E-Paper

নৃত্যে তোমার মুক্তির রূপ

সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বুঝতে পারি, নটীর পূজা রবীন্দ্রনাথের এমন একটি সৃষ্টি, যা নারীসত্তার ক্ষমতায়ন ও সামাজিক প্রথার শৃঙ্খল ভাঙার এক শক্তিশালী দলিল।

সুজাতা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৬:৩৭
সাহসিকা: নটীর পূজা-র শ্রীমতী, শিল্পী নন্দলাল বসুর কল্পনায়।

সাহসিকা: নটীর পূজা-র শ্রীমতী, শিল্পী নন্দলাল বসুর কল্পনায়।

শতাব্দীকাল আগে ভুবনবিখ্যাত কবি তাঁরই জন্মদিন পালনের ব্যবস্থাপকদের ‘ফরমায়েশ’ মতো পুরুষ-বর্জিত একটি নাটক লিখলেন— সেটি তাঁর ৬৫তম জন্মদিন উদ্‌যাপন উপলক্ষে শান্তিনিকেতনে অভিনীত হল। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন অর্থকষ্ট মেটানোর উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ ডাকে অনাত্মীয় হাতে এটিকে বেচার চেষ্টা করছেন। কবির জীবনীকার এই নাটক সম্বন্ধে একটু ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছিলেন, নাট্যকার এখানে কেবল নারীর দুঃখ দেখিয়েছেন; পুরুষেরও যে দুঃখ আছে, সে কিন্তু তাঁর চোখেই পড়েনি!

এই অভিযোগ আমাদের আজ একটু ফিরে ভাবাতে পারে। ভাবাতে পারে, এই পক্ষপাতদোষের অভিযোগ কি সত্যি? যদি সত্যি হয়, তবে তো বলতে হয়, এই অভিযোগে অভিযুক্ত নাটকটি ও তার অভিনয় এক বিরাট ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করছে, যাকে বৈপ্লবিক বললে অত্যুক্তি হয় না। শতবর্ষ অতিক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তে তবে ফিরে দেখা দরকার এই নাটকের বৈপ্লবিক আবেদনকে।

সামাজিক বৈষম্য, ধর্মবিদ্বেষ, স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্রশক্তির দম্ভের বিপরীতে বুদ্ধের ভালবাসা ও অহিংসার বাণীতে অনুপ্রাণিত এক প্রান্তিক নারীর আত্মত্যাগের কাহিনি নটীর পূজা। নটীর পূজার পূর্ব-রূপ ছিল অবদান-শতকের কাহিনি অবলম্বনে লেখা ‘পূজারিণী’ কবিতা। রাজা বিম্বিসার বুদ্ধের নিদর্শন নিয়ে প্রাসাদে অপূর্ব স্তূপ তৈরি করেছিলেন, যেখানে পূজার জন্য ছিল ভক্তদের আনাগোনা। অজাতশত্রু রাজা হয়ে পিতার ধর্মকে ‘শোণিতস্রোত’-এ মুছে ফেলতে উদ্যত হলেন। বৌদ্ধ স্তূপে পূজা-অর্চনা নিষিদ্ধ হল। প্রাণভয়ে ভীত রাজপরিবারের সবাই যখন এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে অসম্মত, ভীত, কিংবা উদাসীন— কে এগিয়ে এলেন? এলেন নর্তকী শ্রীমতী। মৃত্যু অবধারিত জেনেও দিনের শেষে সেই মেয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে গেলেন, এবং প্রাণ দিলেন। শেষ সন্ধ্যারতি করলেন নিজের প্রাণের বিনিময়ে।

‘পূজারিণী’ কবিতা কথা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত, যে কাব্যগ্রন্থের বেশির ভাগ কবিতা ১৮৯৭ থেকে ১৮৯৯ সালের মধ্যে লেখা। রাজপুত, মরাঠা, শিখ, বৈষ্ণব ও বৌদ্ধ সাহিত্য অবলম্বনে কাব্যগুচ্ছ রচিত হয়েছিল। আদর্শ ভারতকে খুঁজতে কবি অতীত ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকিয়ে ছিলেন। বৌদ্ধ কাহিনি সংগৃহীত হয় রাজেন্দ্রলাল মিত্র সঙ্কলিত নেপালি বৌদ্ধ সাহিত্য সম্বন্ধে ইংরেজি গ্রন্থ থেকে।

ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান-পরবর্তী সময়ে সভ্যতা, সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি সব রকম শক্তির যেন পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। বুদ্ধদেব জাতি মানেননি, যাগযজ্ঞের আড়ম্বর থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলেন, আত্মশক্তির প্রচার করেছিলেন। এর প্রতিটি আদর্শেই রবীন্দ্রনাথ নিজে বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন, যথার্থ স্বাধীনতা তখনই আসবে যখন চিত্তের মুক্তি ও প্রকাশ ঘটবে। বুদ্ধের বাণীর মধ্যে কবি সেই চিত্তের মুক্তিকে আবিষ্কার করেছিলেন।

জগদীশচন্দ্র বসু, অবলা বসু, স্বামী সদানন্দ, শংকরানন্দ, নিবেদিতা, ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার, এঁদের সঙ্গে কবি ১৯০৪ সালে গিয়েছিলেন বুদ্ধগয়া ভ্রমণে। সেখানে মোহন্ত মহারাজের অতিথিশালায় সপ্তাহখানেক থাকার সময় প্রতি দিন পাঠ করা হত প্রাচ্যবিদ ওয়ারেন হেনরি ক্লার্কের লেখা। আমেরিকার এই পালি ভাষাবিশেষজ্ঞ রচিত বুদ্ধিজ়ম ইন ট্রান্সলেশনস পড়া হত। আর পড়া হত এডউইন আর্নল্ড-এর দ্য লাইট অব এশিয়া। এখানে দেখা বোধিদ্রুমের নীচে তপস্যারত এক দরিদ্র জাপানি ভক্তকে কবি কোনও দিন ভুলতে পারেননি। এ কথা ভাবতে গিয়ে মনে হয়, নটীর পূজার শ্রীমতীও তো সেই তথাকথিত নিম্নবর্গের, প্রান্তিক নারী। চণ্ডালিকার প্রকৃতিও তাই।

বিশ শতকের তৃতীয় দশকে যখন কবি নটীর পূজা সৃষ্টি করলেন সে ছিল এক উত্তাল সময়। রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে রীতিমতো চিড় ধরেছিল। গান্ধীজি অহিংস অসহযোগের সঙ্গে খিলাফত আন্দোলনকে যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের পরের নানা ঘটনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে দুর্বল করে তুলছিল। দুই তরফেই উগ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল ধীরে ধীরে। ইংরেজ শাসকদের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে খিলাফতিরা কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। ১৯২৪-এ কামাল আতাতুর্ক খলিফার পদ তুলে দেওয়ার পরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ভিত্তি খর্ব হল। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা, গো-কুরবানি প্রভৃতি। সমান্তরাল ভাবে হিন্দু মহাসভার উত্থান, আর্য সমাজের শুদ্ধি, সংগঠন অনুষ্ঠান ইত্যাদি ঘিরে ধর্মীয় পরিচিতি সুদৃঢ়করণের প্রক্রিয়া বাড়তে লাগল। ইংরেজ শাসকরা স্বভাবতই মহাখুশি, পরস্পরকে ঘৃণা করতে ব্যস্ত দুই সম্প্রদায় এ বার ইংরেজ বিরোধিতার সময় পাবে কম, এই প্রত্যাশায়। ১৯২৫ সালে ১৬টি এবং ১৯২৬ সালে ২৫টি দাঙ্গা ঘটল ভারত জুড়ে। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল কলকাতার দাঙ্গা, ১৯২৬-এর মার্চে। তখন কলকাতায় ছিলেন কবি। খবর পেলেন শহরে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু। আর্য সমাজের সদস্যদের মসজিদের সামনে শোভাযাত্রা করে বাজনা বাজানো দিয়ে সংঘাত শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ স্বচক্ষে দেখছিলেন সন্ত্রস্ত শহরবাসী প্রাণভয়ে আশ্রয়ের জন্য দলে দলে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে আসছিলেন। মর্মাহত কবি শান্তিনিকেতনে ফিরে প্রমথ চৌধুরীকে একটি চিঠিতে লেখেন হিন্দু-মুসলমান সমস্যার কূল পাওয়া যায় না। লক্ষণীয়, এমনই এক সময়ে কবি নির্ভীক প্রতিবাদকে চিত্রিত করছেন এক নারীর চরিত্রচিত্রণে।

১৩৩৩ (১৯২৬)-এর ২৫ বৈশাখ সন্ধ্যাবেলা শান্তিনিকেতনে নটীর পূজার অভিনয়ে শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর কন্যা গৌরী কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীমতীর ভূমিকায় অভিনয় করলেন। নিউ থিয়েটার্সের প্রধান কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকার এই নৃত্যনাট্যকে চলচ্চিত্রের রূপ দেওয়ার জন্যে রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ জানালেন। কথা হয়েছিল লভ্যাংশের অর্ধেক শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন প্রকল্পের সাহায্যার্থে দেওয়া হবে। রবীন্দ্রনাথ পরিচালিতএবং অভিনীত (উপালির ভূমিকায়) এই একমাত্র চলচ্চিত্র ১৯৩২ সালের মার্চ মাসে মুক্তি পেল। চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক ছিলেন নীতিন বসু এবংসঙ্গীত পরিচালক দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। শান্তিনিকেতনের পড়ুয়াদের অভিনীত ছবিটির চলচ্চিত্রায়ন মঞ্চের নৃত্যনাট্যের মতো করা হয়েছিল। সমালোচকরা ছবির নান্দনিক দিকটির প্রশংসা করলেও এটি বাণিজ্যিক ভাবে সফল হয়নি।

সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বুঝতে পারি, নটীর পূজা রবীন্দ্রনাথের এমন একটি সৃষ্টি, যা নারীসত্তার ক্ষমতায়ন ও সামাজিক প্রথার শৃঙ্খল ভাঙার এক শক্তিশালী দলিল, এক বৈপ্লবিক ডাক। এক তরুণী নর্তকী যে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা ভেঙে নৃত্যকে পূজার অর্ঘ্য হিসেবে নিবেদন করে মৃত্যুবরণ করেন— এ যেন নারীরই বিদ্বেষ-প্রাকার ভাঙতে পারার স্বাভাবিক শক্তির জয়। রবীন্দ্রনাথ দেখাতে চাইলেন, রাজকীয় আড়ম্বরপূর্ণ পূজার বিপরীতে ভক্তির জয়গান— নারীরই কণ্ঠে। শ্রীমতীর আত্মবলিদান যেন এক ধাক্কায় ধর্মের গোঁড়ামি, নারী-পুরুষের সামাজিক বৈষম্য এবং স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রতিষ্ঠান— সব কিছুর বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। এমন প্রতিবাদ, যা পৌরুষদীপ্ত শাসন ও সমাজের বিপরীত দিক থেকেই উঠে আসতে পারে।

১৩৩৩ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে কলকাতায় নটীর পূজা অভিনয় বাংলার সামাজিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সেই যুগে ‘ভদ্রঘরের’ মেয়েদের জনসমক্ষে অভিনয় বা নাচ করা সমাজস্বীকৃত ছিল না। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের ছাত্রীদের দিয়ে এই নাটকের অভিনয় করিয়ে সেই ‘ট্যাবু’ ভেঙেছিলেন। শান্তিনিকেতনী তথা আধুনিক ভারতীয় নৃত্যশৈলীর এক আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। এর মঞ্চায়নের মধ্যে দিয়ে যেন শ্রীমতীর নির্ভীক প্রতিবাদ সামাজিক অনুশাসনের বিরোধিতার বাস্তব রূপ পেল।

ভারতের সংবিধানের প্রধান স্থপতি বাবাসাহেব আম্বেডকর বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তাঁর আকর্ষণের কারণ হিসেবে তিনটি নীতির কথা উল্লেখ করেছেন, প্রজ্ঞা, করুণা ও সমতা। জাতকের কাহিনিতে বোধিলাভের যে ধারাবাহিক সাধনার কথা রয়েছে, রবীন্দ্রনাথের মনেও তা গভীর ভাবে রেখাপাত করেছিল। জগতে ভাল ও মন্দের দ্বন্দ্বের মধ্যে ধর্মের শ্রেষ্ঠ আদর্শ বুদ্ধের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত। জাভা থেকে লেখা চিঠিতে বোরোবুদুর মন্দির প্রসঙ্গে লিখেছিলেন ভালর যে শক্তি, তার চরম বিকাশ ‘অপরিমেয় মৈত্রীর শক্তিতে আত্মত্যাগ’। ১৯২৬-এ শান্তিনিকেতনের মন্দিরে এক ভাষণে বেদনা ও ক্ষোভের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে ধর্মের নামে পশুত্ব দেশ জুড়ে বসেছে। কিছু কাল পরে বিদেশযাত্রার পথে লিখেছিলেন ‘ধর্মমোহ’: “ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে /অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।” সেই মোহ-বিকার থেকে মুক্তির পথ এক শতাব্দী পর আজও তাঁর দেশ খুঁজে চলেছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindranath Tagore Women Empowerment Society

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy