সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

বিদ্যাসাগরের মাস্টারমশাই, বর্ধমানের প্রেমচন্দ্র

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠার সাক্ষী যে মানুষেরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বর্ধমানের এই ভূমিপুত্র। তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগরের পাঠগুরু, তাঁর লেখালেখির সূচনাপর্বের উৎসাহদাতা। প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশকে নিয়ে লিখছেন স্বপ্নকমল সরকার

Ishwar Chandra Vidyasagar

Advertisement

চলতি বছরটিতে পালিত হচ্ছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দু’শো তম জন্মবার্ষিকী। সে উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। ঈশ্বরচন্দ্রের গড়ে ওঠা এবং তার প্রতিভার বিকাশে নানা ভাবে যে মনীষীরা সাহায্য করেছিলেন তাঁদের কথাও এই সময়ের প্রেক্ষিতে বিচার করা প্রয়োজন। ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠার সাক্ষী যে মানুষেরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বর্ধমানের এক ভূমিপুত্র। এক দিকে, তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগরের পাঠগুরু, তাঁর লেখালেখির সূচনাপর্বের উৎসাহদাতা। এমনকি, বিদ্যাসাগরের আমন্ত্রণে সুকিয়া স্ট্রিটে আয়োজিত প্রথম বিধবা বিবাহের সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানেরও সাক্ষী। তিনি উনিশ শতকের শিক্ষক ও কবি প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ।

১৮০৬ সালে বর্ধমানের রায়নার শাকনাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। ছোটবেলায় নৃসিংহ তর্কপঞ্চাননের কাছে ব্যাকরণ শিখে ১৮২৬ সালে কলকাতার সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন প্রেমচন্দ্র। ন্যায়শাস্ত্রের অধ্যাপক নাথুরাম শাস্ত্রী অসুস্থতা হয়ে পড়ায় ১৮৩২ সালে নিজের কলেজেই অলঙ্কারশাস্ত্রের শিক্ষক নিযুক্ত হন প্রেমচাঁদ। তিন বছর পরে, ১৮৩৫ সালে তাঁর ছাত্র হয়ে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। 

ছাত্রাবস্থাতেই প্রেমচন্দ্রের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সঙ্গে বাংলার প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সংবাদ প্রভাকর’ প্রকাশের পিছনে তাঁর অবদানও কিছু কম নয়। এই কাগজেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্রের মতো সাহিত্যিক। ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর সম্পাদকীয় লিখতেন প্রেমচন্দ্র। সে সময়ে বাংলা খবরের কাগজের মাথায় একটি করে সংস্কৃত চাঁদমালা থাকার রীতি ছিল। প্রেমচন্দ্র শিরোনাম লেখায় প্রসিদ্ধ ছিলেন। এ ধরনের লেখার জন্য অনেক পত্রিকার সম্পাদকই সে কালে প্রেমচন্দ্রের কাছে আসতেন। সমাজে সংবাদপত্রের ভূমিকা নিয়ে তাঁর মতামত ছিল, ‘এক জন উপযুক্ত সম্পাদক, প্রকৃত সমাজসংস্কারক এবং নিপুণ উপদেশক অপেক্ষা সমধিক প্রতিষ্ঠাভাজন।’’ সেই সময়ের প্রায় সব কাগজেই প্রেমচন্দ্র নিয়মিত সম্পাদকীয় লিখতেন। 

সেই সময়ের বহু বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রেমচন্দ্রের নাম। মধুসূদন দত্ত ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক লিখেছেন। রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ সেই নাটক এক বার প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশকে দেখিয়ে নিতে বলায় মাইকেল নাটকের কয়েক ফর্মা এক বন্ধুর হাত দিয়ে প্রেমচন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। খুব মন দিয়ে পড়ে প্রেমচন্দ্র ফেরত দিলে সেই বন্ধুটি পাণ্ডুলিপিতে কোনও সংশোধনের চিহ্ন না দেখে বলেন, ‘‘কোথাও কোনও দাগ রাখলেন না যে আপনি।’’ প্রেমচন্দ্র উত্তরে বলেছিলেন, ‘‘দাগ দিলে সবটাই দাগাতে হত, তার চেয়ে এমন নিষ্কলঙ্ক থাকলেই বরং ভাল দেখায়!’’ পরে রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ যখন প্রেমচন্দ্র ও মধুসূদনকে মুখোমুখি বসানোর ব্যবস্থা করেন তখন তাঁকে মধুকবি বলেছিলেন, ‘‘যে জায়গাগুলিকে আমি ‘অভ্রান্ত’ বলে মনে করেছিলাম এখন তা যে ‘ভ্রমসঙ্কুল’ বুঝতে পেরেছি।’’ সেই সময়ে বেশ কয়েক জন ইংরেজ সংস্কৃত শিখতেন। তাঁদেরই এক জন ছিলেন সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল কাউয়েল। তিনিও সংস্কৃত শিখতে প্রেমচন্দ্রের সাহায্য নিতেন বলে শোনা যায়। প্রাচ্য শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রগাঢ় পণ্ডিত এই মানুষটি পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। শোনা যায় কলুটোলার কৃষ্ণমোহন মল্লিক, প্রেমচন্দ্রের কাছে ভাগবত গীতার পাঠ নিতেন। কৃষ্ণমোহনের কাছে তিনি শুনতেন ‘হ্যামলেট’-এর গল্প শুনতেন। ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকের ‘পোর্সিয়া’ চরিত্রটি প্রেমচন্দ্রকে মুগ্ধ করেছিল।

প্রেমচন্দ্র নিজেই যে শুধু কবি ছিলেন তা নয়, ছাত্রদের ভাল কবিতা পড়ে তাদের প্রশংসা করা ও লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ায় অনুপ্রেরণা দেওয়ায় তাঁর জুড়ি ছিল না। বিদ্যাসাগর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেছেন তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য প্রেমচন্দ্রের অবদান ছিল অনেকটাই। ১৮৩৮ সালে সংস্কৃত কলেজে নিয়ম হয়, স্মৃতি, ন্যায় আর বেদান্ত এই তিন বিষয়ে উঁচু শ্রেণির ছাত্রদের পরীক্ষায় মৌলিক গদ্য ও পদ্য রচনা করতে হবে। এমনকি, সেরা লেখকের জন্য ১০০ টাকা পুরস্কারও বরাদ্দ হয়। ঈশ্বরচন্দ্র পরীক্ষার হলে অনুপস্থিত দেখে প্রেমচন্দ্র তাঁকে ধরে এনে যখন জোর করে পরীক্ষায় বসালেন তখন এক ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে। বিদ্যাসাগর প্রাথমিক ভাবে এ বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেন। পরীক্ষায় লেখার বিষয়টি ছিল, ‘সত্যকথার মহিমা’। প্রেমচন্দ্রের জোড়াজুড়িতে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা প্রথম স্থান ও পুরস্কারমূল্য অর্জন করেন ঈশ্বরচন্দ্র। এ বিষয়ে বিদ্যাসাগর লিখেছেন, ‘‘তৎপরে আমি আর রচনা বিষয়ে পরাঙ্মুখ হইতাম না।’’ 

বিদ্যাসাগর এবং প্রেমচন্দ্রের সম্পর্ক ছিল বেশ বন্ধুসুলভ। বিদ্যাসাগরের পাশাপাশি, শিবনাথ শাস্ত্রীও প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশের ছাত্র ছিলেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা থেকে জানা যায়, ‘কুমারসম্ভব’ পড়ানোর সময়ে বেশ ভাববিহ্বল হয়ে পড়তেন প্রেমচন্দ্র। স্বভাবগত দিক থেকেও তিনি ছিলেন আবেগপ্রবণ। শাকনাড়া গ্রামের সৎগোপ প্রতিবেশীদের জন্য ছোটবেলায় তরজার গান লিখে দিতেন তিনি। জয়গোপাল তর্কভূষণের চতুষ্পাঠিতে পুঁথিপাঠ করার দিন গুরুর সঙ্গে মাইলের পর মাইল হেঁটে যাওয়ার সময় রাস্তার দু’পাশের দৃশ্য বর্ণনা করে কাব্য বলতে হত বালক প্রেমচন্দ্রকে। এই ভাবে ধীরে ধীরে তাঁর কবিত্বশক্তির প্রকাশ ঘটে। এমন বহু লেখা টুকরো কাগজে লিখে রাখতেন তিনি। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই কবিতাগুলির বেশিরভাগই পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ছাত্র তারাকুমার কবিরত্ন প্রেমচন্দ্রের লেখা কিছু শ্লোকের স্বচ্ছন্দ অনুবাদ করেছিলেন। ‘পুরুষোত্তমরাজাবলী’ নামে একটি কবিতার সিরিজ প্রেমচন্দ্রের মৃত্যুর প্রায় তিরিশ বছর আগে লিখতে শুরু করেও কোন অজ্ঞাত কারণে আর শেষ করে যেতে পারেননি। সংস্কৃতের পাশাপাশি, বাংলাতেও লেখালেখি করতেন প্রেমচন্দ্র। জয়গোপাল তর্কালঙ্কার জানান, আড্ডায় গল্পচ্ছলে যা কিছু বলতেন তার প্রেক্ষিতে প্রেমচন্দ্র তৎক্ষণাৎ পদ্য রচনা করতেন। এই কবিতাগুলি নিয়ে পরে ‘সমস্যাকল্পলতা’ নামে প্রেমচন্দ্রের একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল।

উনিশ শতকের এই সংস্কৃত পণ্ডিত মানুষটি বহুবিবাহ রোধ আর বিধবা বিবাহের সক্রিয় সমর্থক ছিলেন। এ ছাড়াও ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’, ‘কুমারসম্ভব’—অষ্টম সর্গ’, ‘উত্তর রামচরিত’, ‘পূর্ব্বনৈষধ’-এর টীকা রচনা করেছিলেন প্রেমচন্দ্র। হেম্যান উইলসন অশোকের শিলালিপি উদ্ধারের জন্য তাঁর সাহায্য পেয়েছিলেন। জেমস প্রিন্সেপকে ভারতের পুরাতত্ত্ব সঙ্কলনের কাজে প্রেমচন্দ্রের সহায়তা নিয়েছিললেন। উনিশ শতকের প্রখ্যাত পুরাতাত্ত্বিক রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রেমচন্দ্রের সঙ্গে সংস্কৃত কলেজে নিয়মিত দেখা করতে আসতেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য, শিবনাথ শাস্ত্রী, মদনমোহন তর্কালঙ্কার-সহ উনিশ শতকের নবজাগরণের অনেক নক্ষত্রই প্রেমচন্দ্রের ছাত্র ছিলেন। রাজা রাধাকান্ত দেবও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। 

প্রেমচন্দ্র ১৮৬৭ সালে ৬১ বছর বয়সে কাশীতে প্রয়াত হন। সম্পাদক, কবি, সমাজ সংস্কারক প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশের সঙ্গে সংস্কৃত কলেজের ৩২ বছরের সম্পর্কের কথা স্মরণে রেখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি ‘প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশের জীবনচরিত ও কবিতাবলী’ বইটি আবার প্রকাশ করেছে। ১৮৯২ সালে বইটি লিখেছিলেন প্রেমচন্দ্রের ভাই রায়বাহাদুর রামাক্ষয় চট্টোপাধ্যায়। প্রেমচন্দ্রের উত্তরপুরুষ প্রপৌত্র বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ‘প্রেমচন্দ্র ফাউন্ডেশন'’ গত বছর থেকে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের প্রসার চেয়ে প্রেমচন্দ্রের নামাঙ্কিত বাৎসরিক বৃত্তির ঘোষণা করেছেন। বর্ধমানের গ্রাম শাকনাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রেমচন্দ্রের একটি স্মৃতিসৌধ।

তথ্যসূত্র: প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশের জীবনচরিত ও কবিতাবলী

বর্ধমানের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মী

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন