E-Paper

রাজ্যে উন্নয়ন কিন্তু গতিশীল

অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানও একটি মিশ্র ছবি দেখায়। ভোগব্যয় বা মাথাপিছু আয়ের মতো সূচকে পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে আছে। কিন্তু, দারিদ্র কমানোর ক্ষেত্রে রাজ্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। বহুমাত্রিক দারিদ্রের হার ২০১৫-১৬ সালে ২১.৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২২-২৩ সালে ৮.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

ইন্দ্রনীল দে

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৩৭

বর্তমান শাসকদের পরিচালনায় গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়ন প্রক্রিয়া ঠিক কোথায় পৌঁছল? নির্বাচনের মুখে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অবশ্যই প্রয়োজন। তৃণমূল সরকার রাজ্যে ক্ষমতায় আসার দু’বছর পরে, ২০১৩ সালে, চালু হয় ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প— যা পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রকল্প। এই প্রকল্পে সপ্তম শ্রেণি বা তার উপরে পড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি মেয়েদের বছরে ১০০০ টাকা সাহায্য দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া এবং অল্পবয়সে বিয়ে রোধ করা। ২০১৫ সালে চালু হয় ‘সবুজ সাথী’— নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের সাইকেল দেওয়া হয় যাতে তারা সহজেই স্কুলে যাতায়াত করতে পারে এবং স্কুল ছেড়ে না যায়। ২০২১-এ চালু হয় ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’।

এই ধরনের প্রকল্পগুলি লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি। ২০১০-এর দশক থেকে উন্নয়ন নীতিতে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা বা ক্যাশ ট্রান্সফার কর্মসূচি ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট মানুষের কাছে সরাসরি সাহায্য পৌঁছে দেওয়া যায়, এবং প্রশাসনিক খরচও তুলনামূলক ভাবে কম হয়। তবে এর রাজনৈতিক দিকটিও স্পষ্ট— এই ধরনের প্রকল্প শাসক দল এবং উপভোক্তার মধ্যে এক ধরনের নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি করে, ফলে উপভোক্তারা রাজনৈতিক ভাবে শাসক দলের প্রতি বেশি অনুগত হয়ে ওঠেন। ফলে লক্ষ্যভিত্তিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প অনেক সময় রাজনৈতিক লাভের মাধ্যম হয়ে ওঠে। অন্য দিকে, সকলের জন্য জনকল্যাণমূলক পরিষেবা প্রদান করলে একই ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা নাও পাওয়া যেতে পারে। যেমন, ভাল হাসপাতাল বা প্রাথমিক স্কুল— উন্নয়ন অভিঘাত প্রবল হলেও এই ধরনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের রাজনৈতিক লাভ তুলনায় কম।

কলকাতার বস্তি এলাকার উপর কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বেশি হলে এই ধরনের ক্লায়েন্টেলিস্ট বা পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর রাজনীতি আরও শক্তিশালী হয়। এর ফলে অনেক সময় পানীয় জল সরবরাহ, নিকাশি পরিষ্কার বা আবর্জনা অপসারণের মতো মৌলিক পরিষেবাগুলি সমস্ত জনসাধারণের কাছে সীমিত ভাবে পৌঁছয়। তবে এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এই পরিষেবাগুলি তুলনামূলক ভাবে বেশি পেতে পারে। এরাই প্রায়শই রাজনৈতিক দলের বিশেষ সমর্থকে পরিণত হয়।

রাজনীতিকদের কাছে এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক প্রকল্প আকর্ষণীয়। কারণ এগুলি প্রায়ই নির্বাচনে ভাল রাজনৈতিক ফল দেয়। যেমন ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ-র জয়। নির্বাচন ঘোষণার আগে এনডিএ সরকার প্রায় ১.২১ কোটি সম্ভাব্য মহিলা উদ্যোক্তাকে ১০,০০০ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। এর সঙ্গে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, পেনশন এবং বেকার ভাতার মতো আরও কিছু প্রকল্পও চালু করা হয় নির্বাচনের আগেই।

অন্য দিকে, দিল্লিতে আম আদমি পার্টি বেকার যুবক, পুরোহিত এবং আবাসিক কল্যাণ সমিতির জন্য আর্থিক সহায়তার কথা ঘোষণা করলেও তা তেমন রাজনৈতিক লাভ আনতে পারেনি। বিহার এবং দিল্লির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পার্থক্য এই বিপরীত ফলাফল ব্যাখ্যা করতে পারে।তুলনামূলক ভাবে দরিদ্র অঞ্চলে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা রাজনৈতিক ভাবে অনেক বেশি লাভজনক হতে পারে।

তবে এই প্রকল্পগুলির ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ২০১৭ সালে কন্যাশ্রী প্রকল্প রাষ্ট্রপুঞ্জের পাবলিক সার্ভিস পুরস্কার পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রকল্পের ফলে অনেক মেয়ে তুলনায় দীর্ঘ দিন স্কুলে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পেরেছে। তবে পরিবারের মধ্যে মেয়েদের শিক্ষার বিষয়ে মানসিকতার দীর্ঘমেয়াদি বড় পরিবর্তন ঘটাতে এই প্রকল্প খুব বেশি সফল হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন আছে।

অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানও একটি মিশ্র ছবি দেখায়। ভোগব্যয় বা মাথাপিছু আয়ের মতো সূচকে পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে আছে। কিন্তু, দারিদ্র কমানোর ক্ষেত্রে রাজ্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। বহুমাত্রিক দারিদ্রের হার ২০১৫-১৬ সালে ২১.৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২২-২৩ সালে ৮.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই হার শিল্পোন্নত গুজরাতের থেকেও সামান্য কম। ২০২৩-২৪ সালে গুজরাতে মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৩,০০,৯৫৭ টাকা, যেখানে পশ্চিমবঙ্গে তা ছিল ১,৪৯,৫১৫ টাকা। অন্য দিকে, পূর্ব ভারতের আরও কয়েকটি রাজ্যে দারিদ্রের হার এখনও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। ফলে, দারিদ্র হ্রাসে পশ্চিমবঙ্গের কৃতিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান— এই তিন ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। লক্ষ্যভিত্তিক কল্যাণ প্রকল্প তার একটি বড় কারণ। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গকে আবার পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে হলে পরিকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে আরও জোর দিতে হবে।

ত্রিভুবন সহকারী বিশ্ববিদ্যালয়, আনন্দ, গুজরাত

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy