E-Paper

আশা-আশঙ্কার দোলাচল

এই পরিস্থিতির জন্য ভারতের সরাসরি দায় নেই ঠিকই, কারণ সমস্যার সূত্রপাত দেশের বাইরে। তবুও প্রশ্ন উঠছে— ভারতকে এতটা দুর্বল দেখাচ্ছে কেন?

কৌশিক বসু

শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৩৯

আমরা এক অন্ধকার সময়ে বাস করছি। গত ছ’বছর বিশ্ব জুড়ে একের পর এক সঙ্কট এসেছে— কোভিড-১৯ অতিমারি, ইউক্রেনের যুদ্ধ, গাজ়ায় সংঘর্ষ। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় ইজ়রায়েল ও আমেরিকা ইরানকে আক্রমণ করায় যে নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা বিশ্বব্যাপী সঙ্কটকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমরা এক বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বাস করি। তাই এই সঙ্কটের প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। তেলের দাম বাড়ছে, গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, এবং খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। সব দেশই এই অভিঘাতে আক্রান্ত। যে দেশগুলি এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হতে পারে, সে তালিকায় বেশ উপরের দিকেই ভারতের নাম রয়েছে। রান্নার গ্যাসের ঘাটতি ইতিমধ্যেই গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে; এবং ভারতীয় টাকার দামও দ্রুত পতনের মুখে পড়েছে। বস্তুত, বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলির মধ্যে ভারতীয় টাকার দামই সবচেয়ে বেশি কমেছে।

এই পরিস্থিতির জন্য ভারতের সরাসরি দায় নেই ঠিকই, কারণ সমস্যার সূত্রপাত দেশের বাইরে। তবুও প্রশ্ন উঠছে— ভারতকে এতটা দুর্বল দেখাচ্ছে কেন? সংক্ষেপে যদি বলতে হয়, তা হলে বলব— ভারতের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত, কিন্তু নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুতর ত্রুটি রয়েছে।

এই ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে আমি সপ্তাহছয়েকের জন্য ভারতে ছিলাম। সত্যি বলতে, এই কয়েক দিনে যা দেখলাম, তাতে ভারত সম্বন্ধে বেশ আশাবাদী হয়েছিলাম। এ দফায় আমি দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম বিভিন্ন কারণে— বহু বছর পর ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে এতখানি সময় কাটালাম। পুণেয় পাহাড়ের উপরে এক সুন্দর ক্যাম্পাসে কনফারেন্স দিয়ে এই সফরের সূচনা হয়েছিল; শেষ হল দিল্লিতে ‘মনমোহন সিংহ স্মারক বক্তৃতা’ দিয়ে।

মাঝখানে বেশ কয়েক দিন কলকাতায় ছিলাম। এই শহরে জন্মানো ও লেখাপড়া করা বহু অর্থনীতিবিদই প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। আমি নই। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আমি যখন কলেজের দোরগোড়ায় পৌঁছলাম, তখন নকশাল আন্দোলন তুঙ্গে— কলকাতার কলেজগুলিতে প্রবল অস্থিরতা চলছিল। বাবা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমাকে দিল্লিতে পাঠিয়ে দিলেন— আমার কলেজজীবন দিল্লিতেই কেটেছে। তবুও প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রতি আমার এক বিশেষ আবেগ রয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায় থেকে অমর্ত্য সেন— দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কত বিশ্বমানের মেধা এই কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন, ভাবলেও বিস্মিত হতে হয়। এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বের যে কোনও সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনীয়। এই জানুয়ারিতে আমি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা দিলাম— সেই ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে দাঁড়িয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

কলকাতা থেকে পুরুলিয়ায় গিয়েছিলাম, সেখানকার এক ইস্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে খানিক সময় কাটাতে। এটা এখন আমার বাৎসরিক ক্যালেন্ডারের অঙ্গ। এ বছর ‘ডিসকভার দ্য ওয়ার্ল্ড অব ইকনমিক্স’ নামে এক সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচিতে মহান মহারাজ, প্রভাত পট্টনায়কের মতো বিশিষ্ট জনেদের বক্তৃতা শুনতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীরা এসেছিল। জনজাতি-অধ্যুষিত গ্রামীণ এলাকার সেই স্কুলে স্থানীয় গ্রামের ছাত্ররা বড় শহরের ছাত্রদের পাশাপাশি বসে অর্থনীতি, রাজনীতি ও জ্যামিতি নিয়ে আলোচনা করছে— এই দৃশ্যের সাক্ষী থাকলে আশাবাদী না-হয়ে উপায় কী?

এই সমস্ত জায়গায় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের আন্তরিকতা এবং বৌদ্ধিক উজ্জ্বলতা প্রত্যক্ষ করা— যা স্বাধীনতার পর থেকে উচ্চশিক্ষায় ভারতের বিনিয়োগের ফল— আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ভারতের মানবসম্পদ বিপুল এবং তার শক্তিও অপরিসীম, বহুস্তরীয়।

তবে স্বীকার করতেই হবে যে, এই আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। সরকারের নীতি এবং ভারতের অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতির দিকে তাকালে দুশ্চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। আমি সাম্প্রতিক যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতির অবস্থা সম্বন্ধে কথাটি বলছি না— উদ্বেগের কারণ তার আগে থেকেই স্পষ্ট। স্লোগানকে প্রাধান্য দিয়ে বাস্তব নীতিকে উপেক্ষা করার ফলে অর্থনীতির গভীর ক্ষতি হচ্ছে। যে পরিসংখ্যান ও গবেষণার ক্ষেত্রে ভারত এক সময় গোটা দুনিয়ায় একেবারে প্রথম সারিতে ছিল, এখন তার জায়গা নিচ্ছে স্লোগান। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের অগ্রগণ্য কাজ, এবং ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারত পরিসংখ্যান গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহে গোটা দুনিয়ার নজর কেড়েছিল— অর্থব্যবস্থা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ-গবেষণায় হয়ে উঠেছিল এক অনুসরণযোগ্য মডেল। গত দশ-বারো বছরে আমরা সেই সম্মানের জায়গা থেকে চ্যুত হয়েছি।

এখন সব আগ্রহ যেন গ্রোস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট (জিডিপি) বা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে কেন্দ্র করে। জিডিপি দেশের মানুষের মোট আয়ের পরিমাপ— কিন্তু সেই আয় কী ভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা সম্পর্কে কোনও ধারণা দেয় না। কয়েকটি পরিবারের হাতে বিপুল আয় থাকলেও জিডিপি বাড়তে পারে, অথচ বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র ও বেকারত্বে ভুগতে পারেন। বস্তুত, ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি অনেকটা সে ধরনেরই। তাই, যখন দেখি যে, নেতারা শুধু জিডিপির কথা বলেন, অথচ মানুষের মাথাপিছু আয়, যুবদের মধ্যে বেকারত্বের হার, বা জনসংখ্যার নীচের দিকের ৫০ শতাংশের জীবনযাত্রার মানের প্রসঙ্গ তাঁদের বক্তৃতায় বা আলোচনায় আসেই না, তখন খুব একটা অবাক হই না। ভারতের প্রকৃত অবস্থা কী রকম, তা বুঝতে একটি সরল পরিসংখ্যানই যথেষ্ট— দেশে যুব-বেকারত্বের হার ১৫.৬%, যা উদ্বেগজনক ভাবে চড়া। বিপদ যে সম্ভবত গভীরতর, তার ইঙ্গিত মিলল অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যন, অভিষেক আনন্দ ও জশ ফেলম্যানের একটি সাম্প্রতিক গবেষণার ফলে। প্রসঙ্গত, সুব্রহ্মণ্যন বিজেপি আমলেই ভারতের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁদের গবেষণা-প্রবন্ধ বলছে যে, ২০১২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার সরকার সম্ভবত বছরে ১.৫ থেকে ২ শতাংশ-বিন্দু বাড়িয়ে দেখিয়েছে।

আরও একটি বিষয় নিয়ে আমি গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন বোধ করি। বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে ভারত তার স্বাধীনতা হারাচ্ছে। এক সময় বিশ্বরাজনীতিতে স্বাধীন অবস্থানের জন্য পরিচিত ভারত সাম্প্রতিক কালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে সঙ্গতি রেখে চলেছে। তা ছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে প্রচার করেছেন। এতে ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঐতিহাসিক ভাবে ভারত তার স্বাধীন অবস্থানের জন্যই পরিচিত ছিল। ১২০টি দেশের আন্তর্জাতিক জোট-মঞ্চ নন-অ্যালাইনমেন্ট মুভমেন্ট বা জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনে ভারত নেতৃত্ব দিয়েছে। দরিদ্র দেশ হয়েও তার বৌদ্ধিক শক্তি ও স্বাধীন অবস্থান তাকে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছিল। আজ বিশ্ব জুড়ে অস্থিরতার মধ্যে ভারতের সেই শক্তিশালী কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক পরিসরে অনেকটাই ম্লান। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন বিশ্বমঞ্চে ভারতের মর্যাদা কমিয়েছে।

ভারতে উচ্চশিক্ষার অবস্থা এখন যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। এই ক্ষেত্রে ভারত এক সময় গোটা দুনিয়ায় আলাদা করে চোখে পড়ত। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত আইআইটি, দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্স এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিশ্বমানের শিক্ষা প্রদান করত; বিশ্বখ্যাত গবেষকরা সেখানে কাজ করতেন, প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে নিয়মিত উচ্চ মানের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হত। আমেরিকা ও ইউরোপের বাইরে এই ধরনের সাফল্যের উদাহরণ খুবই কম ছিল। আজও গোটা দুনিয়ায় বৃহদায়তন কর্পোরেট সংস্থার শীর্ষপদে, বা প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অধ্যাপক হিসাবে যত ভারতীয় কর্মরত, তা উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে ভারতের এই জোরের প্রমাণ। এই লেখার শুরুতে দেশের কয়েকটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার যে চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা বলেছি, তা-ও ভারতের সেই প্রাথমিক সাফল্যেরই প্রতিফলন। কিন্তু গত ৭৫ বছরের অর্জনকে অস্বীকার করে বর্তমান সরকার দেশের ক্ষতি করছে।

ভারতের নবজাগরণের ঐতিহ্যই তাকে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে বিশ্বনেতা করে তুলেছিল। কলকাতার ইতিহাসেই তার প্রতিফলন দেখা যায়। এই শহর দেশের নানা প্রান্তের মানুষকে স্বাগত জানিয়েছে— বাঙালির পাশাপাশি রয়েছেন, মারোয়াড়ি, পারসিরাও; আছেন সব ধর্মের মানুষ—হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান। এই উন্মুক্ততার ফলেই শহরটির উত্থান।

আমি আন্তরিক ভাবে আশা করি যে, একদা যে উচ্চ আদর্শ ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এক বিশেষ আসন দিয়েছিল, ভারতের অতি সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি সম্মান ও শক্তির অধিকারী করেছিল, ভারত তার সেই উচ্চ আদর্শগুলিকে ধরে রাখতে পারবে। ক্ষুদ্র রাজনীতির স্বার্থে আমরা যেন সেই বিপুল ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করি। যেন সেই ভিত্তির উপরেই নির্মিত হয় দেশের ভবিষ্যৎ উন্নতির ধাপ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

america GDP Russia-Ukraine Conflict

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy