১৩ বছর ধরে শয্যাশায়ী হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই আবহে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক অতীতে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া কিছু ঐতিহাসিক রায়। সেই সব যুগন্তকারী রায় হাসি ফুটিয়েছিল সমাজের একটা বড় অংশের মুখে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্ট জোর দিয়েছিল ‘অধিকার’ শব্দে! সমাজের কোনও না কোনও অংশের ‘অধিকার’ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে সিলমোহর পড়েছিল সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন সব রায়ে।
তাৎক্ষণিক তিন তালাক, সমকামী সম্পর্ক, সবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতীদের প্রবেশ, পরকীয়া অপরাধ নয়— সাম্প্রতিক অতীতে সুপ্রিম কোর্ট এমন নানা বিষয়ে ঐতিহাসিক রায় এবং পর্যবেক্ষণ দেয়। হরীশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর পর গত ১০ বছরে সেই সব রায় আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল।
গাছ লাগানো নিয়ে ঝামেলা কিংবা জমি নিয়ে বিবাদ, কোনও ছোটখাটো অশান্তিতেও অনেককেই বলতে শোনা যায়, ‘কোর্টে দেখা হবে’। তাঁরা বিশ্বাস করেন, আদালতে ন্যায়বিচার মিলবে। আইনি লড়াইয়ে জিততে পারলে নিজের অধিকার বজায় থাকবে। নিম্ন আদালত হোক বা হাই কোর্ট কিংবা সুপ্রিম কোর্ট— বিচারপতিদের নির্দেশের দিকে তাকিয়ে থাকেন সব পক্ষই। প্রায় প্রতি দিনই কোনও না কোনও আদালত কোনও না কোনও মামলায় রায় বা নির্দেশ দিচ্ছে। তবে এত ভিড়ের মধ্যেও কিছু রায় সমাজে যুগান্তকারী হয়ে উঠেছে। মানবিকতার বিচারে সেই সব রায় বহুল আলোচিত।
সমলিঙ্গ সম্পর্কে স্বীকৃতি
সমলিঙ্গ সম্পর্ক বা বিয়ে নিয়ে অনেকে এখনও ভ্রু কুঁচকান। সমলিঙ্গ বিবাহের আইনি স্বীকৃতি নিয়ে লড়াই দীর্ঘ দিনের। সুপ্রিম কোর্টে মামলা গড়ায়। ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ সমলিঙ্গ বিবাহ নিয়ে রায় দিয়েছিল। আদালত জানিয়েছিল, একমাত্র সংসদ বা বিধানসভাই সমলিঙ্গের বিয়েকে আইনি স্বীকৃতি দিতে পারে। সমলিঙ্গ বিবাহে আইনি স্বীকৃতি না-দিলেও সমলিঙ্গ সম্পর্ককে অবশ্য স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের রায়ে শীর্ষ আদালত জানিয়েছিল, সমলিঙ্গ যুগলকে কোনও রকম ভাবে হেনস্থা করা যাবে না। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, সমকামিতা একেবারেই স্বাভাবিক বিষয়। সেই অনুসারে কোনও সম্পর্কের অধিকারের কোনও তারতম্য হতে পারে না।
আরও পড়ুন:
পরকীয়া অপরাধ নয়
২০১৮ সালের আগে পর্যন্ত ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী পরকীয়া ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওই ধারায় উল্লেখ ছিল, কোনও পুরুষ বা মহিলা অন্য কোনও বিবাহিত মহিলা বা পুরুষের সঙ্গে তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান ছিল ওই আইনে। তবে ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ বলেছিল, পরকীয়া সম্পর্ক অপরাধ নয়। ওই আইন ব্যক্তি স্বাধীনতা, সম্মান, নারী-পুরুষ সমান অধিকারের পরিপন্থী। বিচারপতিরা আরও বলেছিলেন, ওই আইনে বিবাহিতা মহিলাদের পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বঞ্চিত করা হয়েছে তাঁদের যৌন স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও।
সবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতীদের প্রবেশে অনুমতি
সবরীমালা মন্দিরে সব বয়সের মহিলাদের প্রবেশাধিকার দাবি করে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি আর এফ নরিম্যান, এ এম খানউইলকার এবং বিচারপতি ইন্দু মলহোত্রকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ গঠিত হয়। ২০১৮ সালে জুলাই মাসে সেই বেঞ্চ জানায়, সব বয়সের মহিলাদেরই প্রবেশাধিকার দিতে হবে সবরীমালা মন্দিরে। রায় দেওয়ার সময় বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, মন্দিরে প্রবেশের ক্ষেত্রে ১০ বছরের নীচে ও ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স বেঁধে দেওয়া ‘স্বেচ্ছাচারিতা’। এই বিধির অর্থ, ঋতুমতী থাকাকালীন কোনও মহিলা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবেন না। রায় দিতে গিয়ে আদালত বলে, ‘‘নারী-পুরুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি। মহিলাদের কোনও মন্দিরে প্রবেশাধিকার না দেওয়া তাঁদের প্রতি পূজার্চনায় বৈষম্য সৃষ্টি করা।
তিন তালাক বাতিল
‘তালাক, তালাক, তালাক’, এক নিঃশ্বাসে বলে স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণের দায়মুক্ত হওয়া— ভারতীয় মুসলিম সমাজে প্রচলিত তাৎক্ষণিক তিন তালাক প্রথা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। সুপ্রিম কোর্টে বেশ কিছু মামলা হয়। তিন তালাকের ধাক্কায় ভুক্তভোগী মুসলিম মহিলাদের একাংশ এই প্রথা রদের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১৮ সালে তিন তালাক (তালাক-এ-বিদাত) প্রথাকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জেএস খেহরের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ।
তবে এই মামলায় রায়ে বেঞ্চে মতবিরোধ ছিল। বেঞ্চের পাঁচ বিচারপতি এ বিষয়ে একমত হতে পারেননি। তিন জন বিচারপতি এই রায়ের সপক্ষে মত দিয়েছিলেন। বাকি দুই বিচারপতি ছ’মাসের স্থগিতাদেশ দিয়ে কেন্দ্রকে আইন তৈরির কথা বলেছিলেন। কিন্তু, শেষমেশ সংখ্যাগরিষ্ঠের বিচারেই তালাক-এ-বিদাত অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়।
নিষ্কৃতিমৃত্যুতে অনুমতি
২০১৩ সালে পাঁচতলা থেকে নীচে পড়ে গুরুতর জখম হয়েছিলেন হরীশ রানা নামে দিল্লির এক যুবক। গত ১৩ বছর ধরে নড়াচড়া করতে পারেন না। কোয়াড্রিপ্লেজিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। এমনকি, বাইরের জগৎ বা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও তাঁর কোনও চেতনা নেই। কেবল আছে প্রাণটুকু। তাঁকে কি ‘পরোক্ষ মৃত্যু’ (প্যাসিভ ইউথানেসিয়া) দান করা যায়? পুত্রের অসহনশীল কষ্ট দেখে আদালতে আবেদন করেছিলেন হরীশের বাবা-মা। প্রায় দু’বছর আইনি লড়াই লড়েন তাঁরা। দিল্লি হাই কোর্ট ঘুরে মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। বুধবার সেই মামলাতে রায় দেয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জেবি পর্দীওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ। হরীশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর রায় দিতে গিয়ে বিচারপতিদের বেঞ্চ উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর প্রসিদ্ধ লাইন ‘টু বি অর নট টু বি’ লাইনটি উল্লেখ করে। একই সঙ্গে আদালত আরও জানায়, নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে একটি নির্দিষ্ট আইন আনতে ভাবনাচিন্তা করা উচিত কেন্দ্রের।