E-Paper

বন অধিকারহীন সুন্দরবন

দু’দশক পরেও বন অধিকার আইন সুন্দরবনের পাশে থাকা মানুষের জন্য নয়। বনবিভাগ যখন কিছু অবৈধ কাজকর্ম রোধের জন্য নতুন আইন জারি করল, তখন শ্বাপদসঙ্কুল দ্বীপের বাসিন্দারা জীবিকা আহরণের ক্ষেত্রে বিপদে পড়লেন।

পবিত্র মণ্ডল

শেষ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৩

সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে, এই দাবি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তো বটেই, সচেতন মহলেও প্রবল। কিন্তু, এ দাবি জঙ্গলেরসংরক্ষণ ব্যবস্থার কথা বললেও প্রান্তিক মানুষের আরও প্রান্তিক হয়ে ওঠার কারণ চিহ্নিত করতে পারে না। পশ্চিম রাধানগরে আমার ভিটেতে বসে প্রত্যক্ষ করি, গ্রামের মানুষের বাঁচার লড়াইয়ের মোড় ঘুরেছে নিঃশব্দে। সরকারি বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্প খাদ্যাভাব ঘোচালেও আসলে মানুষের পারিবারিক খরচ বেড়েছে। উপরন্তু, যে চেতনা শিক্ষার দ্বারা তৈরি করা যেত, সেই শিক্ষা শেষ অবধি আমার পাশের ভিটের হরির কিশোর ছেলেটি আর দেখবেই না। প্রশ্ন করলে উত্তর আসে, লেখাপড়া করে পেট ভরবে কি? জীবন কি সুখের হবে?

দু’দশক পরেও বন অধিকার আইন সুন্দরবনের পাশে থাকা মানুষের জন্য নয়। বনবিভাগ যখন কিছু অবৈধ কাজকর্ম রোধের জন্য নতুন আইন জারি করল, তখন শ্বাপদসঙ্কুল দ্বীপের বাসিন্দারা জীবিকা আহরণের ক্ষেত্রে বিপদে পড়লেন। জঙ্গলের যে সমস্ত এলাকায় মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহ করা যেত, সেই সব ধীরে ধীরে সংরক্ষিত বা ‘কোর এরিয়া’-তে পরিণত হল। জীবিকা নির্বাহের জন্য পড়ে রইল বাফার বা জঙ্গলের এমন এক অংশ, যেখানে মাছ পাওয়া দুরূহ। আবার অনুমতি নিয়ে জঙ্গলের মধু সংগ্রহ করলে ফরেস্ট ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশনকে বিক্রি করতে হবে যথেষ্ট কম মূল্যে। জঙ্গলের এই গভীর অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করার বিষয়টি জঙ্গলের উপরে নির্ভরশীল মানুষের কাছে এক জটিল গণিত।

আমার দাদুর ‘জঙ্গল করা’ (জীবন ও জীবিকার জন্য যাঁরা জঙ্গলের উপরে নির্ভরশীল) দল মধুর নৌকা নিয়ে ঘাটে ফিরলে, নদীর ঘাটে ভিড় লেগে যেত। দাদু মাটির মেটে থেকে ঘটিতে করে মধু কাটিয়ে সবাইকে খেতে দিতেন। ক্রমে বনবিভাগ জঙ্গলবাসীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই নতুন আইন প্রণয়ন করে জঙ্গল রক্ষা করতে যাওয়ায় সুন্দরবনের নদী ও খাঁড়িতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার আধিক্য বাড়ল। বিশ্লেষকরা এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে বললেন, কল-কারখানার দূষিত জল নদীতে আসতে শুরু করেছে ও ফরাক্কা ব্যারাজের কারণে মিষ্টি জলের প্রবাহ কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং ম্যানগ্রোভের জীবন বিলুপ্তির মুখে।

এই রকম পরস্পরবিরোধী সংরক্ষণ ব্যবস্থায় সুন্দরবনের জঙ্গলজীবী মানুষ কেন অদৃশ্য, তা বুঝতে আশির দশকে উত্তরপ্রদেশের সাহরানপুরের শিবালিক পর্বতের কোলে বাদশেইবাগ গ্রামে ফিরতে হয়। ভাব্বড় বা ওলু ঘাসের ব্যবসা করতে আসা মানুষ শুরু করলেন আন্দোলন— জঙ্গলের মানুষের উপরে বনবিভাগ ও দালালদের শোষণের বিরুদ্ধে। ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৬ সালে ভারত পেল এমন এক আইন, যা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে স্বীকার করল যে, বননিবাসীদের উপরে ‘ঐতিহাসিক অন্যায়’ করা হয়েছে। শাসন পরিকাঠামোয় রাজ্যের অন্য জঙ্গলজীবীরা কিছু অধিকার পেলেন। কিন্তু এই বনাধিকার সুন্দরবনের জঙ্গল-নির্ভর মানুষের এখনও হয়ে উঠল না।

বরং ‘জঙ্গল করা’ আজ জঙ্গল রক্ষার সম্মুখে অতি ব্যয়বহুল। যেমন, জীবিকা সরবরাহের জন্য অর্থ ব্যয় করে সঠিক কাগজ বা নৌকার পারমিট (বিএলসি) পাওয়ার দায়িত্ব চেপেছে সেই মানুষেরই উপরে, যাঁরা সর্বদাই ঋণের মুখে। বনবিভাগের অনুমতির কাগজ অর্থাভাবে না নিয়ে জঙ্গলে জীবিকা আহরণের সময় বাঘের আক্রমণে মৃত্যু ঘটলে, তা অবৈধ প্রবেশ হিসাবে দেখা হয়। সমস্যা মেটানো যায়, যদি বনাধিকার আইনে গ্রামসভা বানিয়ে গ্রামের মানুষ যে বনে তাঁদের জীবিকা আহরণের উদ্দেশ্যে যান, তার উপরে তাঁদের অধিকার কায়েম করা যায়। তখন আর বিএলসি-র প্রয়োজন হবে না এবং কারা কখন কী সংগ্রহ করবে (জঙ্গলের ক্ষতি না করে) তার অধিকার গ্রামসভার হাতেই থাকবে। বন অধিকার আইনে সুন্দরবনের মানুষ বঞ্চিত। কিন্তু জীবন যাপন তো করতে হবে। তাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ রাজ্যের বাইরে যাচ্ছে।

অন্য রাজ্যে কাজের দরজা খুলে যাওয়ায়, কম সময় কাজ করে আয় ক্রমশ বাড়ছে। বছরে একাধিক ঝড় বন্যা হওয়ার জন্য সরকার ঘর দিচ্ছে। সেই ঘর একটু মজবুত করতে আবার ভিন রাজ্যে পাড়ি। কেরলে মনের মতো মিস্ত্রির কাজ না পেয়ে ঠিকাদার হরির ছেলেকে নিয়ে আসে বেঙ্গালুরু। ছেলে এখন যৌবন পার হয়ে সাংসারিক দায়িত্বে পা বাড়িয়েছে। মাঝে মাঝে সে কেরলমুখী না-হয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলঙ্গানায় ধান রোয়ার কাজে মজুর খাটে। বছরে আশি হাজার টাকা উপার্জন করে সে। তার মতো দলে দলে রাজ্য থেকে পাড়ি দেওয়া শ্রমিকের জোটে মাঠে ত্রিপল বা প্লাস্টিকের ছাউনির নীচে ঠাঁই। এবং সম্মান ছাড়াই দৈনন্দিন জীবনযাপন। এই প্রজন্মের অনেকেই আজ বাদাবনের প্রকৃতি আর নিজের প্রয়োজনের মাঝে আটকা পড়েছেন। যাঁরা পরিযায়ী শ্রমিক, যাঁদের সঠিক তথ্য গণনায় অদৃশ্য, তাঁরা অনেকেই বন অধিকার আইনের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের কথা জানেন না। তাঁদের সামনে অপেক্ষা করে আছে পেট চালানোর লড়াই, জঙ্গল থেকে অনেক দূরে।

তথ্য সহায়তা: সৌরিনা বেজ, গবেষক, বন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sundarbans Environmental Movements Environmental awareness

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy