফলে পেটের অসুখ ও অন্যান্য রোগে মানুষ ভোগেন, চিকিৎসার তেমন সুবিধা নেই বলে মারাও যান। বছর পনেরো-ষোলো আগে বংচের ভাষার গান, গল্প ইত্যাদি সঙ্কলনের একটি কাজে পরোক্ষ ভাবে যুক্ত থাকার সময় খোঁজ নিয়ে দেখেছি, জনসংখ্যা বাড়লেও তা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। আজকাল ভাষা-সংরক্ষণ বলে একটা কথা খুব শোনা যায়। তবে ভাষার চেয়ে আগে মানুষজনের শরীর-স্বাস্থ্যের দিকে বেশি নজর দেওয়া দরকার। তা না হলে স্কটল্যান্ডের গেলিক, আন্দামানের বো ইত্যাদির মতো পৃথিবীর অজস্র ভাষা বিলুপ্তির পথে চলে যাবে।

মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়, আর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু স্বীকৃতি পায়। সে সময় পাকিস্তানে উর্দুর তুলনায় বাংলাভাষীর সংখ্যা বেশি ছিল, কিন্তু গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলি জিন্না উর্দুকেই বেছে নিয়েছিলেন। জিন্না-র মাতৃভাষা ছিল গুজরাতি, কিন্তু বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পিছনে তাঁর একটা যুক্তি নিশ্চয় কাজ করেছিল। সেটা হল, উর্দু ভাষায় আরবি ও ফারসি শব্দের সংখ্যা যেখানে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ, বাংলায় সেটা ১০ থেকে ১২ শতাংশ। জাতিতত্ত্বের সঙ্গে ভাষাতত্ত্ব জুড়ে গেলে জটিল এক রসায়ন তৈরি হয়। উর্দুর চাপে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে নানা সমস্যা দেখা দেয়। আন্দোলন চলতে থাকে, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, বরকত-সহ বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। তার পর ভাষা আন্দোলন আরও শক্তি সঞ্চয় করলে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার আগে পর্যন্ত উর্দুর সমমর্যাদা পায়নি।

ভাষা নিয়ে আর একটি বড় আন্দোলন হয় অসমে। অসম এক মিশ্র ভাষার রাজ্য, নানা ভাষাভাষী মানুষের বসবাস সেখানে। ১৯৫৩-য় অসমের অর্থমন্ত্রী মতিরাম বরার দেওয়া তথ‍্য অনুযায়ী, ৯৬ লক্ষ মানুষের মধ্যে সত্যিকারের অসমিয়া মানুষের সংখ্যা ৩০ লক্ষ। বাকি ৬৬ লক্ষ মানুষের প্রায় অর্ধেক জনজাতি ও বাকি বাঙালি। ভাষার ত্রিধারা অসমের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বর্ণময় ও বৈচিত্র‍ময় করে তুলতে পারত, কিন্তু সরকারি নির্দেশিকায় সবাইকে অসমিয়া ভাষা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হতে থাকল। তার বিরুদ্ধে অসমের নানা অঞ্চলে আন্দোলন দানা বাঁধে। শিলচরে প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়, কমলা ভট্টাচার্য-সহ মোট দশ জন মারা যান।

মধ‍্যযুগের ভক্তকবি তুকারাম তাঁর কবিতায় এক জন যোদ্ধার কথা লিখে গেছেন। সে বলছে, “আমার দুটো হাতই জোড়া কারণ একটাতে তরবারি আর অন্যটাতে ঢাল/ আমি লড়াই করব কেমন করে?/ আমার কোমরবন্ধ, বর্ম আর শিরস্ত্রাণ/ সবই বোঝা বলে মনে হয়/ আমাকে চড়িয়ে দিয়েছে একটা ঘোড়ার উপরে/ আমি এদিক-ওদিক ছুটব কেমন করে!” আমাদের ভাষাগুলির অবস্থা অনেকটা একই রকম। আন্তর্জাতিক ভাষা, রাজভাষা, রাজ‍্যভাষা, ধর্মের ভাষা, অর্থকরী ভাষা, নাগরিক ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা ইত্যাদির ভারে ভাষা ভারাক্রান্ত। ভাষার শরীর থেকে এই সব বোঝা যত তাড়াতাড়ি নেমে যায় ততই মঙ্গল। তখন ভাষা তার সহজ ও স্বাভাবিক ভাব ফিরে পাবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mother Tounge languages

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy