E-Paper

বঙ্গবিজয়ের কর্মযজ্ঞ

সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবন তোলপাড় করে এমন রাষ্ট্রীয় বাহানা স্মরণকালে হয়নি, লকডাউন বা নোটবন্দির সময়েও নয়। হয়নি এ বারও, অন্যান্য রাজ্যে। একটা প্রশ্ন ক্রমাগত উঠছে: শুধু বাংলাতেই এসআইআর নিয়ে ধুন্ধুমার কেন? এর সহজ উত্তর, বাংলায় যে ভাবে এসআইআর সংঘটিত হয়েছে তা অন্যত্র হয়নি।

সুকান্ত চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:০৮
বাতিল: সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম বাদ দেখে পথ অবরোধে মানুষ, বাঁকুড়া-রাইপুর রোড, ১১ মার্চ।

বাতিল: সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম বাদ দেখে পথ অবরোধে মানুষ, বাঁকুড়া-রাইপুর রোড, ১১ মার্চ।

আচ্ছা, আপনারা কে ক’জন রোহিঙ্গা দেখেছেন? শুনি এরা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে গিজগিজ করছে— সারা বিশ্বে এদের যা অনুমিত জনসংখ্যা, তারও বেশি। হাজার হলেও এরা বিদেশি, সহজেই শনাক্ত হওয়া উচিত। এদের ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষার কিছু মিল আছে, পশ্চিমবঙ্গবাসীদের কাছে দুর্বোধ্য হওয়ার কথা। কোন ম্যাজিকে লক্ষ লক্ষ মানুষ অদৃশ্য হয়ে আছে? থাকে কোথায়, করে কী?

২০১৭-য় রোহিঙ্গারা মায়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। আজও এদের প্রধান আশ্রয়স্থল চট্টগ্রাম অঞ্চলের ত্রাণশিবির। ভারতে এরা খ্যাতিলাভ করল বছর দুই আগে— ঠিক যখন কেন্দ্রীয় সরকার তথা শাসক দল বেআইনি অনুপ্রবেশ নিয়ে সরব হচ্ছে। বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশ তো পুরনো কাসুন্দি, রোহিঙ্গা যোগে তার ঝাঁঝ ফেরানো গেল।

অনুপ্রবেশ নিয়ে চর্চা এখন তুঙ্গে। গত স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর লাল কেল্লার ভাষণে তার উল্লেখ ছিল। তাঁর অনুগামী নিনাদবাহিনীর এটা আজ ‘থিম সং’, প্রধান আলোচ্য— শুধু বাংলায় নয়, সর্বত্র।

ভোটগামী রাজ্যগুলির মধ্যে কেরল বা পুদুচেরিতে অনুপ্রবেশের সমস্যা নেই। তামিলনাড়ুতে ছিল শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময়, তার পাট মিটেছে। বাকি রইল অসম, ত্রিপুরা আর পশ্চিমবঙ্গ। তিন রাজ্যেই অবাঞ্ছিত আগন্তুকেরা এক জাতির, এক ভাষাভাষী। উপরন্তু তাদের বড় অংশ এক বিরাগভাজন ধর্মাবলম্বী। এই রাজ্যগুলিতে অনুপ্রবেশতত্ত্ব তাই ভোটের সহজলব্ধ হাতিয়ার।

অন্যান্য রাজ্যবাসীও এই তত্ত্বের উপভোক্তা। বাঙালি ঘুসপেটিয়ার জুজু খাড়া করে দেশময় এক বিধ্বংসী বিদ্বেষ উস্কে দেওয়া হয়েছে, যার মাদকতায় মানুষকে একত্রিত করা যায়, রাজনৈতিক সুবিধা লোটা যায়। যূপকাষ্ঠে পোরা হয়েছে তাবৎ বঙ্গভাষীকে। কে পুবের কে পশ্চিমের, কে হিন্দু কে মুসলিম, অত সূক্ষ্ম বিচারে কে যাবে? সব বাঙালিই হয়ে উঠেছে সন্দেহ আর অপরত্বের শিকার, যদিও আক্রোশের কোপটা স্বভাবতই বেশি পড়ছে গরিব পরিযায়ী কর্মীদের উপর।

অনুপ্রবেশ অবশ্যই ঘটেছে, দীর্ঘ দিন ধরে। প্রশ্ন হল, সংখ্যাটা কত? ২০২১-এ নির্ধারিত জনগণনা আজও শুরু হয়নি। গত বছর সংসদে পেশ করা তথ্য অনুসারে, ২০১৪ থেকে গত বারো বছরে বাংলাদেশ সীমান্তে ৮,৬৩২টি অনুপ্রবেশ আটকানো গেছে, বারো বছরে মোট ২১৪০৭ জন গ্রেফতার হয়েছে। কত জন ঢুকেছে, সেই সংখ্যা সত্যিই জনবিন্যাস পাল্টে দিতে পারে কি না, তার যথাযোগ্য সমীক্ষা হয়নি। ফলে ভীতি আর গুজবের রাজপথ খোলা।

সামাজিক অনাচারের পিছনে কোনও-না-কোনও অজ্ঞতা কাজ করে। জনতাকে খেপিয়ে তুলতে নেতারা সেই অজ্ঞতাকে কাজে লাগান, লালন করেন। বাংলা ভাষা নিয়ে অনীহা ও অজ্ঞতা ভারত জুড়ে বর্তমান, যেমন অন্যান্যের ভাষা ও জীবন সম্বন্ধে বাঙালিদের মধ্যে। বহু লোকের ধারণা, বাংলা একান্ত ভাবে বাংলাদেশের ভাষা। শাসক দলের এক তাবড় নেতা অবিশ্বাস্য ভাবে সমাজমাধ্যমে লিখলেন, পশ্চিমবঙ্গের কোনও ভাষাই নেই, আছে কতক উপভাষা মাত্র। পড়ে আমরা শিক্ষিত বাঙালিরা বরাবরের মতো কিছু হাসাহাসি, মাতৃভাষার কিছু গুণকীর্তন কিছু পোশাকি আলোচনা করলাম। ভেবে দেখলাম না, এই ভুলের চাষ থেকে কী বিপুল রাজনৈতিক ফসল দলবিশেষের গোলাঘরে উঠল। তার সঙ্গে অবশ্যই যোগ হল মুসলিমবিদ্বেষ। কায়েম হল এই সর্বনাশা বিশ্বাস যে বঙ্গভাষী মাত্রেই বাংলাদেশি মুসলমান, ভারতে ঘুসপেটিয়া। শুধু ভিনরাজ্যবাসী কেন, এই অপতথ্যে যেটুকু সত্যের মিশেল আছে— সত্যিই তো সীমানা পেরিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটে— তার দোহাই পেড়ে আমরা উচ্চবর্গীয় হিন্দু বাঙালিরাও নিরুপদ্রব জীবন, রাজভক্তি, এবং অবশ্যই নিজেদের চোরা মুসলমান-বিদ্বেষ অক্ষুণ্ণ রাখলাম।

চৈতন্য হল না তখনও, যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলা বলার ‘অপরাধ’-এ কিছু লোকের প্রাণ গেল, অসংখ্য মানুষ অত্যাচারিত হলেন এক দিকে সেই রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসন, অপর দিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বাহিনীর হাতে। ভয়ে রুটি-রুজি ছেড়ে পালিয়ে এলেন আরও বেশি লোক। তাঁদের মধ্যে নিশ্চয় কিছু বাংলাদেশি ছিলেন, হয়তো রোহিঙ্গাও; কিন্তু যে কয়েকটা সংখ্যা পাওয়া যায়, তাতে স্পষ্ট যে অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গবাসী ভারতীয় নাগরিক। আর হ্যাঁ, একটা বড় অংশ মুসলমান।

একটা প্রত্যুত্তর প্রায়ই শোনা যায়: রাজ্যের আর্থিক হাল এত খারাপ না হলে এই লোকগুলির ভিনরাজ্যে যেতেই হত না। কথাটা আংশিক সত্য কিন্তু এ প্রসঙ্গে অবান্তর। ভারতের যে-কোনও নাগরিকের দেশের যে-কোনও প্রান্তে বসবাস ও জীবিকা অর্জনের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে।

সেই অধিকার ভূলুণ্ঠিত করে দেশ জুড়ে পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের যারপরনাই হেনস্থা ও অপমান করা হয়েছে। তাঁরা নাগরিকত্বের নানা শংসাপত্র দাখিল করেছেন, কর্তৃপক্ষ সেগুলির তোয়াক্কা করেননি। স্থানীয় দুর্বৃত্তের দল বসতি থেকে উচ্ছেদ করেছে, বাড়িওয়ালা ও নিয়োগকর্তাদের শাসিয়েছে বাঙালিদের ঠাঁই না-দিতে। চূড়ান্ত পর্যায়ে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক বিস্ময়কর নির্দেশবলে বাংলাদেশি সাব্যস্ত করে রাতারাতি সীমানার ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে; দেশবাসী নির্বিকার থেকেছে। সুনালী খাতুন অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় তবু তাঁর কিছু সহানুভূতি জুটেছিল। তাঁর স্বামী এখনও ওপারে আটক, আটক দুই নাবালক সন্তান-সহ বীরভূমের আর এক রমণী। নাগরিকত্বের এই অবিশ্বাস্য অপহরণেও উচ্চবর্গের আত্মতুষ্ট বঙ্গসমাজে উদ্বেগ বা প্রতিবাদ দেখা যায়নি, বাকি ভারতে তো নয়ই। ঘুঁটে পুড়েছে, আমরা গোবরের দল হেসেছি কেবল— কেউ মুখ টিপে, কেউ উল্লাস করে।

আজ দেখা যাচ্ছে, ‘অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’ এসআইআর-কর্তাদের আমরাও নানা দলিল দেখাচ্ছি, তাঁরা সেগুলি অগ্রাহ্য করছেন— কেন, পরিবর্তে কী চান তার ব্যাখ্যা জুটছে না, নাম কাটা গেলেও না। নির্বাচন কমিশন আগাগোড়া মৌন: ফর্ম পূরণ থেকে শুরু করে কিছুর কোনও স্পষ্ট নির্দেশ নেই, নিত্যনতুন নিয়মের স্পষ্ট ঘোষণা নেই ব্যাখ্যা নেই। ‘যুক্তির ফাঁক’ দূর করার নামে শতগুণ অবাস্তব কুযুক্তি প্রয়োগ হয়েছে। ফলে বাবা তালিকায় আছেন তো মা নেই, এক সন্তান আছেন তো সহোদরেরা নেই। কোনও পিতামাতার ছয়টি সন্তান থাকা অবিশ্বাস্য বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। পরিবারের সংহত অস্তিত্বের উপরই আঘাত হানছে নিয়মতন্ত্রের নির্বোধ প্রকোপ।

গ্রাম বা পাড়ার স্তরেও কার নাম আছে কার নেই, সেটা হেঁয়ালি। একই বুথে হাজার নামের মধ্যে কয়েকশো বাতিলের উপযুক্ত, এটা বাস্তব বিচারে মানতে বাধে। সরকারি আধিকারিক বা উচ্চ আদালতের বিচারকও বাদ পড়েছেন, যদিও তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়োগের সময়ই খতিয়ে যাচাই হয়। সহোদর ভাইবোন, অবিসংবাদিত নাগরিক, আজীবন ভোটদাতা, বংশপরম্পরায় জমির মালিক বা বাসিন্দা এত সংখ্যায় বাদ পড়লে সেটা তাঁদের ব্যক্তিগত ত্রুটি কিংবা নথির অভাব দিয়ে ব্যাখ্যা চলে না। বলতেই হয়, এসআইআরের পদ্ধতিগত পরিকল্পনায় গুরুতর ত্রুটি আছে, যুক্তি বা বাস্তব কোনওটাই মানা হয়নি। ফর্মের পিছনে এক-এক জন মানুষ আছে, আর মানুষমাত্রেরই জীবনে কিছু অগোছালো অসঙ্গতি থাকে, থাকা খুবই স্বাভাবিক। দায়িত্বশীল প্রশাসন সেগুলি হিসাবে রেখেই ব্যবস্থা করে।

হয়রানির এক অযৌক্তিক ও অবাস্তব দৃষ্টান্ত, নামের বানানে সূক্ষ্ম তারতম্য নিয়ে সাতকাহন করা। চক্রবর্তী বা বন্দ্যোপাধ্যায়/ব্যানার্জি, মহম্মদ বা হুসেন, এই নামগুলি রোমান হরফে নানা হাতে নানাভাবে লেখা হয়, বিশেষত নিরক্ষর বা অল্পশিক্ষিত মানুষের নথিতে। এই তুচ্ছ তফাতগুলি অগ্রাহ্য করবে অর্থাৎ একত্র করে ধরবে, এমন সফটওয়্যার সহজেই বানানো যায়। তার ফলে যাতে ভুয়ো নাম ঢুকে না পড়ে, সে ব্যবস্থাও কঠিন নয়। বর্তমান ব্যবস্থায় যে আসল নাম ঢের বেশি বাদ পড়ছে, বা বহাল রাখতে লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম হেনস্থা হচ্ছেন, দুশ্চিন্তা হয়রানি অবসাদে ভেঙে পড়ছেন, সেটা কি কম গুরুতর কথা? কিছু লোকের প্রাণ গেছে। অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করে অসুস্থ মানুষ পনেরো-বিশ কিলোমিটার দূরে হিয়ারিং সেন্টারে এসেছেন। ভিনরাজ্য থেকে পরিযায়ী শ্রমিক এসেছেন ট্রেন-ভাড়া গুনে। রোজগার পরিহার করেছেন অগুনতি মানুষ। এসআইআর বাবদ পশ্চিমবঙ্গের নাগরিককুল সমবেত ভাবে যা অর্থদণ্ড দিয়েছেন, তার পরিমাণ কত কোটি? বিষয়টি গবেষণা দাবি করে। মানসিক গুনাগার অবশ্যই হিসাবের অতীত, পরীক্ষার্থী ও বিয়ের বর-কনে থেকে সদ্য স্বজনহারা পরিবারবর্গ তা মিটিয়েছেন কড়ায়-গন্ডায়।

সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবন তোলপাড় করে এমন রাষ্ট্রীয় বাহানা স্মরণকালে হয়নি, লকডাউন বা নোটবন্দির সময়েও নয়। হয়নি এ বারও, অন্যান্য রাজ্যে। একটা প্রশ্ন ক্রমাগত উঠছে: শুধু বাংলাতেই এসআইআর নিয়ে ধুন্ধুমার কেন? এর সহজ উত্তর, বাংলায় যে ভাবে এসআইআর সংঘটিত হয়েছে তা অন্যত্র হয়নি। অন্য কোথাও হাজারো মাইক্রো-অবজ়ারভার বসানো হয়নি, অন্য কোথাও এত তেড়েফুঁড়ে ‘যুক্তির ফাঁক’ পূরণের এলাহি অভিযান হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, বঙ্গভাষী অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে দেশ জুড়ে রব ওঠায় পশ্চিমবঙ্গবাসীরা কিছুতেই ভোটাধিকার থেকে নাগরিকত্বকে আলাদা করে দেখতে পারছেন না। ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য তাই সকলে এত মরিয়া। অন্যান্য রাজ্যের বাসিন্দাদের এ ভাবে চেপে ধরলে তাঁরা কী নথিপত্র দেখাতে পারতেন তা অনিশ্চিত, কিন্তু তা চাওয়া হয়নি, এত কঠোর ভাবে ‘যুক্তির ফাঁক’-এর ছাঁকনি দিয়ে যাচাই হয়নি।

দেশ জুড়ে পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের উপর উৎপীড়ন চলছে, তাঁদের ভারতীয়ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে। এসআইআর জারিতে এ বার রাজ্যের তাবৎ বাঙালি সম্বন্ধে সেই প্রশ্ন তোলা হল। অন্য দেশবাসীদের তুলনায় আমরা যেন কম ভারতীয়: বিশেষ করে খতিয়ে বাজিয়ে তবেই নাগরিক স্বীকৃতি মিলবে, নাও মিলতে পারে কোনও অলীক অথচ অমোঘ কারণে। আমাদের বাগে রাখতে কাশ্মীর ও মণিপুর থেকে আধাসেনা তুলে আনতে হয়।

একটা জাতি তথা রাজ্য সম্বন্ধে এমন মূল্যায়ন অপমানজনক তো বটেই; তার চেয়ে বড় কথা, প্রবল আশঙ্কাজনক। নাগরিক অধিকার হারানোর প্রথম ধাপ ভোটাধিকার হারানো। বাকি ধাপগুলিও যে নামতে হতে পারে, এত কাল সেটা অচিন্তনীয় ছিল, আজ অগ্নিগর্ভ প্রশ্ন। প্রতিবেশী রাজ্য অসমে এই কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ নাগরিকত্ব হারিয়েছেন বা এক ধরনের আধা-নাগরিক হয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়াটি যাঁরা চালু করলেন, তাঁরা কি বুঝেছিলেন জল কোথায় দাঁড়াবে? অবশেষে আশা করা যাচ্ছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে সব বিবেচনাধীন কেসের সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি হবে। তাতে যে লক্ষ লক্ষ লোকে বাদ পড়বেন, ট্রাইবুনালে তাঁদের সকলের আপিলের ফয়সালা কত দিনে হবে? স্রেফ প্রশাসনিক বিলম্বের জন্য তাঁরা কি অন্তত এই নির্বাচনে ভোটাধিকার হারাবেন?

যদি হারান, তখন কী করবেন? আদালতে মামলা করবেন? ক’জন সেই ব্যয়বহুল দীর্ঘসূত্রী পথে হাঁটবেন? আন্দোলন করবেন? তা দমন করতে আগে থেকেই রাজ্যে অভূতপূর্ব সংখ্যায় আধাসেনা মোতায়েন। অশান্তির অজুহাতে রাষ্ট্রপতির শাসন জারিও অসম্ভব নয়। বাকি আর একটাই পথ— নিঃশব্দে ভোটাধিকার হরণ মেনে নেওয়া। তার খেই ধরে আরও কত অধিকার হারাতে হতে পারে তা চিন্তা করে কাজ নেই।

‘বাবু বলিলেন, বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।’ কিছু দিন যাবৎ রাজ্যবাসী হিসাবে বোধ করছি, পায়ের নীচের জমিটা দখল হয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য রাষ্ট্রিক প্রক্রিয়ার মতো নির্বাচনটাও নতুন এক নির্দয় নির্বিকার নিরুত্তর রূপ নিচ্ছে, নাগরিকদের আত্মশক্তি খর্ব করে। কী ভাবে সেই আত্মশক্তি বাঁচিয়ে রাখা যায়? এর উত্তর জানি না।

অনেক দ্বিধা কাটিয়ে, নিজেকে অনেক প্রশ্ন করে এতটা লিখলাম। ‘বাঙালি বিপন্ন’ কথাটা শুনতে শুনতে বাসি হয়ে গেছে। সেটা আওড়ায় মুষ্টিমেয় আবেগতাড়িত আন্দোলনকারী। আর আওড়াই আমরা অনেকে, রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্কিমকে কেউ ভেংচি কাটলে। বিপন্ন ওই মহীরুহেরা নন, পরিযায়ী শ্রমিক আর নথিনিঃস্ব উলুখাগড়া। এতই এঁরা অকিঞ্চিৎকর যে কোনও হিসেবে এঁদের ধরা হয় না। এঁরা কি আজ কোনও বৃহৎ অভিসন্ধির জালে জড়িয়ে পড়েছেন? আমরা বাকিরা কি তবে বাদ যেতে পারি?

কথামালার সেই রাখাল বালকের মতো ‘বাঙালি বিপন্ন’ বলে কিছু লোক থেকে থেকে গলা ফাটিয়েছে, বাকিরা সঙ্গত কারণেই কান দিইনি। আজকের পরিস্থিতি কিন্তু আলাদা। সত্যিই কি পালে বাঘ পড়তে চলেছে?

ইমেরিটাস অধ্যাপক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government infiltration

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy