• দেবাশিস ভট্টাচার্য
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

কথার চেয়ে কাজ বড়

করোনা-যুদ্ধ রাজনীতির অঙ্কেও মমতাকে এগিয়ে রাখবে

mamata

করোনা-আতঙ্ক বাড়ছে। এখনও অপ্রতিরোধ্য এই ভাইরাস বিশ্ব জুড়ে যে কালো ছায়া বিস্তার করেছে,  আমাদের দেশও তার শিকার। সংখ্যার নিরিখে অন্য কয়েকটি রাজ্যের মতো না হলেও করোনার থাবা থেকে বাংলা মুক্ত নয়।রাজপথ থেকে গৃহকোণ, ভয়ের বাতাবরণ সর্বত্র। ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন, পেশা, ব্যবসা বাণিজ্য সব টালমাটাল।

যেখানেই যাঁরা প্রশাসনে থাকেন, এইধরনের পরিস্থিতি তাঁদের কাছে খুব কঠিন সময় হয়ে আসে। বাংলা কবে এইরকম অতিমারি-তুল্য অবস্থা দেখেছে, সেটা এখন প্রায় বিস্মৃত ইতিহাস। আমরা জানি,  ১৮৯৯ সালে কলকাতায় প্লেগ মহামারির আকার নিয়েছিল। ভগিনী নিবেদিতা তখন আর্তের সেবায় পথে নেমেছিলেন। কলেরা,  বসন্ত এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগও বাংলার গ্রামগুলিতে এক সময় কালান্তক ব্যাধি বলে গণ্য হত। কালক্রমে সে-সব দিন কেটে গিয়েছে।এখনকার ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া বা চিকুনগুনিয়া নিয়ে যত শোরগোলই হোক, অতীতের ওইসব রোগের ভীতির সঙ্গে তা তুলনীয় নয়।

ফলে এইরকম যুদ্ধ-পরিস্থিতি সত্যিই এখনকার কালের এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। প্রশাসনের পরিচালক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক, সকলের পক্ষেই এটা খাটে। কলকাতা বা এই রাজ্য যেমন স্মরণকালের মধ্যে সামগ্রিক ভাবে এই রকম রোগাতঙ্কের শিকার হয়নি, তেমনই এখন যাঁরা সরকার চালাচ্ছেন বা জনসমাজ কে নানা ভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন,  তাঁদেরও আগে কখনও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়নি।

বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের বেলাতেও সেই একই কথা প্রযোজ্য। সওয়াশো কোটি জনসংখ্যার দেশে একটি নির্দিষ্ট রোগের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার নজির তাদের হাতের কাছে নেই। সেই জন্য রোগের মোকাবিলাও প্রতিষেধক বন্দোবস্তের জায়গা গুলিও খুব শক্তপোক্ত ছিল না। এই বাস্তবতার দিকটি স্বীকার না করলে ভুল হবে।

তবে অজানা বিপদের মুখে পড়ে কত তাড়াতাড়ি নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়া যায়,  সেটা অবশ্যই প্রশাসকের দক্ষতা ও বিবেচনাবোধের একটি বড় মাপকাঠি। আর সেখানেই এসে পড়ছে একটি তুলনা। কী করল দেশের সরকার, কী করল বাংলা? কী করলেন নরেন্দ্র মোদী , কী করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?

চিনের উহান প্রদেশে করোনা ভাইরাসের মারাত্মক প্রকাশ বোঝা যেতেই বিশ্বে সতর্ক বার্তা ছড়িয়েছিল। সজাগ হয়েছিল দিল্লি। রাজ্য গুলিকেও সচেতন করা শুরু হয়। গুরুত্ব বুঝে বাংলার সরকার প্রস্তুতি নিতে দেরি করেনি।অবস্থা যখন উদ্বেগ বাড়িয়েছে, ধাপে ধাপে নিজেদের করণীয় গুলি সংহত করে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলছেন মমতা। তাঁর এই সক্রিয়,  সদর্থক ভূমিকা আজ তাঁর সমালোচকেরাও নস্যাৎ করতে পারছেন না।

রোগের বিপদ সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে মানুষকে সঠিক দিশা দেখানো যে কোনও সরকারের প্রাথমিক কর্তব্য। প্রশাসনের প্রথম কাজ ইহল, রোগ যাতে ছড়াতে না পারে সেই দিকটি যথাসম্ভব নিশ্চিত করা।এই কাজটি নিজেদের মতো করে মোদী-মমতা দু’জনেই করেছেন।

কিন্তু ফারাকটা চোখে পড়ে কর্তব্যের পরবর্তী ধাপ গুলিতে। বলতেই হবে,  একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েও শুধু কিছু কথা আর ঘোষণার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধনা রেখে দ্রুত অনেকটা ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন মমতা। অন্যদিকে গোটাদেশের কর্ণধার মোদী করার চেয়ে বলাতে জোর দিয়েছেন বেশি!

জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর দু’টি ভাষণের কথাই ধরা যাক। অপেক্ষাছিল করোনা-মোকাবিলা নিয়ে তাঁর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনও সহায়তার কথা শোনার। কিন্তু মোদী প্রথম দফায় জনতা-কার্ফু এবং করোনা-যুদ্ধে শামিল চিকিৎসক- সমাজ ও অন্য সকলকে অভিনন্দন জানানোর জন্য থালা, ঘণ্টা বাজানোর ডাক দিয়ে কর্তব্য শেষ করলেন।দ্বিতীয় দফায় সারা দেশে একুশ দিন ঘরবন্দি থাকার নির্দেশের সঙ্গে ১৫হাজার কোটির তহবিল ঘোষণা করলেন বটে।তবে কী ভাবে কোন কোন খাতে কী কী বরাদ্দ, তার পরিষ্কার চিত্র মিলল না।

একথা ঠিক, ঘরবন্দি থাকা অবশ্যই এইধরনের রোগের প্রসার আটকাতে সহায়ক। কিন্তু রাজ্য গুলিকে করোনা-খাতে আর্থিক সাহায্য থেকে শুরু করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো সংশ্লিষ্টলোকেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মতো জরুরি বিষয় গুলি সম্পর্কে অদ্ভুত নীরবতা দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। মোদী এখনও এসব নিয়ে খোলাখুলি কিছু বলেননি।

আমরা জানি,  করোনায় কারও মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে চার লক্ষ টাকা এককালীন সহায়তার ঘোষণা করেও দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছে কেন্দ্র। একই সঙ্গে রোগাক্রান্তদের চিকিৎসার খরচ দেওয়ার ঘোষণাও আধ ঘণ্টার মধ্যে তুলে নেওয়া হয়। মমতা কিন্তু বহু আগেই এইরাজ্যেকরোনা-পরিষেবার সঙ্গে জড়িত সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যকর্মী-সহ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা করে বিমা চালু করেছেন। প্রথম ধাপেই গড়া হয়েছে দু’শো কোটি টাকার তহবিল। গড়া হয়েছে বিশেষ ত্রাণ তহবিলও। বিনামূল্যে চিকিৎসা হচ্ছে সরকারি হাসপাতালে। মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিয়ো- বৈঠকে মমতা দ্রুত রোগ নির্ণয়ের জন্য রাজ্যে করোনা-পরীক্ষাগার বাড়ানোর কথা তোলার পরে কয়েকটির অনুমোদন এসেছে।তবে কেন্দ্র থেকে রোগ পরীক্ষার প্রয়োজনীয় সংখ্যক কিট পেতে সময় লাগছে।

এই রাজ্যের সরকার অবশ্য ইতিমধ্যেই কয়েকশো ভেন্টিলেটর, লাখ দুয়েক মাস্ক, প্রচুর স্যানিটাইজ়ার,  হাজার দশেক থার্মাল গানের মতো জরুরি জিনিসপত্রের ব্যবস্থা করেছে। সহায়তা চাওয়া হয়েছে বেসরকারি ক্ষেত্রগুলির কাছেও। শুধু তা-ই নয়, যাঁরা দু’টাকা কেজি চাল পান,  সেই কয়েক কোটি উপভোক্তাকে আগামী ছ’মাস বিনামূল্যে চাল দেওয়ার ঘোষণাও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন ফুটপাতবাসীদের।

কেউ এ-সবের পিছনে রাজনৈতিক লাভালাভের অঙ্ক দেখতেই পারেন। কিন্তু ঘটনা হল, যাঁরা রাজনীতি করেন,  ভোটে জিতে যাঁদের ক্ষমতায় বসতে হয়, তাঁদের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় জন সমর্থনের একটি ভাবনা মাথায় কাজ করে।কোন পদক্ষেপ কত বেশি মানুষের পক্ষে উপকারী হবে, সেটা তাঁদের ভাবতে হয়। এতে দোষের কিছু নয়।

কিন্তু তার জন্য যেটা প্রথম কর্তব্য, তা হল সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ করা। কোনও দল বা সরকারের শীর্ষ নেতা হিসেবে নিজের মানবিক মুখটি তুলে ধরে মানুষকে বোঝানো। ঘটনাচক্রে, বছর পেরোলেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা।নির্ধারিত পুর নির্বাচন গুলি হয়তো কিছুটা পিছোবে। তবে আগামী দিন গুলিতে সব ভোটেই রাজ্যে করোনা- সঙ্কট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা একটি বড় বিষয় হয়ে উঠবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নাগরিকত্বের চলতি আন্দোলনের থেকে এটি কোনও অংশে কম জনস্বার্থবাহী নয়। সেখানে মমতা অবশ্যই এগিয়ে রইলেন।গোবর মাখা আর গোমূত্র খাওয়ার দাওয়াই দিয়ে এই ধারণার সমূহ বদল ঘটানো খুব সহজ হবে না বলেই মনে হয়।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন