E-Paper

যত পাল্টায়, তত একই থাকে

ক্ষমতা বদল আর ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে সবচেয়ে মজার বিষয় হল, দলীয় রং-নির্বিশেষে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে বেশ খানিকটা সাদৃশ্য।

বিশ্বজিৎ মণ্ডল

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪৬

রাজ্যের নির্বাচনে এ বার যাঁরা প্রার্থী, তাঁদের মধ্যে কত জন কত বার দল বদলে বর্তমান দলে পৌঁছেছেন, হিসাব কষা মুশকিল। সাম্প্রতিক অতীতে বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর যে দলবদলের প্রবণতা দেখা গিয়েছে— দুর্জনে বলবে, নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে— পশ্চিমবঙ্গেও ফলপ্রকাশের পরে তা ঘটবে না, সে দাবিও করা মুশকিল। দলবদলের নৈতিকতা বা তার অভাব নিয়ে প্রশ্ন করাই যায়। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল, জনগণ কি কখনও আপত্তি করেছে নেতাদের এই জার্সি পাল্টানোয়? বলেছে, এক আদর্শের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ উল্টো আদর্শে চলে যান যে নেতা, তাঁকে বিশ্বাস করব কী করে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা। দলবদলের এই প্রবণতাকে আমরা নিতান্ত স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি, পাল্টে যাওয়া এই কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছি। অতি সম্প্রতি এক তথাকথিত সরব এবং সমাজসচেতন তরুণ রাজনীতিকের সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে সরাসরি আদর্শগত ভাবে বিপ্রতীপ অবস্থানের দলে যোগ দেওয়ার পরও আমরা ভাবিনি, দলে কোণঠাসা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কী ভাবে পাল্টে যেতে পারে আদর্শগত আনুগত্যও।

ক্ষমতা বদল আর ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে সবচেয়ে মজার বিষয় হল, দলীয় রং-নির্বিশেষে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে বেশ খানিকটা সাদৃশ্য। অর্থাৎ, ক্ষমতার লড়াইয়ে যিনিই জয়লাভ করুন না কেন, পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্য বোধ হয় বিশেষ পাল্টাবে না।

রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দলের কর্মদক্ষতা ও অবদান ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে আমরা অনেক ক্ষেত্রে পাশের রাজ্য বা দেশে ক্ষমতায় থাকা দলের ইতিহাস দেখে কিছুটা আন্দাজ করার চেষ্টা করি। কিন্তু বিষয়টি একেবারেই সরলরৈখিক নয়। এবং, সেটা অস্বাভাবিকও নয়। রাজ্যভেদে, মানুষের চাহিদার চরিত্র অনুসারে দলগুলি নিজেদের অবস্থানকে ঢেলে সেজে নেয়। তবুও খটকা লাগে। কারণ, ন্যূনতম কিছু আদর্শগত সঙ্গতি স্থানভেদেও থাকা উচিত। সেটিই আসলে একটি দলের মৌলিক পার্থক্যকে বুঝিয়ে দেয়। এমনটাই হয়ে এসেছে এ যাবৎ কাল। বিভিন্ন দলকে আমরা রাজনীতির বিভিন্ন বিপ্রতীপ অক্ষে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম— বামপন্থী-দক্ষিণপন্থী, উদ্যোগপতি-চাকরিজীবী ভিত্তিক, বাজারপন্থী-রাষ্ট্রপন্থী প্রভৃতি। আজকাল এই পার্থক্যটি ক্রমশ বিলীয়মান। কারণ, গণচাহিদা আর নীতির পরোয়া করে না। শুধুই স্বল্পকালে ব্যক্তিগত পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব রাখে। সেই কারণেই নীতিভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো মোটের উপরে বিসর্জন দিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের জন্য বিভিন্ন দল নিজেকে খানিক আঞ্চলিক চাহিদানির্ভর এবং চাহিদাচালিত রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করেছে। তাই এক রাজ্যের ভাল-র উদাহরণ যেমন অন্যত্র চালিয়ে দেওয়া যায় না, তেমনই চলে না জুজুও।

এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী লড়াই ক্রমশ সঙ্কীর্ণ হতে হতে প্রায় এমন এক কানা গলিতে এসে দিগ্‌ভ্রষ্টের মতো মুখ থুবড়ে পড়েছে, যেখানে লড়াইটা আর সরকারের কাছ থেকে জনগণের প্রাপ্য বনাম সরকারি দাক্ষিণ্যের নয়, বরং সব দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি জুড়ে জ্বলজ্বল করছে সরকারি দাক্ষিণ্য বনাম আরও বেশি দাক্ষিণ্য। অপর পক্ষে, আলোচনার টেবিল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো, পরিবহণ, লিঙ্গসমতা, সুরক্ষার মতো অধিকারের প্রশ্নগুলি। এতে শুধু প্রশ্নগুলি আড়ালে চলে যায় না, নষ্ট হয়ে যায় জনগণের ভাবনা থেকে অধিকারবোধ। ক্রমশ বিলুপ্ত হতে থাকে অধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্ন করার পরিবেশ ও স্পর্ধা। মোটা দাগের হিসাবে ভাল কিছু করার আকাঙ্ক্ষার কলকব্জাগুলোয় উত্তরোত্তর জং ধরতে থাকে। মাসিক ভাতার ঠেলায় আমরা ভুলে যাই যে, সরকারি দায়িত্বে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের জায়গা নেওয়া উচিত ছিল আধুনিক প্লেসমেন্ট সেলের; দেওয়া-নেওয়ার তাৎক্ষণিকতার পরিবর্তে থাকা উচিত ছিল একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনাভিত্তিক সমাজ-অর্থনীতি। সব মিলিয়ে একটি জাতি হিসাবে সার্বিক ভাবে আমরা সবাই গভীর আকাঙ্ক্ষাহীনতার শিকার। এবং, এর দীর্ঘকালীন ফল হল অনুন্নয়ন এবং অধিকতর অনুন্নয়ন।

নির্বাচনী ইস্তাহারের প্রতিশ্রুতি যদি সবার ক্ষেত্রেই কম-বেশি অভিন্ন হয়; আলাদা ভাবে রাজনৈতিক দলভিত্তিক কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শের বালাই না থাকে; তখন স্বভাবতই ভোটের রাজনীতিও এক ধরনের স্বাভাবিক জীবিকা। সে ক্ষেত্রে নেতাদের দল বদলানো নিয়ে আমাদের মতো অধিকার-অসচেতন জনগণের চেঁচামেচির যৌক্তিকতা কোথায়? এই অসচেতন জনগোষ্ঠী নিজেদের চাওয়াকে সংজ্ঞায়িত করতে পারেনি বলেই পরোক্ষ ভাবে নিজেদের পাওয়ার হিসাবটুকু পুরোটাই গুলিয়ে ফেলেছে। এই সার্বিক দোলাচলে বিশ্বাস, আশা-আকাঙ্ক্ষার খতিয়ান প্রতিস্থাপিত হয়েছে ভরসাহীনতার এক অন্যায্য প্রতিযোগিতার দ্বারা। আর আমরা মাথা কুটছি কম নিকৃষ্টের সন্ধানে।

অবশ্য, মানুষ যেখানে জানেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, পাল্টাবে না কিছুই— সেখানে কি দু’দলের মধ্যে চাল-কাঁকর বাছার আদৌ কোনও প্রয়োজন থাকে? তবুও ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন শুধু উন্নয়নের জন্য নির্বাচন নয়, নিজেদের অধিকারসচেতন, চিন্তাশীল, প্রতিবাদী রাজ্যবাসী হিসাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার নির্বাচনও বটে।

অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বিশ্বভারতী

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy