Advertisement
E-Paper

পক্ষাঘাতে ১৩ বছর বিছানায়! ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবার! নিষ্কৃতিমৃত্যুর মামলা! অবধারিত একটি মৃত্যুর করুণ ধারাবিবরণী

চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিলেন হরীশ রানা। ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট, রাখিবন্ধনের দিন। যে বাড়িতে থাকতেন তিনি, তার পাঁচতলা থেকে পড়ে যান নীচে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ ১৪:০৯
From 2013 accident to Supreme Court’s passive euthanasia verdict

হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

১৩ বছর ধরে লড়াই করছেন। মাথা থেকে পা— অসাড়। সামান্য নড়াচড়ার ক্ষমতাও নেই। বিছানাই তাঁর একমাত্র আশ্রয়। প্রতি দিন চোখের সামনে নিজের ছেলেকে এ ভাবে পড়ে থাকতে দেখছেন বৃদ্ধ দম্পতি। ছেলের যন্ত্রণা, বলতে না-পারা কষ্ট, এক লহমায় বুঝে নিতে পারেন তাঁরা। কিন্তু সেই যন্ত্রণা থেকে রেহাই দেওয়ার কোনও পথই খুঁজে পাচ্ছিলেন না ওই দম্পতি। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে করতে ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়ছিলেন। শেষে আদালতের দরজায় কড়া নাড়েন তাঁরা! সেই লড়াইও কম ছিল না। প্রায় দু’বছর ধরে আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে ‘জয়’ পেলেন তাঁরা। তবে এ জয় সুখের নয়। বুধবার, ১৩ বছর ধরে শয্যাশায়ী বছর বত্রিশের হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। আবেদনকারী ছিলেন তাঁর বাবা-মা। আইনি লড়াই জিতলেও পুত্রকে হারানোর শোকে স্তব্ধ তাঁরা!

চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিলেন হরীশ। পেয়িং গেস্ট হিসাবে একটি বাড়ির পাঁচতলায় থাকতেন। চনমনে যুবক। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। আচমকা দুর্ঘটনা। ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট, রাখিবন্ধনের দিন। যে বাড়িতে থাকতেন তিনি, তার পাঁচতলা থেকে পড়ে যান নীচে। গুরুতর আঘাত পান মাথায়। প্রাণ বাঁচলে অক্ষম হয়ে পড়েন। শুধু যে হাঁটাচলার ক্ষমতা হারান তা-ই নয়, গোটা শরীরেই সাড় ছিল না হরীশের। দুর্ঘটনার পর থেকে স্নায়ুর অসুখে ভুগছেন। শরীরের ১০০ শতাংশই পক্ষাঘাতগ্রস্ত।

দুর্ঘটনা নিয়ে ‘রহস্য’ রয়েছে বলে দাবি করেছিল পরিবার। থানায় এফআইআরও করেছিলেন হরীশের বাবা। কিন্তু সেই তদন্ত কোন পথে এগিয়েছিল, তা-ও ‘রহস্য’। পুত্রের শারীরিক অবস্থা দেখে আর তদন্ত নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার সুযোগ পাননি।

হরীশ চণ্ডীগড়ে থাকলেও তাঁর পরিবার থাকত দিল্লিতে। পুত্রের দুর্ঘটনার খবর তছনছ করে দেয় গোটা পরিবারকে। প্রথমেই পুত্রকে বাঁচানোর চেষ্টায় ছোটেন এক হাসপাতাল থেকে আর এক হাসপাতালে। চিকিৎসকদের চেষ্টায় প্রাণে বেঁচে যান হরীশ। কিন্তু শরীরের প্রায় সমস্ত অঙ্গই অকেজো হয়ে যায় তাঁর। সারাজীবন কি এ ভাবেই থাকবেন হরীশ, সেই চিন্তায় খাওয়াদাওয়া ভুলে বিভিন্ন হাসপাতালের দরজায় কড়া নাড়েন বৃদ্ধ দম্পতি। যে যা পরামর্শ দিয়েছে, তা চোখবন্ধ করে বিশ্বাস করেছেন। দিল্লির এমসে দীর্ঘ দিন চিকিৎসায় ছিলেন হরীশ। কিন্তু শরীরে স্পন্দন ফেরেনি। এমস, রামমনোহর লোহিয়া, লোকনায়ক এবং দিল্লির ফর্টিস হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছে পরিবার। তবে কোনও চিকিৎসাতেই উন্নতি হয়নি হরীশের।

প্রতি দিন ছেলেকে একটু একটু করে বিছানার সঙ্গে মিশে যেতে দেখে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন হরীশের ৬২ বছরের বাবা অশোক রানা এবং মা নির্মলা দেবী। তাঁদের আবেদন, মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে ছেলেকে প্যাসিভ ইউথানেসিয়া (নিষ্কৃতিমৃত্যু) দেওয়া হোক। সালটা ২০২৪। আদালতের কাছে হরীশের বাবা জানান, যখন বাবা-মা তাঁদের সন্তানের মৃত্যু কামনা করেন, তখন তা নিষ্ঠুরতা নয়। সেটা আসলে ভালবাসার অভিশাপ। সেই ভালবাসার টানে ছেলের জীবন শেষ করে দেওয়ার অনুমতি চাইছেন আদালতের কাছে!

তবে সে সময় দিল্লি হাই কোর্ট হরীশের বাবা-মায়ের আবেদনে সাড়া দেয়নি। খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল তাঁদের। কিন্তু দমেননি। ছেলের অসহায়তা, কষ্টই যেন তাঁদের মনে আইনি লড়াই লড়ার সাহস জোগায়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন হরিশের বাবা-মা। কিন্তু তখন আবেদন গ্রাহ্য হয়নি। বলা হয়েছিল, রোগীকে বাড়িতেই রাখতে হবে এবং চিকিৎসকেরা নিয়মিত তাঁকে দেখতে যাবেন।

সুপ্রিম কোর্ট ফিরিয়ে দিলেও আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন বৃদ্ধ দম্পতি। তবে তত দিনে আর্থিক দিক থেকে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছেন তাঁরা। ২০২১ সালে হরীশের বাবা তাঁদের তিনতলা বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। সম্বল শুধু পেনশনের কয়েকটা টাকা। দম্পতির কথায়, ‘‘ওই ক’টা টাকায় কী ভাবে সংসার চালাব, আর কোথা থেকেই বা ছেলের চিকিৎসা করাব।’’ ২০২৫ সালে আবার সুপ্রিম কোর্টে কড়া নাড়েন দম্পতি। আর্জি একটাই, হরীশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিক আদালত। বেঞ্চের সামনে হরীশের বাবা কাতর কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘‘আমরা ওই জায়গাটিকে বাড়ি বলে জানতাম ১৯৮৮ সাল থেকে। চার দেওয়ালের মধ্যে আমাদের— স্বামী-স্ত্রী-ছেলের অসংখ্য স্মৃতি ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু সেটাও বিক্রি করে দিতে হয়।’’ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলেন হরীশ। ওইটুকুই।

হরীশের এক ভাই আছে। আশিস। বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। তাঁর চাকরি পাওয়ার পরে সংসারে টানাটানি কিছুটা কমলেও হরীশের চিকিৎসার খরচ জোগান দিতে নাভিশ্বাস ওঠে দম্পতির। শুনানিতে বার বার একই আর্জি জানিয়েছেন। অবশেষে বুধবার তাঁদের আর্জিতে সাড়া দিল সুপ্রিম কোর্ট।

Harish Rana Case Euthanasia Supreme Court of India Passive Euthanasia
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy