E-Paper

কেন্দ্রীয় বঞ্চনার সত্য-মিথ্যা

কেন্দ্র থেকে রাজ্যে টাকা যে পথেই আসুক না কেন, তাতে রাজ্যভিত্তিক পার্থক্য হবেই— কারণ, যে কোনও মাপকাঠিতেই রাজ্যগুলি একে অপরের তুলনায় অনেক আলাদা।

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩০
অধিকার: একশো দিনের কাজ শুরু করার দাবিতে সিপিআইএম সমর্থকদের মিছিল। ১ নভেম্বর ২০২৫, ঘাটাল

অধিকার: একশো দিনের কাজ শুরু করার দাবিতে সিপিআইএম সমর্থকদের মিছিল। ১ নভেম্বর ২০২৫, ঘাটাল

গত শতকের আশি-নব্বই’এর দশকে বাম ফ্রন্টের নির্বাচনী দেওয়াললিখন জুড়ে প্রার্থীদের জয়ী করার আবেদনের পাশাপাশি থাকত দু’টি বিষয়— কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, এবং বাহাত্তরের সন্ত্রাস। তার পর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে, কিন্তু বঙ্গরাজনীতিতে এখনও সমান প্রাসঙ্গিক কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ। বাম আমলে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা সংক্রান্ত আলোচনা আবর্তিত হত মূলত মাসুল সমীকরণ এবং শিল্প লাইসেন্স নীতিকে কেন্দ্র করে, এখন যে বিষয়গুলোর আর কোনও অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে কেন্দ্রের বঞ্চনার প্রশ্নটি তাই মূলত কেন্দ্র থেকে রাজ্যের প্রাপ্য টাকার হিসাবে সীমাবদ্ধ। এই বিষয়টি ভারতের মতো দেশে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ— যেখানে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিকতার বিষয়গুলি অতি-কেন্দ্রীভূত। কিন্তু এই অভিযোগ কতটা সত্যি? সত্যিই কি পশ্চিমবঙ্গ বঞ্চিত? না কি, এ শুধুই নির্বাচনী কৌশল?

কেন্দ্র থেকে রাজ্যে টাকা যে পথেই আসুক না কেন, তাতে রাজ্যভিত্তিক পার্থক্য হবেই— কারণ, যে কোনও মাপকাঠিতেই রাজ্যগুলি একে অপরের তুলনায় অনেক আলাদা। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে কর বিভাজন সংক্রান্ত যে দু’টি পরিসংখ্যান সহজলভ্য, সেগুলি হল— এক, কেন্দ্র থেকে কত কর রাজ্যে হস্তান্তরিত হচ্ছে; এবং দুই, রাজ্য থেকে মোট কত কর সংগৃহীত হচ্ছে। এই দু’টি চলকের অনুপাতকে কর বিভাজনের ক্ষেত্রে বঞ্চনার পরিমাপ হিসাবে ব্যবহার করা যায়। এই অনুপাত দেখায় যে, একটা রাজ্য থেকে যত কর সংগ্রহ হচ্ছে, সেই রাজ্যটি সেই অনুপাতে করের টাকা ফেরত পাচ্ছে কি না। অনুপাতটি কমলে বোঝা যাবে যে, সে রাজ্যটি আনুপাতিক হারে কেন্দ্র থেকে কম টাকা পাচ্ছে। অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকার হিসাবের ক্ষেত্রে বঞ্চনার একটি ভিন্ন পরিমাপ ব্যবহার করছি— দেখছি যে, কোনও প্রকল্পে মোট কেন্দ্রীয় বাজেটের যত শতাংশ কোনও রাজ্যে আসছে, এবং সেই প্রকল্পের উদ্দিষ্ট উপভোক্তাদের কত শতাংশ ওই রাজ্যে বসবাস করেন, তার অনুপাত কত।

কেন্দ্রীয় বঞ্চনার একটি স্থায়ী আখ্যান হচ্ছে, কেন্দ্রে যার বিরোধী, তাদের শাসিত রাজ্য কেন্দ্র থেকে কম টাকা পায়। যে সব রাজ্যে গত বারো বছরে শাসক দল বা জোট পরিবর্তিত হয়েছে, সে রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে এই সময়কালে কেন্দ্রীয় কর হস্তান্তর এবং রাজ্যের কর সংগ্রহের অনুপাত পাল্টেছে কি না, তা দেখলে এই অভিযোগটির সত্যতা বিচার করা সম্ভব হবে। এই তালিকায় রাজস্থান, কর্নাটক, ঝাড়খণ্ড এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্য রয়েছে। এই রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় হস্তান্তর ও রাজ্যের কর সংগ্রহের অনুপাত শাসক দল পরিবর্তনের পর কখনও কমেছে, কখনও বেড়েছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের অভিমুখের সঙ্গে বিজেপি শাসনের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে না। যেমন কর্নাটকে ২০১৩ সালে কংগ্রেস জেতার পর এই অনুপাতটি কমে যায়; কিন্তু ২০১৮-তে বিজেপি জেতার পরেও এই অনুপাতটি কমে যায়; আবার ২০২৩-এ কংগ্রেস জেতার পর এই অনুপাতটি বাড়ে। এখানে মনে রাখতে হবে যে, এই অনুপাত যেমন কেন্দ্রীয় হস্তান্তর কমলে কমে— যা কেন্দ্রীয় বঞ্চনার সূচক; তেমনই, রাজ্যের কর সংগ্রহ বাড়লেও কমে— যা রাজ্যের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রতিফলন। আলাদা ভাবে কেন্দ্রীয় হস্তান্তর এবং রাজ্যের কর সংগ্রহের হিসাবের দিকে তাকালে বোঝা যায় যে, এই অনুপাতের বাড়া-কমা মূলত রাজ্যের কর সংগ্রহের হ্রাস-বৃদ্ধি দিয়েই পরিচালিত হয়; কেন্দ্রীয় হস্তান্তরের ভূমিকা সেখানে নগণ্য। এই ফলাফল অস্বাভাবিক নয়— কারণ, কেন্দ্রীয় কর হস্তান্তর নির্ধারিত হয় অর্থ কমিশনের সূত্র অনুসরণ করে। কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের সম্ভাবনা সেখানে কম।

যেখানে রাজ্যের প্রাপ্য পুরোটা নির্দিষ্ট সূত্র-নির্ভর নয়, যে প্রাপ্য অন্তত আংশিক ভাবে হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের উপরে নির্ভর করে, সেখানে বঞ্চনার সম্ভাবনা বেশি। সে রকম একটি ক্ষেত্র হল কেন্দ্রীয় সরকার পোষিত বিভিন্ন প্রকল্প, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথ ভাবে প্রকল্পের ব্যয়ভার বহন করে। গত কয়েক বছরে বার বার এই ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের ঘটনা উঠে এসেছে সংবাদ শিরোনামে। অন্তত তিনটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী দল শাসিত রাজ্যের টাকা আটকে রেখেছে বিভিন্ন যুক্তিতে। এর মধ্যে অধুনাবিলুপ্ত মহাত্মা গান্ধী জাতীয় কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা যোজনা প্রকল্পের কথা বহুল-আলোচিত।

তুলনায় কম আলোচিত দু’টি প্রকল্প হল জল জীবন মিশন এবং সমগ্র শিক্ষা অভিযান। জল জীবন মিশনে গ্রামীণ পরিবারে নলবাহিত পানীয় জলের সংযোগ দেওয়া হয়। ২০২৫-২৬’এ এসে কোনও রাজ্যকেই আর জল জীবন মিশন বাবদ কোনও টাকা দেওয়া হচ্ছে না এবং রাজ্যগুলিকে নিজেদের টাকায় এই কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত, অর্থাৎ, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫’এর পরিস্থিতি যদি দেখি, তা হলে দেখব যে, অনেক রাজ্যই এই লেখায় ব্যবহৃত সূচক অনুযায়ী বঞ্চিত— অর্থাৎ, তাদের প্রাপ্ত অর্থের অনুপাত, তাদের গ্রামীণ জনসংখ্যার অনুপাতের তুলনায় কম। বঞ্চিত রাজ্যের বেশির ভাগই বিরোধী-শাসিত, তবে হরিয়ানা বা মহারাষ্ট্রের মতো বিজেপি-শাসিত রাজ্যও সে দলে আছে। কিন্তু বঞ্চনা সূচকের নিরিখে একদম উপরের দিকে আছে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু বা তেলঙ্গানার মতো অ-বিজেপিশাসিত রাজ্য। যেমন, ২০১১ সালের জনশুমারি অনুসারে দেশের মোট গ্রামীণ জনসংখ্যার আট শতাংশ পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হলেও, এ রাজ্য জল জীবন মিশনে মোট কেন্দ্রীয় অনুদানের ছ’শতাংশের কাছাকাছি পেয়েছে।

কিন্তু কেন্দ্রীয় বঞ্চনার আরও বড় উদাহরণ সমগ্র শিক্ষা অভিযান। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার পিএম স্কুল ফর রাইজ়িং ইন্ডিয়া (সংক্ষেপে পিএমশ্রী) বলে একটি প্রকল্প চালু করে। সেই প্রকল্প অনুযায়ী প্রতি ব্লকে একটি করে মডেল স্কুল চালু করতে হবে, যার মাধ্যমে নতুন শিক্ষানীতির প্রচলন করা হবে। তিনটি রাজ্য পিএমশ্রীর জন্য সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃত হয়— কেরল, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গ। এর প্রতিক্রিয়ায় কেন্দ্র এই তিনটি রাজ্যের প্রাপ্য সমগ্র শিক্ষা অভিযানের টাকা আটকে দেয়। প্রসঙ্গত, গত শতকের আশির দশকে যখন রাজীব গান্ধী নবোদয় বিদ্যালয় চালু করার প্রকল্প গ্রহণ করেন, তখনও বাধা এসেছিল দু’টি রাজ্য থেকে— পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ু।

পিএমশ্রী বিতর্কে কেন্দ্রীয় টাকা বন্ধ আছে ২০২৪-২৫ থেকে। কিন্তু যদি ২০১৯ থেকে ২০২৩-এর পরিসংখ্যানও নিই, তা হলে দেখব যে, পশ্চিমবঙ্গে যেখানে দেশের মোট সরকারি স্কুলের ছাত্রদের ১২% পড়ে, সেখানে সমগ্র শিক্ষা অভিযানের মাত্র ৫.৫% টাকা আসে এই রাজ্যে। সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সমগ্র শিক্ষা অভিযান থেকে পেয়েছে মাথাপিছু ১৪৩৬ টাকা; যেখানে বিহারের ছাত্রছাত্রীরা পেয়েছে ২৩৫১ টাকা, উত্তরপ্রদেশে ১৯৩৫ টাকা, অন্ধ্রে ৩০০৮ টাকা, তামিলনাড়ুতে ৩৬৯৪ টাকা। এই তালিকার সবচেয়ে উপরে হিমাচল প্রদেশ— সে রাজ্যের ছাত্রপিছু প্রাপ্তি ৮৭৪৪ টাকা। পশ্চিমবঙ্গ এই তালিকায় নীচের দিক থেকে তৃতীয়; কেরল ও মহারাষ্ট্রের উপরে।

উপরের আলোচনায় দু’তিনটি বিষয় বেশ স্পষ্ট। প্রথমত, ফর্মুলাভিত্তিক সাধারণ কর বিভাজনে নয়, বঞ্চনার সম্ভাবনা বেশি কেন্দ্রপোষিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়ত, এই বিশ্লেষণ ডাবল ইঞ্জিন মডেলের পক্ষে যাচ্ছে না— অর্থাৎ, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় থাকলেই যে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের ঢল নামবে, তা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, আমি যে ক’টি প্রকল্প দেখেছি, কোনওটির ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গ তার জনসংখ্যার অনুপাতে প্রাপ্য বরাদ্দ পাচ্ছে না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

100 Days Work

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy