Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৯ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

অনিশ্চিত শিক্ষার ভবিষ্যৎ

ঈশা দাশগুপ্ত
০৭ মে ২০২১ ০৫:৩৮

খবরটা চোখে পড়েছে বোধ হয় সবারই। সিবিএসই দশম শ্রেণির ছাত্রীর পরীক্ষা প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় ইউনিট টেস্ট বেশ ভাল হয়েছিল। খুশি-মনে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বেরোচ্ছিল, এমন সময় মা ফোন করে জানান যে, করোনা সংক্রমণের কারণে দশম শ্রেণির পরীক্ষা সম্পূর্ণ বাতিল। ছাত্রীর হতাশার খবর খুব স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

খবরে ছিল আরও অনেকের কথা, যারা মন দিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল প্রথম বড় পরীক্ষার জন্য। তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দরজাগুলি, যেমন— অন্য স্কুলে ভর্তি, বিজ্ঞান শাখায় পড়ার সুযোগ পাওয়া, অথবা না পাওয়া, সবই নির্ভর করছে এই দশম শ্রেণির ফলের উপরে। কোনও সম্ভাবনা প্রকাশের সুযোগ রইল না। যদিও পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা বা সিবিএসই বোর্ড জানিয়েছে, তারা আপ্রাণ চেষ্টা করবে যাতে যথাযথ মূল্যায়ন হয়। সারা বছরের পরীক্ষার ফল বা টেস্ট পরীক্ষার ফলকে মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা হবে, গত শিক্ষাবর্ষের অসমাপ্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে যেমন করা হয়েছিল। একই ঘোষণা করা হল দশম শ্রেণির আইসিএসই বোর্ডের ক্ষেত্রেও। দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা অনিশ্চিত হয়ে রইল। এরা দু’বছরের বড়, তাই এই দোদুল্যমানতা গলাধঃকরণ করতে পারবে, এই রকমই আশা করা হল বোধ হয়।

অনিশ্চয়তাতেই তো আছে ছাত্রছাত্রীরা, একটি পুরো শিক্ষাবর্ষ জুড়ে। লকডাউনে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া পৃথিবী তাদের বয়ঃসন্ধির মননকে কোন স্তরে প্রভাবিত করল, তার খোঁজ গবেষকরা নেওয়ার সুযোগ এখনও বোধ হয় পাননি। তার পর আছে অনলাইন পড়াশোনা, সেই সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত প্রয়োজন, আর তা না থাকলে চরম অসহায় অবস্থায় পড়া। মেধার থেকে প্রয়োজনীয় হয়ে গেল প্রযুক্তি।

Advertisement

তা ছাড়া লকডাউনের ফলে ভেঙে পড়া আর্থিক অবস্থার অভিঘাতও তো তাদের উপর কম পড়ল না। বাড়ির পরিবর্তিত আর্থিক পরিস্থিতির জন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কত ছাত্রছাত্রীর। তাদের যে পাহাড়প্রমাণ পার্থক্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে, তা তারা কী ভাবে করবে— ভাবতেই ভয় লাগে। অনেকেই বলবেন, পরীক্ষা কি স্বাস্থ্য বা প্রাণের থেকে বড়? কিন্তু স্বাস্থ্যই যদি অগ্রাধিকার হয়, তা হলে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় যখন বন্ধ, তখন স্কুল খুলে দেওয়া হল কেন? স্কুল খোলামাত্র যে বিপদঘণ্টা বাজল, তা তো আমরা সকলেই দেখলাম। সংক্রমিত হতে হল বহু শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীকে।

এর সঙ্গে যুক্ত হল ভারতীয় গণতন্ত্রের নির্বাচন নামক পঞ্চবার্ষিক প্রহসন। তার দায় বহন করলেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ, করোনা সংক্রমিত হয়ে। দায় গ্রহণ করল কমবয়সি ছেলেমেয়েরা, ছাত্রছাত্রীরাও। পরিসংখ্যান বলছে, সংক্রমণের এই দ্বিতীয় পর্যায়ে অল্পবয়সিদের ভাগ বেশি, যা আগে দেখা যায়নি।

কমবয়সিদের নিজেদের দায়িত্ববোধের কথা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তার চেয়েও প্রাসঙ্গিক আরও অনেকের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা। তার মধ্যে ভোটের সমাবেশ, রোড শো’র কথা সম্ভবত সবচেয়ে প্রথমে আসবে। নিশ্চয়ই চৈত্র সেলের ভিড়ের কথাও আসবে। তবে বিপদের পরিমাণ ও পরিমাপে অবশ্যই দ্বিতীয় স্থানে।

শুধু শিক্ষা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা নয়, অনলাইন পরীক্ষার সুযোগে গড়ে উঠেছে এক দুষ্টচক্র। কিছু ছাত্রছাত্রী নানা অসাধু উপায় অবলম্বন করছে, শিক্ষকরা বুঝতে পেরেও নিরুপায়। এ ছাড়া বকলমে পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছেন এক শ্রেণির গৃহশিক্ষক বা মেধাবী কর্মহীন তরুণতরুণীরা। প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে শিক্ষকরা নানা ভাবে এই চক্র ভাঙার চেষ্টা করছেন। যেমন— ল্যাপটপে পরীক্ষা দেওয়ার সময় অন্য একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেখাতে হবে যে, কোনও বইয়ের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে ল্যাপটপ, ফোন ইত্যাদি নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে ছাত্রছাত্রীকে, যার আর্থিক বা পরিকাঠামোগত চাহিদার পরিমাণ আকাশছোঁয়া।

এই চক্র ভাঙার আর একমাত্র উপায় ছিল অফলাইন পরীক্ষা, যেখানে সবাইকে সশরীরে উপস্থিত হতে হবে। এক বছর আগেও পরীক্ষার যে ধরন ছিল একমাত্র সম্ভাব্য ধরন, আজ তা বিতর্কের বিষয়। অফলাইন পরীক্ষা হলে দুষ্টচক্রের স্বার্থে ঘা লাগবে, তাই শোরগোলও কম হল না। সংক্রমণের আশঙ্কার সামনে সবাই অসহায়, অভিভাবকরা তো অবশ্যই। এক দিকে সন্তানের সঠিক মূল্যায়ন, তার ভিত্তিতে নতুন জীবনে ঢোকার উপায় ও আত্মবিশ্বাস, অন্য দিকে করোনা সংক্রমণ, পরীক্ষা নিয়ামকদের সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে তাঁরাও।

তবে পরিস্থিতি দু’মাস আগেও এমন ছিল না। অ্যাক্টিভ রোগীর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল উল্লেখযোগ্য হারে। সেই সময় পরীক্ষা গ্রহণ করলে হয়তো আজকের এই সঙ্কট থেকে বাঁচত ছাত্রছাত্রীরা, বাঁচতাম আমরা অভিভাবকরা। কিন্তু তা হল না। এই মুহূর্তে সুস্থ থাকাই সকলের অগ্রাধিকার, সন্দেহ নেই। আমাদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে বেরোতে হচ্ছে না বলে হয়তো স্বস্তির নিশ্বাসও ফেলছি।

কিন্তু এই স্বস্তি কত দিনের? আর তার বিনিময় মূল্যই বা কী? সন্তানের ভবিষ্যৎ নয়তো?

আরও পড়ুন

Advertisement