E-Paper

কথা ঠান্ডা করুন

সমস্ত পেশাতেই দেখবেন, নাগরিকের চোখে যে ব্যাপক হিসেব গুরুত্ব পায় সেটার উপর কলম চালিয়ে পেশাদার বিশেষজ্ঞ এক রকম সঙ্কীর্ণ খাজাঞ্চির হিসেব কষেন। সেই পদ্ধতি সাধারণ বুদ্ধির নাগালের বাইরে।

প্রবাল দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৮

রাজায় রাজায় যুদ্ধ, প্রজায় প্রজায় বিবাদ, সব রকম অশান্তির একটাই দাওয়াই বাতলায় লোকে। মাথা ঠান্ডা করে আলোচনায় বসুন। পরস্পরের যুক্তি মন দিয়ে শুনে এমন চুক্তি ছকে ফেলুন যেটা দু’পক্ষই মানবে। রাষ্ট্রীয় ব্যাপার হলে সত্যিকারের দলিলে সইসাবুদ হবে। ব্যক্তিগত অশান্তির বেলায় অলিখিত চুক্তির নিঃশব্দ তর্জনীকে দু’পক্ষই মানতে রাজি হবে, এটাই লক্ষ্য। আলোচনায় যারা বসবে তাদের যদি ‘কথা ঠান্ডা করুন’ বলি, সেটা কি ‘মাথা ঠান্ডা করুন’ পরামর্শেরই রকমফের?

ওই ভাষায় না-বললেও শুভার্থীরা কিন্তু ওই রকম পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাঁরা বলেন, আবেগের স্রোতে ভেসে যেয়ো না। আবেগের ঠোকাঠুকিতে অশান্তিই বাড়বে। নিষ্পত্তি যদি চাও, দু’পক্ষই যুক্তিগ্রাহ্য কথা বলে এ-দিকের যুক্তির সঙ্গে ও-দিকের যুক্তির দূরত্ব যথাসাধ্য কমিয়ে নাও। শেষে দেখবে একটু তফাত তবু রয়ে যাচ্ছে। সেই তফাতটাকে বলে কয়ে মেনেই নিয়ো তোমাদের চুক্তিতে।

শুভাকাঙ্ক্ষীদের সুপরামর্শে উল্লিখিত ওই ‘যুক্তিগ্রাহ্য কথা’ ঠিক কী জিনিস? অশান্তি যখন বাধে, কোনও না কোনও হিসাবের গরমিলের ফলেই বাধে। যুক্তি দেওয়া মানে সেই হিসাবটার দিকেই ফিরে তাকানো। কিন্তু কাণ্ডজ্ঞানের হিসেবের সঙ্গে যে বিশেষজ্ঞদের আখড়ায় শেখা খাজাঞ্চির হিসেব কিছুতেই মেলে না। এই জট ছাড়াবে কে?

এই দেখুন না, বাংলা ক্রিয়াপদের গলি-ঘুঁজি ঘুরে ব্যাকরণবিদ লক্ষ করেছে, দ্রুত লয়ে কথা বলতে গিয়ে লোকে ‘এসেছে’-র সংক্ষিপ্তরূপ ‘এস্‌ছে’ বলে থাকে, কিন্তু ‘কেশেছে, ফেঁসেছে, ভেসেছে, হেসেছে’-কে ভুলেও কখনও ‘কেশ্‌ছে, ফেঁস্‌ছে’ ইত্যাদি বলবে না। খাজাঞ্চিসুলভ হিসেব কষে এই তথ্যের কী বিশ্লেষণ লিখেছে বৈয়াকরণ? লিখেছে, “ক্রিয়াপদের আরম্ভে চন্দ্রবিন্দুবিহীন স্বরধ্বনি থাকলে তবেই বিকল্পে মাঝের ‘এ’-টা বাদ দিতে পারবে।” সাধারণ নাগরিক মাথা চুলকে শুধোবে, “চন্দ্রবিন্দু বা স্বরধ্বনির কথা তুলছ কেন? ‘এসেছে’-র তুলনায় তো ‘কেশেছে, ফেঁসেছে, ভেসেছে, হেসেছে’ প্রত্যেকেই এক-একটি ডুমুরের ফুল। ওদের বিরলতাই এই পার্থক্যের আসল ব্যাখ্যা নয় বুঝি?” জবাবে বৈয়াকরণ গম্ভীর মুখে বলবে, “ব্যাকরণের সূত্রে উপাদানের উল্লেখের তুলনায় রাশিবৈজ্ঞানিক বিবেচনার ওজন বেশি। আমাদের পেশার দস্তুর হল যথাসাধ্য হালকা সরঞ্জাম দিয়ে কাজ করা। বিরলতার উল্লেখ করতে বাধ্য হলে করব। কিন্তু চন্দ্রবিন্দু আর স্বরধ্বনির কথা বলেই কাজ চালাতে যখন পারছি তখন সেটাই বিধেয়।”

এটা স্রেফ আমার পেশার একার সমস্যা নয় মোটেই। সমস্ত পেশাতেই দেখবেন, নাগরিকের চোখে যে ব্যাপক হিসেব গুরুত্ব পায় সেটার উপর কলম চালিয়ে পেশাদার বিশেষজ্ঞ এক রকম সঙ্কীর্ণ খাজাঞ্চির হিসেব কষেন। সেই পদ্ধতি সাধারণ বুদ্ধির নাগালের বাইরে। মানুষের ব্যাপক হিসেবের গুরুত্ব বিশেষজ্ঞেরা মানেন না। কেউ প্রশ্ন করতে এলে তাঁরা টুলো পাণ্ডিত্যের শর্তেই সে প্রশ্নের জবাব দেন।

সে কালের সবুজপত্র পত্রিকার প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রমথ চৌধুরী তাঁর প্রিয় বিশেষ একটা দেশের নাম করে লিখেছিলেন, অমুক দেশের নাগরিক সমাজের আবহের একটা গুণের সঞ্চার আমাদের দেশেও হওয়া দরকার। ওখানে সাধারণ নাগরিকদের বৈঠকখানায় ঢোকার সময় বিশেষজ্ঞদের নিজস্ব পেশায় প্রচলিত খাজাঞ্চির হিসেব আর বিশেষ পরিভাষা দরজার বাইরে রেখে আসতে বলা হয়। সার্বজনিক পরিসরে কাণ্ডজ্ঞান-সংলগ্ন বিবেচনার ভিত্তিতেই কথা বলার শর্ত মেনে চলে সকলেই। শাস্ত্রবিশেষে যারা দীক্ষিত তারা তাদের পেশাদার বিচারপদ্ধতি সবিস্তারে বোঝানোর চেষ্টা করে আসরকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় না।

দেশটার যে নাম করছি না তার কারণ, সেখানেও হাওয়া পাল্টে গেছে বহু দিন আগেই। যদি বা না পাল্টাত, তা হলেও, ভিনদেশের নজির তুলে ধরলে আমাদের আত্মশোধনের কাজ এগোবে কী করে? বিশেষজ্ঞদের কাছে আত্মসমর্পণ করাও যে রকম কাজের কথা নয়, তেমনই আর একটা দেশের সমাজকে আমাদের সমাজের অনুকরণীয় আদর্শ ভেবে তাদের কাছে নতজানু হলেও আমাদের নিজেদের কাজ ঘেঁটে যাবে। তবে হ্যাঁ, যে সব গুণ দেখে সে দিন প্রমথ চৌধুরী মুগ্ধ হয়েছিলেন, সেগুলো নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। সেই সমস্ত গুণ বিশেষ কোনও দেশে কতটা দেখা গিয়েছে বা যায়নি, সে সব কথা বিভিন্ন দেশে যাঁরা বাস করেছেন তাঁদের কাছেই জেনে নেবেন নাহয়। আশু বিবেচ্য হল, বিশেষজ্ঞদের পেশাগত জ্ঞানের সঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিসরের আলোচনার কী সমীকরণ চাইব আমরা।

‘যুক্তিগ্রাহ্য কথা’ ব্যাপারটার দুটো পর্যায় আলাদা করে দেখা ভাল। ব্যাপক বা সাধারণ পর্যায়ের সঙ্গে ক্ষেত্রবিশেষে প্রযোজ্য পর্যায়কে গুলিয়ে ফেললে ছবিটা পরিষ্কার দেখা যায় না।

ব্যাপক অর্থে যুক্তিপ্রয়োগের নিয়ম মেনে চলার দরকারটা সব রকম আলোচনাতেই সমান। যেমন ধরুন, “যাদের খাবারে প্রোটিন কম তারা প্রায়ই বেঁটে হয়; তুমি বেঁটে; অতএব নিশ্চয়ই ছোটবেলায় তুমি কম প্রোটিন খেতে পেয়েছিলে” এই ধরনের বক্তব্যকে ভুল যুক্তি বা কুযুক্তি বলে চিনতে পারা জরুরি। ব্যাপক পর্যায়ে যুক্তিগ্রাহ্য কথা বলার অভ্যেসটা যাতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সর্বত্র ছড়িয়ে যায় তার জন্যে কুযুক্তি প্রয়োগ-সহ বেশ কয়েকটা বদভ্যাস কাটিয়ে উঠতেও হবে, নানাবিধ ভাল অভ্যেস রপ্ত করতেও হবে, ইত্যাদি।

ও-দিকে বিশেষজ্ঞদের যেটা চর্চার বিষয় সেই সব বিদ্যাশাখা-নির্ধারিত যুক্তির নিয়ম বিদ্যা থেকে বিদ্যায় যেতে পাল্টে যায়। ডাক্তারের যুক্তি, উকিলের যুক্তি, গণিতজ্ঞের যুক্তি, সাহিত্যতাত্ত্বিকের যুক্তি, আরও বারোটার এলাকার বারো যুক্তিগুচ্ছের কোনও বারোয়ারি সমন্বয় কী করেই বা হবে। ওই রকম বিশেষজ্ঞ যখন পেশাদার, পোশাকি তর্কবিতর্কের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে অদীক্ষিত পাঠকের বোধগম্য ভাষায় কিন্তু সাধারণ যুক্তির শর্ত মেনে নিজের বিদ্যাশাখার কোনও কোনও জরুরি বক্তব্য খুলে বলেন, একমাত্র তখনই আপনি চিন্তার সেই সব ধারার নাগাল পাবেন। যে সমাজে বিশেষজ্ঞেরা সম্প্রতি উঠে আসা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তাঁদের বিশেষ জ্ঞানের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ লিখে পাঠকসাধারণকে জানাচ্ছেন না, সেখানে গণতন্ত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকবেই।

তবে বিশেষজ্ঞেরা কোনও পেশাতেই সমস্বরে একই কথা বলেন না, কে না জানে। ‘নানা মুনির নানা মত’। পাঠককেই শিখতে হবে মুড়ি থেকে মিছরিকে আলাদা করার বিদ্যে। সতর্ক পাঠের কোনও বিকল্প নেই, বুঝলেন। বিভিন্ন মুনির বক্তব্য মিলিয়ে পড়লে নিজেই দেখতে পাবেন, আপনার বিচারে এক পক্ষের যুক্তি দাঁড়াচ্ছে, অন্য পক্ষ কুযুক্তি দিয়ে কিংবা আবেগমথিত বক্তৃতাবাজি করে মনোহরণ করতেই ব্যস্ত। সংবাদমাধ্যম বলুন, সর্বপ্লাবী সমাজমাধ্যম বলুন, সব জায়গাতেই নাগরিকরা যা পড়বেন সতর্ক হয়ে পড়বেন, এ ভাবেই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেবেন বিভিন্ন বিষয়ে, এটাই সুস্থ গণতন্ত্রের পক্ষে জরুরি।

লেখার আরম্ভে শান্তির কথা তুলেছিলাম। দেখতে পাচ্ছেন বোধ হয়, শান্তির আলাদা কোনও ফর্মুলা হয় না। কথা ঠান্ডা করার গণতান্ত্রিক মেজাজ যার মনে শিকড় গাড়তে পেরেছে সেই মানুষই যুক্তিগ্রাহ্য সংলাপে অভ্যস্ত হবে। সংলাপের পথেই সে বিভিন্ন মতভেদের বা বিবাদের মীমাংসা করতে পারবে। এই বক্তব্যটাকে অলীক আকাশকুসুম ভাবছেন? দেখুন, ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্নকেও অলীক মনে হয়েছিল দেড়শো বছর আগে। চোখ তুলে সুদূর অভীষ্টের দিকে তাকিয়ে দেখতেও সাহস লাগে। এক বার দেখুন তাকিয়ে। তার পর নিশিদিন ভরসা রাখুন। নিজেকে বলে চলুন, “যদি পণ করে থাকিস, সে পণ তোমার রবেই রবে।” আর কেউ আপনার হয়ে পণ করতে পারে না, এ কথাটা আপনাকেই বুঝতে হবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Logic Republic

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy