সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের এক সাংসদের প্রশ্নের উত্তরে ভারত সরকারের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রক জানিয়েছে, ১৯০৯ থেকে ১৯৩৮ সময়কালে আন্দামান সেলুলার জেলে যে ৫৮৫ জন স্বাধীনতা-বিপ্লবীকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ৩৯৮ জন অবিভক্ত বাংলার। ওই সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বাঙালি বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের নামে জেলটির নামকরণ করার দাবি পেশ করেছেন।
এর থেকে কয়েক কদম এগিয়ে, আলিপুর বোমা ষড়যন্ত্র মামলায় যে ১২ জন বাঙালি বিপ্লবীকে দ্বীপান্তর দণ্ড দিয়ে সেলুলার জেলে পাঠানো হয়েছিল, সেই প্রথম দলের বিপ্লবীদের প্রত্যেকের নামে জেল-কুঠুরি চিহ্নিত করার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এবং আন্দামান প্রশাসনকে চিঠি লিখেছে কলকাতার একটি রিসার্চ গ্রুপ, উল্লাসকর দত্ত অ্যাকাডেমি। (দ্য টেলিগ্রাফ, ১১/১)
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনকারীদের মূল হাতিয়ার যখন পিস্তল, রিভলভার, বঙ্গদেশের কতিপয় তরুণ, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে সেই আন্দোলনে আর একটি হাতিয়ার যোগ করেন— বোমা। তখন বঙ্গদেশে বোমা তৈরির দুই প্রধান মুখ— উল্লাসকর দত্ত আর হেমচন্দ্র দাস।
ভাল করে বোমা তৈরি আর গুপ্ত সমিতি চালানোর কাজ শিখতে, ১৯০৬-এর দ্বিতীয়ার্ধে নিজের সম্পত্তির একাংশ বিক্রি করে সুইৎজ়ারল্যান্ড প্যারিস ঘুরে লন্ডন গেলেন হেমচন্দ্র। কিন্তু সেখানেও সুবিধে না-হওয়াতে আবার প্যারিস। এই বার ঠিকঠাক দলের সন্ধান পাওয়া গেল। ওইখানে যাঁদের তত্ত্বাবধানে বোমা তৈরির কাজ শেখেন, তাঁদের প্রধানতম সদস্য এক রাশিয়ান, নিকোলাস সাফ্রানস্কি।
হেমচন্দ্রের অনুপস্থিতিতে বাংলার বিপ্লবীদের হাতে বোমা তুলে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন উল্লাসকর দত্ত। উল্লাসকর স্ব-শিক্ষিত বোমা বিশারদ। শিবপুরে সিভিল এঞ্জিনিয়ারিং কলেজের লাইব্রেরি থেকে বিস্ফোরক তৈরির নানান বই ঘেঁটে তিনি বানিয়ে ফেললেন পিকরিক অ্যাসিডের বিধ্বংসী বোমা আর নাইট্রোগ্লিসারিন ভিত্তিক ডাইনামাইট। সঙ্গীদের জানালেন ট্রেন উড়িয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী মাইন প্রস্তুত করতে তিনি সক্ষম। উত্তর কলকাতার গোয়াবাগানে বানানো উল্লাসকরের মাইন পোঁতা হল খড়্গপুরের কাছে নারায়ণগড়ে। উদ্দেশ্য, ছোটলাটকে খতম। ৫ ডিসেম্বর সন্ধেবেলায় ট্রেন এল যথাসময়ে, বিস্ফোরণ হল প্রচণ্ড, কিন্তু অবিশ্বাস্য ভাবে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হল না, ছোটলাট বেঁচে গেলেন।
প্যারিস থেকে দেশে ফেরার পরে, হেমচন্দ্র দাস উল্লাসকরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুরু করলেন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড। হেমচন্দ্র থাকেন ৩৮/৪ রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিটের বাড়িতে, তিনি ওইখানে বোমা বানান। অন্য দিকে, ১৫ গোপীমোহন দত্ত লেন ও ৩২ মুরারিপুকুরের বোমা বানানোর দায়িত্ব উল্লাসকরের। দেশে ফিরে হেমচন্দ্র যে দু’-তিনটি বোমা বানিয়েছেন, তা আজ ইতিহাস হয়ে গেছে; যার একটি বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ১৯০৮ রাত সাড়ে আটটায় ক্ষুদিরাম বসুর ছোড়া বোমা। ডগলাস কিংসফোর্ড ভেবে ক্ষুদিরাম যে গাড়ির উদ্দেশ্যে ছুড়েছিলেন, তাতে উনি ছিলেন না। বোমার অভিঘাতে দুই ইংরেজ মহিলা মারা যান। ঘোড়ার গাড়িটি ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোচম্যান কালীরাম আহত, সহিস সঙ্গতরাম দুসাদ গুরুতর জখম হয়ে ছিটকে পড়েন।
এই সূত্রেই, ১৯০৮-এর ২ মে, মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি-সহ কলকাতার বিভিন্ন বাড়িতে হানা দিয়ে মোট ৩৪ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শুরু হয় বিখ্যাত আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা। শেষ পর্যন্ত, ১৯০৯ সালে উল্লাসকর দত্ত, হেমচন্দ্র দাস, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ সরকার, বীরেন্দ্র সেন, হৃষীকেশ কাঞ্জিলাল, ইন্দুভূষণ রায়, সুধীর সরকার, পরেশ মৌলিক, ইন্দ্রনাথ নন্দী, অবিনাশ ভট্টাচার্য প্রমুখ ১২ জন বিপ্লবীর দ্বীপান্তর দণ্ড হয়।
যে বোমার দর্শন চালু করেছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবীরা, তা রয়ে গেল। পরবর্তী কালে, মুন্সিগঞ্জ, ডালহৌসি স্কোয়্যার, মৌলভীবাজার ইত্যাদি দশটি গুরুত্বপূর্ণ বোমার মামলা হয়েছে। সশস্ত্র আন্দোলন মরল না, বাঘা যতীন করলেন বুড়িবালামের যুদ্ধ, তার পর সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিদ্রোহ।
আন্দামানে যাওয়া বিপ্লবীরা শুধু বোমার কথা বলেননি, তাঁরা অত্যাচারী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে পাল্টা হিংসার দর্শন এনেছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে। জাতিকে জেগে ওঠার সাহস জোগাতে চেয়েছিলেন। ওই পথেই তো সৈন্যবাহিনীতে বিদ্রোহের শুরু। যা ১৯৪৬-এ হয়ে দাঁড়াল নৌবিদ্রোহ। ক্লিমেন্স রিচার্ড অ্যাটলি, ব্রিটেনের যিনি মুখ্যমন্ত্রী পদে ছিলেন, ভারতবর্ষকে স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দানের সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেন, তিনি তো ১৯৫৬ সালে কলকাতার রাজভবনে বসে তদানীন্তন রাজ্যপাল ফণিভূষণ চক্রবর্তীকে স্পষ্ট করে বলে গিয়েছেন, এই বিদ্রোহগুলিই তাঁদের ভারত ছাড়ার প্রধান কারণ। অর্থাৎ উল্লাসকর-হেমচন্দ্রদের দেখানো বিপ্লবের পথেই স্বাধীনতা এসেছে।
আলিপুর-মামলার বিপ্লবীদের তথা উল্লাসকর-হেমচন্দ্র’সহ সেলুলার জেলের বন্দিদের উপর যে কী রকম অত্যাচার হত, তা ওই জেল যাঁরা ভ্রমণ করেছেন, আন্দাজ পাবেন, অথবা যাঁরা জেল-ফেরত বিপ্লবীদের স্মৃতিকথনগুলি পড়েছেন, তাঁরাও কিছুটা অনুভব করবেন। এমনই অত্যাচারের মাত্রা যে, বন্দি উপেন্দ্রনাথের মনে হত, ‘গলায় একগাছা দড়ি লাগাইয়া না হয় ঝুলিয়া পড়ি’; অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ইন্দুভূষণ রায় আত্মহত্যা করেন, উল্লাসকরের মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটে। বিকৃতি সারানোর নামে তাঁকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়।
উল্লাসকরের বাবা, শিবপুরের সিভিল এঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কৃষিপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক দ্বিজদাস দত্ত ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯১২ সালে ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিবকে লিখছেন—
“আমার ছেলে উল্লাসকর, পোর্ট ব্লেয়ারে, কয়েদি নম্বর ৩১৫৫২, যে উন্মাদ হয়ে গেছে, এ খবর পেয়ে আমি গভীর ভাবে মর্মাহত। উন্মাদ হলেও সন্তানের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে তার বাবা-মা’র দুশ্চিন্তা থাকবেই। অনুগ্রহ করে এমন ব্যবস্থা করবেন কি, যাতে আমি বা উল্লাসকরের মা যখনই তার স্বাস্থ্যের খবর জানতে চাইব, তখনই আমাদের সেই প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়া হয়। আপনি যদি দয়া করে নিচের বিষয়গুলি সম্পর্কে আমাদের একটু আলোকপাত করেন, তাহলে আমার এবং উল্লাসকরের মা দু’জনেরই খুব স্বস্তি হবে—
১. কতদিন হল উল্লাসকর উন্মাদ অবস্থায়?২. তার উন্মাদ হয়ে যাওয়ার কোনও নির্দিষ্ট কারণ কি জানা গেছে? জানা গেলে, তা কী? ৩. উন্মাদ রোগের আক্রমণের আগে কী ধরনের পূর্বলক্ষণ দেখা গিয়েছিল? ৪. রোগ সারানোর জন্য এখন কী ধরনের চিকিৎসা-পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে? ৫. উল্লাসকর একজন দক্ষ গায়ক এবং ধর্মীয়, ভক্তিমূলক সঙ্গীত খুবই পছন্দ করত। গানের— কণ্ঠসঙ্গীত বা যন্ত্রসঙ্গীত— নিরাময়কারী প্রভাব কি তার ওপর কখনও প্রয়োগ করা হয়েছে, বা এখন করার কোনও পরিকল্পনা আছে? ৬. তার কী ধরনের আচরণ দেখে মনে হয় সে উন্মাদ? ৭. সাধারণভাবে এখন তার স্বাস্থ্যের অবস্থা কেমন? এই ভাবে আপনাকে বিব্রত করবার জন্য আশা করি ক্ষমা করবেন।”
যার জন্য এমন হৃদয়-বিদারক চিঠি লিখতে হয় এক যন্ত্রণাক্লিষ্ট বাবাকে, সেই স্বাধীনতাযোদ্ধা উল্লাসকর আর তাঁর সহযোদ্ধা এগারো জন বাঙালি বীরের স্মৃতিরক্ষার আয়োজন আলাদা করে থাকবে না আন্দামান সেলুলার জেলে? তার বদলে ফক্কিকারি করে স্বাধীনতা যোদ্ধার সম্মান পেতে থাকবে কিছু প্রচারসর্বস্ব মুখ?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)