E-Paper

আগুন যে ভাবে ছড়ায়

যুদ্ধ যেহেতু নানা ভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার প্রভাব যেহেতু ভৌগোলিক সীমানার পরোয়া করে না, তাই উদ্বেগ কেবলমাত্র প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ে নয়; বরং, সেই সংঘাতের বৈশ্বিক বিস্তার নিয়েই আশঙ্কা অধিকতর।

পুনর্জিৎ রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৬:০০

ইতিহাসকে সাক্ষী মানলে বলতে হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো— হঠাৎ, এবং প্রবল ভাবে। প্রায় সব সময়ই সেই যুদ্ধেরআগুনে ঝলসে যায় এমন বহু দেশ এবং অসংখ্য মানুষ, যাঁরা কোনও মতেই যুদ্ধের প্রাথমিক শরিক নন। এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ: গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানকে কেন্দ্র করে চলা সঙ্কট। প্রথমে যা কেবল আমেরিকা, ইজ়রায়েল এবং ইরানের মধ্যেকার সংঘাত বলে মনে হয়েছিল, তা ইতিমধ্যেই চিন, রাশিয়া, ভারত, পশ্চিম এশিয়া এবং ইউরোপের বহু দেশকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে জড়িয়ে ফেলেছে। এর মধ্যে কিছু দেশে ইরান-সমর্থিত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা যেমন বেড়ে গিয়েছে, তেমনই কিছু দেশ এই সংঘাতে ইতিমধ্যেই আক্রান্ত হয়ে কিংবা ভবিষ্যতে আক্রান্ত হতে পারে বলে তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশল নতুন করে নির্ধারণ করছে। কোনও কোনও দেশ আবার আপাতত শুধুমাত্র কূটনৈতিক ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দীর্ঘ দিন ধরে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে আসছেন যে, কেন সংঘাতের আগুন এ ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গেম থিয়োরি বা দ্বন্দ্বতত্ত্ব থেকে একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সেখানে যুদ্ধকে ধরা হয় বিভিন্ন স্বার্থসম্পন্ন পক্ষের মধ্যে কৌশলগত মিথস্ক্রিয়ার ফল হিসাবে। অনেক মডেলে যুদ্ধকে দেখা হয় দর-কষাকষির ব্যর্থতা হিসাবে। সাধারণ বুদ্ধি বলে, যুদ্ধের বিপুল খরচ এড়াতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত সমস্ত রাষ্ট্রের। কিন্তু অনিশ্চয়তা, অবিশ্বাস অথবা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সেই সমঝোতাকে ব্যাহত করে। এক বার কোনও দু’টি দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে তা বিশ্বের অন্য দেশগুলির কাছে নানা সাঙ্কেতিক বার্তা পাঠায়। যুদ্ধ দেখিয়ে দেয় কার সামরিক সক্ষমতা কতটা, কার রাজনৈতিক দৃঢ়তা কতটা, এবং কার কোথায় কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে। অন্য রাষ্ট্র ও গোষ্ঠী এই বার্তাগুলি পাঠ করে এবং নিজেদের প্রত্যাশা ও কৌশল নতুন করে নির্ধারণ করে। ফলে একটি স্থানীয় যুদ্ধ দ্রুত একটি বৃহত্তর কৌশলগত গেম-এ পরিণত হয়।

প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির ভূমিকা এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র বলতে বোঝায় তাদের, যারা ক্ষমতা, প্রভাব বা ভূখণ্ডের অধিকারের জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, বা যাদের প্রতিস্পর্ধী ভূরাজনৈতিক স্বার্থ আছে। যখন কোনও রাষ্ট্র বা আঞ্চলিক শক্তি একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলির চোখে সেই যুদ্ধের মুহূর্তটি যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া রাষ্ট্রের পক্ষে দুর্বলতার মুহূর্ত হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। তার কারণ, যুদ্ধপরিস্থিতিতে দেশের সামরিক সম্পদ যুদ্ধে নিয়োজিত থাকে, রাজনৈতিক মনোযোগ বিভক্ত হয়ে যায় এবং নানা আর্থসামাজিক ফাটল দেখা দেয় দেশের অভ্যন্তরীণ পরিসরে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি সেই দেশকে নানা ভাবে চাপে ফেলতে পারে— নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে; অথবা এমন পদক্ষেপ করে, আগে যে ধরনের পদক্ষেপ করার সাহস তারা পেত না। একই সঙ্গে, মিত্র রাষ্ট্রগুলি যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত রাষ্ট্রটিকে সমর্থন দিতে এগিয়ে আসতে পারে— এই আশঙ্কা থেকে যে, যুদ্ধে পরাজয় হলে অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে। ফলে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকে— দু’পক্ষের সংঘাতে যুক্ত হয়ে পড়ে আরও নানা পক্ষ।

রাষ্ট্র-বহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি অনেক সময়ই এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যখন বড় কোনও সংঘাত শুরু হয়, তখন তারা নিজেদের মতাদর্শগত লক্ষ্য এগিয়ে নিতে বা তাদের পৃষ্ঠপোষকদের প্রতি আনুগত্য দেখাতে নিজেদের কার্যকলাপ বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হয়। এই গোষ্ঠীগুলি রাষ্ট্রীয় মদতপ্রাপ্ত হতেই পারে— কিন্তু, যে রাষ্ট্র তাদের মদত দেয়, তাদেরও এই গোষ্ঠীর কার্যকলাপের উপরে সব সময় সম্পূর্ণ বা প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে তাদের কর্মকাণ্ড নতুন নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এবং মিত্র রাষ্ট্রের যুদ্ধে যুক্ত হয়ে পড়া কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সক্রিয় হয়ে ওঠা— এই সব প্রক্রিয়াই এক ধরনের ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে অভিহিত করেন কনফ্লিক্ট ডিফিউশন বা সংঘাতের বিস্তার হিসাবে। এর কারণ একটাই— যুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন দেশের সংঘাতে জড়ানোর ইনসেনটিভ বা প্রণোদনা কৌশলগত ভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

যুদ্ধে ছড়িয়ে পড়ার আর একটি প্রক্রিয়া হল সিকিয়োরিটি ডাইলেমা বা নিরাপত্তা সঙ্কট। যখন একটি দেশ তার সামরিক প্রস্তুতি বাড়ায়— তা আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্যে হোক, বা আত্মরক্ষার জন্য— অন্য দেশগুলি সেটিকে হুমকি হিসাবে দেখতে পারে (রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর সময় সীমান্তে রাশিয়ার কার্যকলাপের কথা ভাবুন)। তখন তারাও নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে শুরু করে। এতে প্রথম দেশটির উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়, এবং সে আরও প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ভয়ের ফলে তৈরি হয় এক উত্তেজনাপূর্ণ বিষচক্র— যেখানে হয়তো গোড়ায় কোনও পক্ষই যুদ্ধ চাইছিল না, সেখানেও পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়। একটি যুদ্ধ শুরু হলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা, নতুন জোট গঠন এবং কৌশলগত সঙ্কেত পাঠানোর প্রবণতা বাড়ে। প্রতিটি পক্ষই একটি অনিশ্চিত পরিবেশে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত করতে চায়। এই পরিস্থিতিতে যে সংঘাতগুলো আগে সুপ্ত অবস্থায় ছিল, সেগুলিও দ্রুত জেগে উঠতে পারে।

ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় আমেরিকা এবং সোভিয়েট ইউনিয়ন খুব কম ক্ষেত্রেই সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছিল। কিন্তু তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক প্রক্সি ওয়ার বা ছায়া যুদ্ধের জন্ম দেয়— কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে। ভূরাজনীতির গতি বিচিত্র— ঠান্ডা যুদ্ধের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই মহাশক্তির মধ্যে কৌশলগত স্থিতাবস্থা অন্যত্র অস্থিরতার জন্ম দিয়েছিল। সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি এবং ব্যয় অত্যন্ত বেশি, ফলে তারা তুলনামূলক ভাবে ছোট যুদ্ধে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে থাকে। এই ঘটনাকে অনেক গবেষক ‘স্টেবিলিটি-ইনস্টেবিলিটি প্যারাডক্স’ বলে ব্যাখ্যা করেন। ফলে অনেক সময় যে একাধিক যুদ্ধ আমরা আলাদা আলাদা ঘটনা হিসাবে দেখি, সেগুলি আসলে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছায়াও হতে পারে।

তবে শুধু বৃহৎ শক্তি নয়, আঞ্চলিক শক্তিগুলিও অনেক সময় সরাসরি যুদ্ধ না করে ছায়া যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতির উদাহরণই দেখা যেতে পারে। ইরান ও সৌদি আরব খুব কমই সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, কিন্তু ইয়েমেন ও সিরিয়ার মতো সংঘাতে তারা বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিয়ে পরোক্ষ ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ইরান ও ইজ়রায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও প্রায়শই লেবানন বা সিরিয়ার মতো জায়গায় ছায়া যুদ্ধের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাতও সংঘাতের বিস্তারকে প্রভাবিত করতে পারে। আধুনিক বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় প্রতিটি দেশই একে অপরের সঙ্গে গভীর ভাবে সংযুক্ত। বড় বাণিজ্যপথ, জ্বালানি সরবরাহ বা আর্থিক বাজারে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জোগানশৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটা, এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা এমন দেশগুলিতেও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে, যেগুলি সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয়। ভারতের মতো দেশগুলোর জন্য এই ঘটনাক্রম বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারত অনেক সময় এ সব সংঘাতে সরাসরি যোগ দেয় না, তবু তার অর্থনৈতিক প্রভাব ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থব্যবস্থার উপরে বেশ জোরালো ভাবে পড়ে। ভারতের অর্থনীতি স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ এবং নিরাপদ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের উপরে নির্ভরশীল। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ চলাচলের খরচ বাড়তে পারে, বাণিজ্য প্রবাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব কেবল বৃহৎ অর্থনৈতিক সূচকেই নয়, দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও অনুভূত হয়— পরিবহণের ব্যয়বৃদ্ধি থেকে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া পর্যন্ত।

যুদ্ধ যেহেতু নানা ভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার প্রভাব যেহেতু ভৌগোলিক সীমানার পরোয়া করে না, তাই উদ্বেগ কেবলমাত্র প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ে নয়; বরং, সেই সংঘাতের বৈশ্বিক বিস্তার নিয়েই আশঙ্কা অধিকতর। একটি যুদ্ধকে সীমাবদ্ধ রাখা— নতুন কোনও পক্ষকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখা, বা অন্য অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো— অনেক সময় মূল সংঘাতের সমাধানের থেকেও কঠিন হয়ে পড়ে।

যে পৃথিবীতে এক যুদ্ধ অনেক যুদ্ধের জন্ম দেয়, সেখানে একটি স্ফুলিঙ্গও পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, এ কথা বোঝার জন্য ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

অর্থনীতি বিভাগ, শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

War Crime Conflicts World War

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy