“The amount of missing women tell us quietly, a terrible story of inequality and neglect leading to the excess mortality of women.”— অমর্ত্য সেনের কথা। নারী-পুরুষের অনুপাতও সারা বিশ্ব জুড়ে কমে আসছে। দায়ী, স্ত্রী ভ্রুণ হত্যা, মেয়ে শিশুদের উপর অত্যাচার আর অবহেলা। সামগ্রিক চিত্রটা ভয়ঙ্কর। একশো সতেরো মিলিয়ন নারী জন্মের আগেই হারিয়ে গিয়েছে গর্ভপাতের মাধ্যমে শুধু মাত্র স্ত্রী ভ্রুণ বলে। তথ্যটি ইউনাইটেড নেশনসের। ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক স্বীকার করে নিয়েছে আমাদের দেশে এই ধরনের গর্ভপাত অধিকাংশ সময়ই বেআইনি ভাবে হয়। 

এই ধরনের গর্ভপাতের সংখ্যাটাও মারাত্মক। ভারতের পপুলেশন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৪ সালে শুধু স্ত্রী ভ্রুণের গর্ভপাত ঘটানোর সংখ্যাটি ১২৭৭১০৪৩। একবার ভেবে দেখুন, গড়ে দৈনিক ২৩৩২টি এই ধরনের অপকর্ম করা হয়েছে। ছ’বছরের কমবয়সী মেয়ের সংখ্যা ২০০১ সালে ছিল ৭৮.৮৩ মিলিয়ন, সেখানে ২০১১ সালে দাঁড়িয়েছে ৭৫.৮৪ মিলিয়নে। আর নারী পুরুষের অনুপাত ১৯৯১সালে হাজারে ৯৪৫ থেকে নেমে ২০১১ সালে দাঁড়িয়েছে ৯১৪। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অনুপাত ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী হাজার পুরুষ প্রতি নারীর সংখ্যা ৯৫০। কেরালা আর পুদুচেরী ছাড়া সর্বত্র নারীর সংখ্যা নিম্নগামী। 

সারা বিশ্বে জন্মকালীন লিঙ্গ অনুপাতে প্রতি ১০১টি পুরুষ শিশুতে একশোটি স্ত্রী শিশু রয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে সেখানে একশো দশটি পুরুষ শিশু প্রতি একশো স্ত্রী শিশু রয়েছে।

সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পিছনে এ এক বিরাট কারণ। দেখা গিয়েছে নির্যাতন, যথাযথ খাদ্য এবং চিকিৎসার অভাব— এ সবের কারণে বালিকা থেকে পূর্ণ বয়স্ক নারী হওয়ার আগেই হারিয়ে যায় অনেকে। কিছু অদ্ভুত ধারণা আর কিছু অমানবিক নিয়মের জন্য দায়ী। একটি মেয়ে যতটা কাজ করতে পারে, তার চেয়ে এক জন পুরুষ অনেক বেশি কাজ করতে পারে এই ধারণাটা কম্পিউটার, স্মার্টফোনের যুগে একেবারেই অচল। আজকের পৃথিবী শুধু মাত্র কায়িক শ্রমের উপরে চলে না। দেখা গিয়েছে সূক্ষ্ম কাজে মেয়েরা অনেক বেশি পারদর্শী। আরেকটি অদ্ভুত কারণ আছে স্ত্রী ভ্রুণ হত্যার। একবিংশ শতাব্দীতে বসে পণপ্রথার মতো একটি কাজকে যারা প্রশ্রয় দেয় তাদের জন্য শুধু ঘৃণাই যথেষ্ট নয়। পরোক্ষ ভাবে নারী হয়ে যায় তার বাড়ির মানুষদের কাছে অর্থনৈতিক ভাবে বোঝা। মেয়ে আর মানুষ শব্দ দু’টির সমাপতন বড্ড নিচু করে দেয় নারীকে— “ইচ্ছে করে যাই,/ পৃথিবীর সমস্ত বালিকা দিই/ গোল্লা থেকে ছুট।” তসলিমা নাসরিনের ভাষা থেকে বলা যায় পৃথিবীর সমস্ত মেয়েমানুষ শুধু মানুষ হওয়ার দিকে এগিয়ে যাক। হোক প্রতিবাদ। কলরবও হোক না— পণপ্রথা আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে। 

স্ত্রী ভ্রুণ হত্যা রুখতে আইন কি করছে? ১৯৯৪ সালে তৈরি হয়েছে PNDT act। জন্মের আগে লিঙ্গ নির্ধারণের আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। PNDT act-এর কিছু পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে ২০০৩-সালে। এমন কোনও আলট্রাসোনোগ্রাফি মেশিন, যার দ্বারা জন্মের আগে ভ্রুণস্থ শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ করা যায়, সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাকে বিক্রি করা যাবে না।  ১৯৭১ সালে তৈরি হওয়া গর্ভপাত আইনের কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে ২০০২ সালে। যদি কুড়ি সপ্তাহ প্রেগন্যান্সি চলার পর বোঝা যায়— আর এগোতে দিলে মায়ের জীবনহানি হতে পারে কিংবা তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ভীষণ ক্ষতি করবে ওই ভ্রুণ, তা হলেই গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়া হয়। 

২৪ জানুয়ারি ভারতে ‘ন্যাশনাল গার্ল চাইল্ড ডে’ হিসাবে পালন করা হয়। শুরু হয়েছে ২০০৮ সাল থেকে। উদ্যোক্তা ভারতের নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রক। প্রাথমিক ভাবে লক্ষ্য ছিল, ভারতীয় মেয়েরা যে বৈষম্যের শিকার সে দিকে নজর দেওয়ার এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুষম খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর। এছাড়াও আইনের সহায়তা, সুচিকিৎসা, শিশু বিবাহ রোধ ইত্যাদি ব্যাপারগুলির দিকে নজর দেওয়া হয়।

মেয়েদের দিন— ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে অব দ্য গার্ল চাইল্ড’ পালিত হয় ইউনাইটেড নেশনসের উদ্যোগে। অক্টোবরের ১১ তারিখকে বেছে নেওয়া হয়েছে মেয়েদের দিন হিসেবে। শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে। সারা বিশ্ব জুড়ে পালিত হয় দিনটি। এক এক বছরে একেকটা থিম ঠিক করে দেওয়া হয়। প্রথম বছরের থিম ছিল ‘এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ’। গত বছরের থিম ‘উইথ হার— এ স্কিলড্ গার্ল ফোর্স’। এ বছরের থিম ‘এমপায়ারিং গার্ল ফর এ ব্রাইটার টুমরো’— কন্যাশিশুকে আরও ক্ষমতা দেওয়া আমাদের আলো ঝলমলে ভবিষ্যৎ তৈরি করার জন্য।  

আর আমাদের পুরাণের গল্প তো তাই বলে। দেবী দুর্গা সকলের থেকে অস্ত্র ও শক্তি নিয়ে তৈরি হন অকল্যাণের বিনাশ করবেন বলে। সেই যুদ্ধ আবার নতুন মোড়কে। 

“যত্র নার্য্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ। যত্রৈতাস্তু ন পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ।।”— মনুসংহিতার এই শ্লোকটির মূল অর্থ এই— যে সমাজ নারীকে যথাযোগ্য সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখায় সেই সমাজ উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি লাভ করে। আর না হলে বিফলে যায় সব কাজ।

প্রতিটি বালিকাকে তার নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। সমাজের আজ শপথ নেওয়ার দিন— ভবিষ্যতের প্রতিটি দুর্গাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরপত্তার অস্ত্র দিয়ে সাজিয়ে দিতে হবে কুসংস্কার, পণপ্রথা, অবহেলা নামক অসুরকে ধ্বংস করার জন্য। 

শক্তিনগর জেলা হাসপাতালের শল্যচিকিৎসক