সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বয়ানটির কালি এখনও শুকায় নাই। তাহার আগেই প্রধানমন্ত্রী মোদী, প্রধান বিচারপতি অনুমোদিত বিচারক সিক্রি এবং বৃহত্তম বিরোধী দলের নেতা মল্লিকার্জুন খড়্গের তিন সদস্যের কমিটি ২-১ ভোটে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে রাতারাতি পাল্টাইয়া দিল। সমগ্র ঘটনাটি চোখ কপালে তুলিবার মতো— বিস্ময়ে নহে, আতঙ্কে। অলোক বর্মাকে যে এই ভাবেই সিবিআই শীর্ষকর্তার পদ হইতে যেন তেন প্রকারেণ সরাইয়া দেওয়া হইবে, গোটা দেশ যেন তাহা আগে হইতেই জানিয়া ফেলিয়াছিল। প্রধান সরকারি তদন্ত সংস্থার কর্ণধার কে হইতে পারেন না, তাহা নিশ্চিত করিবার জন্য সরকারের শীর্ষ মহল হইতে যে কোনও পন্থা বা পদ্ধতি অনুসরণ করা হইতে চলিয়াছে— তাহাও সর্বজনের অনুমানের বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। সুতরাং, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতার দিক দিয়া এই ঘটনার অর্থ কী, বুঝিতে কষ্ট হয় না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভিত পর্যন্ত নষ্ট করিয়া শাসক দলের এই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখিয়া আতঙ্কিত হওয়ারই কথা। এমনকি শাসক দলের যে সাংসদরা ইতিপূর্বে কখনও নিজেদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করিবার চেষ্টা করেন নাই, যেমন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী, তাঁহারাও ত্বরিত প্রতিক্রিয়া দিয়াছেন, ‘শকিং’! প্রধানমন্ত্রী মোদী অবশ্যই এই বিরাট ‘কৃতিত্ব’-এর মুহূর্তটিকে তাঁহার শাসনের শিরোমূহূর্ত বলিতে পারেন। সিবিআই-এর সহিত সরকারের সম্পর্ক সব সরকারের আমলেই সন্দেহের অধীন। কিন্তু মোদী সরকারের আমলে দেশশাসনের নামে কোন ধরনের কর্তৃত্ববাদ ও স্বৈরতন্ত্র চলিল, তাহার প্রতীক হিসাবে এই সপ্তাহের সিবিআই-মুহূর্তটি চূড়ান্ত হইয়া থাকিবে।

অলোক বর্মার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলি সরকারি ভাবে আনীত হইয়াছে, তাহার অধিকাংশই তথ্যপ্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয় নাই। অথচ বিচারপতি সিক্রি জানাইয়াছেন, অভিযোগের ভিত্তিতেই বর্মাকে আর এই পদে রাখা যায় না। যে প্রতিপ্রশ্নটি এখানে উঠিবার কথা, কিন্তু যাহা উঠিতে দেওয়া হয় নাই, সেটি হইল: সর্বোচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষা করিয়া কমিটি একতরফা ভাবে সিদ্ধান্ত লইতে পারে কি না। অভিযুক্তকে নিজপক্ষে কিছু বলিবার সুযোগ পর্যন্ত না দিয়া সেই সিদ্ধান্ত বলবৎ করিতে পারে কি না। প্রশ্নটি আলঙ্কারিক মাত্র। ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়া সকলেই এই ঘটনা বিষয়ে একটি শব্দ ব্যবহার করিবেন: ‘শকিং’। 

আটচল্লিশ ঘণ্টারও কম সময়ের জন্য ফিরিয়া আসিয়াছিলেন সিবিআই-এর পূর্বতন অধিকর্তা অলোক বর্মা। অত্যল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি স্থানান্তরকরণের নির্দেশ দিয়াছিলেন। তাঁহাকে সরাইয়া যে নাগেশ্বর রাওকে প্রধান করা হইল, তিনি আরও দ্রুত সেই সব নির্দেশ প্রত্যাহার করিয়াছেন। স্পষ্টতই, সিবিআই-এর অন্দরযুদ্ধের ফলে শাসকের পক্ষে অসুবিধাজনক কোনও তথ্য যাহাতে বাহির না হয়, সেই লক্ষ্যেই এত অবিশ্বাস্য দ্রুত পদক্ষেপ। যুদ্ধটি ঠিক কোন পরিসরে, সাধারণ নাগরিকও সহজেই অনুমান করিতে পারেন। সকলেই জানিয়া গিয়াছেন, অলোক বর্মা প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত তদন্ত পরিচালনা করিতেছিলেন, সেই সংক্রান্ত বহু ফাইল তাঁহার তত্ত্বাবধানে ছিল, এবং এই মুহূর্তে রাফাল নামক যুদ্ধবিমান সংক্রান্ত অভিযোগই শাসক দলের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের সর্ববৃহৎ অস্ত্র। সুতরাং, এক দিক দিয়া বর্মাকে সরাইবার প্রয়াসের মধ্যে দুর্নীতির দুর্গন্ধ ভয়ানক রকমের প্রকট। অন্য দিকে, সিবিআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানের যে শাসক দলের পুতুল ছাড়া কিছু হইবার অবকাশ নাই, তাহাও আলোর মতো স্পষ্ট। বর্মা বিদায়কালীন বার্তায় বলিয়াছেন, দেশের পক্ষে এ এক ‘সর্বজনীন অন্তঃসমীক্ষা’র সময়। অন্তঃসমীক্ষা বলিবে, মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্ব দেশের গণতন্ত্রকে যে নিম্নতম বিন্দুতে নামাইয়াছে, তাহা হইতে উদ্ধার সহজ হইবে না।