যে যেখানে লড়ে যায়, তা আমাদেরই লড়াই হলেও হতে পারে। কিন্তু যে যেখানে জিতে যায় তাকে আমাদের জয় বলে খুশি হওয়া কতটা যথাযথ? গত বছর ২ নভেম্বর মধ্যরাতে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের বিশ্বজয়ের পর থেকে যে অভিনন্দনের স্রোত বইছে, তার এক পাশে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন কিন্তু কারও কারও মনে গভীর হয়ে বাজছে যে, এই জয় সামগ্রিক ভাবে ‘মেয়েদের’ কতটা এগিয়ে দিল? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরও জানা। মেয়েদের এই ক্রিকেট বিশ্বকাপ কবে শুরু হয়েছিল, আমরা জানতাম না; প্রথম দিকের খেলাগুলোর হারজিত আমরা খেয়ালও রাখিনি। ভারতীয় দল সেমিফাইনালের আগে হেরে বিদায় নিলে এই ‘মেয়েদের খেলা’ নিয়ে আমাদের কিচ্ছু এসেও যেত না। তাই আমরা যা উদ্যাপন করছি, সেটা আসলে ভারতের সাফল্য। এর সঙ্গে আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে মেয়েদের ওঠাপড়া বড় একটা সম্পর্কিত নয়।
এই কথাটা মেয়েদের বার বার ঠেকে শিখতে হয় জীবনভর। নারী স্বাধীনতা, নারী মুক্তি— এই সব নিয়ে কথা বলতে গেলে এক ঝলকে যে মেয়েদের ছবি চোখে ভেসে আসে, শুধু সেই অসহায় মেয়েদের কথাই বলছি না, তাঁদের থেকে বহু দূরের আলোকিত বৃত্তে বাস করেন যে উচ্চশিক্ষিত মেয়েরা, কথাটা তাঁদের ক্ষেত্রেও একই রকম সত্যি। ছেলেদের পাশাপাশি একই ভাবে পড়াশোনা (এবং গবেষণা) শেষ করার পর সংসারজীবন ও মাতৃত্বের আঙিনায় প্রবেশ করে প্রায় স্বাভাবিক নিয়মেই এই মেয়েরা অনেকে পুরুষ সহকর্মীদের থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েন। কিন্তু যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়েরা কোনও চাকরিতে না ঢুকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার (বিজ্ঞান) জগতেই থাকার স্বপ্ন দেখেন, সেই মেয়েদের জন্য এই শতকের শুরুর দিক থেকেই (২০০১) কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে কিছু প্রকল্পের অবতারণা করা হয়েছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতর (ডিএসটি)-এর ‘মহিলা বিজ্ঞানী প্রকল্প’। সাংসারিক কারণে যে সব মহিলা ‘কেরিয়ার’-এর দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন, তাঁদের বিজ্ঞান গবেষণার মূলধারায় ফিরিয়ে আনার (ঠিক এই কথাটাই লেখা আছে) মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই প্রকল্প চালু হয়েছিল। কিন্তু ঠিক সিকি দশক পরে এই প্রকল্পগুলির কী হাল?
এই সময়কালের মধ্যে বার বার নাম (প্রথমে ‘দিশা’, পরে ‘কিরণ’), উদ্দেশ্য ও বিধেয় বদলে ‘মহিলা বিজ্ঞানী প্রকল্প’ আজ যেখানে দাঁড়িয়েছে, সে কথাটা আগে বলি। এক-একটা তিন বছরের প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু মহিলাকে পিএইচ ডি করার সুযোগ দেওয়া, যাঁদের পিএইচ ডি ডিগ্রি আছে, তাঁদের গবেষণাবৃত্তি ও গবেষণার খরচ চালানোর জন্য কিছু অনুদান দেওয়া ছিল এই প্রকল্পের (ডব্লিউওএস-এ) মুখ্য কার্যক্রম। এ ছাড়াও বিশেষ সামাজিক গুরুত্ব আছে এমন কাজের (ডব্লিউওএস-বি) জন্য বৃত্তি ও অনুদান দেওয়াও এর আওতায় পড়ে। মোটের উপরে একটা চাকরির সমমানের বৃত্তি এবং প্রায় সব বয়সের মহিলাদের জন্য কিছু গবেষণার সুযোগ ছিল প্রকল্পের অন্তর্গত। কিন্তু প্রথম কয়েক বছর পর থেকেই এই প্রকল্প তার বৃহত্তর উদ্দেশ্য থেকে ক্রমাগত বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। দেখা গিয়েছে, যাঁরা পিএইচ ডি করতে চাইছেন, এই প্রকল্প মূলত তাঁদেরই সাহায্য করছে, পরবর্তী ধাপের গবেষকদের জন্য বরাদ্দ অনুদান ক্রমাগত অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। অথচ পিএইচ ডি ডিগ্রি না-পাওয়া অবধি এক জন গবেষককে প্রচলিত অর্থেও বিজ্ঞানী বলা যায় না। সেই জন্যই পিএইচ ডি-র আগে গবেষকের গবেষণা বৃত্তি ও অনুদান, দুই-ই অনেক কম। সে দিক থেকে যাঁরা ডিগ্রি পেতে চাইছেন, আর যাঁরা স্বাধীন গবেষণা করতে চাইছেন, তাঁদের একই নামের প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করাটা প্রাথমিক ভাবে এই পরিকল্পনার একটা ত্রুটি। কিন্তু এই ত্রুটিকে ব্যবহার করেই মহিলা বিজ্ঞানী প্রকল্প ‘সুলভ মূল্যে’ খাতায় কলমে চালু আছে, ‘আউটকাম’ কেন্দ্রিক বর্তমান জমানায় কিছু পিএইচ ডি উৎপাদন করছে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে মহিলা বিজ্ঞানী যাঁরা, তাঁদের উপর থেকে সাহায্যের হাত তুলে নিচ্ছে। কাজ শুরুর সময় থেকে তিন বছরে তিন ধাপে টাকা আসার বদলে মাত্র এক বা দু’বার টাকা আসছে। এক জন মহিলা যে কাজের পরিকল্পনা করে দরকারি যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সব কিছুর দাম ধরে একটা হিসাব পাঠিয়েছেন, টাকার অভাবে তিনি কিছুই না কিনতে পেরে শুধু মাসের মাইনেটুকু নিয়ে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এই হাল চলেছে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আর এতদ্দ্বারা বিজ্ঞানী নামধারী এক জন উচ্চশিক্ষিতা পেশাদার কার্যত এক জন সীমিত সময়ের ভাতাধারীতে পরিণত হয়েছেন। কাজের মধ্যে দিয়ে মূলধারায় ফিরে আসার যে স্বপ্ন তাঁদের দেখানো হয়েছিল, তাও একবারেই সফল হয়নি। এই পরিকল্পনার গোড়াতেই অনেক গলদ ছিল যেগুলো সংশোধন করে নিলে এই প্রকল্প মহিলাদের বিজ্ঞানের গবেষণায় লেগে থাকার পক্ষে সত্যিই সহায়ক হয় উঠতে পারত; সে বিষয়ে কারেন্ট সায়েন্স পত্রিকায় (২৫ অক্টোবর, ২০১৬) আমাদেরই লেখা একটি প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করব। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সদিচ্ছার অভাবে শুধু নিয়মরক্ষার চক্রে পড়ে প্রকল্পটি পুরোপুরিই দিশা হারিয়ে ফেলল।
নিয়মরক্ষার মুখোশও ইদানীং অটুট থাকছে না। বছর দুই আগে যাঁদের ডব্লিউওএস-এ ‘প্রোজেক্ট’ শুরু হয়েছিল, প্রথম দফার অনুদানের পর আর কোনও সাড়াশব্দ নেই। ফলে মাসের মাইনেটুকুও আর আসছে না। এমনকি যে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মহিলা বিজ্ঞানীরা নিজেদের নথিভুক্ত করে প্রোজেক্ট পাঠিয়েছেন, যেখানে তাঁর প্রোজেক্টের সব তথ্য রাখা থাকে, সেই সাইটই আর খোলা যাচ্ছে না। এর মধ্যে ডিএসটি নাম বদলে ‘অনুসন্ধান ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (এএনআরএফ) হয়েছে। কিন্তু তার জন্য আগে থেকে চালু ‘প্রোজেক্ট’গুলো বন্ধ হয়ে যাবে— এমন কিছু বলা হয়নি। আর দেড়-দুই বছর আগে থেকে ডব্লিউওএস (‘এ’ আর ‘বি’, দুই-ই) প্রোজেক্ট পাঠিয়ে আবেদন করে ইন্টারভিউ দিয়ে যাঁরা অপেক্ষা করেছেন এখনও তাঁদের ফলাফলই জানানো হয়নি। অর্থাৎ, সাংসারিক কারণে যাঁরা গবেষণায় পিছিয়ে পড়েছেন, তাঁদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার নামে এই ভাবে বছরের পর বছর বসিয়ে রাখা যায়, কিংবা কিছু না বলে মাইনেটাও বন্ধ করে দেওয়া যায়, যেন এটা অনুদান নয়, ভিক্ষা! গবেষকদের অভিজ্ঞতা বলে, ডিএসটি-র তরফে ফল প্রকাশে বা টাকা পাঠানোয় ছ’মাস থেকে আঠারো মাস দেরি প্রায় স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু এ বার যা হচ্ছে সেটা নতুন।
সব প্রশ্নের উত্তরে ডিএসটি একটি কথাই সবাইকে বলে, ‘অনুদানের অভাব’। কিন্তু এই পরিকল্পনার খাতে ধারাবাহিক ভাবে অনুদানের এতটা অভাব কেন? ডিএসটি বিভিন্ন প্রোজেক্টে তো অনেক বেশি অনুদান দেয় (যদিও ক্রমহ্রাসমান), এখানে নয় কেন? কারণ মেয়েদের এগোতে সাহায্য করাটা সরকারের কাছে অগ্রাধিকার তো পায়ই না, কিছুটা বাজে খরচের মতো দেখা হয়। কিন্তু এতটা আর্থিক দৈন্য নিয়ে একটা পরিকল্পনা কী ভাবে চালু থাকে, চালু থেকে লাভ কী, তারও কি উত্তর আছে? যাঁরা পিএইচ ডি-র জন্য গবেষণা শুরু করেছেন, প্রথম বা দ্বিতীয় বছরে এই প্রোজেক্টে আবেদন করলে তাঁদের তবু বৃত্তি পাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু যাঁরা তৃতীয় বছরে আবেদন করেছেন, তাঁদের তো বৃত্তি মঞ্জুর হয়ে হাতে আসতে পিএইচ ডি শেষ হয়ে যাবে। তা ছাড়া বিজ্ঞানের গবেষণা শুধু বৃত্তিটুকুই নয়, অন্যান্য খরচ আছে, যে কারণে এই প্রোজেক্টের কথা ভাবা হয়েছিল। সেই খরচ আসবে কোথা থেকে?
মহিলা বিজ্ঞানী প্রকল্পের ‘বেটি’-রা উচ্চশিক্ষিতা, গবেষণার ক্ষেত্রে দেশের অগ্রগতিতে তাঁদেরও ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু গবেষণা তো ক্রিকেট-ফুটবলের মতো কোনও তাক লাগানো ব্যাপার নয়। তার যুদ্ধ অন্য রকম, সাফল্যও অমন চমকদার, ঝলসে ওঠার মতো হয় না। তার উপর সাংসারিক দায়িত্বে কিছুটা বিপর্যস্ত, গবেষণার মূলধারা থেকে সরে যাওয়া মেয়েরা যদি এই রকম ‘সহায়তা’ পান, তা হলে তাঁদের পক্ষে গবেষণায় কতটা এগোনো সম্ভব, সহজে অনুমেয়। মহিলা বিজ্ঞানী প্রকল্পের সহায়তা নিয়ে মহিলাদের প্রকৃত অর্থে বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়েই যাচ্ছিল, আপাতত বিলীন হয়ে গিয়েছে। লড়াই শুরুর আগেই তাঁরা হেরে যাচ্ছেন আর দিনের শেষে তাঁদের বৃত্তিও স্রেফ ‘পয়সা’ হিসেবেই ভাবা হচ্ছে। প্রায় এক দশক আগে যিনি এই প্রকল্পের হতাশাজনক দিকটির কথা তুলে ধরেছিলেন (‘মেয়েরা সংসার করবে, বিজ্ঞানীও হবে?’ ২৭-১০-১৬), এই গণ্ডি থেকে বেরিয়ে গিয়েও তিনি আজ আরও হতাশার কথাই লিখতে বাধ্য হলেন। এটাই দুঃখ।
রসায়ন বিভাগ, সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)