পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক (ফিসকাল) পরিস্থিতি মোটের উপরে স্থিতিশীল (স্টেবল)।” “২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪’এর মধ্যে রাজস্ব ব্যয় ও মূলধনি ব্যয় মিলিয়ে মোট উন্নয়ন ব্যয় বেড়েছে ১.৫ লক্ষ কোটি টাকা থেকে ১.৭১ লক্ষ কোটি টাকা, অর্থাৎ দু’বছরে বৃদ্ধি হয়েছে ১৫ শতাংশ, যা থেকে দেখা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধি এবং জনকল্যাণকে রাজ্য অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছে।” “সামাজিক ও আর্থিক পরিষেবা ক্ষেত্রে মূলধন বাবদ ব্যয় এই দু’বছরে দ্বিগুণ হয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে পরিকাঠামো, কানেক্টিভিটি ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগে রাজ্যের নজর রয়েছে।”
না, উপরের উদ্ধৃতিগুলি তৃণমূলের নির্বাচনী ইস্তাহার থেকে নেওয়া হয়নি— কথাগুলি আছে নীতি আয়োগের সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্ট ফিসকাল হেলথ ইন্ডেক্স ২০২৬-এ, যা প্রকৃতপক্ষে ২০২৩-২৪’এর পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নির্মিত। রাজ্যগুলিকে এই সূচকের মান অনুসারে উপর থেকে নীচে সাজানো হয়েছে, আর সে বিন্যাস অনুসারে পশ্চিমবঙ্গ আঠারোটি রাজ্যের মধ্যে ষোড়শ স্থানে। তা হলে উপরে উদ্ধৃত প্রশংসাসূচক বাক্যগুলি? নীতি আয়োগ যেন এক নির্বিরোধী অতিশয় মঞ্জুভাষ শিক্ষক, সব রাজ্যের জন্যই ভাল ভাল কথা রেখেছে রিপোর্ট কার্ডে! বোধ করি, ফিসকাল স্বাস্থ্য সূচকের মতো একটি বহুমাত্রিক পরিমাপক থেকে কী বলা যায় আর কী বলা যায় না, তা নিয়ে রিপোর্ট নির্মাণকারীরা এক প্রকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন, যে সতর্কতা এই মুহূর্তের অতি উষ্ণ নির্বাচনী আবহাওয়ায় অতিশয় দুর্লভ।
যে কোনও আর পাঁচটি মূল্যায়নের মতোই রাজ্যগুলির আর্থিক স্বাস্থ্যের মূল্যায়নও সোজা-সরল হতে পারে না। প্রথমেই প্রশ্ন উঠবে যে, কোন সূচকটির দিকে দেখব? রাজ্যের জমে ওঠা মোট ঋণের পরিমাণ, না তার হ্রাস-বৃদ্ধির হার? কিন্তু সেই ঋণ নিয়ে রাজ্যের আর্থনীতিক কাজকর্মের বৃদ্ধি হল কি না, তা ধরতে হবে না? আয়ের থেকে ব্যয় বেশি হলে ঘাটতি মেটাতে ঋণ করতে হয়। তা হলে তো এক দিকে রাজ্যের আয়ের উৎসগুলির আর অন্য দিকে ব্যয়ের প্রকৃতির দিকেও দেখতে হয়। অর্থাৎ মানতেই হবে যে, যদি মূল্যায়নটিকে ‘সামগ্রিক’ মূল্যায়ন বলতে হয়, তবে একটি নয়, একাধিক সূচক কম-বেশি গুরুত্বের দাবিদার। নীতি আয়োগ এই কাজটিই করছে বা করার চেষ্টা করছে গত বছর থেকে— খানকয়েক সূচক একত্রিত করে বানাচ্ছে ‘ফিসকাল স্বাস্থ্য সূচক’।
রাজ্যগুলিকে নম্বর দেওয়া এবং নম্বর অনুসারে তাদের শ্রুতিমধুর নামকরণ নীতি আয়োগের একটি প্রিয় বিনোদন। যেমন নীচের দিকে থাকা রাজ্যকে বলতে হবে ‘অ্যাস্পিরেশনাল’, একটু উপরে ‘পারফর্মার’, আর একদম উপরের ধাপে ‘অ্যাচিভার’। সেই সুবাদে পশ্চিমবঙ্গ ‘অ্যাস্পিরেশনাল’। আর অ্যাচিভার? ওড়িশা, গোয়া, ঝাড়খণ্ড। বস্তুত, উপর থেকে প্রথম ছ’টি রাজ্যের মধ্যে দক্ষিণ ভারতের একটি রাজ্যও নেই। আর, অ্যাস্পিরেশনাল গোত্রে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গী কারা? কেরল, পঞ্জাব আর অন্ধ্রপ্রদেশ। এ থেকে স্বাভাবিক ভাবেই কৌতূহল জাগে যে, এই ‘ফিসকাল স্বাস্থ্য’ নামক জীবটি আদতে কী প্রকার? কোন সে গুণ, যার বলে বলীয়ান হয়ে উন্নয়নে পিছিয়ে-পড়া ঝাড়খণ্ড রাজ্যটি পঞ্জাব বা কেরলের অনেক উপরে থাকে? এটি কি কোনও লক্ষ্য, না লক্ষ্যে পৌঁছনোর উপায়? এখানে বলে রাখা ভাল, যাঁরা দেখতে বা দেখাতে চান যে পশ্চিমবঙ্গের সব ভাল কিংবা সব খারাপ, এই লেখাটা তাঁরা আর পড়বেন না, হতাশ হবেন। কারণ এ রচনার মূল উদ্দেশ্য হল মূল্যায়নের বহুমাত্রিকতার গুরুত্বটি একটু সামনে আনা, আর সেই সঙ্গে কোনটি লক্ষ্য আর কোনটি উপায়, সে বাবদে খানিক স্পষ্টতা।
নীতি আয়োগের ‘ফিসকাল স্বাস্থ্য সূচক’ তৈরি হয়েছে পাঁচটি সূচক একত্রিত করে। এক, খরচের গুণগত মান। মোট সরকারি ব্যয়ের কত শতাংশ ‘উন্নয়ন’-এ খরচ হচ্ছে, আর মূলধনি ব্যয় রাজ্যের মোট উৎপাদন মূল্যের (জিএসডিপি) কত শতাংশ, এই দু’টি সূচক জুড়ে গড়া হয়েছে এটি। দুই, রাজস্বসংগ্রহ— অর্থাৎ, রাজ্যের সংগৃহীত রাজস্ব রাজ্যের মোট উৎপাদন মূল্যের কত শতাংশ, আর মোট ব্যয়ের কত শতাংশ। তিন, ফিসকাল বিচক্ষণতা— অর্থাৎ, মোট বাজেট ঘাটতি আর রাজস্ব ঘাটতি মোট উৎপাদন মূল্যের কত শতাংশ। চার, ঋণ সূচক— যার মধ্যে আছে এ-যাবৎ জমে ওঠা মোট ঋণ জিএসডিপির শতাংশ হিসাবে এবং রাজস্বের কত শতাংশ সুদ মেটাতে খরচ হয়। আর পাঁচ, ঋণের সুস্থিতি বা সাসটেনেবিলিটি। এই শেষ সূচকটি নির্মিত হয়েছে জিএসডিপির বৃদ্ধির হার থেকে সুদের হার বিয়োগ করে। ঋণের উপর সুদের হার যদি হয় পাঁচ শতাংশ আর অর্থনীতি যদি বেড়ে চলে ছয় শতাংশ হারে, তা হলে জমে ওঠা ঋণ যা-ই হোক না কেন, তা ‘সাসটেনেবল’ বা সুস্থায়ী।
এই পাঁচটি সূচকের প্রত্যেকটিই ফিসকাল স্বাস্থ্য সূচকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। তবু খচখচানি থেকে যাচ্ছে উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবতে বসলে। প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল, ‘আয়ের থেকে ব্যয় বেশি’ কথাটি পারিবারিক ক্ষেত্রে যতটা উদ্বেগের, একটি দেশের বা দেশের অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে তা নয়, যদি ঘাটতির পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। ফিসকাল রেসপন্সিবিলিটি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট (এফআরবিএম) আইন চালু হওয়ার পর এখন প্রতিটি রাজ্যেই বাজেট ঘাটতি রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মূল্যের তিন শতাংশের মধ্যে রাখার কথা। দেশের অনেক রাজ্যই তা কম-বেশি রাখে। আবার কোনও কোনও রাজ্য রাখছে না, বা রাখতে পারছে না। এর ফলে যে ভয়ানক ক্ষতিবৃদ্ধি হচ্ছে, তার প্রমাণও নেই তেমন। কিন্তু কিছু রাজ্যে ঘাটতি তিন শতাংশের অনেকটা নীচে থাকছে বেশ কিছুকাল ধরেই, যেমন ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা। কাজটা ভাল হচ্ছে না মন্দ বলা মুশকিল।
নীতি আয়োগের রিপোর্টই বলছে, পশ্চিমবঙ্গের বাজেট ঘাটতি জিএসডিপির শতাংশ হিসাবে তিনের সামান্য উপরে হলেও অন্য বেশ কয়েকটি রাজ্যের তুলনায় কম— যেমন অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়, তামিলনাড়ু। আরও বলা যায় যে, উত্তরপ্রদেশে স্বাস্থ্য খাতে খরচ মোট খরচের শতাংশ হিসাবে কমেছে; বলা যায় ঝাড়খণ্ডে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে খরচ সাধারণ বর্গের যে আঠারোটি রাজ্যকে নেওয়া হয়েছে তাদের গড় খরচের তুলনায় কম। অথচ নীতি আয়োগেরই অন্য রিপোর্ট থেকে জেনেছি যে, বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচক অনুসারে ঝাড়খণ্ডে ২৮.৮% মানুষ দরিদ্র; ওড়িশায় ১৫.৭%। আর পশ্চিমবঙ্গে ১১.৯%। ফিসকাল স্বাস্থ্যে স্বাস্থ্যবান ওড়িশা বা ঝাড়খণ্ড তা হলে কোন লক্ষ্যে পৌঁছল? খরচ কম করে বাজেট ঘাটতিকে ঊর্ধ্বসীমার অনেক নীচে আটকে রাখায় কী কৃতিত্ব আছে, বোঝার উপায় নেই।
এখান থেকে বলা যায় যে, নীতি আয়োগের ফিসকাল স্বাস্থ্য সূচকের প্রধান সীমাবদ্ধতা হল কয়েকটি বাছাই অনুপাত আর শতাংশের ব্যবহার, এবং সম্ভবত একটি বিশেষ সূচককে গুরুত্ব না দেওয়া। সেই সূচকটি হল মাথাপিছু সরকারি ব্যয়। সরকারি ব্যয় মানে স্বাস্থ্য শিক্ষা সামাজিক সুরক্ষার বৃদ্ধি, যা জনকল্যাণমুখী। তা বাড়াতে গিয়ে বাজেট ঘাটতি যদি তিন শতাংশ ছুঁয়েও ফেলে, তা হলেও তা না করার কারণ দেখি না— বিশেষত সে সব রাজ্যে, যেখানে মানব উন্নয়ন পিছিয়ে রয়েছে। খরচকে অনুমিত জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে দেখছি, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে মাথাপিছু ব্যয় প্রায় সমান— মোটামুটি ২৫,০০০ টাকার মতো, যদিও ওড়িশায় তা প্রায় ৪১,০০০ টাকা। কেরলে ৪৪,০০০। তা হলে দেখা যাচ্ছে দারিদ্র কমাতে ঝাড়খণ্ড যথেষ্ট খরচ করছে না, আর তা না করে ফিসকাল স্বাস্থ্য সূচকে উপরে আছে। আবার দেখছি অনেক রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ মাথাপিছু ব্যয় কম করছে— যার সম্ভাব্য কারণ আয় কম, রাজ্যের সংগৃহীত নিজস্ব রাজস্ব অন্য রাজ্যের তুলনায় অনেক কম। পশ্চিমবঙ্গে তা হলে কি খরচ বেশি করার অক্ষমতাই সমস্যা, বেশি বেশি খরচ করে ফেলা নয়? প্রশ্নটি তোলা থাক।
বহুমাত্রিক মূল্যায়ন সহজ কর্ম নয়। আবার তার সহজ বিকল্পও হয় না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)