E-Paper

ঐতিহ্যের সন্ধানে

বাংলা বিপন্ন বলেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ভদ্রলোক-সংস্কৃতিও আজ অস্তিত্ব-সঙ্কটে, হিন্দি আধিপত্যবাদের সামনে অসহায় এবং আত্মবিস্মৃত। অসহিষ্ণু এব‌ং অসংবেদনশীল।

কণাদ সিংহ

শেষ আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৪৪

গত জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে আনন্দপুরের একটি কারখানায় আগুন লেগে মারা গিয়েছিলেন অন্তত ২৫ জন শ্রমিক, নিখোঁজ আরও অনেকে। কিছু দিন এই নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, কিছু গ্রেফতারিও হয়েছিল। তার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি হারিয়ে গেছে খবরের শিরোনাম থেকে। ভাবা দরকার, এর কারণ কি এই যে, দুর্ঘটনার আক্রান্তরা সবাই শ্রমিক, তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির নন, যে শ্রেণি উনিশ শতক থেকে বাঙালির জনপরিসরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাষ্য নির্মাণের প্রধান কারিগর?

সামনে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন। ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি থেকে বাঙালির অতীত গৌরব হারিয়ে ফেলার আক্ষেপ বার বার উঠে আসছে জনপরিসরের আলোচনায়— উঠে আসছে বাঙালির বিপন্নতার কথা। অথচ বিপদের সঙ্কেত তো অনেক দিন ধরেই ছিল, যখন বাংলাভাষী হওয়ার অপরাধে বার বার ভিনরাজ্যে আক্রান্ত হচ্ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিকরা, কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছিলেন, বৈধ নথিপত্র দেখিয়েও সীমান্তের ও-পারে ‘পুশব্যাক’ করা হচ্ছিল কাউকে কাউকে, আমির শেখ বা সুনালী খাতুনের মতো কেউ কেউ দেশে ফিরতে পারলেও এখনও আটকে রয়েছেন সুইটি বিবির মতো অনেকে। কিন্তু বাঙালি শ্রমিকের বিপদ— যাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশই ধর্মে মুসলমান— তাকে তো বাঙালির অস্তিত্ব-সঙ্কট বলে মনে হয়নি বাঙালি ভদ্রলোকের একটা অংশের?

বরং প্রশ্ন উঠেছিল, ভিনরাজ্যে কাজ করতে যেতে হবে কেন। প্রশ্নটা অর্থহীন, কেননা ভারতের যে কোনও প্রান্তে যাতায়াত, বসবাস, কাজ করা ভারতীয় নাগরিকের অত্যন্ত স্বাভাবিক অধিকার, পশ্চিমবঙ্গেও সসম্মানে বসবাস করেন অন্যান্য রাজ্যের অনেক শ্রমিক। প্রতিবেশী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যখন বাঙালি মুসলমানের উপর নির্যাতন করার নিদান দিলেন, তখনও বাঙালি অস্তিত্ব-সঙ্কটে ভোগেনি। আক্রমণের লক্ষ্য যদি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরাও হন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা করাই যায়, কিন্তু সাংবিধানিক পদে থেকে নির্যাতনের নিদান দেওয়া যায় কি?

অথচ মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের দেহ ঘিরে মানুষের বিক্ষোভে প্রতিবাদের ধরন নিয়ে ভদ্রলোক সংবেদনশীলতা আহত হয়েছে। অবশ্যই অশান্তি কাম্য নয়, প্রতিবাদ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পথে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু, যাঁরা শুধু বাঙালি হওয়ার অপরাধে ভিনরাজ্যে রুজি-রোজগারের সুযোগ হারাচ্ছেন, কাজ করতে গিয়ে যাঁদের পরিজন বা বন্ধুরা শারীরিক নিগ্রহের ভয়ে, এমনকি প্রাণসংশয়ে দিন কাটাচ্ছেন, তাঁদের উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভে সহমর্মী হয়ে দাঁড়াতেও দেখা গেছে কি বাংলার নাগরিক সমাজকে?

এ রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ নামের যান্ত্রিক অব্যবস্থার অজুহাতে ভোটার তালিকার বাইরে রেখে যখন ভোটের দিন ঘোষণা হয়ে যায়, কিছু মানুষের নাম তালিকায় ফিরে এলেও অনেকের নাম মুছে দিয়ে ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তার মধ্যেই ভোট শুরু হতে চলে, বহু বৈধ ভোটারকে বাদ দিয়ে হতে চলা নির্বাচনের মুখে যখন আদালতেও শোনা যায় ‘এক বার ভোট দিতে না পারলেও ভোটাধিকার তো চলে যাবে না’, তখনও আমরা ততটা বিচলিত হচ্ছি না— যতটা হয়েছি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে এবং হয়তো রাষ্ট্রপতি শাসনের ভয়ে।

রঘুনাথগঞ্জে রামনবমীর শোভাযাত্রা থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দোকানে হামলা অবশ্য ‘আইনশৃৃঙ্খলা নিয়ে’ সে রকম কোনও উদ্বেগের জন্ম দেয়নি। অমর্ত্য সেন বা জয় গোস্বামীর নাম বিচারাধীন তালিকায় উঠে এলে বা তালিকা থেকে মুছে গেলে নন্দলাল বসুর বংশধরের নাম, আমরা একটু বিচলিত হয়েছি ঠিক, কিন্তু এত মুসলমান ও দরিদ্র হিন্দুর নাম বাদ গেলে নড়েও বসিনি!

তার মানে কি এই যে, ভদ্রলোক (বড়জোর ভদ্রমহিলা) পরিচয়ের বাইরে বাঙালি পরিচয়ের কোনও তাৎপর্য নেই? উনিশ শতকের তথাকথিত ‘নবজাগরণ’-এর ফলে তৈরি হওয়া মূলত ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দু ও ব্রাহ্ম বাঙালির এই শ্রেণি পরিচয় প্রধানত ছিল ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার আগে কি ছিল না বাঙালির গরিমা? ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন, প্রাচীন যুগে বরেন্দ্র/পুণ্ড্র, রাঢ়, বঙ্গ, সমতট-হরিকেল, সুহ্ম প্রভৃতি উপ-অঞ্চলের সমষ্টি ছিল আজকের ‘বাংলা’। ‘বঙ্গ’ বলতে বোঝাত পুব বাংলার বিস্তীর্ণ উপ-অঞ্চলকে। চর্যাপদের কবি ভুসুকুপাদের উক্তি ‘ভুসুকু বাঙ্গালী ভইলা’ কি এই উপ-আঞ্চলিক পরিচয়ই নির্দেশ করে? দশম শতকের পূর্ববঙ্গের রাজা শ্রীচন্দ্রের পশ্চিমভাগ লেখতে ‘বঙ্গালী’ ও ‘দেশান্তরীয়’ বিভাজনের উল্লেখ মেলে কি আজকের বাঙাল-ঘটি বিভাজনের পূর্বসূরি? বাঙালি পরিচয় বরং মূলত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক। আদি মধ্যযুগ থেকেই ‘গৌড়ীয়’ নামের আঞ্চলিক পরিচিতিবাহী গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় হয়ে উঠেছে তার লিপি, ভাষা, সংস্কৃতি। ভদ্রলোক শ্রেণির আবির্ভাবের আগেও এই বাঙালির অর্জন ছিল অনেক। ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার ঠিক আগে পৃথিবীর জিডিপি-র প্রায় এক-চতুর্থাংশ করে ছিল চিন আর ভারতের দখলে— আর সেই মোগল-শাসিত ভারতে সব থেকে বেশি রাজস্ব আসত সুবা বাংলা থেকে। এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পিছনে যেমন ছিল কৃষিসম্পদ, তেমনই ছিল বয়নশিল্পের আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধি। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য পরম্পরায় দেখা যায় বাণিজ্য-সমৃদ্ধ বাঙালি সমাজে স্বীকৃতিলাভের জন্য দেবতারাও হচ্ছেন ধনপতি-চাঁদ সওদাগরের মতো সম্পন্ন বণিকদের মুখাপেক্ষী। ঔপনিবেশিক যুগে বিপুল সম্পদের নির্গমন, বস্ত্রশিল্পের ধ্বংসসাধন, একের পর এক দুর্ভিক্ষ নষ্ট করেছে বাংলার সমৃদ্ধি।

ঔপনিবেশিক শিক্ষার সঙ্গে এসেছে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্ব— বাংলায় বখতিয়ার খিলজির আক্রমণের আগে ও পরে ‘হিন্দু যুগ’ ও ‘মুসলিম যুগ’-এর কল্পনা। অথচ বাঙালি হিন্দুর বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, চৈতন্য-আন্দোলন, কৃত্তিবাসের রামায়ণ, মালাধর বসুর ভাগবতের সৃষ্টি তথাকথিত ‘মুসলিম যুগ’-এ! তার আগের সময়ও কি ‘হিন্দু যুগ’? পালযুগের বাংলার জ্ঞানগরিমার স্তম্ভস্বরূপ নালন্দা-বিক্রমশীলার পণ্ডিত শীলভদ্র বা অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধ ছিলেন, যেমন ছিলেন চর্যাপদের রচয়িতা সিদ্ধাচার্যেরা। বাংলার এই বৌদ্ধ ধর্ম তন্ত্রপ্রভাবিত বজ্রযান-সহজযান, যেখানে বাংলার লৌকিক দেবী উপাসনার ঐতিহ্যও মিশে গিয়েছিল। প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে বৌদ্ধ ধর্ম বাংলা থেকে হারিয়ে গেলেও সহজযানের ছাপ রয়ে গেছে সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্ম থেকে বাউল-ফকিরের সহজ সাধনায়। জনপ্রিয় বৌদ্ধ দেবী তারা রয়ে গেছেন শাক্ত দশমহাবিদ্যার অন্যতমা হয়ে, তারাপীঠের তীর্থ থেকে মিষ্টির দোকানের নামে তাঁর জনপ্রিয়তার ছাপ। বাংলার ধর্মের ইতিহাস এক মিশ্র ধর্মের ইতিহাস, ক্ষিতিমোহন সেন যাকে বলেছেন যুক্তসাধনা। সেই মিশ্রসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান বাংলার ইসলামও।

নবজাগরণের উত্তরাধিকার এই মিশ্র-সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ‘রেনেসাঁস’ শব্দটার অর্থই তো পুনর্জন্ম— ইউরোপের ক্ষেত্রে তা ছিল প্রাচীন গ্রিক-রোমান ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। শুধু নতুন ঔপনিবেশিক শিক্ষার ফল ‘নবজাগরণ’ হতে পারে না যদি তা প্রাচীনতর ঐতিহ্যবিচ্ছিন্ন হয়। নবজাগরণের পুরোধা রামমোহন রায়ের প্রথম বই তুহফাত-উল-মুওয়াহিদিন-এর ভাষা ছিল ফারসি। ইংরেজি শিক্ষার আগেই রামমোহনের একেশ্বরবাদের ভিত তৈরি হয়েছিল উপনিষদ ও কোরানের মেলবন্ধনে। বাঙালির নব্য জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম প্রেরণা স্বামী বিবেকানন্দ ইংরেজি শিক্ষিত হলেও তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ লোকায়ত মিশ্র সাধনার ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই দিয়েছিলেন ‘যত মত তত পথ’-এর ডাক। রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের সঙ্গীতচিন্তায় লালন ফকির-গগন হরকরার বাউল ঐতিহ্যের প্রভাবও অস্বীকার করা যায় কি?

মনে রাখা ভাল, সে দিনের ইংরেজি শিক্ষিত নবজাগ্রত বাঙালি ঠিক মেকলের কাঙ্ক্ষিত বাদামি সাহেবটি তৈরি হয়নি। বাঙালি সংস্কৃতিতে ভদ্রলোক-প্রাধান্যের সমালোচনা সঙ্গত। কিন্তু বাঙালি ভদ্রলোকের উৎকর্ষের সাধনা জনবিচ্ছিন্ন ছিল না। হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়-দীনবন্ধু মিত্র কলম ধরেছেন বাংলার নীলচাষির পক্ষে। গোরা বা ঘরে বাইরে-র মতো উপন্যাসে আত্মসমালোচনা করে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন জনবিচ্ছিন্ন জাতীয়তাবাদের সমস্যা, বুঝিয়েছেন দেশের মানুষকে ভাল না বেসে দেশকে ভালবাসা যায় না। সত্যজিৎ রায় তাঁর শেষ সিনেমা আগন্তুক-এ পাশ্চাত্য আধুনিকতার একমাত্রিক জয়গানকে তীব্র সমালোচনা করেছেন। ৩৪ বছর যাঁরা পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছেন তাঁদের নেতৃত্বে ভদ্রলোক সমাজের আধিক্য নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, তাঁরা ক্ষমতায় এসেছিলেন শ্রমিক-বর্গাদার-উদ্বাস্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রাজনীতিতে। বামশাসনের অবসানে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের পিছনেও ছিল কৃষক আন্দোলন। আজ ভদ্রলোক শ্রেণি ক্ষয়িষ্ণু বলে বাংলা বিপন্ন নয়। বাংলা বিপন্ন বলেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ভদ্রলোক-সংস্কৃতিও আজ অস্তিত্ব-সঙ্কটে, হিন্দি আধিপত্যবাদের সামনে অসহায় এবং আত্মবিস্মৃত। অসহিষ্ণু এব‌ং অসংবেদনশীল।

সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান-সৃষ্টির পর ও-পার বাংলার মানুষ ভাষা-সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশই সম্প্রতি নির্বাচনে প্রতিহত করেছে সাম্প্রদায়িক শক্তির রাষ্ট্র দখলের চেষ্টা।

ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতের অংশ পশ্চিমবঙ্গ তার চরম অস্তিত্ব-সঙ্কটে কোন পথ বেছে নেয়, আসন্ন নির্বাচনে তা দেখার কৌতূহল থাকল।

ইতিহাস বিভাগ, সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal government Bangladesh West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy