E-Paper

আসল প্রতিপক্ষ কারা

গেরুয়া শিবিরের আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, রাজনৈতিক ভাবে তথাকথিত উদারমনস্ক বাঙালি হিন্দুরা এখনও বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতিকে খারিজ করেছেন ঠিকই, কিন্তু সামাজিক ভাবে বা বাঙালির সাংস্কৃতিক মননে বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্ব ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছে।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ ০৫:৪৮

বিজেপি দাবি করে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতি বার মুসলিমদের ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসে। তৃণমূলের অনেক নেতা মনে করেন, তাঁরা মহিলা, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষের ভোটে জেতেন। ভোটের ফলের বিশ্লেষণ অবশ্য বলে, তৃণমূল আসলে বাঙালি হিন্দু উদারমনস্ক, ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবাপন্ন মানুষের ভোটে জিতে আসছে। আরও স্পষ্ট করে বললে, এই বাঙালি হিন্দু উদারমনস্ক, ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবাপন্ন মানুষের একটা বড় অংশ বিজেপিকে ভোট দিতে চাননি, চান না। সেই কারণেই ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় ২০২১-এর গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোট কমেছিল। ২০২৪-এর গত লোকসভা নির্বাচনে সেই পতন অব্যাহত থেকেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসল লক্ষ্য হল, এই ‘উদারমনস্ক, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি হিন্দু’র সংখ্যাটাই কমিয়ে ফেলা। বাঙালি মননে হিন্দুত্বের রাজনীতির বীজবপন করতে পারলেই বিজেপির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব কাটিয়ে ফেলা যাবে। ‘উদারমনস্ক, ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দু’টি ফেলে দিয়ে খাঁটি ‘বাঙালি হিন্দু’ ভোটব্যাঙ্ক তৈরি হবে।

গেরুয়া শিবিরের আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, রাজনৈতিক ভাবে তথাকথিত উদারমনস্ক বাঙালি হিন্দুরা এখনও বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতিকে খারিজ করেছেন ঠিকই, কিন্তু সামাজিক ভাবে বা বাঙালির সাংস্কৃতিক মননে বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্ব ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছে। শিল্প বা চাকরির অভাব নয়। মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধিই রাজ্যের একমাত্র প্রধান সমস্যা বলে এখন বহু মানুষের বিশ্বাস। গত এক দশকে আরএসএস-এর শাখা সংগঠন ক্রমশ ডালপালা ছড়িয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্ব এর মোকাবিলায় পাল্টা মন্দির-রাজনীতি করতে গিয়ে এই হিন্দুত্বের রাজনীতির চাষেরই জমি তৈরি করে দিচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে বিজেপির এখনও পর্যন্ত সেরা সাফল্য ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসন জয়। বিধানসভা কেন্দ্রের হিসেবে বিজেপি সে-বার ১২১টি আসনে এগিয়ে ছিল। কিন্তু ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৭৭টি আসনে আটকে যায়। অর্থাৎ, মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে বিজেপি ৪৪টি আসনে পিছিয়ে পড়েছিল। বিজেপির ভোটের হারও ৩ শতাংশ কমেছিল। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ফল যদি দেখেন, সেই পতন থামেনি। বিজেপি ১২টি আসন জিতেছে। ভোটের হার আরও ৩ শতাংশ কমেছে।

কেন? পশ্চিমবঙ্গের জেলাওয়ারি ফল দেখলে বোঝা যাবে, তৃণমূল ২০১৯-এর পর থেকে বিজেপির গড় বলে পরিচিত উত্তরবঙ্গ থেকে মালদহ-মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় বিপুল পরিমাণে ভোট বাড়িয়েছে। বিজেপি বলতেই পারে, মুসলিম ভোটের সুবাদেই তৃণমূলের এই সাফল্য। এমনিতেই বিজেপি নেতারা বলে থাকেন, ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই রাজ্যের ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলিতে চলে যায়। মুসলিমরা কেন পদ্মফুলে ভোট দেবেন, তার কোনও জুতসই কারণ অবশ্য এখনও বিজেপি নেতারা দেখাতে পারেননি। কিন্তু তার পরেও মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় তৃণমূলের ভোটের বাড়বাড়ন্ত প্রমাণ করে, বাম-কংগ্রেসের ঝুলি থেকেও মুসলিম ভোট তৃণমূলের ঝুলিতে গিয়েছে। তাঁরা মনে করেছেন, বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূলকেই ভোট দেওয়া উচিত।

বিজেপির চিন্তার কারণ হল, পরিসংখ্যান বলছে, তৃণমূল জঙ্গলমহলেও ভোট বাড়িয়েছে। যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা তুলনায় কম। আবার কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের যে সব এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম, সেখানেও তৃণমূলের ভোট বেড়েছে। যার অর্থ, বাঙালি হিন্দু ভোটও গত বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির থেকে সরে গিয়েছে। তৃণমূল সরকারের প্রতি ক্ষোভ থাকলেও তাঁরা বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বিজেপিকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না বলে মানুষের মনোভাবই তৃণমূলের সাফল্যের কারণ।

গত বিধানসভা নির্বাচনে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ প্রচার বা ‘লেসার ইভিল’-এর তত্ত্ব তৃণমূলের এই সাফল্যের চাবিকাঠি ছিল। বলা হয়েছিল, তৃণমূল দুর্নীতি-অপশাসন করেছে ঠিকই, কিন্তু বিজেপির তুলনায় মন্দের ভাল। তৃণমূল অন্তত মাছে-ভাতে বাঙালির উপরে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেবে না। এ-বার বিধানসভা নির্বাচনে তাই বিজেপি নেতাদের বাজার থেকে কেনা আস্ত কাঁচামাছ হাতে ঝুলিয়ে প্রচার করতে হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে বসে মাছের কাঁটা বেছে নিজেদের বাঙালিয়ানা প্রমাণ করতে হচ্ছে।

গত বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল বাঙালিসত্তার আবেগকে হাতিয়ার করে বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়েছিল। এ-বার বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল শীর্ষনেতৃত্ব সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি চাইছেন। এসআইআর-এর বিরুদ্ধে ধর্মতলায় তৃণমূলের ধর্নামঞ্চ থেকে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি ছাড়া যে কোনও দলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এসআইআর-এ যৌক্তিক অসঙ্গতি (এলডি)-র নামে বাঙালির নাম-পদবির বানান নিয়ে হেনস্থার জন্য বিজেপিকে ‘সামাজিক বয়কট’-এরও ডাক দিয়েছেন তিনি। এ থেকে স্পষ্ট, তৃণমূল এ-বারেও সেই উদারমনস্ক বাঙালি হিন্দুর মধ্যে বিজেপির প্রতি নেতিবাচক মনোভাবকে উস্কে দিয়েই সাফল্য পেতে চায়।

অন্য রাজ্যের থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির লড়াইটা তাই আলাদা। অন্য রাজ্যে বিজেপি কোথাও প্রতিপক্ষের ওবিসি ভোটব্যাঙ্ক, কোথাও দলিত, কোথাও মহিলা ভোটব্যাঙ্ক ছিনিয়ে নিয়ে সাফল্য পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির চ্যালেঞ্জ হল, এই ‘উদারমনস্ক, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি হিন্দু’ ভোটব্যাঙ্ককে সঙ্কুচিত করে ফেলা। বাঙালি মননে ও সংস্কৃতিতে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তোলা।

ইতিহাস বলে, বাংলায় হিন্দু জাতীয়তাবাদ মোটেই ভিনগ্রহের বস্তু নয়। আরএসএসের প্রথম সরসঙ্ঘচালক কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার কলকাতায় মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করার সময়ই হিন্দু জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তোলায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছেন। সেই সুপ্ত হিন্দু জাতীয়তাবাদকে আবার জাগিয়ে তুলতেই এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপির বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও বন্দে মাতরম্ নিয়ে মাতামাতি। দেশভাগের যন্ত্রণার ইতিহাসকে বার বার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।

বাম জমানায় বাংলায় আরএসএসের গতিবিধি লাগামের মধ্যে থাকলেও একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। কিন্তু তৃণমূলের জমানায় আরএসএসের শাখাপ্রশাখা বেড়েছে, শিকড়ও ছড়িয়েছে। ২০১১-য় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন মুখ্যমন্ত্রী হলেন, সে সময় রাজ্যে আরএসএসের হাজারখানেক শাখা ছিল। ২০২৪-এ আরএসএসের শাখা, মিলন, মণ্ডলীর সংখ্যা সাড়ে চার হাজার ছাড়িয়েছে। উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ— তিনটি সাংগঠনিক প্রান্তেই আরএসএস শাখাবিস্তার করেছে। বেড়েছে আরএসএস পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। উত্তরবঙ্গের জেলায় জেলায় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গ্রামে অনুপ্রবেশের মোকাবিলায় আরএসএস ‘সীমান্ত চেতনা মঞ্চ’ নামে শাখা সংগঠনও তৈরি করেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ বিজেপি শীর্ষনেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে গিয়ে এই অনুপ্রবেশের কথা বলেই তাঁদের ‘হিন্দু খতরে মেঁ হ্যায়’ প্রচারে ধুয়ো তুলছেন। চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাজ্যে প্রচারে বলেছেন বেআইনি অনুপ্রবেশের ফলে রাজ্যের জনসংখ্যার চরিত্র বদলে যাচ্ছে। তৃণমূলকে হিন্দু-বিরোধী প্রমাণ করতে নরেন্দ্র মোদীর দাবি, তৃণমূল হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করছে। কারণ তৃণমূল শুধু সংখ্যালঘু তোষণ করে, হিন্দুদের ভোটব্যাঙ্ক বলে মনে করে না।

তৃণমূল নেতৃত্বের সমস্যা হল, বিজেপি-আরএসএসের এই হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোকাবিলা করার জন্য যে মতাদর্শগত লড়াইয়ের প্রয়োজন হয়, তা লড়ার ক্ষমতাস্ত্র তৃণমূলের অস্ত্রাগারে নেই। তাই তৃণমূল জনমোহিনী রাজনীতি করে। বাঙালিসত্তাকে হাতিয়ার করতে চায়। সহজ পথে হিন্দু ভোটকে আগলে রাখতে সরকারি অর্থে মন্দির তৈরি করে রাজ্য জুড়ে প্রসাদ বিলি করে। তাতে অবশ্য হিন্দুত্বের রাজনীতিরই উড়ানের রানওয়ে তৈরি হয়।

সিপিএমের নেতৃত্বে বামেরা একদা এই হিন্দুত্বের শিকড় বিস্তারের পথে বাধা ছিলেন। কারণ তাঁরা জানতেন, এই হিন্দুত্বের রাজনীতি সিপিএমের শ্রেণিসংগ্রাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার মতাদর্শের জন্য বড় বিপদ। বিজেপির মোকাবিলায় কংগ্রেস বা অন্য আঞ্চলিক ‘নরম হিন্দুত্ব’-র পথ নিলে সিপিএম নেতারা কড়া সমালোচনা করতেন। অধুনা দেখা যাচ্ছে, সেই সিপিএমের তরুণ তুর্কিরাও হিন্দুত্বের প্রলোভন এড়াতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় প্রচারে বেরিয়ে যজ্ঞের আগুনে ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন। কলতান দাশগুপ্তরা মন্দিরে নমস্কার করতে যাচ্ছেন। শূন্যের গেরো কাটাতে গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসানো ছাড়া আর কী-ই বা করার থাকে!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Assembly Election TMC BJP West Bengal government West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy