×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৭ মে ২০২১ ই-পেপার

কাজ করে চলার স্বধর্ম

প্রতিকূল সময়ের মধ্যেও হাল ছাড়া নয়, থেমে যাওয়া নয়

রোচনা মজুমদার
০১ মে ২০২১ ০৫:১৮

সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ নিয়ে এই লেখা যখন লিখতে বসেছি, তখন এক অভূতপূর্ব বিষাদ গোটা দেশে। অক্সিজেনের জোগান নেই, শ্মশানে স্থান অকুলান, পরীক্ষা আর টিকায় ঘাটতি— অতিমারির এক বছর পেরিয়েও এই দুর্দশায় ভীষণ অসহায় লাগে, রাগ হয়। গত ক’দিন ধরে বেশ কয়েক জন ভারতীয় ছাত্র গবেষকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তারা ভারত থেকে আসা কোভিড-সংক্রান্ত দুঃসংবাদের স্রোত বিষয়ে নিজেদের রাগ, হতাশা উগরে দিচ্ছিল। গত বছর ওরা যে সাহস আর ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিল, তাতে চিড় ধরেছে। কবে দেশে ফিরতে পারবে, অনিশ্চিত। আমার ভারতীয় সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যেকের কোনও না কোনও আত্মীয় বা বন্ধু কোভিড পজ়িটিভ। এই সব কিছুর মাঝেই আমরা অপেক্ষা করছি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফল প্রকাশের। অকল্পনীয় তিক্ততায়, কদর্যতায় নিমজ্জিত নির্বাচনের ফল; চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবে দীর্ঘায়িত নির্বাচনের ফল।

আগামী কাল, ২ মে নির্বাচনের ফল ঘোষণা হবে। একশো বছর আগে, এই দিনেই জন্মেছিলেন বাংলার অন্যতম খ্যাতিমান সন্তান সত্যজিৎ রায়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একটা চিন্তা ক্রমাগত মাথায় ঘুরছে— সত্যজিৎ রায় যদি এই বিপন্ন সময়ে বেঁচে থাকতেন, তা হলে কী হত? ভাবছিলাম, এই দীর্ঘ, জনবিচ্ছিন্ন, বিপন্ন মাসগুলোয় তিনি ঠিক কী ভাবে থাকতেন। সম্প্রতি এক টিভি-অনুষ্ঠানে সঞ্চালক সন্দীপ রায়ের কাছে এই প্রশ্নটা তুলেছিলেন। মানিকবাবুকে প্রচারের মঞ্চে পেতে নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে সাঙ্ঘাতিক লড়াই বাধত, তাঁকে নির্বাচনে দাঁড় করাতে ঝাঁপিয়ে পড়ত নানা দল। তাঁর সম্পর্কে আমরা যতটা জানি তাতে মনে হয়, দলগুলোকে বিফলমনোরথ হয়েই ফিরতে হত।

ষাটের দশকের শেষে আর সত্তরের দশকে যখন পশ্চিমবঙ্গ খাদ্যসঙ্কট, নকশাল আন্দোলন, বাংলাদেশি শরণার্থীর সমস্যায় উত্তাল, তখন সত্যজিৎ রায় সম্বন্ধে এক শ্রেণির সমালোচকরা বলতেন, তাঁর ছবি যথেষ্ট র‌্যাডিক্যাল নয়। তাঁর ছবিতে বৈপ্লবিক উপাদানের অভাব কতখানি প্রকট, তা বোঝানো হত অন্য পরিচালকদের কাজের তুলনা টেনে। নিমাই ঘোষ (ছিন্নমূল-এর নির্মাতা) থেকে শুরু করে অবধারিত ভাবে ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের সঙ্গে তুলনা হত। আর এক শতবর্ষী, ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’র দিনগুলিতে সত্যজিতের সহকর্মী চিদানন্দ দাশগুপ্ত ১৯৬৬ সালে লিখেছিলেন, “যে কলকাতায় ট্রাম জ্বলে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, উদ্বাস্তুরা ভিড় করেন; বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি বা খাদ্যসঙ্কটের মতো সমস্যা যে শহরের প্রাত্যহিক বাস্তব— সত্যজিতের ছবিতে সেই কলকাতার অস্তিত্ব নেই। যদিও তিনি এই শহরেই থাকেন, কিন্তু গত দশ বছরে যে বিপন্নতার মহাকাব্য এই শহরের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে, তার সঙ্গে তাঁর কোনও যোগাযোগই নেই।” ১৯৬৯-এ সত্যজিৎ অরণ্যের দিনরাত্রি ছবিটির কাজ শেষ করেন। চিদানন্দ দাশগুপ্তের লেখায় সেই সময়টা ধরা পড়েছে এ ভাবে: “বাংলার প্রাপ্তবয়স্কদের দুনিয়াটা যেন দাউদাউ করে জ্বলছিল... কলকাতা... অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছিল। প্রতি দিন কেউ না কেউ খুন হত। পাইপগান আর বোমাবাজি ছিল চেনা ছবি আর শব্দ। তরুণদের ভিতরে যে অসন্তোষ ফুটছিল, তারই প্রকাশ ছিল নকশাল আন্দোলনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রদের অনেকেই তাতে যোগ দিয়েছিলেন।”

Advertisement

এই সব উক্তির মধ্যে যে কথাটি নিহিত ছিল, তা এই রকম: এক জন চলচ্চিত্রনির্মাতার কাজ হল বোঝা— “শুধু এই নতুন ঘটনাপ্রবাহকেই নয়, যে উথালপাথাল পরিবর্তন নতুন প্রজন্মে এসেছে, তাকেও। নবজাগরণের গৌরবের অবশিষ্টটুকুও কবেই পিছনে ফেলে এসেছে এই প্রজন্ম— অবশ্য, সেই নবজাগরণ নিয়ে এই প্রজন্মের তিলমাত্র মাথাব্যথাও নেই।” শুধু চিদানন্দ দাশগুপ্ত নন, অনেকেই মনে করতেন যে, সত্যজিৎ তাঁর সেরা কাজগুলো করেছেন উনিশ শতকের সময়কে ধরে থাকা ছবিগুলিতেই— সেই সময়কার মধ্যবিত্ত বাঙালির ভুবনকে নিয়ে, যে পর্বে মধ্যগগনের সূর্যের মতো দীপ্যমান ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পথের পাঁচালী-র অপু, বা নরেন্দ্রনাথ মিত্রের মহানগর-এর আরতির মধ্যেও এই ভাবধারারই প্রতিফলন— একটিতে গ্রামীণ যুবকের ছবি যে বাইরের পৃথিবীকে জানতে চায়, অন্যটিতে এক মহিলা, সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে মুক্তির সন্ধান পাচ্ছেন।

কিন্তু ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫, এই ছ’বছরে যে ছবিগুলি বানালেন সত্যজিৎ, তাতে এই সব ধারণা ভেঙে খানখান হল। আমার মতে, এই ক’বছরে সত্যজিৎ যে ছবিগুলি বানালেন, সেগুলি ভারতীয় পর্দায় দেখা সবচেয়ে রাজনৈতিক সিনেমার তালিকার অন্তর্ভুক্ত হবে— অরণ্যের দিনরাত্রি, গুপী গাইন বাঘা বাইন, প্রতিদ্বন্দ্বী, সীমাবদ্ধ এবং জনঅরণ্য। এই সময়পর্বেই নির্মিত হল অশনি সংকেত, সোনার কেল্লা এবং দু’টি তথ্যচিত্র— দি ইনার আই ও সিকিম। এই সব ছবিতে সত্যজিতের রাজনৈতিক চেতনাকে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের অন্যান্য অংশের বাম-ঘেঁষা প্রগতিশীলতার চেনা ছকে ধরা যাবে না। তাঁর ঠাকুরদার লেখা গুপী গাইন বাঘা বাইন গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে সন্দেশ-এ, তারই অনবদ্য চলচ্চিত্রায়ণ করেন সত্যজিৎ। বাচ্চা থেকে বুড়ো, সব বাঙালির কাছে জনপ্রিয় এই ছবিটির অন্দরে নিহিত যুদ্ধবিরোধী স্বরকে হয়তো হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন কয়েক জন। আপাতদৃষ্টিতে ছোটদের জন্য তৈরি এই রূপকথার ছবিটিতে স্পষ্টতই সত্যজিতের চিন্তাজগৎ জুড়ে ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। প্রতিদ্বন্দ্বী ছবিতেও তাই। বিশ শতকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা চন্দ্রাভিযান নয়, ভিয়েতনামের কৃষকদের প্রতিরোধ— সিদ্ধার্থের জবানিতে আসলে কথাটা বলেছেন সত্যজিৎ নিজেই।

মারি সিটনকে লেখা চিঠিগুলিতে সত্যজিৎ কলকাতার জীবন ও কাজের অবস্থা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। বহু বছর ধরেই তাঁর চিঠিতে এসেছে ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’ কলকাতা ছেড়ে বম্বে বা মাদ্রাজ চলে যেতে চাওয়ার কথা। কিন্তু সত্যজিৎ কখনও কলকাতা ছেড়ে যাননি। পরে লিখেছিলেন এ ছিল তাঁর “কাজ করার জায়গা, বসবাসের ঠিকানা; কাজেই, যা আসবে তাকে তো মেনে নিতে হবে— গ্রহণ করতে হবে পরিবর্তনের বাস্তবটাকেও।”

সেই অস্থির সময়ে তিনি সেটাই করেছিলেন। ১৯৬১-তে সন্দেশ পত্রিকাকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজে মগ্ন তিনি, পাশাপাশি ভারতীয় সিনেমার নব্য তরঙ্গ নিয়ে তুমুল তর্কে মেতেছেন, বইয়ের অলঙ্করণ করেছেন, ছবি এঁকেছেন, প্রচ্ছদ ডিজ়াইন করেছেন এবং সঙ্গীত পরিচালনাও। যখন তাঁর শহরে রোজ অগ্নিসংযোগ করছে রাজনীতি আর বাদ-বিসংবাদ, তখনও তিনি কাজ করে গিয়েছেন। কাজের প্রতি তাঁর সততা মনে করিয়ে দেয় তাঁরই সমনামী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পী (১৯৪৬) গল্পের চরিত্র মদন তাঁতিকে। গল্পের প্রেক্ষাপট চল্লিশের দশকে মন্বন্তর ও যুদ্ধকালীন মন্দায় পীড়িত গ্রামবাংলা। মানুষ মরছে, গ্রাম থেকে কলকাতায় পালাচ্ছে শয়ে শয়ে। অর্থগৃধ্নু মহাজন, ভূস্বামী, বড় ব্যবসাদারদের চোখে কেবল ঔপনিবেশিক, যুদ্ধে ঘায়েল অর্থনীতির দুর্দিনে মুনাফা কামিয়ে নেওয়ার নেশা। ভূমিহীন চাষি, ছোট কারিগরদের জীবন-জীবিকা লুটেপুটে আখের ভরছে তারা। জাতে তাঁতি মদনের নামডাক ছিল তার হাতের কাজের জন্য, কিন্তু মাসের পর মাস হাতে কাজ নেই। গর্ভবতী স্ত্রীর শরীর বিগড়লে শেষমেশ কিছু সুতো আর টাকার জন্য মহাজনের কাছে হাত পাতে মদন। সুতো জোটে অতি নিম্ন মানের। বেনারসি নয়, তা দিয়ে কেবল জ্যালজেলে গামছা বোনা চলে। সারা রাত পড়শিরা শোনে মদনের তাঁত ঠকাঠক করে চলছে তো চলছেই। এত কষ্ট করে কী বুনেছে সে, কৌতূহলে সকাল হতেই তার কুঁড়েতে ছুটে আসে সবাই। ফাঁকা তাঁত দেখিয়ে মদন বলে, তাকে কিছু একটা করতেই হত!

সত্যজিৎ রায়ও সব সময় কিছু না কিছু করে গিয়েছেন। আজ যখন সাহিত্যিক অমিতাভ ঘোষের ভাষায় আমরা একটা ‘চরম বিশৃঙ্খলা’র যুগে এসে পড়েছি, তখন সত্যজিতের শরণ নিতে পারি। শিখতে পারি, অনেকেরই যখন মগজে কার্ফু, তখন সেই স্থবিরতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে কী ভাবে নিজের সম্বন্ধে অবিচল থেকে ‘কিছু না কিছু’ করে চলতেই হয়।

সাউথ এশিয়ান ল্যাঙ্গোয়েজেস অ্যান্ড সিভিলাইজ়েশনস, সিনেমা অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ়, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো

Advertisement