E-Paper

‘অকারণ’ নয়, ‘আনখাই’

‘খাস বাংলা’ বলতে পারলে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। খাস বাংলা সামাজিক প্রতিপত্তির সূচক এই বোধ স্পষ্ট বলেই পুরুলিয়ার মুখের বাংলা বলায় অবশ্য তাদের অনীহা।

বিশ্বজিৎ রায়

শেষ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৬:০৫
ভবিষ্যৎ: পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডি স্কুলের ছাত্রীরা।

ভবিষ্যৎ: পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডি স্কুলের ছাত্রীরা।

এই যে আমাদের গণতন্ত্রধারী নির্বাচনমুখী রাজ্য, সে রাজ্যে গণের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেলে কখনও ‘মিস’ করি না। শিক্ষকতা যখন পেশা, পেশার দাবি মেনেই শিখতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশে শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান, কিন্তু তা তো শূন্যে দাঁড়িয়ে নেই, বিদ্যালয় শিক্ষার উপরেই ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। সেই বিদ্যালয়ের অংশ যে জনসমাজ, তাঁদের কাছে না গেলে উপরের শিক্ষা তো সম্পূর্ণ হওয়ার নয়। যাঁর পরিকল্পিত ও নির্মিত প্রতিষ্ঠানের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে আমার এখনকার কর্মস্থলের কাঠামো, তিনি চেয়েছিলেন সমাজের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগ সাধন করতে। হালের ভাষায় তার নাম হয়েছে ‘কমিউনিটি সার্ভিস’।

রবীন্দ্রনাথের সেই সহযোগ-ভাবনা যে এখনও প্রাসঙ্গিক তা টের পেলাম প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ার দু’টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে। একটি সুপরিচিত, অপরটি তুলনায় প্রান্তিক। একটি অযোধ্যা পাহাড়ের ঠিক নীচে বাঘমুণ্ডিতে। অন্যটি শহর-সংলগ্ন বোঙাবাড়িতে। শহর তো এখন ফুলে-ফেঁপে গোশালার মোড় পর্যন্ত, কাজেই বোঙাবাড়ি আর আগের মতো শুনশান নয়। আইআইটি খড়্গপুরের পঁচাত্তর বছর পূর্তিতে ‘স্কুল কানেক্ট প্রোগ্রাম’-এর যে পরিকল্পনা, সেখানে কর্মরত দুই ভাষাতাত্ত্বিক বন্ধু দৃপ্তা পিপলাই মণ্ডল আর বর্ণিনী লাহিড়ি করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল এই রাজ্যের বহুভাষিকতার স্বরূপ সন্ধান। বাংলা ভাষার মার্জিত ও মান্য রূপের বাইরে যে নানা বাংলা তার খোঁজ নেওয়া। সাধারণের মুখের বাংলার ও সেই ভাষার মধ্য দিয়ে যে সাংস্কৃতিক জ্ঞান বয়ে যাচ্ছে তা শেখা। বিদ্যালয়ের শিক্ষায় পড়ুয়াদের ‘স্বভাষা’ আর বিদ্যালয়ে ‘পড়ানোর ভাষা’ দুয়ের মধ্যে কী সম্পর্ক তা বুঝতে চাওয়া।

বাঘমুণ্ডি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ‘স্মার্ট ক্লাস রুমে’ আমাদের সামনে পঞ্চাশ জন ছেলে-মেয়ে, ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস টেনের সেই ছেলে-মেয়েদের চোখে আমরা ‘খাস’ বাংলা বলা মানুষ। যাকে মান্য বা প্রমিত বাংলা বলা হয়, তা ওখানে খাস। ‘দেওয়ান-ই-খাস’ আর ‘দেওয়ান-ই-আম’ এই দুয়ের কথা মনে পড়ে গেল। পাশেই ঝাড়খণ্ডে অনেকের মামার বাড়ি। হিন্দি-বাংলা দুই ভাষাই পড়ুয়ারা বোঝেন। ইংরেজির কী অবস্থা? স্কুলের প্রধান শিক্ষক রশিদ স্যর এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন, পুরুলিয়ার জগন্নাথ কিশোর কলেজ আর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়েছেন। উৎসশ্রীর সুবিধে নিয়ে তাই তাঁকে দূরে যেতে হয়নি। বাঘমুন্ডির স্মার্ট ক্লাস রুমের দেওয়ালে ইংরেজি ভাষায় নানা সুভাষিত লেখা। আমাদের দলের ভাষা-প্রযুক্তিবিদ ঋতেশ কুমারের প্রশ্নের উত্তরে পড়ুয়াদের মধ্যে দু’জন জানাল তারা ইংরেজি শেখার জন্য ‘ডুয়ো লিঙ্গো’ ব্যবহার করে। তাদের সঙ্গে দুপুর বেলায় বসে যখন বিশেষ ব্যবস্থা করে আনা ‘ওয়ার্কিং লাঞ্চ’ খাচ্ছিলাম তখন এক জন আর এক জনকে বললে ‘ইট লুকস ফ্যাবুলাস’।

বিদ্যালয়ে তখন মিড-ডে মিল খাওয়া চলছে, খিচুড়ির স্বাস্থ্যকর ঘনত্ব চোখে পড়ে। তবে পড়ুয়াদের মিড-ডে মিল খাওয়ার জন্য শেড-দেওয়া কোনও আলাদা জায়গা এখনও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ করতে পারেননি। জলের সমস্যা খুবই রয়েছে। একটু দূরে যে রাস্তা অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় উঠে গেছে, তা দিয়ে বন্দে ভারতে চেপে আসা কলকাতার নাগরিকেরা হোটেলে পৌঁছে যান। সেখানে পরিষ্কার জল-ভরা সুইমিং পুল, পুলের ধারে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করলে দিতে হয় বিশেষ খরচ। নীচে স্কুলে জলের অভাব।

অভাব শিক্ষকেরও। যদিও স্থায়ী শিক্ষকেরা যত্ন করে নিয়মিত ক্লাস নেন তবু পড়ুয়াদের তুলনায় স্থায়ী শিক্ষকের সংখ্যা কম, তেরো জন। স্থায়ী, প্যারা-টিচার ও ম্যানেজমেন্ট-টিচার মিলিয়ে বাকি সতেরো। ভূগোল শিক্ষক পড়াচ্ছিলেন, কানে এল: ‘তিস্তা নদী উত্তরবঙ্গে বন্যার সময় ত্রাসের কারণ। ত্রাস মানে তোমরা জানো? ত্রাস মানে ভয়।’ মিড-ডে মিলের ঘণ্টা পড়লে পার্শ্ববর্তী এলাকার গৃহপালিত ছাগলেরা ইস্কুলের ভিতর ঢুকে পড়ে। খাবারের উচ্ছিষ্ট খায়। পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যালয় শিক্ষা ও অন্যত্র সর্বত্রই যা চোখে পড়ে তা অসামঞ্জস্য, এটা আছে তো ওটা নেই। স্মার্টবোর্ড আছে জল নেই। এই নিয়েই চলা।

আমাদের সামনে থাকা বাঘমুণ্ডি স্কুলের ছেলে-মেয়েগুলি অত্যন্ত সজীব। কী ভাবে যন্ত্রকে ভাষা শেখানো হয় খানিকটা হাতে-কলমেই দেখাচ্ছিলেন ঋতেশ। আন্তর্জালের সংযোগ আর মুঠোফোন যে তাদের দুনিয়া সদর্থে বদলে দিতে পারে পড়ুয়ারা তা এত দিনে খুবই বুঝতে পেরেছে। তাই যন্ত্র ও ভাষার সম্পর্ক নিয়ে তাদের আগ্রহ ছিল দেখার মতো। ঋতেশের দেখানোয় খুশি হয়ে বলল, ভবিষ্যতে যন্ত্র আর ভাষার সহযোগ নিয়ে কিছু কাজও করতে চায় তারা। ‘খাস বাংলা’ বলতে পারলে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। খাস বাংলা সামাজিক প্রতিপত্তির সূচক এই বোধ স্পষ্ট বলেই পুরুলিয়ার মুখের বাংলা বলায় অবশ্য তাদের অনীহা। ভাষাতাত্ত্বিক বন্ধুরা বার বার বোঝাচ্ছিলেন মানুষের ভাষা মাত্রেই ভাল ভাষা। এমনকি স্থানীয় ভাষাভেদে এমন শব্দ থাকতে পারে যা প্রমিত শব্দের থেকে ক্ষেত্র বিশেষে প্রয়োগ করতে পারলে কাজ হয় বেশি। শুধু সাহিত্যে কোনও চরিত্রের মুখে স্থানীয় ভাষার শব্দ বসানোর মতো ব্যাপার নয় তা, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও মান্য বাংলা শব্দের পাশাপাশি বাংলা ভাষার নানা ভেদ থেকে শব্দ-গ্রহণ করা চলে।

পরে যখন শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলা হল তখন এক জন বললেন, আপনারা যদি এমন একটা অভিধান করেন যেখানে মান্য শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে আমাদের নানা ভাষা অঞ্চলের শব্দগুলি থাকবে তা হলে খুব ভাল হয়। বুঝতে পারলাম তাঁরা আঞ্চলিক বাংলা ভাষার অভিধান চাইছেন না, সে অভিধান প্রয়োজন হয় খাস বাংলা বলা মানুষদের। তাঁরা চাইছেন বাংলা ভাষার নানা ভেদের মধ্যে ব্যবহৃত শব্দের সঙ্গে প্রমিত শব্দের সমানাধিকার। অর্থাৎ ‘অকারণ’ শব্দের সমার্থক হিসেবে সেই অভিধানে ‘আনখাই’ শব্দটি থাকবে। তাড়াতাড়ি শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে থাকবে ‘চাঁড়ে চাঁড়ে’। শরীরী অভিধান না হলেও চলবে। বাঘমুণ্ডিতে বসে মুঠোফোনে এক ক্লিকে যেন তাঁরা তাড়াতাড়ির পাশে ‘চাঁড়ে’ দেখতে পান।

এক দিকে মাস্টারমশাইরা সমানাধিকার চাইছেন ঠিকই কিন্তু নব-প্রজন্মের পড়ুয়াদের মুখের ভাষায় ‘ল্যাঙ্গুয়েজ শিফ্‌ট’ হয়েছে। খাস বাংলাই বলার চেষ্টা করে তারা। পুরুলিয়ার মানভূমি বাংলায় লেখা একটি কবিতার মান্য গদ্যরূপ লিখতে দেওয়া হয়েছিল। ‘মানভূমি’ বাংলায় লেখা কবিতাটি পড়ে শোনাতে বলায় তারা বেশ লজ্জাই পেল। তবে কলকাতা-কেন্দ্রিক ভদ্রলোক বাঙালি পরিবারগুলির থেকে পড়তে আসা পরিবারের ছেলেমেয়েদের যে সাংস্কৃতিক পুঁজি থাকে, তা এই প্রান্তিক পুরুলিয়ার ছেলে-মেয়েদের নেই। অবশ্য পারিবারিক সাংস্কৃতিক পুঁজি না থাকলেও সাংস্কৃতিক স্রোতে তারা এক রকম করে স্নান করেছে। ‘আকাশ’-এর প্রতিশব্দ দিয়ে শূন্যস্থান পূর্ণ করার কাজ দেওয়া হয়েছিল। আকাশ বিশ্বাস তোমার বন্ধু। ‘আকাশ’-এর প্রতিশব্দ দিয়ে শূন্য স্থান পূর্ণ করে অন্য বন্ধুদের নাম তৈরি করো— এমন একটা কাজ দেওয়া হয়েছিল। পুরুলিয়ার রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত স্কুলের ছেলেরা সত্যজিতের ফেলুদা পড়ে। সেই সাংস্কৃতিক পুঁজির অধিকারে তারা সবাই ‘সেন’ পদবিধারী আকাশ অর্থধারী বন্ধুর নাম লিখেছে ‘অম্বর সেন’। সত্যজিতের ‘অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্য’ একদা ‘আনন্দমেলা’র পাতায় প্রকাশ পেয়েছিল। সাংস্কৃতিক পুঁজির অধিকারে তারা অম্বর সেন ছাড়া আর কিছু ভাবতে না পারলেও বাঘমুণ্ডির ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অনেকেই গগন সেন, আসমান সেন, এমনকি আসমানী সেন লিখেছে অক্লেশে। এক প্রকারের সাংস্কৃতিক পুঁজি কেবল সুবিধেই দেয় না, অতি-নির্ধারণও করে। ‘আসমান’ হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোকদের খুব ব্যবহৃত শব্দ নয়, তবে শব্দটি সুন্দর। ‘আকাশ-পাতাল পার্থক্য’-এর মতোই ‘আসমান-জমিন ফারাক’ আমাদের বাংলা ভাষায় সু-ব্যবহৃত।

এই সব দেখে মনে হচ্ছিল— ভোটের বাদ্যি বেজেছে, দলতান্ত্রিক রাজনীতি তার যুক্তিতে চলবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্তর্গত নাগরিক সমাজের মানুষেরা যদি নানা ভাবে তাঁদের অধীত বিদ্যা ইস্কুলের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিনিময় করেন, তা হলে সামাজিক পুঁজি ও মানব সম্পদ তৈরি হতে পারে। দু’টি স্কুলেই এক জনও পড়ুয়া শিক্ষক হতে চায় না। এ বড় ভয়ের। শিক্ষকেরা যেন সমাজের চোখে কেবলই রাজনৈতিকতার ঘুঁটি, নিষ্ক্রিয় অস্তিত্বের অধিকারী অথচ সুবিধাভোগী জীব হিসেবে পরিচিত। এই পরিচিতির অশ্রদ্ধা থেকে মুক্তির উপায় রবীন্দ্রনাথের মতে ‘বিদ্যা উৎপাদন’ ও ‘বিদ্যা বিতরণ’। সমাজের সঙ্গে সংযোগ ছাড়া তা অসম্ভব। শিক্ষাক্ষেত্রে নানা স্তরের মধ্যে চলাচল জরুরি।

বাঘমুণ্ডি স্কুল থেকে একটু দূরে পথের ধারে ‘টাটার হোটেল’-এ খেতে বসি। পরিচ্ছন্ন সহজ খাবারের থালি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Education system Society School students School Teachers

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy