E-Paper

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৃত্যু পরোয়ানা

দু’টি প্রশ্ন আসে। নিয়োগযোগ্য শ্রমিক তৈরি করতে পারছে কি না, তা কী ভাবে বোঝা যায়? আর যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পারল না, তার মৃত্যুর পরোয়ানা ঠিক কী ভাবে ঘোষিত হবে?

ঈশা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৫৭

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষানীতির জায়গা করে নেওয়ার প্রায় তিন বছর পূর্ণ হল। প্রচুর বাদ্য সহযোগে ঘোষিত এই নীতিতে কেমন আছেন শিক্ষক, অধ্যাপকরা? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বা কেমন আছে? তার আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন, এই নতুন শিক্ষানীতির মুখ যাঁরা, তাঁরা কী বলছেন? নির্দিষ্ট ভাবে বলে দেওয়া হচ্ছে, এই শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ‘টু ক্রিয়েট এমপ্লয়েবল ওয়ার্কার্স’, নিয়োগযোগ্য শ্রমিকশ্রেণি তৈরি করা। প্রাথমিক ভাবে মনে হতে পারে, ভালই তো। যেখানে এত বেকারত্ব, সেখানে যদি এমন কিছু পড়ানো হয় যাতে কলেজ থেকে বেরিয়েই চাকরি পাওয়া যায়, তা হলে অসুবিধা কী? ‘স্কুল টু ওয়ার্ক ট্রানজ়িশন’ নিয়ে অর্থনীতিবিদরা অনেক আগেই চিন্তাভাবনা করেছেন। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এর করুণ মুখও আমরা দেখেছি। ‘ট্রানজ়িশন’ বা সময়পথে হাঁটার সুযোগ ছিল না অনেকেরই। পড়াশোনা নিয়ে এগোতে পারেনি অনেকেই। বাধ্যতামূলক স্কুলছুট, বাধ্যতামূলক ট্রানজ়িশন।

আর যে কোনও মতে আঁকড়ে থেকেছে নামকরা কলেজের সুযোগটুকু? বাবা কোভিডে মারা গিয়েছেন, মা গৃহবধূ, স্বামীর হঠাৎ মৃত্যুতে দিশাহারা। বেসরকারি চাকরি থেকে কোনও আর্থিক প্রাপ্য উদ্ধার হয়নি। রীতিমতো সচ্ছল ছিল পরিবার, কোভিড সব কেড়েছে। মেয়েটি একাই ছোটাছুটি করছে। “আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়ার সার্টিফিকেট কয়েক দিনের মধ্যে পাওয়া যাবে না ম্যাডাম? ঠিক সময় পেলে, শুধু কন্যাশ্রী নয়, স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপও পাব। আমার না হলে পড়াশোনা হবে না ম্যাডাম।”

মেয়েটি এখন দিল্লিতে। অর্থনীতি নিয়ে পড়ছে। শুধু সরকারি ভাতা নয়, অধ্যাপিকাদের নিঃশর্ত সাহায্য নয়, সরকারি কলেজের নামমাত্র খরচে পড়াশোনার সুযোগ, লাইব্রেরির সুবিধা মেয়েটিকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দিল। এ রকম অসংখ্য ছাত্রী, গ্রাম বা মফস্‌সল থেকে যে পড়াশোনা করতে পারে, তার একমাত্র কারণ ন্যূনতম খরচ। ট্রেনে যাতায়াতের ছাড়ের ফর্ম সই করাতে আসে যখন, নিজেরাই গল্প করে কত টাকায় তাদের যাতায়াত হয়, কলেজের হস্টেলে থাকার টাকা দিতে কেন দেরি হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি। একটাই কথা ঘুরে ফিরে আসে— এত কম খরচে সরকারি হস্টেলে থাকার সুযোগ, কম খরচে পড়ার সুযোগ না-হলে তাদের আর পড়াশোনা হত না। ট্রেনে করে আসুক বা হস্টেলে থাকুক, ওরা কলকাতার নামকরা কলেজে পড়ে।

ঠিক এইখানে আঘাত দিতে প্রস্তুত এই নতুন শিক্ষানীতি। যদি শুধুমাত্র চাকরির সুযোগ করে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য হত, তা হলে এত কথার দরকার ছিল না। কিন্তু বলা হল ‘পারফর্ম অর পেরিশ’-এর কথা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি যদি যথেষ্ট ‘এমপ্লয়েবল ওয়ার্কার’ বা চাকরির সুযোগপাচ্ছে এ রকম ছাত্রছাত্রীর পরিসংখ্যান না দেখাতে পারে, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেঁচে থাকার কোনও অধিকার নেই।

দু’টি প্রশ্ন আসে। নিয়োগযোগ্য শ্রমিক তৈরি করতে পারছে কি না, তা কী ভাবে বোঝা যায়? আর যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পারল না, তার মৃত্যুর পরোয়ানা ঠিক কী ভাবে ঘোষিত হবে? কলেজ বিল্ডিং, হস্টেল ভেঙে ফেলা হবে? না কি অযথা সরকারি খরচ বাড়ানোর মধ্যে যাবে না? এমনিতেই বাজেটের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সরকারের খরচ করার অদ্ভুত ধরন। গত বছরে ৭.৮৫ লক্ষ কোটি বরাদ্দ হয়েছে জাতীয় সুরক্ষা খাতে, যা গত অর্থবর্ষের থেকে ১৫.১৯% বেশি। নতুন শিক্ষানীতিতে শিক্ষার বরাদ্দ জিডিপি-র ৬% করার কথা হলেও, গত ছ’বছরেও তা করেনি সরকার। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ থেকেছে জিডিপি-র ৪%।

প্রায় মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে চেয়ে নেওয়া হচ্ছে চাকরি পাওয়ার পরিসংখ্যান। তার পোশাকি নাম ‘প্রগ্রেশন’। মেয়েদের কতটা ‘প্রগ্রেশন’ হয়েছে, তার পরিসংখ্যান দিতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে। স্নাতকস্তরে উত্তীর্ণ হয়ে, মেয়েটি কোনও চাকরি পেয়েছে কি? আমরা, অধ্যাপকরা বাধ্য হই যে মেয়েটি হয়তো এক বছরের ফাঁকা সময় চেয়ে নিয়েছে নিজেরই জীবন থেকে, তাকে বার বার ফোন করতে। “তুমি এখন কী করছ? কোনও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ? তা হলে তার ডেটা দাও।”

প্রস্তুতির আবার পরিসংখ্যান কী? আছে। এই শিক্ষানীতির ইঁদুর দৌড়ে তারও হিসাবনিকাশ আছে। কোন কোচিং সেন্টারে পড়ছে সে? তার তথ্য দিক। মনে রাখতে হবে, সেই তথ্যে আর ছাত্র বা ছাত্রীটির অধিকার রইল না। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই তথ্য চেয়ে নিচ্ছে, তার অধিকারও রইল না। সেই তথ্য চলে গেল এই অমূল্য তথ্যভান্ডারে, যার মাধ্যমে আমরা সবাই আজ নজরদারি রাষ্ট্রের অধীনে। আর যে মধ্যবিত্ত ছাত্রীটি হয়তো কোনও প্রতিষ্ঠানেই পড়ছে না, নিজে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার সাহসটাও কিছুটা ভেঙে দেওয়া গেল— “আমি এক বছর ফাঁকা সময় নিচ্ছি, তার উপর কোথাও প্রথাগত তালিম নিচ্ছি না, আমার কি আদৌ কিছু হবে?”

নিজে লজ্জিত হই। শিক্ষক হয়ে, অভিভাবক হয়ে। কিছু দিন পর সংবাদমাধ্যমে ফুটে উঠবে নতুন শিক্ষানীতি পোষিত সংস্থার দেওয়া ‘রেটিং’। আবারও, শিক্ষক হয়ে, অভিভাবক হয়ে ব্যর্থ হব। নিজের প্রতিষ্ঠানে সেই রেটিং ভাল হলে খুশি হব। খারাপ হলে ভীষণ চিন্তিত হবে। আমি, আমরা কিছুই করতে পারিনি। মৃত্যুর পরোয়ানার ভয়ে দিন গুনেছি, পরিসংখ্যান ভরেছি শুধু।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Education system West Bengal government New Education Policy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy