Advertisement
E-Paper

নিষ্কৃতিমৃত্যু! ইথানের জীবনে ছবি, হরীশের জীবনে ঘোরতর বাস্তব

অরুণা দুর্ভাগা ছিলেন। হরীশ সৌভাগ্যবান। তাঁকে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ঝপ করে ১৬ বছর আগের ‘গুজ়ারিশ’ ছবিটার কথা মনে পড়ে গেল।

অনিন্দ্য জানা

অনিন্দ্য জানা

শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৭:৫৮
Euthanasia debate in India: journey from Aruna Shanbaug to Harish Rana & a film Guzaarish in the midway

হরীশ (পিছনে ডান দিকে) কি হৃতিক-ঐশ্বর্য অভিনীত গুজ়ারিশ ছবিটি দেখেছিলেন! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ঝপ করে মনে পড়ে গেল ১৬ বছর আগের ছবিটার কথা। ‘গুজ়ারিশ’। অর্থাৎ, অনুরোধ। অর্থাৎ, আবেদন। কী আবেদন? নিষ্কৃতিমৃত্যুর। কার কাছে আবেদন? আদালতের কাছে।

দুর্ঘটনায় টানা ১৪ বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, চলচ্ছক্তিহীন জাদুকর ইথান মাসকারেনহাস আদালতের কাছে আবেদন করে, তাকে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অধিকার দেওয়া হোক। পর্যায়ক্রমে বিছানা এবং হুইলচেয়ারে বন্দি ইথানের জীবন, তার বিরক্তি, অসহায়তা, আকুলতা এবং কালক্রমে তার আবেদন নিয়ে আদালতের কাটাছেঁড়া ও সওয়াল-জবাব নিয়ে পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভন্সালী ছবিটি বানিয়েছিলেন। তার মধ্যেই ছিল পঙ্গু ইথানের বিছানায় শুয়ে শুয়ে রেডিয়ো জকি হয়ে ওঠা। সেই রেডিয়োর মারফতেও শ্রোতাদের মতামত চাওয়া তার নিষ্কৃতিমুত্যু নিয়ে।

ছবির শেষে মরণোন্মুখ ইথান তার ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছোতে পেরেছিল কি না, তা খানিকটা ধোঁয়াটেই রেখে দিয়েছিলেন পরিচালক তথা ছবির অন্যতম প্রযোজক সঞ্জয়। স্বাভাবিক। তিনি ছবি বানিয়েছিলেন ২০১০ সালে। যখন এ দেশে নিষ্কৃতিমৃত্যু এক ভয়ানক স্পর্শকাতর বিষয়। সেখানে ছবির মূল চরিত্রের মুখে যতই নিষ্কৃতিমৃত্যুর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যৌক্তিক এবং আপাতগ্রাহ্য সংলাপ বসান না কেন পরিচালক, কাহিনির উপসংহারে তার সমর্থন থাকলে সে ছবি সেন্সরের সোনার কাঁচিতে বিলক্ষণ কাটা পড়ত।

Advertisement

সঞ্জয়ের ছবিতে এমনিতেই বহু কল্পদৃশ্য থাকে। স্বপ্নের মতো। ‘গুজ়ারিশ’ ছবিতেও ছিল (ইউটিউবে গিয়ে আবার দেখলাম)। ইথানের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন হৃতিক রোশন। আর ইথানের নার্স সোফিয়ার চরিত্রে ঐশ্বর্য রাই। তার আগেই এই জুড়ি ‘ধূম টু’তে অভিনয় করেছে। সেখানে তাঁদের রসায়ন স্ক্রিনে দাউদাউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল! সেসব দেখেশুনেই তাঁর ছবিতে হৃতিক-ঐশ্বর্যকে নিয়েছিলেন সঞ্জয়। হৃতিককে তো এমনিতেই বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর দেখতে। চোখের বাদামি তারা, ঘাড় ছাপানো লম্বা চুল আর চোখা চোয়ালে ঘনসংবদ্ধ দাড়িতে তাঁকে অনেকটা পেশল যিশু খ্রিস্টের মতো দেখাচ্ছিল। ঐশ্বর্য এমনিতেই বিপজ্জনক রকমের সুন্দরী। সঙ্গে যোগ করুন তাঁর মোহময়ী নীল নয়ন, বক্ষবিভাজিকা ঈষৎ উন্মুক্ত করা ঊর্ধ্বাঙ্গের আঁটোসাঁটো কালো পোশাক, পরনের স্মার্ট স্কার্ট এবং মাথার লাল স্কার্ফ।

এ ছবি বক্স অফিসে লাভের মুখ দেখেনি (কে জানে কেন! হয়তো বিষয়টা খটোমটো ছিল। হয়তো একটু ধীরগতি ছিল)। কিন্তু সমালোচক মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। ইথান মাসকারেনহাস এবং সোফিয়ার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য হৃতিক এবং ঐশ্বর্য সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রীর পুরস্কারও পেয়েছিলেন।

ইথানরূপী হৃতিক এবং সোফিয়ারূপী ঐশ্বর্যকে নিয়ে মূল কাহিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা নার্স সোফিয়া রোজ ইথানের পরিচর্যা করে। তাকে খাইয়ে দেয়, জামাকাপড় বদলে দেয়, হুইলচেয়ার ঠেলে-ঠেলে তাকে নিয়ে যায় এদিক-সেদিক। কিন্তু যখন ইথান একা থাকে, তখন তার যাপন তার নিজের কাছেই বিরক্তিকর। তার বাহন ইলেকট্রিক হুইলচেয়ারটি সে নিজে চালাতেও পারে না। কারণ, তার হাত এবং পায়ের সমস্ত আঙুল অসাড়।

ইথানের নাকে মাছি এসে বসে। মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সে মাছিটাকে ওড়ানোর চেষ্টা করে। মাছি উড়ে যায়। আবার আসে। বিনবিন করে ঘুরতে থাকে। কখনও বসে চোখের পাতায়। কখনও গালের উপর। ইথান অবিরত চেষ্টা করে যায় মাথা এবং ঘাড় নাড়িয়ে মাছিটাকে ওড়ানোর। কিন্তু মাছি ওড়ে না। একটা সময়ে হাল ছেড়ে দিয়ে অসহায় হাসি হেসে ইথান মাছির সঙ্গে আপস করে নেয়। নাক চুলকোলে নার্সকে ডাকতে হয়। জামাকাপড় বদলানোর সময় নার্সকে ডাকতে হয়। এমনকি, ক্রোধ প্রকাশের জন্যও নার্সের সাহায্য নিতে হয়। চণ্ড রাগের সময়েও তাকে নার্সকেই বলতে হয়, ‘‘ওই যে ফুলদানিটা দেখছ, ওটা তুলে নিয়ে মাটিতে আছড়ে ভাঙো! আমি এখন ওটাই করতে চাইছি। কিন্তু পারছি না!’’

সঞ্জয়ের ছবিতে এমনিতেই আলো-ছায়ার প্রক্ষেপণে প্রচুর জাদুকরি মুহূর্ত তৈরি করা হয়। এ ছবিতেও তেমনই অসাধারণ কিছু দৃশ্য আছে। তেমনই জমকালো সেট। গোয়ার একটি প্রাসাদে (মেহবুব স্টুডিয়োয় সেট পড়েছিল) ইথান-সোফিয়াকে ঘিরে কাহিনি বুনেছিলেন তিনি। কাহিনি আবর্তিত হয়েছিল তাদের দৈনন্দিনতা ঘিরে। তবে দু’জনকে নিয়ে সবচেয়ে অসামান্য দৃশ্য সম্ভবত এক রেস্তরাঁয় একটি গান এবং তার সঙ্গে ঐশ্বর্যের নাচের। যা দেখে মোহিত হয়ে যায় ইথান। নাচটা সম্ভবত স্প্যানিশ ফ্ল্যামেঙ্কো। হতে পারে। না-ও পারে। এ বিষয়ে আমার জ্ঞান বরাবরই অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু যে ঘরানার নাচই হোক, দেখার মতো সেই নাচের দৃশ্যে ঐশ্বর্যের অভিনয়, তাঁর দেহের নমনীয়তা এবং গানের প্রতিটি ছন্দের উত্থানপতনের সঙ্গে তাঁর কল্পনায় দু’হাতে ড্রামস্টিক সঞ্চালন।

কিন্তু সেই দৃশ্য এই বিষণ্ণ ছবির মধ্যে এক ঝলক মলয়বাতাসের মতো। ছবির পরতে পরতে অনেক বেশি ছড়িয়ে ইথানের অসহায়তা। পঙ্গু জীবন বাঁচতে বাঁচতে ক্লান্ত, হতাশ, অসহায় এবং নাচার ইথান তার উকিলকে বলে, আদালতে তার জন্য স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করতে। উকিল চায় না। কিন্তু ইথান তাকে জোর করে। আদালতের কাছে ইথানের আবেদনে বলা হয়, ‘গত ১৪ বছর ধরে আমি যন্ত্রের সাহায্যে বেঁচে আছি। এই জীবনটা আমি আর বাঁচতে চাই না। আমার নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন মঞ্জুর করা হোক।’

পাশাপাশিই ইথান রেডিয়োয় তার নিষ্কৃতিমৃত্যুর ইচ্ছা নিয়ে শ্রোতাদের মতামত নেয়। একমাত্র প্রাক্তন প্রেমিকা ছাড়া কেউ তার কথায় সায় দেয় না। কেউ পাল্টা ধমক দেয়, কেউ গান গেয়ে শোনায়, কেউ মিনতি করে।

আদালতও, বলা বাহুল্য, তার আবেদন মঞ্জুর করে না। আদালত বলে, নিষ্কৃতিমৃত্যু অথবা ইচ্ছামৃত্যুর অনুমতি প্রদান হল প্রকারান্তরে আত্মহত্যার অনুমতি দেওয়া। ঘটনাচক্রে, সঞ্জয় যখন ওই ছবি বানিয়েছিলেন, তার অনেক আগে থেকেই নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে গোটা পৃথিবী এবং ভারতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আলোচনা শুরু হয়েছে। জল্পনা চালু হয়েছে। তার আগে ঘটে গিয়েছে নার্স অরুণা শানবাগের ঘটনা। যাঁর নিষ্কৃতিমৃত্যুর আর্জি খারিজ হয়ে গিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে।

৫৩ বছর আগে ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে মুম্বইয়ের এক হাসপাতালে ২৫ বছর বয়সি নার্স অরুণার উপর ভয়াবহ যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল। কুকুর বাঁধার শিকল দিয়ে তাঁর শ্বাসরোধ করা হয়েছিল। অত্যাচারের ফলে অক্সিজেনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়ে মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে গিয়েছিল তাঁর। অরুণা চোখে দেখতে পেতেন। কিন্তু কী দেখছেন, সে সম্পর্কে তাঁর মস্তিষ্ক কোনও সঙ্কেত গ্রহণ করতে পারত না। তিনি কথা বলার বা কোনও অনুভূতি প্রকাশ করার অবস্থায় ছিলেন না। শরীরের কোনও অঙ্গ ব্যবহার করতে পারতেন না। অরুণারা আট ভাইবোন ছিলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, অরুণার ওই পরিস্থিতি হওয়ার কয়েক দিন পর থেকেই পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য তাঁকে দেখতে আসা বন্ধ করে দেন। পরিবার অবশ্য অন্য কথা বলেছিল। তাদের বক্তব্য, অরুণাকে দেখতে গেলেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চাপ দিতেন। বলতেন, তাঁকে ছুটি করিয়ে বাড়ি নিয়ে যেতে। কিন্তু বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দেখাশোনা করার সামর্থ্য অরুণার পরিবারের ছিল না।

তখন থেকে টানা চার দশক অচেতন ছিলেন অরুণা। নিউমোনিয়ায় ভুগতে ভুগতে শেষে ২০১৫ সালের ১৫ মে তাঁর মৃত্যু হয়। অরুণার নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল দেশের শীর্ষ আদালত।

অরুণা দুর্ভাগা ছিলেন। নয়াদিল্লির হরীশ রানা সৌভাগ্যবান। তাঁকে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। অনুমতি দিয়েছে তাঁর শরীরে যুক্ত জীবনদায়ী ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার। ভারতে এই প্রথম!

হরীশের দৃষ্টান্ত দেখতে দেখতেই ঝপ করে ১৬ বছর আগের ‘গুজ়ারিশ’ ছবিটার কথা মনে পড়েছিল। পাশাপাশিই মনে হল, সঞ্জয়ের ছবিতে নিষ্কৃতিমৃত্যুর বিষয়টাকে কতটা মহিমান্বিত করে দেখানো হয়েছিল! কোথায় গোয়ার এক আলিশান প্রাসাদের বাসিন্দা ইথান মাসকারেনহাস এবং তার যাপনের সাহায্যকারিণী সুন্দরী নার্স (ঘটনাচক্রে, যে ইথান নিষ্কৃতিমৃত্যু চেয়েছিল, ছবির শেষে সেই ইথানই নার্স সোফিয়ার পাণিপ্রার্থী হয়)। আর কোথায় হরীশ আর তাঁর নাচার বাবা-মা। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে সংজ্ঞাহীন পুত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে যাঁদের বসতবাড়িটিও বিক্রি করে দিতে হয়েছে!

(বাঁ দিকে) ‘গুজ়ারিশ’ ছবিতে ইথানের চরিত্রে হৃতিক রোশন। (ডান দিকে) হরীশ রানা (উপরে) এবং অরুণা শানবাগ (নীচে)।

(বাঁ দিকে) ‘গুজ়ারিশ’ ছবিতে ইথানের চরিত্রে হৃতিক রোশন। (ডান দিকে) হরীশ রানা (উপরে) এবং অরুণা শানবাগ (নীচে)। —ফাইল চিত্র।

মনে হচ্ছিল, নিষ্কৃতিমৃত্যুটা ইথানের জীবনে ছবি। নিছক সিনেমা। অরুণা-হরীশের জীবনে (না কি মরণে?) ঘোরতর বাস্তব!

৩২ বছরের হরীশ ২০১৩ সালে মাথায় গুরুতর চোট পেয়েছিলেন। তার পর থেকেই তিনি ‘পারসিসটেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ রয়েছেন। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন অবস্থায় শয্যাশায়ী। চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিলেন হরীশ। ‘পেয়িং গেস্ট’ থাকতেন একটি বাড়ির পাঁচতলায়। ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট রাখিবন্ধনের দিন পাঁচতলা থেকে আচমকাই নীচে পড়ে যান তিনি। গুরুতর আঘাত পান মাথায়। প্রাণে বাঁচলেও শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েন। গোটা শরীরে কোনও সাড় ছিল না হরীশের। শরীরের ১০০ শতাংশই পক্ষাঘাতগ্রস্ত। কথা বলতে পারেন না। শরীর সামান্য নড়ানো-চড়ানোর ক্ষমতাও ছিল না।

হরীশের বাবা-মা অশোক এবং নির্মলা দুর্ঘটনার পরে পুত্রকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেছেন ছেলের প্রাণ বাঁচাতে। প্রাণ বাঁচানোর পরে দ্বিতীয় লড়াই শুরু হয় রানা দম্পতির। কারণ, হরীশ প্রাণে বাঁচলেও পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। বিছানায় বন্দি। আবার এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। নয়াদিল্লির এমস, রামমনোহর লোহিয়া, লোকনায়ক এবং দিল্লির ফর্টিস হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছে হরীশের পরিবার। এমসে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন হরীশ। কিন্তু তাঁর শরীরে স্পন্দন ফেরেনি। কোনও চিকিৎসাতেই সাড়া দেয়নি হরীশের পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীর।

অগত্যা ২০২৪ সালে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন অশোক-নির্মলা। আদালতে আবেদন জানান, মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে তাঁদের পুত্রকে নিষ্কৃতিমৃত্যু দেওয়া হোক। আদালতে অশোক জানান, যখন বাবা-মা তাঁদের সন্তানের মৃত্যু কামনা করেন, তখন তা নিষ্ঠুরতা নয়। তা আসলে ভালবাসার অভিশাপ। ভালবাসার জন্যই তাঁরা পুত্রের এমত জীবনে ইতি টানতে দেওয়ার অনুমতি চাইছেন!

দিল্লি হাই কোর্ট সাড়া দেয়নি। কিন্তু তাতেও পিছিয়ে যাননি রানা দম্পতি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টে একই আবেদন করেন। কিন্তু সে আবেদনও গ্রাহ্য হয়নি। শীর্ষ আদালত বলেছিল, হরীশকে বাড়িতে রাখতে হবে। চিকিৎসকেরা নিয়মিত তাঁকে দেখতে যাবেন। ততদিনে হরীশের পরিবার প্রায় সর্বস্বান্ত। ২০২১ সালে তিনতলা বাড়ি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। সম্বল শুধু পেনশনের কয়েকটা টাকা। সেই সামান্য অর্থে না-চলে সংসার। না-হয় পুত্রের চিকিৎসার ব্যয়নির্বাহ।

২০২৫ সালে আবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন রানা দম্পতি। আর্জি একটাই, হরীশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিক আদালত। বিচারকদের সামনে ষাটোর্ধ্ব অশোক অসহায় ভাবে বলেছিলেন, ‘‘১৯৮৮ সাল থেকে যে বাড়িতে আমরা থাকতাম, সেখানে চার দেওয়ালের মধ্যে আমাদের স্বামী-স্ত্রী-পুত্রের অসংখ্য স্মৃতি ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু হরীশের চিকিৎসার জন্য সেটাও বিক্রি করে দিতে হয়েছে।’’ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রকল্পে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলেন হরীশ। ওইটুকুই।

হরীশের ভাই আশিস বেসরকারি সংস্থায় চাকরি পাওয়ার পরে সংসারে টানাটানি কিছুটা কমেছিল। কিন্তু অথর্ব পুত্রের চিকিৎসার নিয়মিত খরচের সঙ্কুলান সে অর্থে হয় না। শুনানিতে বার বার তাঁরা তাই প্রিয় পুত্রের নিষ্কৃতিমৃত্যুর আর্জি জানাতেন।

এক এক করে ১৩টি বছর কেটে গিয়েছে। অবশেষে হরীশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ হরীশের ‘জীবনদায়ী ব্যবস্থা’ সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, সুস্থ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা না-থাকায় হরীশকে কৃত্রিম ভাবে বাঁচিয়ে রাখা আদতে তাঁর মানবিক অধিকারেরই লঙ্ঘন। হরীশের বাবা-মা বার্ধক্যের কারণে তাঁর সেবা করতে অক্ষম। পাশাপাশিই তাঁরা পুত্রের কষ্টও সহ্য করতে পারছিলেন না। তাই তাঁরা সুপ্রিম কোর্টে নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এমসের চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বিশেষ বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। সেই বোর্ড খতিয়ে দেখে রিপোর্ট দেয়, হরিশের মস্তিষ্কের ক্ষতি অপূরণীয়। তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কোনও সম্ভাবনা ছিল না।

কী মনে হয়েছিল রানা দম্পতির? যখন তাঁদের পুত্রের নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদনে অবশেষে সাড়া দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত? ভেঙে পড়েছিলেন তাঁরা। অনুমান করতে পারি, পরস্পর-বিরোধী নানা আবেগ কাটাকুটি খেলে যাচ্ছিল তাঁদের মনের আলো-আঁধারিতে।

আবার মনে পড়ে যাচ্ছিল সঞ্জয়ের ছবির কথা। ইথানের প্রাসাদে আদালত বসেছে। সেখানে ডাকা হয়েছে তার মা’কে। সরকারি কৌঁসুলি (যিনি নিষ্কৃতিমৃত্যুর বিপক্ষে) প্রৌঢ়াকে প্রশ্ন করেন, তিনি কি পুত্রের আবেদন ঠিক বলে মনে করেন? এজলাসকে চমকিত করে ইথানের মা জানান, তিনি পুত্রের আর্জির সঙ্গে সহমত। কারণ, ‘‘এই জীবনটা কার? জীবন যার, জীবন রাখা বা না-রাখার অধিকারও তো তারই থাকা উচিত!’’ কষ্ট চেপে রেখে বলেন, ‘‘আমি তো ওর মা। আমিই ওকে পৃথিবীতে এনেছিলাম। কিন্তু বেঁচে থাকার বদলে ওর এ ভাবে স্রেফ থাকাটা মানতে পারছি না। আমি চাই, সসম্মানে জীবন ছেড়ে চলে যাওয়ার অধিকারটুকু ওকে দেওয়া হোক।’’

ছবির আদালত মায়ের কথাতেও নিষ্কৃতিমৃত্যুর আবেদনে সায় দেয়নি। বলেছিল, দেশের আইন ভঙ্গ করা যায় না। বাস্তবের আদালত অসহায় বাবা-মায়ের আবেদনে সায় দিয়েছে। সঞ্জয়ের ছবিতে ইথানের মা তার কিছুদিনের মধ্যেই ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন। ইথানের পরিণতিও ধোঁয়াশায় মুড়ে রেখেছিলেন পরিচালক। হরীশের বাবা-মায়ের ভাগ্য ছবির মায়ের মতো সুপ্রসন্ন নয়। নিষ্কৃতিমৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে তাঁদের চোখের সামনেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন তাঁদের সন্তান।

১৩ বছরের টানা লড়াইয়ের পর আকাশ-নির্মলা কি জিতলেন? না কি আসলে হারলেন?

Euthanasia Passive Euthanasia Supreme Court of India Harish Rana Case Guzaarish Movie Aruna Shanbaug Case
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy