সম্প্রতি এক মহিলা-চিকিৎসকের দায়ের করা মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত দৃষ্টান্তমূলক রায় দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়েছে, ঋতু-সম্পর্কিত স্বাস্থ্য প্রত্যেক নারীর মৌলিক অধিকার। আদালতের নির্দেশ, স্কুল-কলেজে ছাত্রীদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন বা ডায়াপার বিনামূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। এই নির্দেশ মেয়েদের স্বাস্থ্য ও সক্ষমতার একটি মাইলফলক বলে মনে করছেন অনেকেই। কারণ, ঋতুস্রাবের কয়েকটা দিন ঋতুস্বাস্থ্য মেনে চলা জরুরি। স্বাস্থ্যকর বিকল্পের অভাবে নোংরা বা অপরিচ্ছন্ন কাপড় ব্যবহার করে নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে মেয়েরা।
ঋতুমতী হওয়া থেকে ঋতুনিবৃত্তি— প্রায় চার দশক ধরে নারীদেহের ঋতুচক্র নিয়ন্ত্রণ করে মগজের হাইপোথ্যালামাস, অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি আর ডিম্বনালির দু’পাশে থাকা ডিম্বাশয়। প্রত্যঙ্গগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়ায় মাসিক ঋতুস্রাব হয়। এটি একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার হলেও আমাদের সমাজে ঋতুস্রাব নিয়ে নানা ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে। ঋতুস্রাব হলেই নারী ‘অশুচি’— এই জঘন্য চিন্তা এখনও দূর হয়নি। ঋতুমতী মেয়েদের পুজো করা, মন্দিরে প্রবেশ, রান্নাঘরে ঢোকা বা নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার উপরে আজও নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়। শীর্ষ আদালতের এই রায় ঋতু-সম্পর্কিত স্বাস্থ্যকে ‘অধিকার’ অভিহিত করে ঋতুকে ‘অশুচি’ এবং ঋতুমতী মেয়েকে ‘অস্পৃশ্য’ বলে চিন্তা করার মানসিকতাকে খারিজ করে দিয়েছে।
স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার সমাজের সচ্ছল অংশে বহুকাল ধরে চালু রয়েছে। নানা জাতীয় সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, গ্রামেও স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহারের হার আগের চেয়ে বেড়েছে। চতুর্থ জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষায় (২০১৫-১৬) গ্রামে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার ছিল ৩৩ শতাংশ, পঞ্চম সমীক্ষায় (২০১৯-২১) যা প্রায় ৫৯ শতাংশ। ১৫-১৯ বছর বয়সি মেয়েদের মধ্যে তা ৭৩ শতাংশ। তবু ঋতুচক্রের দিনগুলোর জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা বহু দরিদ্র মহিলার সাধ্যের বাইরে। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জনৌষধি সুবিধা’ প্রকল্পে এক টাকায় একটা ন্যাপকিন বিক্রি করা হয়। বাস্তবে তা দুর্লভ বস্তু। সুপ্রিম কোর্ট স্কুলের ছাত্রীদের জন্য যে নির্দেশ দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায় সরকারের। স্বাস্থ্যের সুরক্ষা ছাড়া, এর একটি সামাজিক এবং মানসিক দিকও রয়েছে। দেশের বেশির ভাগ প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে ছেলেমেয়েরা এক সঙ্গে পড়াশোনা করে। হঠাৎ ঋতুস্রাব শুরু হওয়া একটি ছাত্রীর মনে চরম অস্বস্তি ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। স্কুলে ও কলেজে ভেন্ডিং মেশিন ব্যবহার করে ছাত্রীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়া গেলে সে সমস্যা অনেকটাই কমতে পারে।
ছাত্রীদের জন্য ছাত্রদের থেকে আলাদা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার থাকা জরুরি। যথেষ্ট জল ও সাবানের ব্যবস্থা বহু স্কুলে নেই। শৌচাগার পরিষ্কার রাখার উপকরণ কেনা, বা সাফাইকর্মী নিয়োগের জন্য কোনও বরাদ্দ নেই। স্কুলগুলির ‘কন্টিনজেন্সি ফান্ড’-ও আসছে না। অতএব কেবল ভেন্ডিং মেশিন বসালেই সমস্যা মিটবে না। বেসরকারি স্কুলগুলিতে ভেন্ডিং মেশিন বসানোর বিষয়ে সরকারি নজরদারি থাকবে কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়।
প্রশ্ন থাকে, ন্যাপকিন সরবরাহের ভেন্ডিং মেশিন কেন স্কুল-কলেজের চৌহদ্দিতে বন্ধ থাকবে? মেয়েরা নিয়মিত যাতায়াত করেন, এমন সব জায়গায় থাকবে না কেন? বাচ্চাদের নিয়ে মায়েরা টিকা দেওয়াতে আনেন, এমন সাবসেন্টারে, সেই সঙ্গে প্রাথমিক ও ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও এই ব্যবস্থা করা খুব কঠিন নয়। আইসিডিএস কেন্দ্রগুলো থেকেও মায়েদের হাতে প্রয়োজনে তুলে দেওয়া যায় সুলভ স্যানিটারি ন্যাপকিন। সরকারি এবং বেসরকারি দফতর, বড় কলকারখানাগুলিতেও ভেন্ডিং মেশিন থাকা দরকার। সম্প্রতি ভারতে ঋতুকালীন ছুটির (মেনস্ট্রুয়াল লিভ) দাবি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তাতে কর্মরত মেয়েদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্যের বিষয়টি অনেকটাই সামনে এসেছে। এই সংলাপের প্রসার চাই।
তার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, খেত-খামারে, ইটভাটায়, বিভিন্ন অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন যে সব মহিলা শ্রমিক, তাঁদের ঋতুস্বাস্থ্য নিয়ে ভাববেন কে? ঋতুস্রাবের কারণে কর্মদিবস কমে যেতে পারে, তাই হতদরিদ্র মহিলা শ্রমিকদের না-জানিয়ে জরায়ু বাদ দিয়ে দেওয়া হয় এ দেশে, সেখানে আদালতের নির্দেশে ইস্কুলের মেয়েরা ন্যাপকিন ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগার পাবে, এমন ভরসা হয় না। তেমনই কঠিন এটা ধরে নেওয়া যে সমাজের সব স্তরের, সব বয়সের মেয়েদের কাছে সুলভে ন্যাপকিন পৌঁছে দেওয়া যাবে।ঋতুস্বাস্থ্য শুধু ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। ঋতুস্বাস্থ্যের পরিধি বিস্তৃত। এখন মেয়েরা ঋতুমতী হচ্ছে দশ-বারো বছরে, এমনকি আরও কম বয়সে। ঋতুচক্র বন্ধ হওয়ার বয়স ৪৫ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। ঋতুকালীন পেট ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তস্রাব, অনিয়মিত ঋতু, ঋতুনিবৃত্তিতে শারীরিক-মানসিক সঙ্কট, এমন নানা ধরনের সমস্যার মোকাবিলার ব্যবস্থা সব স্তরের হাসপাতালে থাকা প্রয়োজন।
বছর কুড়ি আগে বিজ্ঞানসম্মত ঋতুস্বাস্থ্য গড়ে তুলতে স্কুল-কলেজে জীবনশৈলী শিক্ষার মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কেন্দ্র বা রাজ্য, কোনও সরকারই তা মানেনি। ভয় হয়, আদালতের নির্দেশও হয়তো থেকে যাবে কেবল খাতা-কলমে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)