মহারাষ্ট্রে রাজ্য সরকারের নির্দেশে ২০১৯ সালে এক সমীক্ষা হয়, আগের তিন বছরে আখ খেতের মেয়ে-শ্রমিকদের মধ্যে জরায়ুচ্ছেদনের হারে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ বুঝতে। জানা গিয়েছিল, বিড় জেলায় ২০-৩০ বছর বয়সি মেয়েরা অপ্রয়োজনীয় ভাবে হিস্টেরেক্টমি করাচ্ছে, যাতে ঋতুস্রাবের কারণে কাজ কামাই না হয়। কামাই হলে তারা দিনমজুরি হারায়, সঙ্গে জরিমানা হয়, ছাঁটাইও হতে পারে। ২০২৫-এ জানা যায়, বিড় জেলায় সেই ‘ব্যবস্থা’ সমানে চলেছে। আর এ বছর মার্চে, শ্রমজীবী নারীকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাসে ভারতের মহামান্য সর্বোচ্চ আদালত এক জনস্বার্থ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জানালেন, সবেতন পিরিয়ড-ছুটি বাধ্যতামূলক হলে মেয়েদের কর্মসঙ্কোচন হতে পারে।
রায় নয়, এটি শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ। নীতিনির্ধারণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন বিচারকদ্বয়। কিন্তু যেখানে আদালতের নির্দেশ থাকলেও বিল পেশ করতে, বিল পাশ হয়ে আইন হতে সময় লাগে, সেখানে আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে ঋতুস্রাবকালীন সবেতন ছুটির প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বাড়বে কি? লক্ষণীয়, এই পর্যবেক্ষণে বিড় জেলার শ্রমিক নারীদের ভয়ের সপক্ষেই যুক্তি পাওয়া গেল, যেন ঋতুস্রাবের কারণে কামাই হলে মাইনে কাটা, জরিমানা ধার্য করা, ছাঁটাই করাই ইত্যাদি স্বাভাবিক। অন্য দিকে, ঋতুস্রাবকালে সবেতন ছুটি চাওয়া যেন অস্বাভাবিক— সেই ধৃষ্টতা দেখালে নারীদের আর কাজে রাখাই হবে না। প্রসঙ্গত, ভারতে এই রায় ঘোষিত হওয়ার ঠিক এক দিন আগে স্পেনের সরকার মাসিক পাঁচ দিন ঋতুস্রাবকালীন ছুটি ঘোষণা করে।
ঋতুস্রাবকালীন ছুটির বিপক্ষে আপাত-যুক্তি: যদি নিয়োগকর্তারা বোঝেন যে নারী-কর্মী ‘অতিরিক্ত ছুটি’ নেবেন, তা হলে তাঁরা নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারেন। প্রশ্ন হল, ভিন্নতাকে (এ ক্ষেত্রে শারীরিক ভিন্নতা) স্বীকার করা কি সত্যিই সাম্যের পরিপন্থী? বস্তুত, কর্মী বা শ্রমিকের যে ধারণা, তা দীর্ঘ দিন ধরে গড়ে উঠেছে পুরুষশরীর মাথায় রেখে। সিমোন দ্য বোভোয়া বলেছিলেন, পুরুষ হল সত্তা আর নারী তার ‘অপর।’ টুওয়ার্ডস আ ফেমিনিস্ট স্টেট-এ নারীবাদী আইনতাত্ত্বিক ক্যাথারিন ম্যাককিনন প্রায় একই সুরে বলেন, রাষ্ট্র ও আদালত পুরুষের অভিজ্ঞতাকেই সাধারণ মানদণ্ড ভাবে, নারীদের সেই মানদণ্ডে বিচার করা হয়। ঋতুস্রাবহীন মানুষকে মানদণ্ড ধরলে ঋতুস্রাবজনিত অসুস্থতাকে তো ব্যতিক্রম মনে হবেই!
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কর্মসংস্থান, শ্রম-নীতি ইত্যাদি সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়। এই শ্রম-নীতির দর্শন নিয়েও নারীবাদীরা দীর্ঘ দিন আলোচনা করেছেন। একে তো পুঁজিবাদী অর্থনীতি এক তথাকথিত ‘আদর্শ কর্মী’ কল্পনা করে নিয়েছে— যে অন্তত চল্লিশ বছর নিরলস পরিশ্রম করবে, কর্মজগৎকেই সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেবে। এই প্রত্যাশা পুরুষের পক্ষেও শ্বাসরোধকারী। উপরন্তু, শ্রমনীতি তাত্ত্বিক জোয়ান সি উইলিয়ামস হোয়াই ফ্যামিলি অ্যান্ড ওয়ার্ক কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হোয়াট টু ডু অ্যাবাউট ইট-এ লিখেছিলেন, এই কল্প-কর্মীর জীবনে গৃহকর্ম, পরিচর্যার দায়িত্ব পালন বা নিজের শরীরজনিত সীমাবদ্ধতার যেন কোনও জায়গাই নেই। এই মাপকাঠিতে ‘আদর্শ কর্মী’ হয়ে ওঠা হয় না নারীর, কারণ তাকে প্রজনন ও পরিচর্যার শ্রমও করতে হয়। পরিচর্যা শ্রমের ভাগ যদি কখনও পুরুষ নেয়ও, প্রজনন শ্রমের ভাগ হয় না। সিলভিয়া ফেদেরিচির মতো মার্ক্সীয় নারীবাদীরা বার বার বলেন, নারীর প্রজনন ও পরিচর্যাজনিত শ্রম অদৃশ্য রয়ে যায়। ঋতুস্রাবও প্রজনন চক্রেরই অংশ। অস্বীকারের ঐতিহ্য মেনে কর্মক্ষেত্র এই বাস্তবতাকেও অপ্রাসঙ্গিক ভেবে নেয়।
ঋতুস্রাব নারীশরীরের স্বাভাবিক জৈব প্রক্রিয়া। কিন্তু যা কিছু ‘স্বাভাবিক’, তা কষ্টহীন না-ও হতে পারে। প্রজননও স্বাভাবিক জৈব প্রক্রিয়া। তার মানে এই নয় যে, গর্ভাবস্থায় দশ মাস শারীরিক শ্রম ও কষ্ট কম। মাতৃত্বকালীন ছুটিও এক শতক আগে অভাবনীয় ছিল। এখনও পৃথিবীর মাত্র ১২০টি দেশে তা আছে। তেমনই, ‘পিরিয়ড লিভ’-এর ধারণাটি অপেক্ষাকৃত নতুন, কিন্তু প্রয়োজনীয়।
সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ অন্য রকম হলে হয়তো প্রতিষ্ঠিত হত, সমানাধিকার মানে বৈচিত্র মুছে ফেলা নয়। বরং সেই কাঠামোগুলো বদলানো, পুরুষের অভিজ্ঞতাকেই যা সর্বজনীন ধরে নিয়েছে। মাতৃত্বকালীন ও ঋতুকালীন ছুটির দায় ঝেড়ে ফেলতে পারলে সুবিধা পুঁজিবাদের, যা কর্মী/শ্রমিককে উৎপাদনের পরিমাপ দিয়ে মাপে। ‘ঋতুস্রাব সত্ত্বেও পেরে দেখাও’, ‘প্রসবের ঠিক পরেই উঠে দাঁড়াও’, এই বাণীর মধ্যে প্রচ্ছন্ন পুঁজিবাদী উস্কানি।
ঋতুকালীন শারীরিক কষ্ট সবার সমান হয় না। পিসিওএস বা এন্ডোমেট্রিয়োসিস থাকলে ঋতুসময়ে দুর্গতি সীমাহীন। ভারতে আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মেয়েরা অপুষ্টি, রক্তাল্পতায় ভোগেন; তাঁদের কর্মস্থল বা স্কুল-কলেজে পর্যাপ্ত শৌচালয়, পরিষ্কার জল, স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন, ন্যাপকিন ফেলার বিন থাকে না। ঋতুমতী হওয়ার পর ২৩% মেয়ে স্কুলছুট হয়। সংগঠিত কর্মস্থলে পিরিয়ড লিভ চালু হলে ক্রমে তা অসংগঠিত কর্মক্ষেত্রে ও স্কুলছাত্রীদের মধ্যে প্রসারিত হবে, এটাই কাঙ্ক্ষিত ছিল। তা প্রসারিত হওয়া দরকার ট্রান্স-পুরুষদের জন্যও, যাঁরা পুরুষ হয়ে উঠতে চান কিন্তু ঋতুচক্র ঝেড়ে ফেলতে পারেননি।
বিষয়টি কেবল ছুটির নীতি সংক্রান্ত নয়, কর্মক্ষেত্রে কর্মীর মর্যাদার প্রশ্নও বটে। কর্মটুকু নেব, আর কর্মীর শরীরের সত্যকে অস্বীকার করব— তা কি কখনও হয়?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)