এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, মাথাপিছু আয়ের নিরিখে রাজ্য ষাটের দশকের গোড়া থেকেই বাকি দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে, এবং গত পনেরো বছরে সেই প্রবণতা বেড়েছে বই কমেনি। কিন্তু এই আখ্যানের ভিতরে কিছু জটিলতা আছে, যা রাজনৈতিক চাপানউতোরে ঢাকা পড়ে যায়। তনিকা চক্রবর্তী ও দিলীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় আমরা দেখছি, শুধু আর্থিক বৃদ্ধি নয়, মূল্যবৃদ্ধির হারের প্রভাবও ধরা প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির হার বাকি দেশের তুলনায় কম। সেই তথ্যটি হিসাবে রাখলে দেখা যাচ্ছে যে, আপাতদৃষ্টিতে আয়ের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের অবনতিকে যতটা নাটকীয় মনে হয়, প্রকৃতার্থে তা নয়। দ্বিতীয়ত, কৃষি, শিল্প এবং পরিষেবা ক্ষেত্রে আলাদা করে বৃদ্ধির ধরনে স্পষ্ট যে, আশির দশক থেকে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কৃষিতে রাজ্যের মাথাপিছু উৎপাদন বাকি দেশের গড়কে ছাপিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শিল্পে সত্তরের দশক থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু শিল্প উৎপাদন বাকি দেশের গড়ের তুলনায় পড়তে শুরু করে। নব্বইয়ের উদারীকরণের পর সেই প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে, এবং গত দেড় দশকেও তার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। পরিষেবা ক্ষেত্রে নব্বইয়ের দশক থেকে বৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু যে হারে হয়েছে তা শিল্পের দুর্বলতাকে ছাপিয়ে উঠতে পারেনি। তৃতীয়ত, বাকি দেশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ অঞ্চলে মূল্যবৃদ্ধির হার কম, নগরাঞ্চলে তা মোটামুটি একই রকম। তাই সময়ের সঙ্গে রাজ্যের গ্রামীণ অঞ্চলে জীবনযাত্রার খরচ আপেক্ষিক ভাবে কমেছে। এই তথ্যগুলি থেকে রাজ্যের উন্নয়নের যাত্রাপথের যে ছবি ফুটে উঠছে, তা মনোযোগ দাবি করে।
আশির দশক থেকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে রাজ্যে কৃষিজ দ্রব্যের জোগান বাড়ে, আর বাকি দেশের তুলনায় তার দাম কমতে থাকে। দেশে এই সময় শিল্পায়নের হার বাড়ায় নগরাঞ্চলে খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা বাড়ছিল, আর তার সঙ্গে কৃষিতে ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’ নীতির কারণে কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও ঘটছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে শিল্পে শ্লথতার কারণে নগরাঞ্চলে খাদ্যের চাহিদা তুলনায় কম বেড়েছিল। এ দিকে রাজ্যে শিল্পক্ষেত্রে সব মিলিয়ে জিনিসের দাম বাকি দেশের তুলনায় খুব একটা কমেনি। এর নিট ফল হল, রাজ্যে যে পরিসরে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে, তাতে দাম বেড়েছে কম; আর যে পরিসর মোটামুটি স্থবির থেকেছে, তাতে দাম কমেনি। তাই রাজ্যের সার্বিক মাথাপিছু আয় টাকার অঙ্কের হিসাবে বাকি দেশের তুলনায় যত কমেছে, প্রকৃত মূল্যের হিসাবে ততটা কমেনি।
তমোঘ্ন হালদারের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় আমরা পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের পরিসংখ্যান থেকে দেখতে পাচ্ছি যে, পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের প্রতিটি বিভাগেই জাতীয় গড়ের নীচে উপার্জন করেন। স্বনিযুক্ত শ্রমিকরা জাতীয় গড়ের তুলনায় ৩৪% কম পান, এবং সেই ফারাক বাড়ছে। বেতনভোগী কর্মীরা ১৪% কম, এমনকি দিনমজুররাও প্রায় ৮% কম পান। রাজ্যে কাজ পাওয়া যাচ্ছে— কর্মসংস্থানের হার জাতীয় গড়ের উপরে— কিন্তু সেই কাজে আয় কম। ই-শ্রম ডেটাবেসের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ সেই রাজ্যগুলির মধ্যে আছে, যেখান থেকে নিট হিসাবে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকেরা অন্য রাজ্যে যাচ্ছেন। বেঙ্গালুরু বা তিরুঅনন্তপুরমে এঁরা যে কাজ করছেন, শিল্পে আরও গতিশীল হলে পশ্চিমবঙ্গেই সে কাজ তৈরি হতে পারত।
কিন্তু উৎপাদন ক্ষেত্রে রাজ্যের এই প্রবণতার একটি উল্টো পিঠও আছে। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং তুলনায় মূল্যবৃদ্ধির হার কম হওয়ায় গ্রামীণ অঞ্চলে ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, আর তার ফলে জীবনযাত্রার মান বাকি দেশের গড়ের তুলনায় বেড়েছে। যে-হেতু দরিদ্র শ্রেণির মানুষেরা গড়ে খাবারের উপরে বেশি অনুপাতে খরচ করেন, আয়বৃদ্ধির হার কম হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের জীবনযাত্রার খরচ তুলনায় কম থেকেছে।
দেড় দশক আগে পর্যন্ত কয়েক বছর অন্তর জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার পারিবারিক সমীক্ষার মাধ্যমে মাথাপিছু পারিবারিক ব্যয়ের পরিসংখ্যান জানা যেত, যার থেকে জীবনযাত্রার মান এবং দারিদ্ররেখার তলায় থাকা জনসংখ্যার অনুপাত বিচার করা যায়। ২০১১ সালের পর এই সমীক্ষার ফলাফল বেরোয়নি। গত দু’বছরে দু’টি পর্বে এই সমীক্ষার ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। যদিও আগের পর্বের সমীক্ষার সঙ্গে তার ফলাফল সম্পূর্ণ ভাবে তুলনীয় নয়, তা হলেও আশির দশকের গোড়া থেকে গ্রামীণ ও নগরাঞ্চলে গড় মাথাপিছু পারিবারিক ব্যয় এবং দারিদ্ররেখার তলায় থাকা জনসংখ্যার অনুপাত নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত টানা যায়।
পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে যে বর্তমান মূল্যের হিসাবে খানিক পিছিয়ে থাকলেও, প্রকৃত মূল্যের হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে মাথাপিছু গড় পারিবারিক ব্যয় সর্বভারতীয় গড়ের থেকে আগাগোড়া বেশি থেকেছে। অন্য দিকে, বর্তমান মূল্য বা প্রকৃত মূল্য, যে হিসাবেই ধরা হোক— নগরাঞ্চলে মাথাপিছু গড় পারিবারিক ব্যয় জাতীয় গড়ের চেয়ে কম। দারিদ্ররেখার তলায় জনসংখ্যার অনুপাত যদি দেখি, তাতেও একই রকম ছবি ফুটে উঠছে— গ্রামাঞ্চলে এই নিরিখে রাজ্য বাকি দেশের থেকে এগিয়ে আছে, যদিও সর্বশেষ দুই সমীক্ষা-পর্বে রাজ্য ও দেশের গড় প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। অথচ নগরাঞ্চলে দারিদ্রের হার বাকি দেশের গড়ের তুলনায় রাজ্যে বেশি।
এর কারণ নিহিত আছে রাজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রগত বিন্যাস এবং গ্রাম ও নগরাঞ্চলে মূল্যস্তরের উপরে তার প্রভাবের মধ্যে। ঠিক যা গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলিকে সাহায্য করছে, তাতেই শহরের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন— বড় মাপের শিল্পায়নের অনুপস্থিতি। যে রাজ্যে দ্রুত শিল্পায়ন হয়েছে, সেখানে নগরাঞ্চলে আয় বাড়ায় খাদ্যপণ্যের দামও চড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সেই চাপ না থাকায় খাবারের দাম কম থেকেছে। এতে লাভ হয়েছে গ্রামীণ পরিবারগুলির— তাদের খরচের সিংহভাগই যায় খাদ্যে। কিন্তু শহরের পরিবারগুলি, যাদের চাহিদার বিন্যাস আরও বৈচিত্রপূর্ণ, তারা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকেছেন।
রাজ্যে নানা নগদ হস্তান্তর প্রকল্পের বিস্তার নিয়ে অনেক বিতর্ক চলছে, কিন্তু তার বাকি দেশের তুলনায় প্রত্যক্ষ পরিসংখ্যান নেই। তা হলেও পারিবারিক ভোগব্যয় সমীক্ষার শেষ দু’পর্বের রিপোর্টে সরকারি বিনামূল্যের পণ্য— চাল, গম, ডাল, ভোজ্যতেল, এবং মোবাইল-সাইকেলের মতো অন্যান্য পণ্যসামগ্রী— পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের কত অংশ, তার পরিমাপ আছে। তার থেকে দেখা যাচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গে গ্রাম ও শহরাঞ্চল দু’জায়গাতেই এই হার জাতীয় গড়ের থেকে বেশি শুধু নয়, এই দিক থেকে তা সমস্ত রাজ্যের মধ্যে একদম উপরের দিকে আছে। মনে রাখতে হবে, খাদ্যবণ্টন ব্যবস্থার পিছনে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার দুইয়েরই পরিপূরক ভূমিকা আছে। তা হলেও রাজ্য সারা দেশের তুলনায় এই বিষয়ে ভাল করলে তার কৃতিত্ব খানিক রাজ্য সরকারেরও প্রাপ্য। দুয়ারে রেশনের মতো উদ্যোগ এই সাফল্যে সত্যিকার অবদান রেখেছে। সরকারি রাজস্ব দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছলে তার সামাজিক মূল্য অনস্বীকার্য।
নগদ হস্তান্তরের প্রভাব এই সমীক্ষায় আলাদা করে ধরা পড়ে না। তা হলেও একটি গভীর প্রশ্ন থেকে যায়। সরকারি রাজস্ব ভোগব্যয়ে খরচ হলে, এবং তা দরিদ্র শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছলে সামাজিক কল্যাণের দিক থেকে দেখলে তার সবটা নিশ্চয়ই অপব্যয় নয়, কিন্তু কর্মসংস্থান ছাড়া তো দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র দূরীকরণ এবং উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে যে ছবি দাঁড়ায়, তার মধ্যে একটি মৌলিক অন্তর্দ্বন্দ্ব নিহিত আছে। কৃষির বাইরে কর্মসংস্থান ক্ষীণ, আয় কম, দক্ষতাহীন শ্রমিকরা ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন— অথচ গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান তুলনামূলক ভাবে উন্নত। যে কাঠামোগত রূপান্তর তামিলনাড়ু, কর্নাটক বা গুজরাতকে কর্মসংস্থানের ইঞ্জিনে পরিণত করেছে, তা পশ্চিমবঙ্গে হয়নি। কিন্তু, গ্রামে যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছে, তা কাঠামোগত সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনটাকে আড়াল করে রাখছে। গ্রামের মানুষ এতটাও বিপর্যস্ত নন যে, পরিবর্তনের জন্য তীব্র চাপ তৈরি হবে— অথচ শিল্পে, শহরের কর্মসংস্থানে, উৎপাদনশীলতায় যে রূপান্তর দরকার, যা সত্যিকারের উন্নয়ন আনতে পারত, তা থেকে রাজ্য ক্রমশ দূরেই সরে যাচ্ছে।
অর্থনীতি বিভাগ, লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)