চাষিকে বাঁচাইবার উপায় কী? নীতি আয়োগের উত্তর: চাষিকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিতে হইবে। বর্তমানে সার-বিদ্যুতে ভর্তুকি, ফসল বিমার প্রিমিয়াম, কৃষিঋণ মকুব, ন্যায্যমূল্যে ফসল ক্রয়, প্রভৃতি প্রকল্পে সরকার খরচ করে দুই লক্ষ কোটি টাকা। তাহার অনেকটাই দুর্নীতির কারণে নষ্ট হয়। আবার হিতে বিপরীতও ঘটিয়া থাকে। যেমন, ফসলের বাজারমূল্যের সহিত সরকারি সহায়ক মূল্যের পার্থক্য অধিক হইলে চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যে বিচ্যুতি দেখা দেয়। তাহা কৃষির উৎপাদন-বিপণনের স্বাভাবিক চক্রে ব্যাঘাত ঘটায়। অতএব সরকারি ক্রয়ের উপর নির্ভরতা কমিলে বাজারের সহিত চাষির সম্পর্কে উন্নতি হইতে পারে। তেমনই, কৃষিঋণে ভর্তুকির জন্য সরকার বিপুল ব্যয় করিলেও, অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি সেই সুবিধা লইতে অক্ষম। তাহার পরিবর্তে চাষের মরসুমের শুরুতেই অনুদান পাইলে চাষির সুবিধা অধিক। মহাজনি ঋণে আবদ্ধ হইবার সম্ভাবনা কমিবে। ‘রায়তু বন্ধু’ নীতিতে সেই পথই গ্রহণ করিয়াছে তেলঙ্গানা সরকার। সেই নীতিকে যে চাষি সমর্থন করিয়াছে, তাহা বিধানসভা নির্বাচনের ফলেই স্পষ্ট। তাহার পরেই ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গ চাষির জন্য একর-প্রতি আগাম সহায়তার প্রকল্প ঘোষণা করিয়াছে। এমনকী কেন্দ্রও ওই নীতি বিবেচনা করিতেছে, তাহার ইঙ্গিত মিলিয়াছে। এ বার নীতি আয়োগের সুপারিশ, অপর সকল ভর্তুকি-অনুদান খারিজ করিয়া প্রতি হেক্টরে পনেরো হাজার টাকার বাৎসরিক সহায়তা দিতে হইবে চাষিকে।

শুনিতে মন্দ নহে। কিন্তু ভাবিতে গেলে নানা সংশয় জাগে। প্রথম সংশয় রাজনীতির। সার কিংবা বিদ্যুতে ভর্তুকি বহু দশক ধরিয়া ‘চাষির প্রাপ্য’ বলিয়া চিহ্নিত। সুলভ কৃষিঋণও তাই। এগুলি অপসারণ করিলে চাষের ব্যয় হঠাৎ অনেকটা বৃদ্ধি পাইতে বাধ্য। তাহাতে যে ক্ষোভ দেখা যাইবে, কেবল আর্থিক অনুদানের আশ্বাসে তাহা প্রশমিত হইবে কি? তেলঙ্গানা সরকার অপরাপর ভর্তুকি না কমাইয়া রায়তু বন্ধু চালু করিয়াছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পশ্চিমবঙ্গে ‘কৃষক বন্ধু’ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষকের মৃত্যুতে দুই লক্ষ টাকা সহায়তার ঘোষণা করিয়াছেন। অতএব ভর্তুকি-অনুদান বাতিলের রাজনৈতিক ঝুঁকি প্রবল। দ্বিতীয় সংশয় ভূমিহীন চাষিকে লইয়া। কৃষির উপর যাঁহারা বাস্তবিক নির্ভরশীল, তাঁহাদের একটি বড় অংশ ভাগচাষি, ঠিকাচাষি। জমির মালিকানার সহিত সরকারি সহায়তা যুক্ত হইলে তাঁহারা বঞ্চিত হইতে বাধ্য। অথচ সহায়তার প্রয়োজন তাঁহাদেরই সর্বাধিক। তৃতীয় সংশয় জমির নথিপত্র লইয়া। তেলঙ্গানা দীর্ঘ দিন ধরিয়া জমির মালিকানার ডিজিটাল নথি প্রস্তুত করিয়া, তবেই জমি-ভিত্তিক অনুদানের প্রকল্প শুরু করিয়াছে। ডিজিটাল নথি প্রস্তুতির কাজটি সমস্যাসঙ্কুল, এমনকী সংঘাতপ্রবণও বটে। সে কাজটি সম্পূর্ণ না করিয়া জমিভিত্তিক সহায়তা চালু করিলে হিতে বিপরীত হইবার সম্ভাবনা।

সর্বোপরি প্রশ্ন উঠিবে, কেন সহায়তার সুপারিশ? চাষিকে আর্থিক সহায়তা দিবার সেরা উপায় সন্ধানই কি কৃষিনীতির উদ্দেশ্য? না কি কৃষিকে লাভজনক করাই তাহার লক্ষ্য? সেচের উন্নয়ন, লাভজনক বিপণন, ফসল সংরক্ষণ, তৎপর রফতানি নীতি, এই বিষয়গুলি প্রতি বৎসর বাজেট বক্তৃতায় উল্লিখিত হয় মাত্র। এগুলির উন্নয়নের দ্বারা চাষির রোজগার বাস্তবিক বাড়িতে পারে। তাহাকে সরকারি সহায়তার প্রার্থী হইতে হয় না। কিন্তু এই সত্য কেবল তত্ত্বকথা হইয়া রহিয়াছে। চাষির প্রয়োজন কৃষিনীতির সংস্কার, কৃষিপণ্যের বিপণনে বিপুল বিনিয়োগ। উৎপাদনের খরচ চাষির সাধ্যায়ত্ত করাও প্রয়োজন, কিন্তু তাহাই একমাত্র প্রয়োজন নহে, নীতির প্রধান উদ্দেশ্যও নহে। চাষিকে স্বাবলম্বী করাই কৃষিনীতির লক্ষ্য হইতে হইবে।