E-Paper

ঝোলা থেকে নতুন তাস

দশ বছর কেটে গিয়েছে। নরেন্দ্র মোদী তাঁর সেই ঝোলা থেকে এখন নতুন করে মহিলা সংরক্ষণ আইন বার করে এনেছেন। সামনে পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ বিধানসভা নির্বাচন। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি এ বারও বিজেপির অশ্বমেধের ঘোড়া থামিয়ে দেবেন?

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪৬
ক্ষমতায়ন: সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল পেশ হওয়ায় পটনায় বিজেপি মহিলা মোর্চা সদস্যদের উচ্ছ্বাস, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩।

ক্ষমতায়ন: সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল পেশ হওয়ায় পটনায় বিজেপি মহিলা মোর্চা সদস্যদের উচ্ছ্বাস, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩। ছবি: পিটিআই।

নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ যে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিতে দেশের বাকি রাজনীতিকদের থেকে অনেক এগিয়ে, তা তাঁরা আবার প্রমাণ করলেন। বছর দশেক আগের কথা। ২০১৬-র ডিসেম্বর। তার মাসখানেক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নোট বাতিলের কথা ঘোষণা করেছেন। দেশ জুড়ে সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদে নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, “আমি তো ফকির মানুষ। ঝোলা উঠিয়ে বেরিয়ে পড়ব!”

দশ বছর কেটে গিয়েছে। নরেন্দ্র মোদী তাঁর সেই ঝোলা থেকে এখন নতুন করে মহিলা সংরক্ষণ আইন বার করে এনেছেন। সামনে পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ বিধানসভা নির্বাচন। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি এ বারও বিজেপির অশ্বমেধের ঘোড়া থামিয়ে দেবেন? না কি বিজেপিই আগের পরাজয়ের গ্লানি মুছে সাফল্যের হাসি হাসবে? গোটা দেশ এ নিয়ে চুলচেরা বিচারে ব্যস্ত। এ দিকে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ কিন্তু এখন থেকেই ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন। রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি একেই বলে।

২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে মহিলাদের জন্য তিন ভাগের এক ভাগ আসন সংরক্ষণ করে দিতে চাইছেন তাঁরা। তাই আগামী সপ্তাহে ১৬ এপ্রিল থেকে তিন দিনের সংসদের অধিবেশন বসবে। মহিলা ভোটব্যাঙ্ক ঝোলায় পুরে ফের দিল্লির মসনদে ফিরতে সেরা রাজনৈতিক হাতিয়ার।

২০২৩-এর ২০ সেপ্টেম্বর লোকসভায় দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কিন্তু ঠিক উল্টো কথাই বলেছিলেন। নতুন সংসদ ভবনে সে সময়ই প্রথম বিশেষ অধিবেশন বসেছিল। পাশ হয়েছিল নারী বন্দন অধিনিয়ম ওরফে মহিলা সংরক্ষণ আইন। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের মাস ছয়েক আগে, লোকসভা ও সব রাজ্যের বিধানসভায় তিন ভাগের এক ভাগ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করার আইন পাশ করিয়েছিল মোদী সরকার। লোকসভায় সেই বিল পাশের সময় অমিত শাহ বলেছিলেন, “কিছু পার্টির কাছে মহিলা সংরক্ষণ রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারে। কিছু লোকের কাছে মহিলা ক্ষমতায়নের স্লোগান ভোট জেতার হাতিয়ার হতে পারে। নরেন্দ্র মোদীর কাছে এটা রাজনৈতিক বিষয় নয়।”

সে সময় বিরোধীরা দাবি তুলেছিলেন, চব্বিশের লোকসভা ভোটেই এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলা সংরক্ষণ হোক। অমিত শাহর পাল্টা যুক্তি ছিল, কোন আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হবে, কে ঠিক করবে? (রাহুল গান্ধীর) ওয়েনাড় আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করে দিলে কী হবে? তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজনীতি এড়াতেই সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে আসন পুনর্বিন্যাস কমিশন তৈরি হবে। কমিশনে সব দলের এক জন করে প্রতিনিধি থাকবেন। কমিশন ঠিক করবে, কোন কোন আসন সংরক্ষিত হবে। তার ভিত্তিতে ২০২৯-এর পরে মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর হবে।

সেই আইনে বলা ছিল, আসন পুনর্বিন্যাস কমিশন হবে নতুন জনগণনার পরে। এখন সরকার ২০২৭-এর জনগণনার অপেক্ষা না-করেই জুন মাসে এই কমিশন গঠন করতে চায়, যাতে ২০২৯-এই মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা যায়।

প্রশ্ন হল, কেন? উত্তর, তিন বছর পরের লোকসভা নির্বাচনের জন্য এখন থেকেই তিনটি পরিকল্পনা। এখানেই মোদী-শাহের রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি।প্রথমত, দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পরে চব্বিশের ভোটে ‘চারশো পার’-এর স্লোগান দিলেও লোকসভায় ২৪০-এ আটকে যেতে হয়েছিল, পরের বার সরকারের বিরুদ্ধে আরও অভাব-অভিযোগ তৈরি হবে। নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও কমতে পারে। মহিলা সংরক্ষণ সেই অভাব-অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে, মোদীর জনপ্রিয়তায় পুরনো ধার ফিরিয়ে আনতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ওবিসি শ্রেণির জন্য আসন সংরক্ষণের দাবি আগেই হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া। রাহুল গান্ধী ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রায় প্রথম জাতগণনার দাবি তুলেছিলেন। দাবি ছিল, তফসিলি জাতি, জনজাতির সঙ্গে ওবিসি-দের জনসংখ্যায় কতটা ভাগ, তা গণনা করে সেই অনুযায়ী ওবিসি সংরক্ষণ হোক। তখন নরেন্দ্র মোদী একে ‘শহুরে নকশাল’ দাবি বলেছিলেন। কিন্তু ২০২৫-এর এপ্রিলে সেই মোদী সরকারই ঘোষণা করে, আগামী জনগণনার সঙ্গে জাতগণনা হবে। স্বাধীন ভারতে এই প্রথম। মুশকিল হল, ২০২৭-এর জনগণনায় ওবিসি-দের সংখ্যা নির্ধারণ হলে ওবিসি সংরক্ষণ যেমন বাড়ানোর দাবি উঠবে, তেমনই মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মধ্যেও ওবিসি মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের দাবি উঠবে। অথচ মোদী সরকার মহিলা সংরক্ষণ আইনে বলেছে, মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মধ্যে তিন ভাগের এক ভাগ তফসিলি জাতি, এক ভাগ জনজাতি ও এক ভাগ উচ্চবর্ণ বা জেনারেল ক্যাটেগরির জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। তাই মোদী সরকার ২০২৭-এর জনগণনা তথা জাতগণনার আগেই মহিলা সংরক্ষণ করে ফেলতে চাইছে।

তৃতীয়ত, লোকসভায় আসন বৃদ্ধির নতুন সূত্র এনে সংসদে বিজেপির গড় উত্তর ভারত বা হিন্দি বলয়ের দাপট ধরে রাখতে চাইছে মোদী সরকার। মোদী সরকারের পরিকল্পনা হল, লোকসভার মোট আসন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৫৪৩ থেকে ৮১৬ করে দেওয়া। সেই সঙ্গে সব রাজ্যের লোকসভা আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। বা এখনকার লোকসভা আসন দেড়গুণ করে দেওয়া হবে। ফলে, পাঁচটি দক্ষিণ ভারতের রাজ্যের লোকসভার আসন সংখ্যা ১২৯ থেকে বেড়ে ১৯৫ হবে। উত্তর ভারতের সাতটি বড় রাজ্যের লোকসভার আসন সংখ্যা ২০৩ থেকে বেড়ে ৩০৬ হবে। ৮১৬ আসনের লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৪০৯টি আসন জেতার দরকার হবে। শুধু উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতেই তার তিন-চতুর্থাংশ আসন থাকবে।

জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে লোকসভার আসনও বাড়ার কথা। ১৯৭১-এর জনগণনার পরে সংবিধান সংশোধন করে ২৫ বছরের জন্য লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩টিতে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ২০০১-এ সংবিধানে ৮৪তম সংশোধন করে আরও ২৫ বছরের জন্য লোকসভার আসন সংখ্যা একই রাখা হয়। ২০০৯-এর লোকসভার আগে আসন পুনর্বিন্যাস হলেও সে বার শুধু কেন্দ্রগুলির সীমানা নতুন করে আঁকা হয়েছিল, মোট আসন বাড়েনি। ২০২৭-এর জনগণনার পরে লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে ঠিক ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই লোকসভা কেন্দ্রগুলির সীমানাও নতুন করে ঠিক হবে। আশঙ্কা ছিল, জনসংখ্যার বৃদ্ধিতে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলি এগিয়ে বলে তাদের লোকসভা আসনও বেশি হারে বাড়বে। দক্ষিণ বা পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বেশি সফল। ফলে তাদের লোকসভার আসন সেই হারে বাড়বে না।

কোনও রাজ্য থেকে যাতে বঞ্চনার অভিযোগ না ওঠে, তার সমাধানে ২০২৭-এর জনগণনার অপেক্ষা না-করেই সব রাজ্যেরই লোকসভা আসন ৫০ শতাংশ করে বাড়ানোর সূত্র দিয়েছে মোদী সরকার। যাতে মোট লোকসভা আসনের নিরিখে রাজ্যগুলির লোকসভা আসনের অনুপাত একই থাকে। কিন্তু এই সূত্রেও দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে উত্তর বা উত্তর-পূর্বের ছোট রাজ্যগুলির বঞ্চিত হবে। কারণ বড় রাজ্যের লোকসভা আসন যে ভাবে বাড়বে, ছোট রাজ্যগুলির আসন সে ভাবে বাড়বে না।

মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর করার আগে লোকসভার আসন বাড়ানোর প্রয়োজন কেন? কারণ এখনকার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে তিন ভাগের এক মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করা হলে অনেক পুরুষ রাজনীতিক আর লোকসভায় জিতেই আসতে পারবেন না। তাই মোট আসন বাড়িয়ে তার পরেই মহিলা সংরক্ষণের ব্যবস্থা।

তবে শুধু তো লোকসভার আসন বেড়ে ৮১৬ হবে না। বিধানসভাগুলির আসনও দেড়গুণ হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা আসন ২৯৪ থেকে বেড়ে ৪৪১-এ গিয়ে দাঁড়াবে। ৮১৬ জনের লোকসভায় বা ৪৪১ জনের বিধানসভায় কি কোনও বিষয়ে সুষ্ঠু আলোচনা করা সম্ভব হবে? না কি তা শুধু সরকারি বিলে সিলমোহর দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হয়ে যাবে? বিজেপি শীর্ষনেতৃত্ব কি সেটাই চান? তাঁরা তো এমনিতেই রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিতে অনেকটা এগিয়ে!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Central Government Narendra Modi Women Reservation Bill

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy