E-Paper

ক্ষতিপূরণ প্রাপ্য ভারতেরও

প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার সব দেশের থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে যাদের আছে, তাদের উপরে নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু খনিজ সম্পদ না থাকলে তা আমদানি করতে হবে, এই প্রচলিত ধারণার বিপরীতে হাঁটতে চাইছে কিছু যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র।

শৈবাল কর

শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২২

আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ আর কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আর্থিক বাজারের গভীর আন্তর্নির্ভরতার কারণে একটি আঞ্চলিক সংঘাতের অভিঘাত দ্রুত বহু দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে ছড়িয়ে পড়ে। যে দেশগুলি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না, তাদেরও তেলের দাম, গ্যাস সরবরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক সূচকে তার প্রভাব পড়ে। এই বাস্তব পরিস্থিতিতে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে— যুদ্ধের প্রত্যক্ষ পক্ষ না হয়েও যে দেশগুলি আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা কি আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে?

প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার সব দেশের থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে যাদের আছে, তাদের উপরে নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু খনিজ সম্পদ না থাকলে তা আমদানি করতে হবে, এই প্রচলিত ধারণার বিপরীতে হাঁটতে চাইছে কিছু যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র। আমার যা নেই, তা তোমার থাকলে, আমি জোর করে নিয়ে নেব— এই মনোভাবই এখন বহু সংঘাতের অন্তর্নিহিত চালিকাশক্তি। এর ফলে প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তে যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তেল তো রয়েছেই; তার সঙ্গে লিথিয়াম, কোকো, সোনা, ইউরেনিয়াম— যে কোনও সম্পদকে কেন্দ্র করেই বছরে একাধিক সংঘর্ষের উদাহরণ মিলছে।

তেলের ভান্ডারের জন্য যুদ্ধ অবশ্য নতুন নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আরব দুনিয়ার তেল-রাজনীতি, ১৯৩২ সালের বলিভিয়া-প্যারাগুয়ে ‘চাকো’ যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের মালয়েশিয়া-ব্রুনেই আক্রমণ, ১৯৮০-র ইরান-ইরাক যুদ্ধ— সবই সম্পদকেন্দ্রিক সংঘাতের দৃষ্টান্ত। পশ্চিম এশিয়ার তেল নিয়ে আমেরিকা এবং ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলির টানাপড়েনও দীর্ঘ দিনের। তবে আগে এই দেশগুলির পদ্ধতি মূলত নিহিত ছিল খনি-মালিকদের কাছ থেকে উত্তোলনের অধিকার আদায় এবং প্রতিযোগীদের ঠেকানোর কূটনৈতিক প্রয়াসে। দেশ দখল করে খনির মালিকানা ভাগ করে নেওয়ার নগ্ন প্রবণতা প্রকট ভাবে সামনে আসে আমেরিকার ইরাক আক্রমণের পরে। এখন সেই লোভ আর আড়াল করারও বিশেষ প্রয়াস নেই।

যা নতুন, তা হল— এই সীমিত যুদ্ধের অভিঘাত এখন চট করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। যদি দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক এবং আর্থিক লেনদেন সীমিত পর্যায়ের হত, তা হলে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রভাব এত সুদূরপ্রসারী হত না। কিন্তু উৎপাদনের যে মূল্য-শৃঙ্খল উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে বিস্তৃত, তার ফলে এখন যে কোনও দেশের সামান্য রাজনৈতিক সঙ্কটও অন্য দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একটি দেশে উৎপাদনের একটি অংশ সম্পন্ন হয়, অন্য কয়েকটি দেশে তার বাকি অংশ— ফলে এই শৃঙ্খলের যে কোনও স্তরে ব্যাঘাত ঘটলে গোটা উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদনের বিভাজন না থাকলেও দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক বিনিয়োগে তার প্রভাব পড়ে। শিক্ষা, খেলা, উপদেষ্টা পরিষেবা এবং বিভিন্ন উৎপাদন ও পরিষেবা খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের চলাচলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কিন্তু যেটা যুদ্ধে লিপ্ত দেশের হিসাবের মধ্যে পড়ে না, তা হল— এর ফলে অন্য কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা কত দূর পৌঁছতে পারে। যুদ্ধের প্রত্যক্ষ খরচ বহন করে যারা সরাসরি যোগ দেয়। কিন্তু যুদ্ধের সমান্তরাল ক্ষতি বহু দেশের গৃহস্থের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ইরানের উপরে ইজ়রায়েলি এবং আমেরিকান আগ্রাসনের প্রভাব ভারতের সাধারণ মানুষের উপরে, তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উপরে, যে ভাবে পড়ছে তার সামগ্রিক হিসাব দাখিল করা খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়। এই খরচের মধ্যে তেলের দাম এবং গ্যাসের দাম বৃদ্ধি যেমন প্রত্যক্ষ প্রভাবের অন্তর্গত, তেমনই গ্যাসের অভাবে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কোটি কোটি মানুষের দৈনিক মজুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া পরোক্ষ প্রভাব হিসাবে বিবেচিত হবে। এই দুইয়ের যৌথ হিসাব পেশ করা গেলে যুদ্ধশুরু করা দেশের লাভের হিসাব অনেকটাই বদলে যেতে পারে।

কিছু দিন আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে, তেলের দাম বাড়ার ফলে আমেরিকার প্রভূত লাভ হচ্ছে, যে-হেতু তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তেল উৎপাদন এবং বণ্টনের বৃহৎ অংশ। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলি যদি এর উত্তরে কিছু বলতে না পারে, তা হলে ভবিষ্যতেও এই আগ্রাসন থামবে না। এখানেই মূল প্রশ্ন: যুদ্ধ থেকে যদি কিছু দেশ সরাসরি আর্থিক লাভ করে, অথচ অন্য দেশগুলির মানুষের জীবিকা বিপন্ন হয়, তা হলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলি কি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে না?

ইরানকে যুদ্ধে হারিয়ে, পুতুল-প্রধান বসিয়ে, আমেরিকা-ইজ়রায়েল যদি তাদের তেল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে কোটি কোটি ডলার রোজগারের সুযোগ করে দেয়, তা হলে নিরপেক্ষ কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির পক্ষ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি তোলা ন্যায্য। যুদ্ধ থেকে কিছু দেশ লাভ করছে, অথচ অন্য দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে— এই হিসাব মোট যুদ্ধ-খরচের মধ্যেই ধরা উচিত। অন্য সম্ভাবনাটি আরও উদ্বেগজনক। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেল এবং গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং যে দেশগুলি বেশি প্রভাবিত হবে, সেখান থেকে পুঁজি অন্যত্র সরে যাবে। অর্থাৎ, স্বাভাবিক অবস্থায় যে আর্থিক বৃদ্ধি প্রত্যাশিত, তার তুলনায় সূচক অনেক নীচে নেমে আসতে পারে। এই পতনের দায় যুদ্ধ শুরু করা দেশের নয় কি?

যুদ্ধে লিপ্ত দেশগুলি হার-জিতের হিসাব করেই নামে। কত দিন লাগবে, কত খরচ হবে, এবং কত লাভের সম্ভাবনা— এই হিসাবের উপরেই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এই হিসাবের মধ্যে সমান্তরাল আন্তর্জাতিক ক্ষতির হিসাব সাধারণত থাকে না। এখানেই আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন সামনে আসে। ১৯৯০ সালে কুয়েত আক্রমণের জন্য ইরাককে ৫,২০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি, জাপান এবং ইটালিকেও ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক নজির রয়েছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের ক্ষতিপূরণ কমিশন সশস্ত্র সংঘাত-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, পরিবেশগত ক্ষতি, গণ-দাবি প্রক্রিয়াকরণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গত দশ বছরে ৮০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ২৭ লক্ষ দাবি জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৫,৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলিকে পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশন সদর্থক ভূমিকা নিয়েছে। ভারত-সহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলি এই দাবি জানাতে পারে। এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা জরুরি।

সেই দাবি তোলার মতো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাস আমাদের আছে তো?

অর্থনীতি বিভাগ, সেন্টার ফর স্টাডিজ় ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Central Government International Law Financial compensation

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy