E-Paper

‘নে, কাগজ গিলে খা’

নাগরিকত্ব প্রদানের যে দায় সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের ছিল, বিশেষ কালে সে গুরুদায়িত্ব নাগরিকের ঘাড়েই চাপিয়ে দায় এড়াল রাষ্ট্র। বিস্ময়, নিয়মের বেড়াজালে দেশবাসীকেই যথোপযুক্ত নথি এনে প্রমাণ করতে হবে সে নাগরিক কি না!

সন্দীপন নন্দী

শেষ আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৭

দেশ থেকে তাড়ায় দিবেন স‍্যর?” ডিএম অফিসের একতলা আর চারতলা চরকির মতো ঘোরার পর ‘বিপর্যয় মোকাবিলা’ লেখা দরজার পর্দা ঠেলে কাঁপা কণ্ঠে কথাগুলো বললেন এক মহিলা। ঘরটি যে মানবিক বিপর্যয় সামলানোর নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলার দফতর, তাঁকে কে বোঝাবে? বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর শুনানিতে মহিলার কাছে মাধ‍্যমিক পাশের শংসাপত্র চেয়েছেন আধিকারিক, না-পারলে বার্থ সার্টিফিকেট দিতে বলেছেন। অর্ধেক জীবন পার করা মহিলা বুঝতে পারছেন না, কোন ঘরের কোন ফাইলে রাখা আছে তাঁর জন্মের প্রমাণপত্র।

এই সব মুশকিল-আসান কাগজের খোঁজে গত কয়েক মাস লক্ষ লক্ষ মানুষ সরকারি অফিসের দরজায় দরজায় ঘুরছেন। জেলা অফিসের যে রেকর্ড রুমের দফতরে কতিপয় মানুষ আসতেন, সেখানে তিন মাস ধরে জনসমুদ্র। নির্বাচন কমিশনের তৈরি ফর্দ নিয়ে আসছেন সকলে। ঝুল-ধুলোর বাসা ভেঙে চলছে পুরনো নথির সন্ধান। কেউ নথি পেয়ে ঘরে ফিরছেন, কেউ ফিরছেন শূন‍্য হাতে। শুধু ঘর নয়, দেশও ছাড়তে হবে, এই উৎকণ্ঠা বুকে নিয়ে।

বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের পাশেই ‘জেনারেল সেকশন’। বহু পূর্বে জন্মমৃত্যুর শংসাপত্রের যাবতীয় ফাইল এখানেই সংরক্ষিত থাকত। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ফিরোজা বেওয়া। এসেছেন সুদূর হায়দরাবাদ থেকে, রান্নার কাজের বাড়িতে ছুটি ও অগ্রিম বেতন নিয়ে। ট্রেন থেকে নেমেছেন বাপের বাড়ি হিলি-তে। অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাঁ হাতে কব্জির চুড়ি সরিয়ে দেখালেন, “এ সব দাগ ডুপ্লিকেট হয় স‍্যর?” একাত্তরের যুদ্ধে উড়ে আসা শেলের টুকরো ছাপ রেখে গিয়েছিল তখনকার ছোট্ট মেয়েটির শরীরে। শুনানি-তে আধিকারিক বলেছেন, এ সব সাজানো ঘটনা। শুনানির লাইন থেকে সরাসরি দৌড়ে এসেছেন সরকারি অফিসে। পুনরায় হাজিরার নির্দেশ এলে কাজের বাড়ি আর ছুটি দেবে না। আর কাজ গেলে পুত্রের কলেজ সিমেস্টারের টাকা দিতে পারবেন না। গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকরাই যেন অপরাধী।

নাগরিকত্ব প্রদানের যে দায় সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের ছিল, বিশেষ কালে সে গুরুদায়িত্ব নাগরিকের ঘাড়েই চাপিয়ে দায় এড়াল রাষ্ট্র। বিস্ময়, নিয়মের বেড়াজালে দেশবাসীকেই যথোপযুক্ত নথি এনে প্রমাণ করতে হবে সে নাগরিক কি না! তাই ভারতে জন্মেও অবিশ্বাস আর সন্দেহের শিকার হচ্ছেন সব ধর্মের, সব শ্রেণির নাগরিক। এসআইআর যেন হয়ে উঠেছে প্রকৃত ভারতবাসী নির্ধারণের একমাত্র ছাঁকনি। যে দেশে মেয়েদের মধ্যে স্কুলছুট, বাল‍্যবিবাহের হার বেশি, সেখানে মাধ‍্যমিক পাশের শংসাপত্র দাখিলের বাধ‍্যবাধকতা কতটা যুক্তিযুক্ত? বিকল্প হিসেবে নাগরিক নানা বিচিত্র প্রমাণ দাখিল করছেন। কেউ দাদুর কবরের মাটি নিয়ে শুনানিতে উপস্থিত হয়েছেন। কেউ দাবি করছেন, ডিএনএ পরীক্ষার ফলকে প্রামাণ্য নথি বলে ধরুক সরকার। আজ সরকার নাগরিকত্বের প্রমাণ বলে যে নথি গ্রহণ করছে, কাল যে তা মান‍্যতা পাবেই, সে বিশ্বাসটাও টলে গিয়েছে। কে কোথায় ধরা পড়ে কে জানে?

খবর আসে, সরকারি দফতরের কর্মীরা এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে গণতন্ত্রের মহাযজ্ঞের জোগাড়ে ব‍্যস্ত। সরকার সদ্য নিয়ম জারি করেছে, ‘ভোটার তালিকা নির্ভুল’ এই মর্মের বাক্যে সরকারি কর্মীদের স্বাক্ষর দিতে হবে। ফলে উদ্বেগ ঘনাচ্ছে সরকারি অফিসের ঘরগুলোতে। কেউ ভাল নেই— না আবেদনকারী, না আধিকারিক। প্রত‍্যহ অফিস মেলে আসছে নিত‍্যনতুন নির্দেশ, ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি, দুর্ভোগ বাড়ছে। ফলে অফিসের দৈনন্দিন ফাইল দেখা, ছাড়ার কাজ বিলম্বে চলছে। সাধারণ প্রয়োজনে এসে নাগরিকরাও জেরবার হচ্ছেন। কোনও কাজ নিয়ে সরকারি অফিসে এলেই শুনতে হচ্ছে, “এসআইআর চলছে, পরে আসুন।”

নিয়ম অনুসারে ইআরও স্তরে জমা-পড়া শুনানির নথি পুনর্যাচাইয়ের জন‍্য জেলাশাসকের কাছে এলে, এবং তাঁর থেকে ইতিবাচক রিপোর্ট পেলে, সেগুলি কমিশনের সফটওয়্যারে আপলোড করবেন ইআরও বা এইআরও। কিন্তু নথির নির্মম পরীক্ষাগারে কী দেখেন সরকারি কর্মী? ডেস্কটপে একে একে খুলে যায় আপলোড-হওয়া ফর্মগুলো। প্রতিটির সঙ্গে জুড়ে আছে শুনানিতে উপস্থিত মানুষের ছবি। দেখে কে বলবে এ-সব ছবি আধিকারিকের দামি ফোনে তোলা? প্রতিটি মুখে অন্ধকারের ছোপ ছোপ দাগ। মনে হয় ক্যামেরার কাচ তুমুল বিক্ষোভে ঘষে দিয়েছে কেউ। কোনও বৃদ্ধের মুখ দেখে উপলব্ধি হয় দীর্ঘ দিন পেট ভরে খাননি, কোনওটায় ২০০০ সালে জন্মানো তরুণীর সাদা থান-পরা ছবি। কোনও ফর্মে দেখা যায় অশৌচের বসন পরিহিত পুত্রকে। এই আশ্চর্য চিত্রপ্রদর্শনী যেন দেশের মানুষের জীবনযাত্রার আংশিক পূর্বাভাস।

হঠাৎ অফিসের নীচতলায় শুনানি-চলা মহকুমা শাসকের ঘর থেকে চিৎকার ভেসে আসে, “নে, কাগজ গিলে খা।” সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা যায়, এক ভবঘুরে তাঁর ঝোলা থেকে থোকা থোকা ময়লা কাগজ বার করে ছুড়ে মারছেন আধিকারিকের মুখে। পুলিশ ডাকা হয়, বিনা বাধায় প্রিজ়ন ভ্যানে উঠে পড়েন সেই ব‍্যক্তি। জানা যায়, লাইনে দাঁড়ানো লোকটির কাছে কাগজ চাইতেই এমন বিপত্তি ঘটিয়েছেন তিনি। ভিড় থেকে এক জন টিপ্পনী কাটেন, “ব্যাপারটা এক জনে সীমাবদ্ধ থাকলেই মঙ্গল।” অনেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করেন, “এ বার গন্ডগোল লাগল বলে!”

বিপুল জনসমাগমের মধ্যে প্রতিটি মানুষ যেন ঝড়ের মুখে দুলতে থাকা এক-একটা নৌকা। কোনও ক্রমে পার হতে চায় দুস্তর পারাবার। অভিযোগের কথামালা ওঠে, আবার শক্তি হারিয়ে আছড়ে পড়ে। কোনও কোনও কাগজের নৌকা কোনও মতে তীরে এসে ভেড়ে, কোনওটা হারিয়ে যায় চিরতরে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Election Commission Voter List

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy