প্রশ্ন: সম্প্রতি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি বলেছেন, কংগ্রেস যে দিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল— বন্দে মাতরম্ গানটির প্রথম দু’টি স্তবক ছাড়া বাকি গানটি রাজনৈতিক মঞ্চে গাওয়া হবে না, সেই দিনই দেশভাগের বীজ বপন করা হয়েছিল। ভয়ঙ্কর রকমের অতিসরলীকরণ কথাটার মধ্যে। তবে এই প্রসঙ্গে এক বার ফিরে ভাবা দরকার, কংগ্রেসকে সিদ্ধান্তটা কেন নিতে হয়েছিল। এটা তো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পিছনে একটা দীর্ঘ প্রেক্ষাপট আছে। আপনি ইতিমধ্যে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সুভাষচন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহরু দুই জনে বিষয়টি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তাঁরা সকলে আলোচনা করেই স্থির করেছিলেন, প্রথম স্তবক ছাড়া বাকিটা গাওয়া হবে না। 

সুগত বসু: এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। বন্দে মাতরম্ গান রচিত হয় ১৮৭৫ সালে, সেটি আনন্দমঠ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৮৮২ সালে। বন্দে মাতরম্ একটি মন্ত্রের মতো গৃহীত হয় স্বদেশি যুগে, ১৯০৫ থেকে। গাঁধীজির নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনেও বন্দে মাতরম্ ধ্বনি দেওয়া হয়। গাঁধীজি ও শওকত আলি মিলে তিনটি জাতীয় ধ্বনি স্থির করেন। প্রথমটি ছিল আল্লাহু আকবর। দ্বিতীয়টি— হয় ভারতমাতা কি জয়, নয়তো বন্দে মাতরম্। গাঁধী বন্দে মাতরম্ই বেশি পছন্দ করেছিলেন, কারণ ওঁর মনে হয়েছিল এটি গ্রহণ করলে বাঙালিদের বৌদ্ধিক ও আবেগগত অবদান স্বীকার করা হবে। বাঙালিদের উনি ওঁর আন্দোলনে চেয়েছিলেন বলেই এই ভাবনা। আর তৃতীয় ধ্বনিটি ছিল, হিন্দু-মুসলমান কি জয়।

এখন, ১৯২০ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত কিন্তু বন্দে মাতরম্ নিয়ে তেমন বিতর্ক হয়নি। সমস্যা শুরু হয় উনিশশো তিরিশের দশকে। কারণটা সহজ। সংস্কৃতি তো বিভেদ তৈরি করে না, এক ধরনের সঙ্কীর্ণ রাজনীতির জন্যই বিভেদ সৃষ্টি হয়। ব্যাপার হল, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস যথেষ্ট ভাল ফল করে। ১১টি রাজ্যের মধ্যে ৭টি রাজ্যে তারা ক্ষমতায় আসে। অন্য দিকে মুসলিম লিগ তত ভাল করতে পারে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেস একটা বিজয়গর্ব দেখানোর জন্য বলতে শুরু করেছিল বন্দে মাতরম্ গাইতেই হবে, সরস্বতী বন্দনা করতেই হবে ইত্যাদি। ১৯৩৭ সাল মানে, নেহরু তখন কংগ্রেসের সভাপতি, সুভাষ বসু সভাপতি হবেন বলে শোনা যাচ্ছে। মুসলমান সম্প্রদায় থেকে জোর করে বন্দে মাতরম্ গাওয়ানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে জওহরলাল নেহরু ও সুভাষ বসুর মধ্যে চিঠি বিনিময় শুরু হয়। সুভাষ বসু বলেন যে অক্টোবর মাসে এআইসিসি অধিবেশনের আগে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ নেওয়া ভাল। রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত চিঠি লেখেন সুভাষচন্দ্রকে, বলেন যে, ‘বাঙালি হিন্দুরা এই আলোচনা নিয়ে চঞ্চল হয়েছেন, কিন্তু ব্যাপারটি একলা হিন্দুর মধ্যে আবদ্ধ নয়। উভয় পক্ষেই ক্ষোভ যেখানে প্রবল, সেখানে অপক্ষপাত বিচারের প্রয়োজন আছে। রাষ্ট্রীয় সাধনায় আমাদের শান্তি চাই, ঐক্য চাই, শুভবুদ্ধি চাই। কোনও এক পক্ষের জিদকে দুর্দম করে হারজিতের অন্তহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা চাইনে।’ পরে সংবাদমাধ্যমেও বিবৃতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, বন্দে মাতরম্-এর প্রথম অংশটি সুন্দর, একটি কোমল মধুর ভাবের উদ্রেক হয় বঙ্গমাতা বা ভারতমাতার জন্য, সেটি জাতীয় সমাবেশে গাওয়ার উপযোগী, তাতে কারও আপত্তি থাকতে পারে না। কিন্তু দ্বিতীয়াংশে যে ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী কমলা কমলদলবিহারিণী’ ইত্যাদি, তাতে আপত্তি ওঠারই কথা। কোনও গানের আসরে সম্পূর্ণ গানটি গাওয়া চলতেই পারে। কিন্তু কোনও জাতীয় সমাবেশে তা উচিত নয়। যখন জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গানটি গাওয়া হচ্ছে, যখন সব ধর্মের মানুষ একত্র হচ্ছেন— প্রথমাংশটিই গাওয়া উচিত।

রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ কংগ্রেস গ্রহণ করে। হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক দৃঢ় করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। বন্দে মাতরম্ গানটির অসম্মান করাটা লক্ষ্য ছিল না। কেনই বা থাকবে, রবীন্দ্রনাথই তো ১৮৯৬ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে সুর দিয়ে গানটি গেয়েছিলেন।

প্র: অর্থাৎ, সে দিন যেমন জাতীয় সমাবেশে শেষের স্তবকগুলি না গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তেমনই আবার প্রথম দু’টি স্তবক গাইবার কথাও হয়। সুভাষ বসু বন্দে মাতরম্ বলেই কংগ্রেসে নিজের অভিভাষণ শেষ করেছিলেন। বন্দে মাতরম্ কথাটুকুর মধ্যেই যথেষ্ট হিন্দু-ভাব— মাতৃভাবনা-দেবীভাবনার সাযুজ্য— তা সত্ত্বেও গানটিকে কেন ওই বিশেষ জায়গা দেওয়া হল?

উ: দুটো কথা বলব এই সূত্রে। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই একটা হিন্দু ভাব রয়েছে এর মধ্যে। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ বা বিশ শতকের প্রথমে এই ধরনের বেশ কিছু ‘হিন্দু ভাব’ ভারতের জাতীয়তাবাদে স্থান পেয়েছিল। আবার মুসলিম প্রতীকও জায়গা পেয়েছিল। অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের সময়ে ইসলামের সেই ‘ক্ষীণ শশাঙ্ক বাঁকা’ও  আমাদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয়তাবাদের অংশ।

আসলে, সাম্প্রদায়িক কথাটা ১৯২৮-২৯ সালের আগে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হত না। ঠিক যে রকম, বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলের প্রতীক ভারতের জাতীয়তাবাদে জায়গা পেয়েছিল, বিভিন্ন ধর্মীয় ভাবও তাতে জায়গা করে নেয়। ইউনিটারি বা একীভূত জাতীয়তাবাদ জিনিসটা শুরু হল ১৯২৯-৩০ সাল থেকে। তার পর থেকেই সাম্প্রদায়িকতা বিষয়টাও আমরা অন্য ভাবে বুঝতে শুরু করলাম।

রবীন্দ্রনাথ দুটো কথা বলেছিলেন গানটি বিষয়ে। এক, দ্বিতীয় অংশে দুর্গার আরাধনা রয়েছে। দুই, ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের অংশ এটি, যাতে মুসলমানবিরোধী কিছু কথা ছিলই। ফলে সব মিলিয়ে দ্বিতীয় অংশটি বাদ দেওয়াই উচিত। কিন্তু তিনি এও বললেন, যে দিন থেকে বন্দে মাতরম্ কথাটি একটা ধ্বনি বা মন্ত্রের মতো ব্যবহার হতে শুরু করল, তখন থেকে অনেক বিপ্লবী এই মন্ত্রের জন্য বিরাট আত্মত্যাগ করেছেন, এই ধ্বনি মুখে নিয়ে কারাগারে রুদ্ধ হয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন। তাই সকলেরই, বিশেষত মুসলমান ভাইদের মনে রাখা উচিত যে এই ধ্বনির সঙ্গে কিন্তু অনেক বলিদানের স্মৃতি জড়িত। বন্দে মাতরম্ ধ্বনিকে তাই শ্রদ্ধা জানাতেই হবে।

পরবর্তী কালে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে জনগণমন অধিনায়ক-কে বেছে নেওয়া হলেও এখনও পর্যন্ত সংসদে বন্দে মাতরম্ ও জনগণমন দু’টি গানই বাজানো হয়। একটি বাজানো হয় সংসদীয় অধিবেশনের শুরুতে, একটি অধিবেশনের শেষে।

প্র: ‘সাম্প্রদায়িক’ কথাটি ব্যবহার না করলেও, আপনি কি বলবেন, ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের মধ্যে একটা অসহিষ্ণুতা প্রকাশিত? তনিকা সরকারের মতো ইতিহাসবিদরা বলেছেন বঙ্কিমের ভাবনাচিন্তার এই বিবর্তনের কথা, তার পিছনে  জাতীয়তাবাদের ভূমিকার কথা। একটা পরিবর্তন না মেনে হয়তো উপায় নেই, কেননা ‘আনন্দমঠ’-এ যেমন মুসলমানবিরোধী কিছু কথা আছে, বঙ্কিমই তো আবার আগে অন্য উপন্যাসে মুসলিম নারীর মুখ দিয়ে হিন্দু রাজার সম্পর্কে বলিয়েছেন সেই অমর বাক্য: ‘‘এই বন্দী আমার প্রাণেশ্বর!’’  

উ: এই যে উদ্ধৃতিটা দিলে, ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসে আয়েষার মুখের কথা— সেটি রচনা হয়েছিল ১৮৬০-এর দশকে। দেখো, বঙ্কিমকে কিন্তু আমি কখনওই নেতিবাচক অর্থে সাম্প্রদায়িক বলতে প্রস্তুত নই। তার অনেক কারণ। প্রথমত, ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসে ঐতিহাসিক পটভূমিটি হল মুঘল এবং আফগানের মধ্যে যুদ্ধ। ১৮৬০-এর দশকে ‘হিন্দু বনাম মুসলমান’ এই ভাবে ভাবাই হত না। ১৮৭০-এর দশক থেকে ইংরেজরা বলতে শুরু করল, আমরা ধর্মের ভিত্তিতেই ঠিক করব, কে সংখ্যাগুরু, কে সংখ্যালঘু। তার আগে আমরা কখনও ভাবিনি যে হিন্দুরা সারা ভারতে সংখ্যাগুরু আর অবিভক্ত বাংলায় অল্পের জন্য সংখ্যালঘু! তাই দেখি, বঙ্কিমচন্দ্রের রচনায় মুঘলদের হয়ে প্রাণপণ লড়াই করছেন রাজপুত সেনাপতিরা, আকবরের মানসিংহ, কিংবা এই গল্পে জগৎসিংহ— এবং তাঁর সঙ্গে আয়েষা এবং তিলোত্তমার প্রেমের কাহিনি। সেই প্রসঙ্গে আয়েষার ওই উক্তি।

কেবল উপন্যাসই বা কেন? আমি যখন কৃষক অর্থনীতি নিয়ে কাজ করছিলাম, মন দিয়ে পড়েছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা প্রবন্ধ, বিশেষ করে ‘বঙ্গদেশের কৃষক’। কী লিখছেন তিনি? লিখছেন, ইংরেজ শাসনে হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্তের দুর্দশার কথা। ভেবেচিন্তেই এই দু’টি নাম ব্যবহার করছেন তিনি। তাই বলছিলাম, তাঁর লেখায় নেতিবাচক সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। পরে উনি ‘রিভাইভালিস্ট’ হয়ে গেলেন, এটাও পুরোপুরি ঠিক ব্যাখ্যা বলতে পারি না। ‘আনন্দমঠ’-এ অবশ্য উনি কিছু অন্য রকম কথা বললেন। অনেকের মতে, ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা তাঁর পক্ষে বলা মুশকিল বলেই মুসলমানদের বিরোধিতার কথা তাঁকে লিখতে হয়েছিল। এই মতটাও আমি আবার মানতে পারি না। বরং রণজিৎ গুহ ‘অ্যান ইন্ডিয়ান হিস্টরিয়োগ্রাফি ফর ইন্ডিয়া’-য় যেটা লিখেছেন, সেটাই সঙ্গত বলে মনে হয়— যত দিন না আমরা বাহুবল ব্যবহারে প্রস্তুত হলাম, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সত্যিকারের বিদ্রোহ প্রায় অসম্ভব ছিল— এ দিকে বঙ্কিমচন্দ্র করলেন কী, বাহুবলের ভাবনাটা ‘আনন্দমঠ’-এ বসিয়ে দিলেন ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটা ভুল পর্যায়ে। এই সমালোচনা কিন্তু খুবই বৈধ বলতে হবে।

প্র: এই একটি রচনার ভিত্তিতে কি বঙ্কিমচন্দ্রের  মূল্যায়ন করা চলে? তেমন একটা চেষ্টা দেখছি এখন পশ্চিমবঙ্গে।

উ: বঙ্কিমচন্দ্র নিয়ে নতুন পর্যালোচনা হলে তো ভাল কথা। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলি বঙ্কিমকে ‘ব্যবহার’ করার জন্য যদি নিম্ন স্তরের বিতর্ক তৈরি করে, তা হলে তাতে কান না দেওয়াই ভাল। বঙ্কিম তাঁর জীবনের শেষ দিকেও ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন— ‘সীতারাম’, ‘রাজসিংহ’। এই দুইটি পর্যালোচনা করেই রণজিৎ গুহ তাঁর ‘প্রেম না প্রতারণা’ বইতে বলেছেন, বঙ্কিম বড় মাপের ঔপন্যাসিকের সঙ্গে উঁচু মানের ইতিহাসবিদও ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ‘রাজসিংহ’-এর সমালোচনায় লেখেন: এই উপন্যাস তো সোজাসুজি ইতিহাস নয়, এটা সেই ধরনের উপন্যাস; যা ইতিহাসের উপর নির্ভর করে মানবজীবনের মহিমা ফুটিয়ে তোলে। কথাটা আমাদেরও মনে রাখা উচিত। একে আজ আমরা বলি ‘ফিকশনালাইজ়ড হিস্টরি’। তার মধ্যে নানা মন্তব্য, প্রেক্ষিত থাকতে পারে। কোনও একটাকে বার করে এনে আলাদা করে ব্যবহার করাটা অনুচিত। তাই বলছিলাম, বঙ্কিম নিয়ে আলোচনা হলে সেটা একটু উচ্চ মানের হোক।

প্র: ইতিহাসকে আজ যে ভাবে আমরা খুঁড়ে খুঁড়ে নতুন রং দিচ্ছি, সেই প্রবণতাটাও তো— আপনার ভাষায় ‘সঙ্কীর্ণ রাজনীতি’র অংশ?

উ: হ্যাঁ, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চাই না, ইতিহাসকে ‘ব্যবহার’ করতে চাই। এটাই সমস্যা।

তবে আমি আর একটা কথাও বলব। তথাকথিত রাষ্ট্রবাদী ধর্মনিরপেক্ষতাও কিন্তু অনেক সমস্যা তৈরি করে গিয়েছে। এই যে ১৯৩০-এর দশক থেকে সাম্প্রদায়িকতার একটা নতুন অর্থ তৈরি হল, সেটা তৈরি হয়েছিল তখনকার ‘ইউনিটারি’ বা একীভূত জাতীয়তাবাদের কারণেই। তার আগে  কৃষ্টিগত ভিন্নতার বিষয়টা অন্য ভাবে দেখা হত। এই রাষ্ট্রবাদী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা অনেকেই আমাদের মনীষীদের লেখাপত্র না পড়েই, তাঁদের অবস্থান ভাল করে না বুঝেই তাঁদের গায়ে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা এঁটে দিয়েছিলেন। যেমন, অরবিন্দ ঘোষ। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসবিদরা তাঁর ঠিক মূল্যায়ন করতে পারেননি বলেই হিন্দুত্ববাদীরা তাঁকে দখল করে নিতে পারল। এটা দেখেই আমি অরবিন্দের উপর ওই লেখাটা লিখেছিলাম, ‘দ্য স্পিরিট অ্যান্ড ফর্ম অব অ্যান এথিক্যাল পলিটি’। অরবিন্দ যে সব কথা বলছেন, মুঘল সাম্রাজ্য সম্পর্কে তাঁর যা মূল্যায়ন, তার সঙ্গে কোনও হিন্দুত্ববাদী  একমত হবেন না। অথচ আমরা তাঁকে এত দিন হিন্দুত্ববাদী বলেই দূরে সরিয়ে রেখেছি। কেউ ধর্মের কথা বললেই তো তিনি ধর্মান্ধ বা সাম্প্রদায়িক হয়ে যান না। বাংলার বাইরে বালগঙ্গাধর তিলককেও একই ভাবে সাম্প্রদায়িক বলা হয়ে থাকে। অথচ এই তিলকই তাঁর শেষ জীবনে খিলাফতের সবুজ পতাকাকে আশীর্বাদ করেছিলেন। সে ছবিও আছে।

প্রসঙ্গত বলি মদনমোহন মালবীয়ের কথা, যিনি বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সংসদে প্রথম বাজেট বক্তৃতায় আমি মালবীয়ের কথা তুলেছিলাম। সেই সময় বিজেপি সরকার তাঁর নামে একটি টিচার্স ট্রেনিং স্কিম-এর প্রস্তাব দিয়েছিল, তাই আমি কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে মালবীয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় অর্থনীতির পক্ষে কথা বলেছিলাম। বলার পর কংগ্রেসের কিছু সাংসদ এসে বললেন, সে কী, আমরা তো জানতাম না যে মদনমোহন মালবীয় কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন! বোঝো, এই হচ্ছে অবস্থা! কংগ্রেস সাংসদরা জানেনই না যে নেহরু-গাঁধী পরিবারের বাইরে আরও কত বড় নেতা ছিলেন, কত গুরুত্বপূর্ণ তাঁদের অবদান। এটাই তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও সারস্বত-চর্চা তৈরি করে গিয়েছে। ধর্ম বিষয়টাকে আমরা সম্পূর্ণত ধর্মান্ধদের হাতে তুলে দিয়েছি। তাই ধর্ম নিয়েই আবার নতুন করে ভাবতে হবে।

আমাদের পরবর্তী দায়িত্ব, রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে স্পষ্ট কথা বলা এবং সৎসাহস দেখানো। যেমন, শ্যামাপ্রসাদের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও বলব, আমি তাঁর মতাদর্শে বিশ্বাস করি না। কারণ— প্রথমত, তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে তেমন কোনও আত্মত্যাগ করেননি। দ্বিতীয়ত, তিনি বাঙালি হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার রাজনীতি করেছেন, অথচ সেটাও করতে পারেননি তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। দেশভাগের পর কয়েক দশক ধরে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের যে ব্যাপক দুর্দশা, তার জন্য তিনি অনেকাংশে দায়ী।

অন্য দিকে, আমাদের আর একটি রাজনৈতিক ধারা আমরা পেয়েছি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসুর মতো নেতাদের কাছ থেকে। দেশের হিন্দু-মুসলমান মানুষকে সব সময় সমান চোখে দেখেছিলেন। আজ আবার জোর গলায় বলার সময় এসেছে যে, আমরা এঁদের ধারারই উত্তরাধিকারী। বিজেপি যেটা চেষ্টা করছে, সেটা কখনও সফল হতে পারে না। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে গাঁধীজির সঙ্গে একই আসনে দীনদয়াল উপাধ্যায়কে বসানো যায় না। তেমনই বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্রের সমকক্ষ হিসেবে শ্যামাপ্রসাদকেও বসানো যায় না। এই ‘অন্য’ রাজনৈতিক ধারাটিকে তুলে ধরাটাই আমাদের কাজ। একমাত্র তা হলেই ইতিহাসকে ব্যবহার করে আজ যে ভাবে গণতন্ত্রের বদলে সংখ্যাগুরুবাদ তৈরি করার নিরন্তর প্রয়াস চলছে, সেটাকে আটকানো সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, সংখ্যাগুরুর তন্ত্র তৈরি করাটা কিন্তু গণতন্ত্র নয়— গণতন্ত্রের বিরুদ্ধতা করা।

 

সাক্ষাৎকার: সেমন্তী ঘোষ

আগামী কাল: মানবতাবাদই ছিল তাঁদের ধর্ম