Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৩ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

বানভাসিদের ন্যায়ের খোঁজ

আমরা কি জানি, ‘সকলে সুরক্ষিত না হলে কেউ সুরক্ষিত নয়’?

পাপিয়া মজুমদার
০৯ অক্টোবর ২০২১ ০৬:২২

জলবায়ু নিয়ে কথা বলা মুশকিল— বাংলা ভাষায় কথাই খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ নাহয় হল জলবায়ু পরিবর্তন, ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’ কী? জলবায়ু নিয়ে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারই বা করবে কোন আদালত? কেনই বা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এই ধারণার উপর এত জোর দিচ্ছে? আফ্রিকার দেশগুলো হাত মিলিয়ে তৈরি করেছে ‘প্যান আফ্রিকান ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স’। গ্লাসগোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই সংগঠন সম্প্রতি স্কটল্যান্ডে জলবায়ু পরিবর্তনের ন্যায়বিচার দাবি করে দ্বিতীয় বিশ্ব সম্মেলন (ওয়ার্ল্ড ফোরাম অন ক্লাইমেট জাস্টিস) আহ্বান করেছিল। আগামী নভেম্বর মাসে জলবায়ু নিয়ে ২৬তম বিশ্বসমাবেশ (‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ়’ বা সিওপি) হবে। তার আগে এই সম্মেলন তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে ভারতের জন্য।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুগত হাজরার সাম্প্রতিক গবেষণায় মেলে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত মৌসুনি দ্বীপে বেশ কিছু হতদরিদ্র পরিবারের কথা, যাদের ২০০৯-এর বিধ্বংসী আয়লা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ও এ অঞ্চলে বাস করতে দেখা গিয়েছিল। ২০২১-এর সমীক্ষায় তাদের আর হদিস মেলেনি। প্রচলিত তথ্যানুযায়ী মৌসুনি দ্বীপের এ পরিবারগুলি বছরভর বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপে দিশেহারা হয়ে ভিটে-মাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। পৃথিবী জুড়ে এমন শত-সহস্র পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণে বসতবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বইয়ের ভাষায় তাদের বলা হয় ‘ক্লাইমেট-রিফিউজি’। ২০০৯ থেকে ২০২১-এর মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় প্রতি বছরই ছোটবড় ঘূর্ণিঝড়ের জেরে চাষবাসের জমি বা বাসস্থানের ক্ষয়ক্ষতিতে বিপন্ন হয়েছেন সুন্দরবনের বহু মানুষ।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী শাবেরী দাসের গবেষণায় দেখা যায় যে, অতিমারি এবং তৎপরবর্তী দেশব্যাপী লকডাউনে কাজ হারিয়ে ২০২০-র মার্চ মাসের শেষ দিকে ঘরে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন সুন্দরবনের অসংখ্য শ্রমিক। এঁরা অনেকেই ২০০৯ সালের আয়লা ঘূর্ণিঝড়ে চাষের জমির মান-অবনমনে বিকল্প কাজকর্মের খোঁজে পাড়ি দেন ভিন্‌রাজ্যে। অতিমারি কালে বাড়ি ফেরার বাধ্যবাধকতায় গাড়িভাড়া-সহ সব খরচ মিটিয়ে যখন তাঁরা কপর্দকশূন্য, ঘূর্ণিঝড় আমপান তছনছ করে দিল ঘরবাড়ি। আবার, পরিবারের একমাত্র রোজগেরে ব্যক্তি যখন এ পরিস্থিতিতে মানসিক উদ্বেগে দিশেহারা, তাঁর বিভিন্ন বহিঃপ্রকাশের মোকাবিলার স্বাভাবিক দায়ভার এসে পড়ল বাড়ির মহিলার উপর। যিনি নিজে হয়তো শারীরিক এবং মানসিক ভাবে ইতিমধ্যেই ক্লান্ত, ভিন্‌রাজ্যে যাওয়া শ্রমিকের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে পরিবারকে একা হাতে সামলে রাখতে গিয়ে। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট-এর অধ্যাপক, মনস্তাত্ত্বিক দেবদুলাল দত্তরায় সুন্দরবনে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, জলবায়ুর পরিবর্তনে কৃষিজমির লবণাক্ততা-বৃদ্ধি এবং উৎপাদনের অনিশ্চয়তায় এ অঞ্চলের অগুনতি কৃষক অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে মানসিক সমস্যারও শিকার হয়ে পড়ছেন। তেমনই বহু পরিবার হতাশাগ্রস্ত, ফি-বছর ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি বা ভরা-কটালের তোড়ে নিজেদের বাড়িঘর ভেসে যেতে দেখে। করোনা অতিমারি-পরবর্তী কালে সুন্দরবনের স্থানীয় ডাক্তারদের কথায় মানসিক সমস্যা মোকাবিলায় উপযুক্ত পরিষেবার প্রয়োজনের কথা সুস্পষ্ট হয়েছে।

Advertisement

জলবায়ুর পরিবর্তনে তৈরি হচ্ছে জটিল আর্থসামাজিক সমস্যা, যার প্রভাব পড়ছে শরীরে ও মনে। দরিদ্র মানুষদের এই বিপন্নতা বুঝে, তাঁদের উপযুক্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা করা না হলে এই মানুষদের সঙ্গে অন্যায় হবে না কি? তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র মানুষদের প্রতি এই অন্যায় আরও তীব্র মনে হয়, যখন দেখি যে তাঁরা কার্যত ধনী দেশগুলোর কাণ্ডজ্ঞানহীতার ফল ভুগছেন। শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে যে উষ্ণায়ন দ্রুত বেড়েছে, তার কারণ গ্রিনহাউস গ্যাসের (কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন-এর যৌগ)-এর অধিক নিঃসরণ। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নির্গত এই সব গ্যাস ভূমিতলের উপরিভাগের এবং বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন স্তরের উষ্ণতাকে বাড়িয়ে তুলছে। এ দায় পৃথিবীর দেশগুলির উপর সমান ভাবে বর্তায় না। শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী কালে বিশ্বের উন্নত দেশগুলি প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সুনিশ্চিত করেছে অনেক বেশি। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণের আপেক্ষিক দায়ভারও তাই কম উন্নত দেশগুলোর তুলনায় তাদের বহুগুণ বেশি। এই ধনী দেশগুলি তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লাভ দরিদ্র দেশের সঙ্গে ভাগ করে নেয়নি, অথচ তাদের জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির কোটি কোটি মানুষ ঘরবাড়ি, চাষআবাদ হারাচ্ছেন। জলবায়ুর পরিবর্তন-জনিত নানা বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রমাগত। ‘জলবায়ু ন্যায়’ এই অন্যায্যতার সুবিচার দাবি করে। এই ধারণার সমর্থকরা বলছেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলিকে এ দায়ভার স্বীকার করতে হবে। এবং বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিটি মানুষের সুরক্ষার সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলির উষ্ণায়নের প্রতিকূলতার মোকাবিলা যাতে করতে পারে, তার জন্য উন্নত দেশগুলিকে অর্থ, পরামর্শ, প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করতে হবে।

বোঝাই যাচ্ছে, কোনও আদালতে এই ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না। এই ধারণা বস্তুত জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিপন্ন মানুষদের প্রতি একটা সামূহিক দায়বদ্ধতার কথা বলে। যেমন, সুন্দরবনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে পারে স্থানীয় সরকারি ব্যবস্থা। যথাযথ তথ্য-পরিসংখ্যান নিয়মিত সংগ্রহ করতে হবে, তা ব্যবহার করে মানুষের সবচেয়ে গুরুতর প্রয়োজনগুলিকে সুরক্ষিত করতে হবে। সুন্দরবনে কর্মরত একটি বেসরকারি সংস্থার সদস্য অনিরুদ্ধ দে মনে করেন, আগে যা ছিল আপৎকালীন প্রস্তুতি, এখন তাকেই নিয়মিত ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। মাঝেমাঝেই অতিবৃষ্টি হবে, তাই প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ‘অ্যান্টিভেনাম’ মজুত করার ব্যবস্থা চাই। বিকল্প নেই। তবে এ ব্যাপারে দৃষ্টান্ত হতে পারে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগর-উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ক্ষয়ক্ষতির মোকাবিলায় বাংলাদেশের বেশ কিছু পদক্ষেপ আমাদের কাছে শিক্ষণীয়।

করোনা-অতিমারি কালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল টেড্রস অ্যাডানম বলেছেন, “সকলে সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ সুরক্ষিত নয়।” উষ্ণায়নের জেরে জলবায়ু পরিবর্তনও এক বিশ্বব্যাপী অতিমারি। কোনও প্রতিষেধক আবিষ্কার করে তাকে জয় করা যাবে না। আশ্বিন মাসে রেকর্ড-ভাঙা বৃষ্টি বলছে, শুধু বঙ্গোপসাগর উপকূলবাসীই নন, উষ্ণায়নের কবলে আসলে আমরা সবাই। জলবায়ু পরিবর্তনের ন্যায্য-বিচারের দাবি প্রতিষ্ঠায় যৌথ দায়বদ্ধতাই একমাত্র রাস্তা।

ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন

Advertisement