ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতকে কঠিন সঙ্কটে ফেলিলেন। কেবল ভারতকে নয়, আরও সাতটি দেশকে। এই আটটি দেশই ইরানের খনিজ তৈলের বড় অংশ আমদানি করিয়া থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত বৎসর ইরানি খনিজ তৈল বাণিজ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াও এই কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে ‘ছাড়’ দিয়াছিল। চলতি সপ্তাহে সেই ছাড় উঠিয়া গেল। এখন মার্কিন দেশের সহিত সুসম্পর্ক, কিংবা সম্পর্ক রাখিতে গেলে ভারতকে ইরানের সহিত বাণিজ্যিক সংস্রব ত্যাগ করিতে হইবে। আপাতত মার্কিন দেশ এই ক্ষেত্রে ভারতীয় সম্মতি কেবল প্রত্যাশা করিতেছে না, দাবি করিতেছে। তাহাদের ভাবটি হইল: পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বালাকোট ঘটনায় মার্কিন সরকার ভারতের পাশে শক্ত ভাবে দাঁড়াইয়াছে, এই বার ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবস্থানে ভারতের পাল্টা সহায়তা করিবার পালা। অথচ সেই সিদ্ধান্ত লওয়া মোটেই সহজ নয়। প্রথমত, ভারতের মোট আমদানিকৃত খনিজ তৈলের বড় অংশ ইরান হইতে আনা হয়। গত অর্থবর্ষে তাহা ছিল প্রায় দশ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, এই বাবদে ভারত ইতিমধ্যে বেশ কিছু লগ্নি করিয়া ফেলিয়াছে, বিশেষত পরিকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে, যেমন ইরানের চাবাহার পর্যন্ত চলাচল সহজ করিবার বন্দোবস্ত ইত্যাদি। তৃতীয়ত, ইরানের সহিত ভারতের সম্পর্কের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য সেই প্রাচীন কাল হইতেই। এখন নূতন বন্ধুর কারণে পুরাতন বন্ধুত্বে অবসানচিহ্ন টানা ভারতের পক্ষে সম্মানজনক হইবে না। ফলে জাতীয় নির্বাচনের মধ্যেই ভারতের সামনে একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসিয়া দাঁড়াইল। প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সম্ভবত ব্যস্ত উদ্‌ভ্রান্ত প্রচারের মাঝখানেই সময় বাহির করিয়া জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হইবে। 

এই পরিস্থিতি অবশ্য অপ্রত্যাশিত ছিল না। এই কারণে গত অক্টোবর হইতেই ভারত ইরানের উপর হইতে ক্রমশ নিজের নির্ভরতা কমাইতেছে। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, নাইজেরিয়া এবং খোদ মার্কিন দেশ হইতে খনিজ তৈল আমদানির পরিমাণ বাড়াইতেছে। মুশকিল হইল, অন্য দেশগুলি ইরানের মতো ভারতকে নমনীয় ‘টার্মস অব ট্রেড’ দেয় না, বিমা ও জাহাজ-চলাচলের সুবিধা দেয় না। তদুপরি, কেবল ইরান নহে, এখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়িয়া গিয়াছে ‘ওপেক’ গোষ্ঠীভুক্ত আরও কয়েকটি দেশ, এবং রাশিয়াও। সুতরাং ভারতের পক্ষে বিকল্পের সন্ধান সহজ নয়। অর্থাৎ, ট্রাম্পের সরকার যদিও ভরসা দিতেছে যে, অতঃপর অন্য আমদানিকারক দেশগুলির সমস্যা লাঘব করিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ‘ওপেক’-কুলরত্ন সৌদি আরব তাহাদের খনিজ তৈলের রফতানি অনেক গুণ বাড়াইয়া দিতে সক্ষম, অন্তত স্বল্পমেয়াদে ভারতে তৈলের দাম তথা মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী হইতে চলিয়াছে, এমন আশঙ্কা ভিত্তিহীন নয়। 

আরও একটি বিষয় ভাবিবার আছে। ইরান হইতে তৈল-আমদানিকারক দেশগুলির মধ্যে ভারত যদি দ্বিতীয় স্থানে থাকে, চিন প্রথম স্থানাধিকারী। এবং চিন কিন্তু ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা মানিয়া চলিবে বলিয়া মনে হয় না। বরং চিনের সহিত এই অবকাশে ইরানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হইবার সম্ভাবনাই বেশি। সে ক্ষেত্রে ভারতের কূটনৈতিক দ্বিধা কিন্তু আরও কঠিন হইয়া যাইতে পারে, ‘বেজিং রাখি না ওয়াশিংটন রাখি’ জাতীয় সঙ্কটের সম্ভাবনা থাকিতে পারে। অতীতেও এমন সমস্যায় ভারত পড়িয়াছে, যখন ভারতকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন পরমাণু-নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা করিতে হইয়াছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ তখন দেশের স্বার্থের কথা মাথায় রাখিয়া মার্কিন শিবিরে পা রাখিয়াছিলেন। এই মুহূর্তে এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় জটিলতর। একাধারে ইরান ও চিনকে শত্রু বানাইয়া ফেলিলে ভারতের পক্ষে স্বস্তির সন্ধান দুরূহতর হইবে।