Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

বুদ্ধিদীপ্ত নারীর মডেল তিনি

সরলা দেবী যখন এই প্রবন্ধ লিখছেন (আষাঢ় ১৩৩০, ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ), তখন সিমন দ্য বোভোয়া আমাদের পরিচিত নাম নয়।

ঈশা দেব পাল
১৩ মে ২০২২ ০৪:৪৭
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

সরলা দেবী চৌধুরাণী (১৮৭২-১৯৪৫) ‘নারী-মন্দির’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন— “মনুর সময় হইতে আরম্ভ করিয়া অদ্যাবধি ঘরে বাহিরে যাহা কিছু অধিকার নারী পাইয়াছেন, তাহা কেবল পুরুষদের আরাম ও সুবিধাকল্পে, নারীর দিক ভাবিয়া নহে। ছবিটা যদি সিংহের আঁকা হইত, সিংহ যেমন আর এক রকম করিয়া আঁকিত, তেমনই ধর্মশাস্ত্র-রচনা নারীর হাতে পড়িলে শ্লোক কয়টা পুরুষকে উলটা পড়িতে হইত। লোকযাত্রা যেমন পুরুষের, তেমনই মেয়েরও।... কিন্তু শাস্ত্রের ব্যবস্থাগুলি সব পুরুষের একার গড়া, মেয়েদের ‘ভোট’ বা সম্মতি লইয়া গঠিত হয় নাই।”

সরলা দেবী যখন এই প্রবন্ধ লিখছেন (আষাঢ় ১৩৩০, ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ), তখন সিমন দ্য বোভোয়া আমাদের পরিচিত নাম নয়। বোভোয়া দ্য সেকেন্ড সেক্স ফরাসি ভাষায় লিখছেন ১৯৪৯-এ, তা ইংরেজিতে অনুবাদ হচ্ছে ১৯৫৩-য়। অথচ বোভোয়া যখন নারীর স্বাধীন সত্তাকে স্পষ্ট চেহারা দিচ্ছেন, তার আগেই আমাদের এক বাঙালিনি নারীর পরিচয় ও রূপ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন আপন মহিমায়। নারীবাদ বললেই পাশ্চাত্য তাত্ত্বিকদের কথা তো আমরা মনে করি, কিন্তু মনে রাখি কি সেই সরলা দেবীকে? তাঁর জন্মের এই দেড়শোতম বছরেও?

“স্বর্ণপিসীমার দ্বারা ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে স্থাপিত সখীসমিতির সাহায্যকল্পে ‘মায়ার খেলা’ গীতিনাট্য যখন প্রথম বেথুন স্কুলে অভিনীত হয়, তখন সরলাদিদি জামা-পাজামা পরে একজন ‘সখা’ সেজেছিলেন মনে আছে।” ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী লিখছেন সরলা দেবীকে নিয়ে এই কথাগুলি। ১৮৮৩-তে ছদ্মবেশে ‘সখা’ সাজছেন সরলা দেবী চৌধুরাণী মায়ার খেলা নৃত্যনাট্যে। আর তার ঠিক চব্বিশ বছর পর ১৯০৭ সালে প্রকাশিত দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি-তে ‘কিরণমালা’ নামে এক নারীর কাহিনি পাই যে বিপদ এবং বাধা অতিক্রম করছে পুরুষের ছদ্মবেশেই। ঠাকুরমার ঝুলি-র ‘কিরণমালা’ কাহিনিটি কিন্তু যথেষ্ট ব্যতিক্রমী শুধু এই কারণেই যে, পুরুষের ছদ্মবেশে খোলা তরোয়াল হাতে নারীর নিজের বিপদ জয়ের অভিযানের কাহিনি আমাদের বাংলা সংস্কৃতিতে আকস্মিক এবং নতুন।

Advertisement

ঠিক যে সময়ে এই গল্পটি জনমানসে গড়ে উঠেছে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, তখন সরলারও উত্থানের সময়। ‘বীরাষ্টমী’ ব্রত চালু করা এবং তরবারি চালনা ও সাহিত্যচর্চা— উভয় পথে এবং পদ্ধতিতে নারীত্বের এক নতুন সংজ্ঞার সূচনা করলেন সরলা। সেই নারীকে আমাদের সমাজ চেনে না, চিনতে চায় না।

নাহ্, এই সামান্য এহ বাহ্য সাদৃশ্য দিয়ে সরলা দেবীকে কিরণমালার সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চাইছি না। মিল যখন তাঁদের দু’জনেরই অভ্যন্তরীণ এবং প্রাকৃত নারী যখন প্রকৃত নারীর আদল বহন করে লোকমুখে প্রচারিত গল্পের প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে, তখন প্রকৃত চরিত্রটিকে নিয়ে আমাদের গভীর ভাবে ভাবতে হয়। কিরণমালার কাহিনি মুখে মুখে প্রচারিত লোককথা হিসাবেই সংগ্রহ করেছিলেন দক্ষিণারঞ্জন। কেমন সেই আলাদা হয়ে ওঠা নারী? পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাঁকে কতটা মান্যতা দিয়েছে? সুতপা ভট্টাচার্য সরলা দেবীর আত্মকথা জীবনের ঝরাপাতা-র ভূমিকায় জানিয়েছেন— ঠাকুরবাড়ির এক বধূ বলেছিলেন, সরলা দেবী সমর্থ পায়ে চলাফেরা করতেন, জোরে কথা বলতেন, জোরে হাসতেন। রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীকে পছন্দ করতেন তাই, সরলা দেবীকে নয়। রবীন্দ্রনাথের এই পক্ষপাত পঞ্চভূত-এর দীপ্তি আর স্রোতস্বিনী চরিত্রেও স্পষ্ট। স্রোতস্বিনীর আকুল, হৃদয়সর্বস্ব ইমেজ আমাদের পরিচিত এবং অনুমোদিত। নারীর তেমন নম্র, ভদ্র, সঙ্কুচিত, লজ্জিত মিষ্ট রূপ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দেখতে চায় এবং দেখাতেও চায়। কিন্তু দীপ্তি? তার বুদ্ধিদীপ্ত রূপ আমাদের পছন্দ নয়। নারীর এই বুদ্ধিপ্রধান রূপকেই তো আমরা ভয় পেয়ে এসেছি। কবে যাজ্ঞবল্ক্য গার্গীকে শুধু প্রশ্ন করার জন্যই মাথা খসে যাবে বলেছিলেন! কবে খনার জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়েছিল সত্যভাষণের জন্য! পঞ্চভূত-এর ‘দীপ্তি’ যেন নারীর খোলা তরবারির এই ইমেজ, যার স্পষ্ট চেহারা আমরা সরলা দেবীর মধ্যে দেখি।

সরলা দেবী অনায়াসে সামলেছিলেন দু’রকম কাজই। বুদ্ধিবৃত্তি এবং হৃদয়বৃত্তি। যখন একের পর এক সাহিত্য সৃষ্টি করছেন, গান গাইছেন, অভিনয় করছেন তখন বীরাষ্টমী ব্রতও করছেন, করছেন প্রতাপাদিত্য উৎসব, উদয়াদিত্য উৎসব। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের আগেই সরলা দেবী ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ করেছিলেন। সেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মেয়েদের জন্য কাপড় বা অন্যান্য দরকারি জিনিস আনা হত।

রূপকথার গল্পের ‘কিরণমালা’ মায়াপাহাড় অভিযানে যাওয়ার আগে যে ভাবে কাজললতা গাইটিকে খাইয়ে, গৃহকর্ম সম্পাদন করে বেরিয়েছিল, সরলাও যেন সে ভাবেই যাবতীয় মাধুর্য বা হৃদয়বৃত্তির অনুশীলনের সঙ্গে এগিয়ে গিয়েছেন সক্রিয় সমাজসংস্কারেও। এই ভারসাম্য রক্ষার অনায়াস গুণটিকেও আমরা নারীবাদের নতুন সংজ্ঞার আলোয় কি ভেবে নিতে পারি আজকে দাঁড়িয়ে, আর এক বার?

বাংলা বিভাগ, শ্রীরামপুর কলেজ



Something isn't right! Please refresh.

Advertisement