E-Paper

আশ্রয়-রাজনীতির দেশ

যেখানে জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতিগুলি বাড়তে থাকে— বিশেষ করে নগদ হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি— সেগুলি ক্রমশ রাজনৈতিক ভাবে অপরিবর্তনীয় হয়ে ওঠে। এগুলি প্রত্যাহার করার রাজনৈতিক এবং সামাজিক ঝুঁকি থাকে।

শ্রাবণী মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৯
গ্রহীতা: যুব সাথী ভাতার আবেদন শিবিরে উপচে-পড়া ভিড়, ময়নাগুড়ি, ১৭ ফেব্রুয়ারি।

গ্রহীতা: যুব সাথী ভাতার আবেদন শিবিরে উপচে-পড়া ভিড়, ময়নাগুড়ি, ১৭ ফেব্রুয়ারি। ছবি: দীপঙ্কর ঘটক।

ভারতের মতো একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যখন বিরোধী দলগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে, অথবা অন্তর্দ্বন্দ্বে নাজেহাল হয়, কিংবা রাজনৈতিক ভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন দেখা যায় নাগরিকরা প্রায়শই শাসক দলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মতাদর্শগত কারণে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। পরিভাষায় এর নাম শেল্টার পলিটিক্স বা ‘আশ্রয় রাজনীতি’— যেখানে শাসক দলের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রকারান্তরে জনকল্যাণকে পৃষ্ঠপোষকতায় পরিণত করে। শাসক দল হয়ে ওঠে অনুগ্রহকারী, আর নাগরিক পর্যবসিত হন অনুগৃহীত প্রজায়। তার ফলে নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে; যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিযোগিতামূলক যুক্তিকেও সহজেই বিকৃত করা যায়। গণতন্ত্রের মূলগত চরিত্র পাল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রবণতা একটি সহজ অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী কৌশল।

যখন মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত, এবং নিতান্ত বেঁচে থাকার জন্যই রাষ্ট্রীয় সহায়তার উপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হন তাঁরা, তখন পারিবারিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই মানুষের চাহিদার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে পড়ে রাষ্ট্রের এই ‘ওয়েলফেয়ার’ বা কল্যাণমুখী কর্মসূচি। আর যখন বিরোধী দলগুলিকে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসাবে মনে করা যায় না, অথবা তারা নাগরিককে কোনও প্রত্যক্ষ সুবিধা দিতে পারে না, তখন নাগরিকরা যুক্তিসঙ্গত ভাবেই শাসক দলের পক্ষ নেন। আপাতদৃষ্টিতে, একে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের জবরদস্তি বলা চলে না; বরং নাগরিকের কাছে এটি ঝুঁকি কমানোর এক ধরনের পদ্ধতি। অর্থাৎ, শাসক দলের প্রতি সমর্থনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জোটবদ্ধতা এক ধরনের বিমা।

যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রচলিত তত্ত্ব বলে, বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতা প্রতিযোগিতা তৈরি করে এবং আধিপত্যকে প্রতিহত করে। কিন্তু এই ভারসাম্য রাজনৈতিক বিকল্পের উপর নির্ভরশীল। বিরোধী দলের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতার সমান্তরাল মাত্রাটি অদৃশ্য হয়ে যায়, এমনকি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলেও। তখন যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা তার রূপ বজায় রাখলেও সারবস্তু হারিয়ে ফেলে। আজকের পশ্চিমবঙ্গ তার একটি মোক্ষম উদাহরণ। দুর্নীতি এবং দুর্বল শাসনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের শাসক দল এখানে একটি শক্তিশালী নির্বাচনী ভিত্তি ধরে রাখতে পেরেছে। এর কারণ এক দিকে যেমন জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থার প্রসারের ব্যাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত, তেমনই স্থানীয় স্তরে তার বিস্তারের ধরনেও নিহিত।

লক্ষ্মীর ভান্ডার বা যুব সাথী ভাতার মতো উদ্যোগগুলি কর্মসংস্থানের স্বল্পতার প্রেক্ষাপটে একটি নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস নিশ্চিত করে। অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চাৎপদ বা সামাজিক ভাবে অবহেলিত পরিবারগুলির কাছে— যাঁদের কর্মসংস্থান নেই, অথবা যাঁরা কাজ হারানোর আশঙ্কায় থাকেন— এই প্রকল্পগুলি কার্যত আয়ের বিমা। ফলে দুর্নীতি বা অপশাসনের অভিযোগ সত্ত্বেও তাঁরা ক্ষমতাসীন দলের বা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। উত্তরপ্রদেশের মতো অন্যান্য রাজ্যেও অনুরূপ ধারা বিদ্যমান। তীব্রতার দিক থেকে ভিন্ন হলেও তথাকথিত কল্যাণমূলক বণ্টন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে এগুলির মধ্যে স্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে।

ভারতীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষক মাত্রেই স্বীকার করবেন, প্রচলিত প্রবণতাটি হল জনকল্যাণকে প্রথমে ‘অধিকার’ হিসাবে, এবং পরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে ‘প্রাপ্তির সুযোগ’ হিসাবে দেখা। প্রকল্পগুলিকে সর্বজনীন আইনি রূপ দেওয়া হলেও, সেগুলির দৈনন্দিন কার্যক্রম— যেমন নথিপত্র তৈরি, অভিযোগ নিষ্পত্তি, স্থানীয় স্তরে সহায়তা— প্রায়শই রাজনৈতিক বা আধা-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। এর ফলে নাগরিকরা এক ধরনের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন পরিসরে বাস করতে বাধ্য হন, যেখানে অভিজ্ঞতা তাঁদের শেখায় যে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে অনুকূল ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বহুলাংশে বাড়ে। ফলে সর্বজনীন অপশাসনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত লাভ।

মানুষ অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে নেয়, ভিন্নমত পোষণ করা মানেই অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি। তাত্ত্বিক ভাবে এটি অ্যালবার্ট হার্শমানের ‘এক্সিট, ভয়েস অ্যান্ড লয়্যালটি’ কাঠামোকে দেখার জন্য একটি কার্যকর দৃষ্টিকোণ। বিরোধী দলগুলি যখন বিশ্বাসযোগ্য ভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে বা অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারে না, তখন ‘কণ্ঠস্বর’ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। এই অবস্থায় নাগরিকদের সামনে দু’টি পথ খোলা থাকে— হয় তাঁরা সমস্ত কিছু থেকে সরে দাঁড়ান, অথবা অন্যত্র চলে যান; নইলে বৃহৎ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি ‘আনুগত্য’ প্রদর্শন করেন। ভারতে তরুণদের বৃহত্তর রাজনীতিতে অনীহা বা উচ্চ আন্তঃরাজ্য অভিবাসন প্রথমটির, এবং স্থানীয় রাজনৈতিক আনুগত্য দ্বিতীয়টির পরিচায়ক। সুতরাং, ‘আশ্রয় রাজনীতি’ কেবল নির্বাচনী আচরণ নয়, এটি সীমিত পছন্দের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়া। কারণ, বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প থাকলে কী হয়, তার উদাহরণও ভারতীয় রাজনীতিতে রয়েছে। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির উত্থান, বা ২০১১ সালে বাম ফ্রন্টকে পর্যুদস্ত করে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসা, তারই প্রমাণ।

যেখানে জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতিগুলি বাড়তে থাকে— বিশেষ করে নগদ হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি— সেগুলি ক্রমশ রাজনৈতিক ভাবে অপরিবর্তনীয় হয়ে ওঠে। এগুলি প্রত্যাহার করার রাজনৈতিক এবং সামাজিক ঝুঁকি থাকে। তাই সব দলই এগুলি চালু রাখতে চায়, এবং ক্রমে তা সম্প্রসারিত হয়। পাশাপাশি বিরোধী দল দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে এমন শিল্প, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ইত্যাদি খাতে খরচ বাড়ানোর জন্য চাপ দেওয়ার কেউ থাকে না। ফলে ভোগ-কেন্দ্রিক শাসনের একটি প্রবণতা তৈরি হয়, যেখানে স্বল্পমেয়াদি আপাত-জনকল্যাণ কোনও প্রকৃত অর্থনৈতিক সুযোগ প্রসারিত না করেই পরিবারগুলিকে সাময়িক ভাবে স্থিতিশীল থাকতে সাহায্য করে।

তবে এই গতিপথ পূর্বনির্ধারিত নয়। যেখানে জনকল্যাণকে প্রকৃত অর্থেই অধিকার হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়— যা শাসকের রাজনৈতিক বিবেচনার উপর নির্ভরশীল নয়— সেখানে শাসক দলের পৃষ্ঠপোষকতার পথ সঙ্কুচিত হয়ে আসে। একই ভাবে, যেখানে বিরোধী দলগুলি বিশ্বাসযোগ্য, নীতিভিত্তিক বিকল্প প্রস্তাব করতে পারে, সেখানে মানুষ তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না হারিয়েই আলোচনায় নিজেদের ‘কথা বলা’র ক্ষমতা ফিরে পায়। অর্থাৎ প্রশ্নটি আদৌ কল্যাণনীতি নিয়ে নয়— রাজনৈতিক দলগুলি যে ভাবে কল্যাণনীতিকে নিজেদের ভোটের মূলধনে পরিণত করে, প্রশ্ন তা নিয়ে।

আশ্রয়-রাজনীতি গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের বিষয়ে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। যখন নাগরিকরা নিজেদের স্বল্পমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ক্ষমতার সঙ্গে আপস করেন, তখন নির্বাচন আপাতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হলেও তার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। আসলে সামাজিক কল্যাণকে ব্যাহত বা ধ্বংস করা উদ্দেশ্য নয়; বরং প্রয়োজন একে রাজনৈতিক মধ্যস্থতা থেকে মুক্ত করা এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রতিযোগিতার সুযোগ করে দেওয়া। নয়তো গণতন্ত্র একটি স্থিতিশীল কিন্তু নিম্নমানের ভারসাম্যে এসে পৌঁছতে পারে— এমন এক স্থিতাবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক চয়নের চেয়ে বেঁচে থাকা নিশ্চিত করার তাগিদ বড় হয়ে দাঁড়ায়, এবং নীতির পরিবর্তে পৃষ্ঠপোষকতাই হয়ে ওঠে মূল চালিকাশক্তি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল রাজনীতির নয়, নাগরিক সত্তারও। এর দায় কার? সত্যি কথা বললে, দায় আমাদেরই— কারণ আমরা এখন মোটামুটি এটা বিশ্বাস করতে শিখে গিয়েছি যে, আমাদের অস্তিত্ব আসলে অনুগৃহীত হিসাবেই।নিজেদের অজানতেই আমরা নাগরিক থেকে প্রজা হয়ে উঠেছি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Citizen Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy