নতুন বছরের শুরুতেই কেরলে একটা কাণ্ড হয়েছে। সাতসকালে খবরের কাগজ (ধরা যাক ‘ক’) হাতে পেয়ে পাঠকদের একেবার বুঝভোম্বল দশা— দেখা যাচ্ছে, তার একটা জেলা-সংস্করণের সম্পাদকীয় পাতায় ছাপা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন, অন্য একটা খবরের কাগজের (ধরা যাক ‘খ’-এর) সম্পাদকীয় পাতা, একেবারে উপরের নামলিপি (মাস্টহেড) সমেত! এমনিতেই এ কখনও হতেই পারে না, তদুপরি আরও অসম্ভব এ কারণে যে, দুটো কাগজ আসলে পরস্পরের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্রেফ ব্যবসায়িক নয়, ঘোর রাজনৈতিকও: দু’জনের রাজনৈতিক মতাদর্শে, আরও স্পষ্ট করে বললে বিশেষ দুটো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মন-মানসিকতার ঘেঁষাঘেঁষিতে রয়েছে আকাশপাতাল তফাত! তা হলে? খোঁজ নিতে জানা গেল, দুটো কাগজেরই প্রসেসিং-এর কাজ হয় একই কম্পিউটার-টু-প্লেট (সিপিটি) সেন্টার থেকে; সেই সেন্টারেই ‘খ’-এর সম্পাদকীয় পাতার প্লেট ‘ভুল করে’ ‘ক’ কাগজে বসে গিয়েছে। সেই ভাবেই পাঠানো হয়েছে প্রিন্টারকেও, তারাও অতশত দেখেনি— পরিণাম: সাতসকালে হুলস্থুল।
কাগজ দুটোর নাম সবাই খবরেই জানতে পেরে যাবেন, আমরা বরং রাজনৈতিক দল দুটোর নাম বলে দিই— বিজেপি, আর ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল)। এ বার, বিজেপির মুখপত্রে মুসলিম লিগের কাগজের সম্পাদকীয় মুষ্ট্যাঘাত ছাপা হয়ে গেলে তো সাড়ে সর্বনাশ। এ তো আর পয়লা এপ্রিল নয় যে ‘কেমন মজা কল্লুম!’ বলে পার পেয়ে যাওয়া যাবে, এ একেবারে বছর-শুরুর ব্যাপার— ফুটবলে ম্যাচ শুরুর সাড়ে বাইশ সেকেন্ডের মাথায় গদাম করে বিপক্ষ গোল করে দিলে এ-পক্ষের যেমন হুড়ুমতাল দশা হবে, এ ঠিক সেই রকম। আর গোল বলে গোল? একেবারে আত্মঘাতী। খাল কেটে কুমির তবু আনা যেতে পারে, তা বলে মুসলমান?
এত কিছুর মধ্যে বাঁচোয়া একটাই— সে দিন ‘খ’ কাগজের সম্পাদকীয় পাতায় বিজেপিকে তাক করে এমন বিরাট কিছু লেখাপত্তর ছিল না যাতে মাথা কাটা যায়। দলের কর্মীরা তাই একটু হলেও হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। তবে টোন-টিটকিরির কথা আলাদা, এ যুগে আর যা-ই হোক ট্রোল-এর থেকে নিস্তার নেই। ও-দিকে আইইউএমএল নেতা-সমর্থকদের অকাল-দেওয়ালি (না কি ইদ?)— একগাল হেসে তাঁরা সে-দিন ‘ক’ খবরকাগজ কিনেছেন, রাস্তায় যাঁকে পেয়েছেন তাঁকে বলেছেন ও বিলিয়েছেন: ‘উল্টে দেখুন, পাল্টে গেছে!’
অতি বাস্তব ঘটনাও যে কখনও কখনও প্রায়-পরাবাস্তব হয়ে উঠতে পারে, এ ঘটনাটা নিয়ে একটু তলিয়ে ভাবলে আমরা বুঝতে পারব ঠিক। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস আজ বেঁচে থাকলে ওঁর অননুকরণীয় কলমে একটা জম্পেশ ছোটগল্প লিখে ফেলতেন হয়তো, সলমন রুশদির কানে এ খবরটা কেউ পৌঁছে দিলেও মনে হয় একটা সুযোগ আছে। আসলে, একটা ছোট্ট, মানবিক ভুলের পরিণতি যদি অবিশ্বাস্য, প্রায়-অসম্ভব কিছু হয়, তার মধ্যে স্রেফ হাসির বুড়বুড়ি ছাড়াও আরও কিছু শিক্ষণীয় থাকলেও থাকতে পারে। বড় বড় লেখকেরা খুব সহজে আমাদের তা দেখিয়ে দেন, তবে চাইলে আমরা, অতিসাধারণরাও হাসি-মজার পালা শেষ করে উঠে তা ধরে ফেলতে পারব। আর, সকাল যেমন দেখিয়ে দেয় দিনটা কেমন যাবে, সেই ধারাতেই বছরের শুরুতে এমন ঘটনা আদৌ কোনও বৃহত্তর বা দূরপ্রসারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কি না, সেও বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে।
এক কাগজে অন্য কাগজের পাতা ছেপে বেরিয়ে যাওয়ার মতো ভুল কোনও খবরকাগজের লোকই জীবনে কক্ষনও দেখতে চাইবেন না। কিন্তু মার্ক টোয়েন থাকলে হয়তো বলতেন, ও-সব ভুল-টুল তো অনেক পরের কথা, আগে গোড়ার জিনিসটা বলো হে! খবরের কাগজ আবার অমুক কি তমুক ‘দলের’ কী! সে তো— নামেই বলা আছে— শুধু ‘খবর’-এর। তা না হলে তাকে ‘নিউজ়পেপার’ বলতাম না, ‘ভিউজ়পেপার’ বললেই তো হত! আমেরিকা দেশটার প্রতিষ্ঠাতাদের এক জন, দেশের তৃতীয় প্রেসিডেন্টও ছিলেন টমাস জেফারসন; তাঁর একটা কথা এইখানটায় কলার তুলে চালিয়ে দেওয়া যায়: সংবাদপত্রহীন সরকার কিংবা সরকারহীন সংবাদপত্র, যদি আমাকে এই দুইয়ের মধ্যে একটা বেছে নিতে বলা হয়, আমি দ্বিতীয়টা বাছতে এক মুহূর্তও ভাবব না। প্রায় একই কথা আর্থার মিলারের ভাষায়— একটা ভাল খবরকাগজ মানে একটা জাতির স্বগত সংলাপ।
সেই জেফারসনও নাই, সেই আমেরিকাও না। কিংবা ভারতও। দেশ, নদী, আকাশ, অরণ্য, সীমান্ত— সব কিছু রাজনৈতিক ভাবে ভাগ করে নেওয়ার মতোই, দেশের মানুষের স্বগত সংলাপের পরিসরেও যদি রাজনৈতিক দলগুলো ভাগ বসায়, তা হলে আর গণের তন্ত্র যায় কোথায়? এটা ব্রাহ্মণপাড়া, ওটা রামা কৈবর্তদের; এটা আমাদের জল নেওয়ার কুয়ো, ওই দূরের, গাঁয়ের বাইরের ওটা তোদের— এই মানসিকতা এবং অভ্যাসের পরম্পরাই আধুনিক সমাজ-রাজনীতিতে এই ধারণারও জন্ম দিয়েছে: এই কাগজ, টিভি, ওয়েবসাইট, ইউটিউবের চ্যানেল শুধুই আমার, আমার দলের কথা বলবে; তুমি অন্য জায়গা খুঁজে-বুঝে নাও। হ্যাঁ, আমি নামকাওয়াস্তে এক চিলতে জায়গা ছেড়ে রাখব মাঝে মাঝে বা নিয়মিতই তোমার জন্য, হর সন্ধেয় ডেকে আনবও হয়তো তোমাকে, কিন্তু তোমার কথা শুনব না— আমার কথা দিয়েই ঢেকে-চেপে শ্বাসরোধ করে দেব তোমার কথাদের।
অর্থাৎ— বহু স্বর থাকবে, কিন্তু বহুস্বর থাকবে না। এই দুইয়ের চরিত্র আলাদা: একটায় অ্যানার্কির ঝালাপালা, অন্যটায় ডেমোক্র্যাসির সিম্ফনি। কিন্তু অন্যের মতকে জায়গা করে দেওয়া দূরস্থান, শোনার অভ্যাসকেও আমরা জীবনে এত দূর অবধি মুছে ফেলছি রোজ যে, হঠাৎ করে একটা দুর্ঘটনায় বেমক্কা অন্যের মতটা শুনে বা দেখে ফেললে ভ্যাবাচ্যাকা খেতে হয়— যেমন হল কেরলে। অথচ হাসাহাসির পালা শেষে এই ঘটনা থেকে আরও অধিক কিছু শিক্ষা নেওয়া যেতে পারত। যেমন, আইইউএমএল-এর রাজ্য সভাপতির একটা লেখা সে-দিন ওই ‘ভুল কাগজ’-এ ছাপা হওয়ার পর তিনি যে কথাটা বলেছেন সেটা ভেবে দেখার মতো— আমার লেখাটা সে-দিন অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছল সে তো সত্যি কথা, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমার কথাগুলো পৌঁছল সেই সব মানুষের কাছেও, যাঁদের মতের সঙ্গে আমার মত, যাঁদের মনের সঙ্গে আমার মন মেলে না।
এক দিক থেকে ভাবলে, যাদের হাবভাব মতামত কাজকর্ম মোটেই ভাল লাগে না, তাদের সঙ্গেও তো আমাদের রোজই কিছুটা বা অনেকটা সময় কাটাতে হয়— পরিবারে, কাজের জায়গায়, রাস্তাঘাটে, কিংবা আন্তর্জালের অদৃশ্য বিরাট শূন্যে। ভেবে দেখলে, এই ভাল-না-লাগা ‘বিরোধী’ বা ‘বিপক্ষ’কেও আমরা কিন্তু জীবন থেকে মুছে বা ছুড়ে ফেলি না। তাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেব, না কি নিজে নিশ্চুপ উপেক্ষায় দূরে সরে যাব, সেটা ঠিক করে দেয় ক্ষমতার কাঠামোয় আমার অবস্থান। আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আমি দলবল জুটিয়ে (কিংবা একাই) চুপ করিয়ে দেব আমার ভাল-না-লাগা যে-কেউ এবং যা-কিছুকে। যাদের চুপ করিয়ে দেব, তারাও আবার খুঁজে নেবে নিজেদের দল ও স্বর। তৈরি করবে নিজেদের পায়ের তলার মাটি, ঘাঁটি, অস্ত্রাগার। এবং তাদের ‘জায়গা’য় আমাকে একা বা সদলে পেলে বার করবে তাদেরও দাঁতনখ— পাড়ার কুকুর বেপাড়ায় গেলে যেমন দশা হয় তার।
কেমন হত, নতুন বছরে যদি এই পরিস্থিতিটা পাল্টাত! কেরলে নাহয় ভুল করে হয়েছে; যদি সজ্ঞানেই বিরুদ্ধস্বরকে জায়গা করে দেওয়া যেত— সংসদে, রাজপথে, সমাজমাধ্যমে, জনপরিসরেও! গোড়ায় একচোট চেঁচামেচি মান-অভিমান চোখের জল-নাকের জল হত হয়তো। তবে সে-সব পেরিয়ে এই উপলব্ধিও হত নিশ্চয়ই: আমার কথা আমার লোকেদের কাছে নয়, আমার কথা তোমার কাছে বলাটাই হল ‘কথা’ বলা; তোমার প্রকৃত শ্রবণেই আমার বলার সার্থকতা। সেই তুমি, যে কিনা আমার লেখা বইটা না পড়েই তা পুড়িয়ে দিতে চাইছ, বা চাইছ আমার গোটা মুন্ডুটাই।সেই তুমি, যে কিনা তোমার লোকেদের কথায় মন তো বটেই, যুক্তি-বুদ্ধিও সব ভাসিয়ে দিয়ে বিশ্বাস করছ আমার রক্তেই নাকি কেবল সন্ত্রাসের বীজ, আমি মানেই যত নষ্টের গোড়া। কেমন হত, যদি ফি-রোববার শাসক দলের পার্টি অফিসে বসত বিতর্কসভা, ব্রিগেডে হত লক্ষকণ্ঠে জনতার অভিযোগপত্র পাঠ? কেমন হত, যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী নতুন বছরে সাংবাদিক সম্মেলনের রেকর্ড গড়তেন, থুড়ি, ভাঙতেন?
রোজ কত কী ঘটে যাহা-তাহা, এমন কেন সত্যি হয় না, আহা!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)