সম্প্রতি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট অব ২০২৫’ অনুমোদনের ব্যবস্থা করেছেন। রাশিয়াকে পরোক্ষ ভাবে শায়েস্তা করার জন্য সে দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে যোগ দেওয়া দেশগুলোর উপরে ৫০০% বাণিজ্য শুল্ক বসানোর অধিকার দেওয়া হয়েছে আমেরিকান সরকারকে। মূল লক্ষ্য আমেরিকার বাজারে ভারতের রফতানি দ্রব্য। তবে চিন এবং ব্রাজ়িলও এই তালিকায় রয়েছে। এই দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য করে রাশিয়ার প্রচুর অর্থের বন্দোবস্ত হচ্ছে বলে রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে অকারণে অশান্তি বাধিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছে বলে ট্রাম্পের মত।
আমেরিকার সরকার গত বছর বিভিন্ন দেশের রফতানির উপরে প্রতিশুল্ক চাপিয়েছে। ভারত এদের অন্যতম। গত অগস্ট মাসের আগে পর্যন্ত আমেরিকার বাজারে ভারতের রফতানি দ্রব্যের উপরে শুল্কের পরিমাণ ছিল ২৫%। অগস্টে আরও ২৫% শাস্তি শুল্ক বসানোর ফলে মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৫০%। এর পরিপ্রেক্ষিত হল বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি। যেমন, ভারত রাশিয়া থেকে সস্তায় অপরিশোধিত তেল কেনে বলে আমেরিকা থেকে সে পরিমাণ তেল কেনে না। কিন্তু আমেরিকার বাজারে ভারত প্রচুর পরিমাণে বস্ত্র, চর্মজাত দ্রব্য, রত্ন-অলঙ্কার, ওষুধ রফতানি করে। প্রতিশুল্কের চাপে এ সব পণ্যের দাম আমেরিকার বাজারে বাড়বে। ফলে চাহিদা কমবে ও আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি কমার সম্ভাবনা। ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও কুপ্রভাব পড়েছে।
প্রতিশুল্কের চাপে ইতিমধ্যে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি কমেছে প্রায় ১৮%। রফতানি কমেছে পোশাক শিল্পে, জুতো, গয়না, হস্তশিল্পজাত পণ্য, কার্পেট ইত্যাদি ক্ষেত্রে। চর্ম ও চর্মজাত শিল্পের রফতানি বাজার তো প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পথে। এর ফলে কর্মসংস্থানের সমস্যা উত্তরোত্তর বাড়বে বলেই আশঙ্কা। স্যাংশনিং রাশিয়া বিল কার্যকর হলে রফতানি আরও কমবে। আরও ধাক্কা খাবে আমাদের দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ও আর্থিক কর্মকাণ্ড।
আমেরিকার বর্ধিত চাপের মুখে ভারত যদি রাশিয়ার পরিবর্তে আমেরিকার তেল আমদানি করে, ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থব্যবস্থায় তার খারাপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা বিপুল। উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে তেল একটি অপরিহার্য উপাদান। অন্তর্বর্তী পণ্যই হোক বা চূড়ান্ত পণ্য বা পরিষেবা, তার উৎপাদন এবং ভোগের জন্য বাজারজাত করতে যে পদ্ধতিই ব্যবহার করা হোক না কেন, তেলের দাম বাড়লে এই প্রতিটি স্তরে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এবং তার ফলে বাড়বে চূড়ান্ত দাম। সব মিলিয়ে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতির উপরে। মূল্যস্ফীতির আবার নিজস্ব কুপ্রভাব রয়েছে। ভারতের অর্থব্যবস্থায় এখনও অতটা প্রকট না হলেও অচিরেই এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অর্থাৎ এক প্রকার উভয় সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে ভারত। রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনে কম খরচে উৎপাদন করলেও নিস্তার নেই— রফতানি বাজারে মোকাবিলা করতে হবে অকল্পনীয় ৫০০% আমদানি শুল্কের। আবার, শুল্ক এড়াতে হলে তুলনায় বেশি দামে আমেরিকা থেকে তেল কিনতে হবে। এখন দেখার যে, কোনটায় ক্ষতি কম। বিশ্লেষকদের বিশদ পর্যালোচনা ব্যতীত এর উত্তর মেলা ভার। তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের আয়তন এই বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ বাণিজ্য হ্রাস পেলে শুধু রফতানি কমে না, আমদানিও কমানো যায়। রফতানি পণ্য উৎপাদন হ্রাসের আর্থিক ধাক্কা কি ‘ইমপোর্ট সাবস্টিটিউটিং গুডস’ বা আমদানির বিকল্প দেশীয় পণ্য উৎপাদন বাড়িয়ে করা সম্ভব? একে বলে আমদানি প্রতিস্থাপনকারী উন্নয়ন পরিকল্পনা। এটি অতীতে খুব একটা সফল হয়নি। তবে, আপৎকালীন ভিত্তিতে ব্যবহার করা যেতেই পারে, কারণ বর্তমান বিশ্ববাণিজ্য পরিস্থিতি অস্বাভাবিক।
অবাস্তব শুল্কযুদ্ধের সমস্যা যত দিনে মিটবে, তত দিনে বিশ্ব জোগান-শৃঙ্খলের কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন ঘটে যাবে। যেমন, ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, কম্বোডিয়ার মতো দেশ ক্রমশ আমেরিকার বস্ত্র বাজারের দখল নিতে শুরু করেছে। কার্পেটের বাজারে জাঁকিয়ে বসছে তুরস্ক, চিন, মিশর। তাই বাণিজ্যের পণ্যগত বৈচিত্রকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশভিত্তিক বহুমুখীকরণ একটা সমাধান। জার্মানি ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানা দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের উপরে ভারত বিশেষ জোর দিচ্ছে। ভারতের বাণিজ্য খুবই আমেরিকা-নির্ভর বলে ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনায় আমরাই সর্বাপেক্ষা বিব্রত। চিনের এই সমস্যা কম— তাদের বাণিজ্য বহু-রাষ্ট্রমুখী। তাই তারা প্রতিশুল্কের প্রত্যুত্তরে প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠতে পারে। চিনের কাছ থেকে বিশ্বের নানা দেশের জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় বিষয়।
বাণিজ্য শুল্ক, আর্থিক বিকাশ নিয়ে আলোচনার অতি সক্রিয়তায় আমরা অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে চাই না যে, বাণিজ্য নীতি ও তার প্রভাব বহুলাংশে নির্ভর করে দেশের মুদ্রার বিনিময় মূল্যের উপর। গত দশ মাসে প্রায় নিয়মিত টাকার দাম কমেছে আমেরিকান ডলারের তুলনায়। বিচ্ছিন্ন ভাবে এক-আধ বার একটু বাড়লেও মোটের উপরে টাকার দাম ক্রমাগত কমে এখন প্রায় ডলারপ্রতি ৯০ টাকা। মুদ্রার দাম প্রধানত বাজারে চাহিদা ও জোগান দ্বারা নির্ধারিত। ভারতের সাপেক্ষে ডলারের চাহিদা ও জোগান নির্ধারিত হয় বিদেশে ভারতীয় পণ্যের রফতানি ও ভারতে বিদেশি পণ্যের আমদানি থেকে। ভারতীয় পণ্যের চাহিদা বাড়লে টাকার চাহিদা বাড়ে। কারণ, ভারতীয় মুদ্রা ছাড়া তা কেনা যায় না। অন্যান্য দেশের আমদানিকারীরা হয় ডলার বা অন্য মুদ্রার বিনিময়ে ভারতীয় মুদ্রা পেতে চায়। আবার ভারতীয়রা যখন বিদেশি দ্রব্য আমদানি করতে চায়, তখন ঠিক উল্টোটা ঘটে— বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে টাকার জোগান বেড়ে যায়। অর্থাৎ, টাকা নিজেই একটি পণ্যের মতো আচরণ করে এ ক্ষেত্রে। ভারতীয় রফতানি দ্রব্যের চাহিদা যত কমবে, টাকার চাহিদাও তত কমবে। ফলে টাকার দামও কমবে। সেটাই স্বাভাবিক। তাই শুল্কের পরিমাণ বাড়লে রফতানি কমবে এবং টাকার অবমূল্যায়ন অবশ্যম্ভাবী।
তবে অন্য একটি সম্ভাবনাও রয়েছে। টাকার দাম কমলে আবার রফতানি দ্রব্যের চাহিদা বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আগে ১০ ডলার দিয়ে ৫০০ টাকার চা কেনা যেত। কিন্তু এখন ৯০০ টাকার চা কেনা যায়। কারণ এখন এক ডলারের মূল্য ৯০ টাকা। অতএব, চায়ের চাহিদা বিদেশের বাজারে বাড়া উচিত। অর্থাৎ, টাকার দাম কমলে বাণিজ্য শুল্কের অভিঘাত খানিক প্রশমিত হতে পারে। সুতরাং, প্রতিশুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব অনুধাবন করতে হলে টাকার অবমূল্যায়নের অর্থনৈতিক ফলাফল পর্যালোচনা আবশ্যিক।
বর্তমান শতকের গত কয়েক দশকের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায়, রফতানি-ভিত্তিক অতি-বিশ্বায়ন চালিত আর্থিক বিকাশের মডেল এখন প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আজকাল ‘গ্লোবালাইজ়েশন’-এর বদলে অনেক দেশ ‘স্লোবালাইজ়েশন’-এ বেশি নিরাপদ বোধ করে; অল্প কয়েকটি দেশমুখী বাণিজ্য নীতির দৃঢ়তা তুলনায় কম। বাণিজ্যিক বহুমুখিতা যেমন দেশীয় অর্থব্যবস্থার সহনশীলতা বাড়ায়, তেমনই আন্তর্জাতিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিগত বিস্তার প্রসারিত করে আরও মজবুত করে তোলে। তবুও এ বিষয়ে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতারা নানা দেশে, নানা সময়ে, নানা রূপে এর পরেও আবির্ভূত হবেন। ফলে আমাদের বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় দোলাচল আবাহনকারী পাগলামির সামনেও পড়তে হবে। তাই নিজেদের তৈরি রাখাই শ্রেয়। আত্মনির্ভরতা ও বিশ্বায়নের একটি যথাযথ সংমিশ্রণই একমাত্র বহির্বিশ্বের আকস্মিক অনিশ্চয়তা থেকে দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।
কিন্তু সেই মিশ্রণের মাত্রা কত? দেশভেদে মাত্রার বিভিন্নতা নির্ধারণ করার গুরুদায়িত্ব সেই দেশের আর্থিক উপদেষ্টাদের। এখানেই ভারতের মতো রাষ্ট্রের সার্থকতা— যেখানে রাষ্ট্র ও বাজার স্বকীয় মাধুর্যে সহাবস্থান করে বলে বিশ্বায়নের সঙ্গে দেশের সংযুক্তিকরণের মাত্রা গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকার নির্ধারণ করে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)