E-Paper

মুখে প্রত্যয়, আর মনে?

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় যে মোদী ও শাহের কাছে রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই নির্বাচনের সঙ্গে যে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মানের প্রশ্ন জড়িত, তা অমিত শাহ নিজেই পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে পরিষ্কার ভাবে বলে এসেছেন।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:০৯
পরীক্ষা: কালীঘাট মন্দির দর্শনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী (বাঁ দিকে), শমীক ভট্টাচার্য (ডান দিকে)। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫।

পরীক্ষা: কালীঘাট মন্দির দর্শনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী (বাঁ দিকে), শমীক ভট্টাচার্য (ডান দিকে)। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫। ছবি: সুমন বল্লভ।

নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে অমিত শাহের একটি চরিত্রগত ফারাক আছে। দ্বিতীয় জন অনেক সোজাসাপটা কথা বলেন। রাখঢাক না-রেখে। ফলে তাঁর মনের ভাব খুব স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায়।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় যে মোদী ও শাহের কাছে রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই নির্বাচনের সঙ্গে যে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মানের প্রশ্ন জড়িত, তা অমিত শাহ নিজেই পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে পরিষ্কার ভাবে বলে এসেছেন।

শিলিগুড়িতে গত ৩১ জানুয়ারি অমিত শাহ জনসভায় বলেছেন, বিজেপি তথা এনডিএ দেশের ২১টি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু তাতে দেশের প্রধানমন্ত্রী বা বিজেপির কর্মীরা সন্তুষ্ট নন। যখন ২২তম রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটবে, একমাত্র তখনই তাঁদের মুখে হাসি ফুটবে। বিজেপির শীর্ষনেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গের ভোটকে কী চোখে দেখছে, তা এর থেকে বেশি স্পষ্ট ভাবে বলা সম্ভব নয়।

নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তার ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ ও ‘বিজেপির চাণক্য’ অমিত শাহের রণকৌশল— কোনওটিই পশ্চিমবঙ্গের ভোট ময়দানে এখনও বাজিমাত করতে পারেনি। গত লোকসভা নির্বাচনে চারশো পারের লক্ষ্য নিয়ে বিজেপি একার জোরে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যার আগে আটকে গিয়েছিল। তার পরে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি, বিহারের বিধানসভা ভোটে জিতে মোদী-শাহ জুটি কিছুটা হলেও হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যদি ২০২১-এর মতোই হেরে যায়, তা হলে আবার সেই গৌরবে কালি পড়বে। মোদীর জনপ্রিয়তার রেখচিত্র নিম্নগামী কি না, তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি অমিত শাহের কঠিন পিচে রান তোলার ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। পশ্চিমবঙ্গের ভোট তাই বিজেপির কাছে শুধু জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়। মোদী-শাহের কাছে সম্মানের লড়াই। তাঁদের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

পাঁচ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে যখন বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল, তখনও দেশে কোভিডের কালো ছায়া। নরেন্দ্র মোদী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো লম্বা দাড়ি রেখে প্রচারে নেমেছিলেন। আট দফায় ভোটের মাঝপথে নতুন করে কোভিডের প্রকোপ বাড়ায় প্রচার ধাক্কা খায়। বিজেপির কিছু নেতা দাবি করেন, নরেন্দ্র মোদী সে বার ভোটের প্রচারে শেষ পর্যন্ত ময়দানে থাকলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফল অন্য রকম হলেও হতে পারত।

অমিত শাহের ক্ষেত্রে এই অজুহাত খাটে না। ২০২১-এর ভোটে তিনি গোড়া থেকে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন। বিজেপি দু’শোর বেশি আসনে জিতে ‘প্রচণ্ড বহুমত’-এর সঙ্গে সরকার গড়বে বলে হয়তো দু’শো বার দাবি করেছিলেন। এক-এক দফায় ভোটগ্রহণের পরেই সেই দফায় বিজেপি কত আসনে জিতবে, তা নিয়েও ভবিষ্যদ্বাণী করতে শুরু করেছিলেন। প্রথম দফায় ভোটগ্রহণের পরে দিল্লিতে তাঁর সরকারি বাসভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, যে ৩০টি আসনে ভোট হল, বিজেপি তার মধ্যে ২৬টি আসনে জিতবে। তৃতীয় দফার পরে শাহ বলেছিলেন, এখনও পর্যন্ত যে ৯১টি আসনে ভোট হয়েছে। বিজেপি তার মধ্যে ৬৩ থেকে ৬৮টি আসন জিতবে। এর পরে তিনি নিজেই ভবিষ্যদ্বাণী করায় ইতি টানেন। হয়তো দেওয়াল লিখন টের পেয়েছিলেন। বিজেপিতে অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ নেতারা জানেন, বাংলায় একুশের বিধানসভা ভোটে পরাজয় তাঁকে যথেষ্ট ধাক্কা দিয়েছিল।

এ বার অমিত শাহ বলেছেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতবে। অর্থাৎ ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ১৯৬টি আসন বিজেপি জিতবে বলে শাহের দাবি। তৃণমূল তাঁকে ‘ফ্লপ জ্যোতিষী’ বলে তকমা দিয়েছে। বিজেপির ভোটের হার ৫০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলবে বলেও তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।গত বিধানসভায় বিজেপি ৩৮.১৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। তৃণমূল পেয়েছিল ৪৮.০২ শতাংশ ভোট। তার পরে গত লোকসভায় তৃণমূলের ভোটের হার কমে ৪৬.১৬ শতাংশ হয়েছিল। বিজেপির ভোট হার বেড়ে হয়েছিল ৩৯.০৮ শতাংশ।এখন বঙ্গ বিজেপির নেতারা মনে করছেন, এ বার তাঁদের পক্ষে ৫ শতাংশ ভোট ‘সুইং’ করলেই কেল্লা ফতে। অমিত শাহ নিজেও দাবি করেছেন, এখন শুধু ৩৯ শতাংশ ভোটের হারকে ৪৬ শতাংশে টেনে তোলা বাকি।

এই লক্ষ্যে পৌঁছতে অমিত শাহ পাঁচ বছর আগে যে দু’টি ভুল করেছিলেন, তা এ বার শোধরাতে চাইছেন বলে মনে হচ্ছে। এক, তৃণমূল থেকে লোক ভাঙিয়ে বিজেপিতে নিয়ে আসা। একুশের বিধানসভার আগে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রধান অস্ত্র ছিল সারদা-নারদ-সিন্ডিকেট। অথচ তৃণমূলের সারদা-নারদ-সিন্ডিকেটের অধিকাংশ প্রধান চরিত্র বিজেপিতে এসে ভিড়েছিলেন। তৃণমূলের কলঙ্ক বিজেপি সাধ করে নিজের গায়ে মেখেছিল। বিজেপির নেতাদের দাবি, এ বার সচেতন ভাবেই তৃণমূলের ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ লোকেদের দলে টানা হচ্ছে না। দুই, অমিত শাহ এ বার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশে বঙ্গ বিজেপির মতামতকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে ভূপেন্দ্র যাদব, সুনীল বনসল, বিপ্লব দেব ময়দানে থাকলেও শমীক ভট্টাচার্যদের মতামত প্রাধান্য পাচ্ছে।

অমিত শাহের চ্যালেঞ্জ হল, বঙ্গ বিজেপিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার মতো কোনও মুখ তাঁর ঝুলিতে নেই। শুভেন্দু অধিকারীর উপরে প্রচারের আলো সবচেয়ে বেশি পড়ে। তৃণমূল শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে ভোটে নামবে। বিজেপির পক্ষে দলের ঐক্য বজায় রাখতে নির্দিষ্ট এক জনকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী করে ভোটে যাওয়া কঠিন। এমনিতেই দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ঠেকাতে অমিত শাহকে শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার ও দিলীপ ঘোষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করতে হচ্ছে।

অমিত শাহ টের পাচ্ছেন, শহরের শিক্ষিত, হিন্দু ভোটের একাংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকে রয়েছে। তিনি লক্ষ্য বেঁধেছেন, কলকাতা ও শহরতলির চারটি লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ২৮টি বিধানসভা কেন্দ্রের ২০টিতে বিজেপিকে জিততে হবে। মুশকিল হল, শেষ জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামের বাসিন্দা। লোকসভার ভোটের নিরিখে তৃণমূল দক্ষিণবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে ঘাসফুল ফুটিয়েছে। তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে রাজ্যের প্রায় ৩৫ হাজার গ্রাম পঞ্চায়েত ও অধিকাংশ জেলা পরিষদ। তার উপরে রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট তৃণমূলের সমর্থনে এককাট্টা করার বিষয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতখানি আত্মবিশ্বাসী, হিন্দু ভোট এককাট্টা হবে বিজেপির পিছনে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিজেপি মনে করছিল, দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূলের ভোটারদের একটা বড় অংশ এসআইআর-এ ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে বাদ চলে যাবে। কিন্তু তা করতে গিয়ে বিজেপির নিজস্ব মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক ভোটার তালিকায় ঠাঁই পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। আর জি করের ঘটনা, নিয়োগ দুর্নীতি, সন্দেশখালি-কাণ্ডের মতো হাতিয়ার থাকতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসআইআর-এর মাধ্যমে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’-নিশানা করতে গিয়ে তৃণমূলের হাতে জয়ের উপহার তুলে দিল বলেও বিজেপিতে ঘোর সংশয়।

বিজেপির আর এক সমস্যা হল, পশ্চিমবঙ্গে শুধুমাত্র নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তায় ভর করে বিজেপির পক্ষে জেতা কঠিন। তার উপরে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের গায়ে ‘বহিরাগত’-এর তকমা। তাঁরা যতই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্যের সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের আত্মিক যোগাযোগ প্রমাণের চেষ্টা করেন, ততই উল্টো ফল হয়। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ধরতে গিয়ে তাঁরা বাংলা বলে কোনও ভাষা নেই দাবি করে বসেন। বন্দে মাতরম্-এর জয়গান গাইতে গিয়ে মোদী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধন করে ফেলেন। ‘জয় শ্রী রাম’ ছেড়ে ‘জয় মা কালী’ বলতে গিয়েও গোলমাল হয়ে যায়। এর সর্বশেষ উদাহরণ, বাংলার মানুষকে লেখা প্রধানমন্ত্রীর খোলা চিঠি, যা বিজেপি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে। বাংলা হরফে সেই চিঠির শুরুতে আছে, ‘আমার প্রিয় পশ্চিমবঙ্গবাসী, জয় মা কালী’ বলে!

দেখেশুনে বিজেপির এক প্রবীণ বাঙালি নেতা ওয়টস্যাপ করলেন। তাঁর সরস প্রশ্ন, ‘জয় মা কালী’ লিখে কি কোনও বাঙালি চিঠি শুরু করে? একমাত্র বাংলার ডাকাতরাই জমিদারদের পাঠানো হুমকি চিঠি শুরু বা শেষ করত ‘জয় মা কালী’ বলে। নরেন্দ্র মোদীকে কারা পরামর্শ দেয়?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Assembly Election 2026 BJP TMC West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy